বাংলাদেশি জুতার বিশ্বযাত্রা: সংকটের মাঝেও প্রবৃদ্ধি

আসিয়া আফরিন চৌধুরী   বাংলাদেশি চামড়াজাত জুতার রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত চামড়াজাত জুতার রপ্তানি প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মধ্যেও এই সাফল্য চামড়া খাতের জন্য একটি আশাপ্রদ বার্তা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে মোট আয় হয়েছে ১০৩ কোটি ৯১ লাখ ডলার, যার মধ্যে চামড়ার জুতা রপ্তানি থেকে এসেছে ৫৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার। তবে, আগের বছরের তুলনায় এটি ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ কম। গত বছর চামড়ার তৈরি জুতা রপ্তানি হয়েছিল ৬৯ কোটি ৩২ লাখ ডলার।

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতে চামড়া খাতের রপ্তানি পুনরুদ্ধার হতে শুরু করে। জানুয়ারি পর্যন্ত ফিনিশড চামড়া, চামড়াজাত পণ্য এবং চামড়ার জুতা রপ্তানি হয়েছে ৬৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে, চামড়ার জুতা রপ্তানি ২৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ বেড়ে ৪০ কোটি ৩৩ লাখ ডলার হয়েছে।

রপ্তানির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ও সংকট

তবে, রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জানুয়ারি মাসে এককভাবে চামড়া খাতের রপ্তানি ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ১৭ লাখ ডলারে। চামড়ার জুতা রপ্তানি জানুয়ারিতে ৫ কোটি ৭ লাখ ডলার হয়েছে, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় কম।

এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে খাত সংশ্লিষ্টরা কয়েকটি চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেছেন:

  1. সরকারি প্রণোদনার অভাব: সরকারের তরফ থেকে চামড়া খাতের প্রণোদনা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা রপ্তানি কমার অন্যতম কারণ।
  2. উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ছে।
  3. এলডব্লিউজি (Leather Working Group) সার্টিফিকেশনের সীমাবদ্ধতা: বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এলডব্লিউজি সার্টিফিকেট থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাংলাদেশি বেশিরভাগ ট্যানারি এখনো এটি অর্জন করতে পারেনি।
  4. ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ: বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে বেরিয়ে এলে রপ্তানি সহায়তার সুবিধা হারাবে, যা এই খাতের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সম্ভাবনা

দেশে উৎপাদিত চামড়ার ২৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত হলেও, বাকি ৭৫ শতাংশ রপ্তানি করা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা নিলে আগামী চার-পাঁচ বছরে চামড়া খাত থেকে রপ্তানি আয় ৫-৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইতালি, জাপান, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চীন, হংকং, ফ্রান্স, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, এবং দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের চামড়া পণ্যের প্রধান বাজার। এসব বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি করতে হলে উৎপাদন খরচ কমানো, সরকারি নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা, এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে চামড়া প্রক্রিয়াকরণে জোর দিতে হবে।

লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (LFMEAB) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেছেন, ‘সরকার যদি চামড়া খাতের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত না করে, তাহলে বছর শেষে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।’

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমানের মতে, ‘বর্তমানে কিছু চামড়াজাত পণ্যে ১৫ শতাংশ নগদ সহায়তা থাকলেও, ২০২৬ সালের পর বাংলাদেশ যখন এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে, তখন এই সুবিধা থাকবে না। এর ফলে রপ্তানির পরিমাণ কমতে পারে।’

হলে, সংকটের মধ্যেও চামড়া শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান।

বাংলাদেশের চামড়া খাতের রপ্তানিতে সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও প্রচুর। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হলে সরকার ও ব্যবসায়ীদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, এবং বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে হবে। নীতিগত সহায়তা এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে, সংকটের মধ্যেও চামড়া শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারবে।

 

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *