খাঁচায় দেশী মুরগি পালন করতে চান? আজ আমরা আলোচনা করবো আধুনিক পদ্ধতিতে কিভাবে দেশী মুরগি পালন করলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং রোগ কমবে।কৃষি নির্ভর আমাদেশে দেশী মুরগি পালন প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিদেশী মুরগীর তুলনায় এর চাহিদাও যথেষ্ট বেশি। তাই তো খাঁচায় দেশী মুরগী পালন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা বেড়েছে।
একারণেই বর্তমানে আমরা অনেক জায়গাতেই ঘরে বদ্ধ অবস্থায় দেশী মুরগী পালন দেখে থাকি , যাকে খাঁচায় দেশী মুরগী পালন পদ্ধতি বলে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউট মুরগী পালন পদ্ধতি নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।সেই প্রচেষ্টারই এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি হলো “দেশি মুরগী সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প” যা দেশী জাতের মোরগ-মুরগীর উন্নতি সাধনে নিয়ে এসেছে এই খাঁচায় দেশী মুরগী পালনের সঠিক পদ্ধতি।
আপনি হয়ত লক্ষ্য করে থাকবেন যে এখন অনেকেই খোলা অবস্থায় বা ছেড়ে মুরগী পালন অপেক্ষা বদ্ধ অবস্থায় মুরগী পালন বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু মুরগী পালনের এই আধুনিক পদ্ধতি কতটা লাভজনক, চলুন তা জেনে নেই-
- খাঁচায় মুরগী পালন করলে এসকল মুরগীর রোগ-ব্যাধির পরিমাণ কম হয়।
- রোগ কম থাকায় এর উৎপাদন ক্ষমতাও বেশি হয় যাতে ফার্মের মালিক বেশ ভালো পরিমাণ লাভ করতে পারে।
- মুরগীর মৃত্যুহার হ্রাস পায়। কেননা রোগ হলে তা নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়।
- খাদ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে মেনে চলা যায়। খোলা অবস্থায় ছেড়ে রাখা মুরগী নিজের খাবার নিজেই খুঁজে নেয়। কিন্তু এসকল মুরগীকে পুষ্টিসমৃদ্ধ উন্নত খাবার দেয়া হয় যা তাদের ভালো বৃদ্ধি এনে দেয়।
- ঘরে গরম এবং ঠান্ডার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকায় মুরগীর রোগ-ব্যাধি ও অন্যান্য সমস্যা কম হয়।
খামারে দেশী মুরগী নির্বাচন
দেশী মুরগী পালন খাঁচায় করলে কতটা লাভজনক তা আমরা ইতিমধ্যে জেনে গেছি। এবার এই খাবার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক। আমাদের দেশে প্রায় ২০-২২ কোটি দেশী মুরগী পালিত হয় যেগুলো সাধারণত ৩ জাতের। কমন দেশী মুরগি,এগুলো বিভিন্ন রঙের হতে পারে। সাদা, সোনালী, বাদামী ইত্যাদি। এদের ওজন ছোট অবস্থায় (১ দিনের বাচ্চা) ২৬-৩০ গ্রাম হয়ে থাকে এবং পূর্ণবয়স্ক মুরগী ১৬০০-১৭০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। তবে এ জাতীয় মোরগ ২০০০-২৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। এই মুরগি বছরে ১৫০-১৫৫ টা পর্যন্ত ডিম দিতে পারে।
গলাছিলা মুরগি,গলায় লোম না থাকায় এরা গলাছিলা নামে পরিচিত। এরা বিভিন্ন রঙের হতে পারে।এদেরও ছোট অবস্থায় ওজন ২৭-৩৪ গ্রাম হয়। তবে পূর্ণবয়স মুরগী ১৩০০-১৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে এবং মোরগ ১৫০০-২০০০ গ্রাম।তবে এরা ওজনে কম হলেও অন্য দুই জাতের তুলনায় ডিম বেশি দেয়। বছরে ১৭০-১৮০ টা ডিম সাধারণত এ মুরগী দেয়।
আরেক ধরনের মুরগি দেখা যায়। সেগুলোর নাম হিলি।সাদা, ধূসর বা লালচের মধ্যে কালো ছিটা রঙের মুরগীগুলো হলো হিলি। এরা আমাদের দেশে প্রচলিত দেশী মুরগীগুলোর মধ্যে আকারে সবচেয়ে বড়।এরা পূর্ণবয়স্ক হলে ১৮০০-২০০০ গ্রাম হয় এবং মোরগ ২৫০০-৩০০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়।বার্ষিক ডিম উৎপাদনের পরিমাণ ১৩০-১৪০ টি।
খামার তৈরী
খাঁচায় দেশী মুরগী পালনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা আবশ্যক। আর এক্ষেত্রে মুরগী জাত নির্বাচনের পরবর্তী ধাপ হলো উপযুক্ত খামার তৈরী। মুরগীর জন্য যে খাঁচা নির্বাচন করবেন কাঠ বা অন্য যেকোনো ধাতুর হতে হবে। তবে খেয়াল রাখবেন যেনো খাঁচার শিক বেশি ঘন না হয়, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকে।প্রতি মুরগীর জন্য ৪ বর্গফুট জায়গা থাকতে হবে। এমন হিসেব করে আপনার যতটুকু জমি বা যতগুলো মুরগী আনতে চান সেই অনুযায়ী খামার তৈরী করুন।মুরগীকে আরামদায়ক রাখতে খড় বা এমন জাতীয় বস্তু দিয়ে বাসস্থান তৈরি করুন।
দেশী মুরগির জন্য খাদ্য ও পানি সরবরাহ
সঠিক উৎপাদন হারের জন্য দেশী মুরগির জন্য প্রয়োজনীয় খাবারের বিষয়ে সচেতন থাকা আবশ্যক। খাবারের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো আমি অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন-
- বাণিজ্যিক ফিড
সাধারণত ধান, গম ইত্যাদি গুঁড়া করে এই ফিড বানানো হয়। তাই এটি মুরগীর জন্য স্বাস্থ্যকর এবং সাশ্রয়ীও বটে।
- পরিপূরক
পরিপূরক হিসেবে রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট শাক বা নরম সবজির অংশ ছোট ছোট টুকরো করে দেয়া যায়। কেননা প্রোটিং ও ভিটামিন জাতীয় খাদ্য থাকা আবশ্যক।
- ফরেজিং
মুরগীকে পোকামাকড়, কৃমি, উদ্ভিদের গ্রহণীয় অংশ এগুলো দেওয়া যায়।
- স্বচ্ছ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে।
মুরগির স্বাস্থ্যসেবা
খাবার এবং উন্নত বাসস্থানের পাশাপাশি মুরগির জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবাও নিশ্চিত করতে হবে যেনো দেশী মুরগির উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত না ঘটে।।মুরগীর দুটি অতি পরিচিত রোগ হলো নিউক্যাসল এবং এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা। মুরগীর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এই দুটি রোগের বিরুদ্ধে টিকা নেয়া আবশ্যক। উকুনের মত কিছু বাহ্যিক পরজীবী অনেক সময় দেখা যায় মুরগীতে। তাই এদের বিরুদ্ধে সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিতে হবে। খামারে প্রবশের সময় অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন।খাঁচায় মুরগীর স্বাস্থ্য সংরক্ষণ করতে খামারে যেনো কোনো জীবাণু কোনোভাবেই না ছড়াতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
দেশী মুরগি পালন নিয়ে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কিছু পরামর্শ
দেশী মুরগি পালন পারতপক্ষে সহজ মনে হলেও সামান্য কিছু ভুলে পুরো ফার্ম লস হয়ে যেতে পারে। তাই কিছু বিষয় নিয়ে পরামর্শ এখানে দেয়া হলো।
- এলাকার আবহাওয়া অনুযায়ী উপযুক্ত মুরগির জাত নির্বাচন করতে হবে।
- মুরগির বিভিন্ন রোগব্যাধি (রাণিক্ষেত, গামরারো, কক্সিডিওসিস৷ ইত্যাদি) যদি একবার ছড়িয়ে পড়ে তাহলে সেই ফার্মের মুরগি রক্ষা করা কঠিন। তাই এই ভুলটির বিষয়ে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে।
- মুরগির জায়গা সংকীর্ণ হওয়া যাবে না। এতে মুরগী পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পাবে না যা স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করবে।
- ডিম পাড়ার পর ৭-১০ দিন বাচ্চাকে মুরগির কাছে রাখতে হবে যেনো মায়ের ওম পায়। তবে এরপর সাথে সাথেই বাচ্চাকে দূরে সরিয়ে নিতে হবে। এমনকি বাচ্চার আওয়াজও যেনো মায়ের কান পর্যন্ত না আসে। এতে মা খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়।
- বাচ্চা মুরগিকে মায়ের সাথে রাখার সময় তাদের জন্য আলাদাভাবে ছোট দানার খাবার রাখতে হবে।
- পর্যাপ্ত খাবার দিতে হবে। এতে দেশী মুরগির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
আমরা এতক্ষণ বাণিজ্যিকভাবে খাঁচায় দেশী মুরগী পালন পদ্ধতি সম্পর্কে জানলাম। বিশেষত ছোট ব্যবসার জন্য খাঁচায় দেশী মুরগি পালন অত্যন্ত লাভজনক। তাই উপর্যুক্ত বিষয়গুলো মেনে আপনিও চাইলে দেশী মুরগি পালনের কাজ শুরু করে দিতে পারবেন। অল্প বিনিয়োগে বেশ ভালো লাভ এতে পাওয়া সম্ভব যদি আপনি সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে সক্ষম হন।









