Category: রেণু চাষ

  • শিং মাছের পোনা উৎপাদন পদ্ধতি

    শিং মাছের পোনা উৎপাদন পদ্ধতি

    শিং মাছ একটি বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ। এই মাছটি অত্যন- সুস্বাদু এবং জনপ্রিয়। আমাদের দেশে বেশ আগে হাওড়-বাঁওড়ে মাছটির প্রাচুর্যতা ছিল। কালের বির্বতনে প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে মাছটি আমাদের দেশ থেকে বিলুপ্ত হতে চলেছে। আমরা মাছটিকে ব্যাপকভাবে উৎপাদনের জন্য ১৯৯৮-৯৯ সালে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ‘৯৯ সালে ব্যাপকভাবে পোনা উৎপাদনে সক্ষম হয়েছি। এই মাছটি উৎপাদন করতে গিয়ে বিভিন্ন হাওড়-বাঁওড় থেকে জীবিত ব্রুড মাছ সংগ্রহ থেকে শুরু করে, ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা দক্ষ জনবল তৈরি করাসহ অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পোনা উৎপাদন ছিল অত্যন্ত- ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল একটি কাজ। আমার সমসাময়িক সময়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেও শিং মাছের প্রজনন পদ্ধতি আবিষ্কারের কথা বলা হয়েছিল। এই প্রযুক্তিতে পুরুষ শিং মাছের টেস্টিজ কেটে স্টিপিং পদ্ধতিতে ডিম সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। বাস-বে এই পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভিত্তিতে কখনই সফলতা বয়ে আনবে না। কারণ-

     চাপ প্রয়োগ পদ্ধতিতে শিং মাছের ডিমের নিষিক্তের হার সাধারণত ৫% এর বেশি হয় না যা কখনই একজন খামারি বাণিজ্যিকভাবে সফলতা পাবে না।

    বাণিজ্যিকভাবে শিং মাছের পোনা উৎপাদনের জন্য যে পরিমাণ শিং মাছের স্ট্রিপিং এর প্রয়োজন সে পরিমাণ শিং মাছকে স্ট্রিপিং করাও এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। তা ছাড়া ওই প্রযুক্তিতে বাণিজ্যিকভাবে কেউ পোনা উৎপাদন করতে পারবে না। কিছু কিছু হ্যাচারি মালিকদের টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়ে ওই প্রযুক্তিটিকে টিকিয়ে রাখার প্রানান- চেষ্টা কিছুদিন লক্ষ্য করেছি। বাস-বে সেইসব হ্যাচারি মালিকরাও কিন্তু ওই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে না। শুধু টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারের লোভে এই অনৈতিক সাক্ষাতকার দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা বাস-বে অনুসরণ করছে আমার প্রযুক্তি। প্রযুক্তি এমনই একটা জিনিস যা কোনদিন স্থায়ীভাবে ধরে রাখা সম্ভব হয় না। আমার ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। আমার এই প্রযুক্তিটি ১৯৯৯ সাল থেকে ব্যবহার করছি। ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তিটি ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।

    শিং মাছের প্রজননে আমার নিম্নলিখিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প বা বিশাল পরিসরে কৃত্রিম

    প্রজননের মাধ্যমে খুব সহজেই চাহিদা মাফিক যে কেউ শিং মাছের পোনা উৎপাদন করতে সক্ষম হবেন।

    শিং মাছ

    প্রজননক্ষম মাছ সংগ্রহ ও পরিচর্যা:
    পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, ১০/১১ মাস বয়সে একটি শিং মাছ প্রজননে সক্ষম হয়। সুস্থ ও সবল মাছ শতাংশ প্রতি পুরুষ স্ত্রী মাছ ৫০ : ৫০ অনুপাতে ২০০টি ব্রুড মাছ মজুদ করে নিয়মিতভাবে দেহের ওজনের ৫% হারে সম্পূরক খাবার দিতে হয়। ৩০% ফিস মিল, ২০% সরিষার খৈল, ৩০% অটোকুড়া, ১০% মিটবোন, ১০% ভূষি ও ভিটামিন প্রিমিক্স সহকারে সম্পূরক খাবার তৈরি করা যায়।

    প্রজননের জন্য উপযোগী স্ত্রী ও পুরুষ মাছ বাছাই:
    সাধারণত এপ্রিলের প্রথম থেকে অক্টোবর মাস পর্যন- শিং মাছের প্রজননকাল। এই সময়ে স্ত্রী মাছের পেটে ডিম ভর্তি থাকে। পুরুষ মাছ স্ত্রী মাছ থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট থাকে এবং পেট স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা যায়। প্রজনন করার জন্য পুরুষ মাছ স্বাভাবিক উদর ও স্ত্রী মাছের উদরে ডিম ভর্তি দেখে পরিপক্কতা সম্পন্ন মাছ বাছাই করে নিতে হয়।

    শিং মাছের ইঞ্জেকশন পদ্ধতি:
    দুটি হরমোননের মাধ্যমে শিং মাছকে ইঞ্জেকশন করা যায়। যথা : পি. জি. দ্রবণ দিয়ে ইঞ্জেকশন : পুরুষ ও স্ত্রী মাছকে একটি করে ডোজ দিতে হয়। স্ত্রী মাছকে ৩০ মি. গ্রা. হারে অর্থাৎ ১ কেজি মাছের জন্য ৩০ মি. গ্রা. পি. জি. এর দ্রবণ প্রয়োগ করতে হয়। এরপর প্রতি কেজি পুরুষ মাছকে ৫/১০ মি. গ্রা. পি. জি. এর দ্রবণ দিয়ে ইঞ্জেকশন করা যায়।

    এইচ.সি.জি. দ্রবণ দিয়ে:
    স্ত্রী শিং মাছকে এইচ.সি.জি. দিয়ে ইঞ্জেকশন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ৫০০০ আই.ইউ এর এইচ. সি.জি. এর একটি অ্যাম্পল দিয়ে ২/৩ কেজি স্ত্রী মাছের ইঞ্জেকশন করা যায়।

    এছাড়া কৃত্রিম প্রজননের জন্য প্রথমে মাছ বাছাই করতে হয়। এক্ষেত্রে সমপরিমাণ পুরুষ ও স্ত্রী মাছ বাছাইয়ের পর পি.জি. দ্রবণের ইঞ্জেকশন দিতে হয়। অন্য একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, পুরুষ মাছের সংক্রান- স্ত্রী মাছের চেয়ে দেড়গুণ দিলে শিং মাছ বেশি ডিম দেয়।

    প্রথমে প্রজননক্ষম উপযোগী স্ত্রী ও পুরুষ শিং মাছ সমান অনুপাতে প্রজনানঙ্গ বরাবর উপরের মাংশল স্থানে ইঞ্জেকশন করে পানির হাউজে ছেড়ে দিলে চলবে। তবে পুরুষ মাছ স্ত্রী মাছের তুলনায় কিছু বেশি দিলে সব স্ত্রী শিং মাছই ডিম ছাড়ে এবং ডিম নিষিক্তের হার ভাল হয়। ইঞ্জেকশন করে প্রাকৃতিক উপায়ে ২ ভাবে ডিম সংগ্রহ করা হয়।

    ১. হাঁপা পদ্ধতি এবং
    ২. সিস্টার্ণ পদ্ধতি।

    হাঁপা পদ্ধতি :
    প্রথমে দৈর্ঘ্যে ১২ ফুট, প্রস্থে ৮ ফুট এবং ১ সে.মি. ফাঁক বিশিষ্ট পলিথিন জাতীয় একটি হাঁপা তৈরি করতে হবে। তারপর এই হাঁপাটিকে হাউজে এমনভাবে স্থাপন করতে হবে যেন হাঁপার তলদেশ হাউজের তলা থেকে কমপক্ষে ৬ ইঞ্চি উপরে থাকে। এরপর হাউজের পানি ৩ ফুট উচ্চতায় ভরে কৃত্রিম ঝর্ণার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে স্রোতের সৃষ্টি হয়। এরপর মাছগুলোকে ইঞ্জেকশন দিয়ে হাঁপাতে ছাড়তে হবে। ইঞ্জেকশনের ১০/১২ ঘন্টা পরে প্রাকৃতিকভাবে শিং মাছ প্রজনন করবে। শিং মাছের ডিম হালকা আঠালো। ডিম দেয়ার পর ডিমগুলো হাঁপার ফাঁক দিয়ে সিস্টার্ণের তলায় পড়ে যাবে। ভোর বেলায় ডিম পারা শেষ হলে সেখান থেকে চিকন পাইপ দিয়ে সাইফন করে ডিমগুলো সংগ্রহ করতে হবে।

    সিস্টার্ণ পদ্ধতি:
    মাছকে ইঞ্জেকশন করে সিস্টার্ণে ছেড়ে দিতে হবে। ১০/১২ ঘন্টা পর শিং মাছ প্রাকৃতিকভাবে ডিম দেয়া শেষ করবে। পরে ডিমগুলোকে সাইফন পদ্ধতিতে সংগ্রহ করতে হবে। সংগৃহীত ডিমগুলো ছোট ছোট সিস্টার্ণে (২/৩ ইঞ্চি উচ্চতায় পানিতে) ছড়িয়ে দিতে হবে। পরে ওই সিস্টার্ণে ০.৫ ইঞ্চি পিভিসি পাইপকে ছিদ্র করে ঝর্ণার ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে ১৮ থেকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ডিম থেকে বাচ্চা বের হবে। বাচ্চা হওয়ার ৩ দিনের মধ্যে ডিম্বথলী শোষিত হয়ে রেনু পোনায় পরিণত হয়। বাচ্চা ফুটে বের হওয়ার ৪৮ ঘন্টা পর ডিম্বথলী থাকা অবস্থাই খাবার খেতে পারে। এরা স্বগ্রোত্রভোজী হয়ে থাকে। তাই প্রতি ৩ ঘন্টা অন-র অন-র খাবার দিতে হয়। খাদ্য হিসেবে এদের ছোট লাল কেঁচো ব্লেন্ডারে মিহি করে সপ্তাহ দেড়েক খাওয়াতে হয় অথবা আটিমিয়া ফুটিয়ে খাওয়ালে সবচেয়ে ভাল হয়। আবার সিদ্ধ ডিমের কুসুম ভাল করে ছেকে রেনুকে খাওয়ালে চলবে। রেনুর বয়স ৪/৫ দিন হলে নার্সারি পুকুরে ছাড়তে হবে। অনেকেই শিং মাছকে চাপ প্রয়োগ পদ্ধতিতে রেনু উৎপাদনের কথা বলে থাকেন। আমার মতে চাপ প্রয়োগে শিং মাছের ডিম সংগ্রহ করে কোনদিনই বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়া যায় না।

    আতুর পুকুর পোনা পালন প্রযুক্তি:
    ৫ দিন বয়সের পোনা সিস্টার্ণ বা সিমেন্টের ট্যাংক থেকে চিকন রাবার নল দিয়ে সাইফন করে রেনু পোনা বের করে নার্সারিতে ছাড়তে হবে। নার্সারি পুকুরের আয়তন ১৫/২০ শতাংশ হলে ভাল হয়। প্রথমে নার্সারি পুকুরটির তলা শুকিয়ে হালচাষ করে শতাংশ প্রতি ৫-১০ কেজি গোবর ছিটিয়ে পুকুরে শ্যালো মেশিনের স্বচ্ছ পানি দিয়ে রেনু ছাড়তে হবে।

    আতুর পুকুর প্রস্তুতির উল্লেখযোগ্য দিক:
    ১. আতুর পুকুর বা নার্সারি পুকুরে যাতে কোন প্রকার ব্যাঙ, সাপ বা অবাঞ্ছিত কোন প্রাণী না ঢুকতে পারে সে জন্য পুকুরের চারপাশ জাল দিয়ে ভালভাবে ঘের দিতে হবে।
    ২. নার্সারি পুকুরে অতিরিক্ত খাদ্য প্রয়োগ করা যাবে না।
    ৩. নার্সারি পুকুরের খাদ্য হিসেবে ৫০% কুড়া এবং ৫০% শুটকি মাছের গুঁড়া একত্রে মিশ্রিত করে প্রতিদিন রেনুর ওজনের ২০০% প্রয়োগ করতে হবে।
    ৪. এরা সাধারণত রাতে খেতে পছন্দ করে। তাই খাবার রাতে ২বার প্রয়োগ করা যেতে পারে।

     

  • মাছের রেণু পোনা চাষ পদ্ধতি: চারা পোনা চাষে ক্ষতিকারক রোগ-বালাই দমণ

    মাছের রেণু পোনা চাষ পদ্ধতি: চারা পোনা চাষে ক্ষতিকারক রোগ-বালাই দমণ

    মাছ চাষে মানসম্মত পোনার ভুমিকা অপরিসীম। হ্যাচারি থেকে রেণু পোনা সংগ্রহ করে তা লালন পালন করার জন্য পুকুরে রেখে ৫-১০ সেঃমিঃ বা ৭-১২ সেঃমিঃ পর্যন্ত বড় করে চাষের পুকুরে ছাড়ার পদ্ধতিকেই রেণু পোনা চাষ পদ্ধতি বলে। মাছ চাষের পূর্বশর্ত হচ্ছে সুস্থ্য সবল উন্নত জাতের পোনা সরবরাহ নিশ্চিত করা।

    রেণু অবস্থায় মাছের জীবন চক্র অত্যন্ত নাজুক থাকে। এজন্য আলাদাভাবে বিশেষ যত্নে পালনের জন্য রেণু সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। সাধারণত দুই ভাবে রেণু পোনা সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। একটি উৎস হচ্ছে নদী অন্যটি হ্যাচারি। হালদা, পদ্মা, যমুনা, আড়িয়াল খাঁ প্রভৃতি নদী থেকে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে বিভিন্ন মাছের রেণু ধরা পড়ে।

    ভালো রেণু পোনা

    ভালো রেণু বা মানসম্মত রেণু কোথায় পাওয়া যাবে তা কিভাবে পাওয়া যাবে এটা অনেকেরই প্রশ্ন থাকে। এবং নদী নালা থেকে প্রাপ্ত বা প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরিত রেণু পোনা ভালো নাকি হ্যাচারির উৎপাদিত রেণু পোনা ভালো এটাও অনেকেরই প্রশ্ন। স্বাভাবিকভাবেই নদী থেকে প্রাপ্ত রেণু পোনার মান ভাল হয়ে থাকে কারণ পরিপূর্ণ এবং অনুকুল প্ররিবেশে পরিপক্ক মাছের প্রজনন ঘটে থাকে নদীতে।

    নদীর আহরিত রেণুতে বিভিন্ন প্রজাতির মিশ্রণ থাকে তাই বাছাই করা সহজ হয় না বলে এ ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। অন্যদিকে হ্যাচারির রেণুতে প্রজাতির মিশ্রন না ঘটিয়ে নিদিষ্ট প্রজাতির রেণু সংগ্রহ ও লালন-পালন করা সম্ভব হয়ে থাকে। তবে ব্রুড মাছের মান ঠিক মত নিয়ন্ত্রন না করা হলে এবং হ্যাচারি ব্যাবস্থাপনায় অসতর্ক হলে নিম্নমানের রেণু বা সংকর জাতের রেণু উৎপাদিত হতে পারে। যা পরে চাষীর ক্ষতির কারণ হতে হবে।

    রেণু লালন পালনের পুকুর প্রস্তুত

    রেণু পোনা লালন পালনের জন্য বিভিন্ন ধরনের অগভীর বার্ষিক পুকুর বা চাষাবাদ মৌসুমে পানির ব্যবস্থা থাকে এমন পুকুর রেণু লালনের জন্য উত্তম। রেণু মজুদ পুকুর সংলগ্ন বা পার্শ্ববর্তী স্থানে অপেক্ষাকৃত ঢালু এবং যে স্থানে সবসময় পানি প্রাপ্তির সুবিধা আছে এমন স্থানে রেণু প্রতিপালনের পুকুর নির্মাণ করা ভাল। পোনার চাহিদা অনুযায়ী কয়েকটি মজুদ পুকুরের পাশে রেণু প্রতিপালনের পুকুর তৈরি করলে বেশি লাভবান হওয়া যায়।

    প্রতিপালন স্থানের অবকাঠামো

    রেণু পোনা প্রতিপালন পুকুর নির্বাচনে যে বিষয় গুলোর উপর খেয়াল রাখতে হবে-

    • পুকুরের চারপাশ উচু, মজবুত থাকতে হবে
    • পুকুর বন্যামুক্ত হতে হবে
    • পুকুরে পর্যাপ্ত রোদ, আলো-বাতাস থাকবে
    • পুকুরে ছায়া সৃষ্টি করে কিংবা পাতা পানিতে পড়ে পানি নষ্ট হয় এমন কোন গাছপালা পুকুরপাড়ে থাকা যাবেনা
    • বর্ষাকালে পুকুরের পানির গভীরতা দুই মিটারের বেশি হওয়া যাবে না
    • পুকুরের তলদেশে বেশি পরিমানে কাঁদা থাকবে না
    • রেণু প্রস্তুতের পুকুরের আয়তন ১০-১৫ শতাংশ হতে পারে।

    চুন সার প্রয়োগ

    পুকুর প্রস্তুতির দ্বিতীয় ধাপে পুকুরের তলদেশের মাটি সূর্যালোকে শুকিয়ে গেলে পুকুরের তলদেশে লাঙ্গল দিয়ে ভালভাবে চাষ করে শতাংশ প্রতি ১ কেজি হারে চুন পাড়সহ সমস্ত পুকুরে প্রয়োগ করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় পুকুরের তলদেশের পরজীবি প্রাণী মারা যায় এবং পুকুরের পানি কিছুটা খারযুক্ত হয়। যদি পানি নিস্কাশন না করে রোটেনন প্রয়োগ করা হয় তাহলে রোটেনন প্রয়েগের ৩-৫ দিন পর চুন দিতে হবে।

    নতুন ও পুরাতন উভয় পুকুরেই সার দিতে হবে প্রথমে রাক্ষুসে মাছ অপসারণ বা সম্ভব হলে শুকানের পর শতাংশ প্রতি ৫-৭ কেজি গোবর বা ৮-১০ কেজি কম্পোস্ট সার অথবা হাঁস মুরগির বিষ্ঠা ৩-৫ কেজি এবং ১০০-১৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৫০-৭৫ গ্রাম টিএসপি একই সঙ্গে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। প্রতি তিনমাস পরপর চুন প্রয়োগ করলে পুকুরের স্বাস্থ্যকর অবস্থা বজায় থাকে। এক্ষেত্রে চুনের মাত্রা হবে প্রাথমিক মাত্রার ১/৪ ভাগ থেকে ১/২ ভাগ।

    পুকুরে পানি সেচ দেওয়া

    পুকুর শুকানো হলে চুন প্রয়োগের ২-৩ দিন পর পুকুরে নিরাপদ উৎস থেকে ২-২.৫ ফুট পরিমাণ পানি প্রবেশ করাতে হবে। পানি উত্তোলেনের ক্ষেত্রে গভীর নলকুপের বা শ্যালো ইঞ্জিনের দ্বারা মাটির নীচের পানি প্রবেশ করানো ভালো।

    যদি পুকুর বা অন্য ডোবা থেকে পানি প্রবেশ করানো হয় সেক্ষেত্রে অবশ্যই আগে পাইপের মুখে ফিল্টার নেট বা নালায় জাল দিয়ে পানি ছেঁকে প্রবেশ করাতে হবে, যাতে এ পানির সঙ্গে অন্য কোনো জলজ প্রাণী, কীতপতঙ্গ, রাক্ষুসে ও অচাষকৃত মাছ প্রবেশ করতে না পারে।

    ক্ষতিকর জলজ কীতপতঙ্গ দমন

    নার্সারি পুকুরে সার প্রয়োগের ৩-৪ দিনের মধ্যেই পানির বর্ণ সবুজ হয় এবং প্লাংক্টনসহ অন্যান্য বেশকিছু প্রজাতির ক্ষতিকর জলজ কীতপতঙ্গ জন্মায়। যেমন- হাঁসপোকা, ব্যাঙাচী, ক্লাডেসিরা, বড় প্রানীকনা (মাখন পোকা) ইত্যাদি।

    এসব কীতপতঙ্গ থাকলে রেণুর মড়ক হয়, রেণু পোনা খেয়ে ফেলে অথবা পেটকেটে মেরে ফেলে এবং খাদ্যের জন্য রেণুর সাথে প্রতিযোগিতা করে। এজন্যই রেণু ছাড়ার আগে এদের নিয়ন্ত্রন করতে হবে।

    ৬-১২ গ্রাম শতাংশ প্রতি ৩০ মে.মি. পানি হিসাবে ডিপটারেক্স ব্যবহার করতে হবে তাহলে হাঁসপোকা, ব্যাঙাচী, ক্লাডেসিরা, বড় প্রানীকনা (মাখন পোকা) কপিপোড ইত্যাদি মারা যাবে। কিন্তু রেণু পোনার খাদ্য রটিফার ঠিকই বেঁচে থাকবে।

    এছাড়া পুকুরে প্রতি শতাংশে ১২০-১৩০ মিলি হারে কেরোসিন বা ডিজেল প্রয়োগ করলে জলজ কীতপতঙ্গ আংশিক দমন পাওয়া যায়। জলজ কীতপতঙ্গ দমনের জন্য ডিপটারেক্স ব্যবহারের পর জাল টেনে মরা পোকা ছেঁকে তুলে দিতে হবে।

    রেণু পোনা মজুদ

    রেণু পালনের সময়কাল এবং পুকুরের আয়তনের উপর ভিত্তি করে রেণু মজুদের ঘনত্ব নির্ভর করে। রেণু থেকে চারা পোনা (৭-১৫ সে.মি.) পর্যন্ত একই পুকুরে বড় করার পদ্ধতিকে এক স্তর পদ্ধতি বলে।

    আবার যদি একটি ছোট পুকুরে রেণু পোনা ছেড়ে ১০-১৫ দিন লালন পালন করে অন্য কয়েকটি পুকুরে কম ঘনত্বে ধানি পোনা স্থানান্তর করা হয়, তাহলে সে পদ্ধতিকে দ্বি-স্তর পদ্ধতি বলে।

    প্রথম পদ্ধতি থেকে তিনগুন বেশি রেণু পোনা মজুদ করা যায়। একস্তর পদ্ধতিতে রেণু পালনের জন্য শতাংশে ৬-৮ গ্রাম ও দ্বি-স্তর পদ্ধতির জন্য ২৫-৩০ গ্রাম রেণু পোনা মজুদ করা সম্ভব।

    সর্তকতা

    রেণু পরিবহনকালীন সময় অক্সিজেন ব্যাগে বহন করতে হবে এবং পরিবহনের সময় ধকল যত কম হবে, রেণু পোনার মৃত্যুর হার তত কম হবে। পুকুরে রেণু ছাড়ার আগে রেণুর ব্যাগের পানির এবং পুকুরের পানির তাপমাত্রা সমতায় নিয়ে আসতে হবে। রেণু ছাড়ার সময় পুকুরের পাড়ের কাছাকাছি ছাড়তে হবে। রেনু ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় সকালে বা বিকালে ছাড়া উচিত ।

    উপরোক্ত বিষয় গুলি ভাল ভাবে মেনে রেণু পোনা চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করলে চাষী লাভবান হবে।

  • মাছের পোনা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা

    মাছের পোনা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা

    বাংলাদেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে মাছের ভূমিকা অপরিসীম। দেশের প্রায় ৮০% মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছের পোনা সংগ্রহ দিনদিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পাশাপাশি রুই, কাতলা, মৃগেল ও শিং-মাগুরের মতো চাহিদাসম্পন্ন প্রজাতির পোনা উৎপাদনে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়, প্রশিক্ষিত জনবল ও টেকসই বিনিয়োগ।

    বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১.৪ লাখ কেজি মাছের পোনা উৎপাদন হয়, যার মধ্যে ৬৫% আসে সরকারি ও বেসরকারি হ্যাচারি থেকে। বাকিটা নির্ভর করে নদী ও প্রাকৃতিক উৎসের ওপর। কিন্তু প্রাকৃতিক উৎসের পোনার গুণগত মান ও সরবরাহ অনিশ্চিত। বিশেষ করে ইলিশের পোনা সংগ্রহ নিষিদ্ধ হওয়ায় এবং নদীদূষণ বেড়ে যাওয়ায় হ্যাচারির গুরুত্ব বেড়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৯৮২টি রেজিস্টার্ড হ্যাচারি রয়েছে, যার মধ্যে ৮০টিই সরকারি। তবে এসব হ্যাচারির সিংহভাগই আধুনিক প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে পোনার মান নিয়ন্ত্রণহীনতা, রোগবালাই ও উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় চাষিদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

    স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রথম শর্ত হলো উন্নত মানের পোনা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৩০% হ্যাচারিতে পোনার মৃত্যুর হার ৫০% ছাড়িয়ে যায়, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। এ সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানীরা জেনেটিক্যালি সুপিরিয়র ব্রুডস্টক (মা-মাছ) তৈরি, রোগ প্রতিরোধী পোনা উৎপাদন ও হ্যাচারি ব্যবস্থাপনায় অটোমেশনের ওপর জোর দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে বিএফআরআই ‘জিএসটি’ নামে রুই মাছের একটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে, যা সাধারণ পোনার চেয়ে ২০% দ্রুত বাড়ে। এ ধরনের উদ্ভাবন উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক।

    প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোও জরুরি। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম (আরএএস) ব্যবহার করে অল্প পানি ও জায়গায় উচ্চমাত্রায় পোনা উৎপাদন করা হয়। এই প্রযুক্তি পানির পিএইচ, অক্সিজেন ও তাপমাত্রা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যা পোনার বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে কয়েকটি বেসরকারি হ্যাচারিতে আরএএস পদ্ধতি চালু হয়েছে। খুলনার একটি হ্যাচারির মালিক মো. সাকিব হাসান বলেন, “আরএএস ব্যবহার করে পোনার উৎপাদন তিন গুণ বেড়েছে। বিদ্যুৎ খরচ বেশি হলেও লাভের পরিমাণ সন্তোষজনক।”

    দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে হলে পোনার মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। মৎস্য অধিদপ্তরের হ্যাচারি ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতিটি হ্যাচারিতে ওয়াটার টেস্টিং ল্যাব, কোয়ারেন্টাইন সিস্টেম ও ট্রেন্ড টেকনিশিয়ান থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই নিয়মের প্রয়োগে শিথিলতা রয়েছে। অনেক হ্যাচারি মালিক অভিযোগ করেন, লাইসেন্স নবায়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া জটিল এবং দুর্নীতিগ্রস্ত। এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. খলিলুর রহমান বলেন, “হ্যাচারিগুলোকে আধুনিকায়নে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে, যারা নিয়মিত পরিদর্শন করবে।”

    গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশে মাত্র ০.৫% জিডিপি গবেষণায় ব্যয় হয়, যার খুব সামান্যই মৎস্য খাতের জন্য বরাদ্দ। অথচ থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের জিডিপির ২% এর বেশি গবেষণায় খরচ করে, যা তাদেরকে বিশ্বব্যাপী পোনা রপ্তানিতে শীর্ষ位置上 এনেছে। বাংলাদেশে ক্রাইওপ্রিজারভেশন (শুক্রাণু হিমায়ন) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিরল প্রজাতির মাছের জেনেটিক মেটেরিয়াল সংরক্ষণ, আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন ও হাইব্রিড পোনা উৎপাদনের মতো প্রকল্প হাতে নেওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

    প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি এই খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। দেশে প্রায় ৫০ হাজার হ্যাচারি কর্মী রয়েছেন, যাদের মধ্যে মাত্র ১৫% ফরমাল ট্রেনিং পেয়েছেন। এ অবস্থা改善 করতে মৎস্য অধিদপ্তর ও এনজিওগুলোর যৌথ উদ্যোগে প্রশিক্ষণ কর্মশালা বাড়ানো হচ্ছে। কুমিল্লার একটি হ্যাচারিতে কাজ করা শিমুল মিয়া বলেন, “প্রশিক্ষণের পর পোনার খাবার দেওয়া ও রোগ চিহ্নিত করার দক্ষতা বেড়েছে। এখন পোনার মৃত্যুহার ১০% এর নিচে।”

    সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও এগিয়ে আসছে। ইস্পাহানি অ্যাগ্রো লিমিটেডের মতো কোম্পানিগুলো উচ্চপ্রোটিন সম্পন্ন পোনার খাবার তৈরি করছে, যা বৃদ্ধির হার বাড়ায়। এ ছাড়া স্টার্টআপগুলো হ্যাচারি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ও আইওটি-ভিত্তিক মনিটরিং সিস্টেম চালু করেছে, যা ডিজিটাল পদ্ধতিতে উৎপাদন তদারকি করে।

    স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের আরেকটি বড় পদক্ষেপ হলো স্থানীয় প্রজাতির পোনা সংরক্ষণ। বাংলাদেশে ২৬০টি দেশীয় মাছের প্রজাতি রয়েছে, যার অনেকগুলোই বিলুপ্তির পথে। মিঠাপানির শিং, মাগুর, পাবদা ও গুলশা মাছের কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি ইতিমধ্যে উদ্ভাবিত হয়েছে। ময়মনসিংহের একটি হ্যাচারিতে গুলশা মাছের পোনা উৎপাদন করে সাফল্য পেয়েছেন ড. মো. আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, “দেশীয় মাছের চাহিদা বাড়ছে। এসব পোনার উৎপাদন বাড়ালে আমদানিনির্ভরতা কমবে।”

    জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নেওয়া হচ্ছে বিশেষ উদ্যোগ। লবণাক্ততা সহিষ্ণু পোনা উৎপাদনের জন্য সাতক্ষীরা ও খুলনার হ্যাচারিগুলোতে গবেষণা চলছে। ইতিমধ্যে ‘সালাইন-রেজিস্ট্যান্ট রুই’ এর ট্রায়াল সফল হয়েছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলে চাষের জন্য উপযোগী।

    তবে এই পথে এখনো কিছু বাধা রয়ে গেছে। ক্ষুদ্র হ্যাচারি মালিকদের মাঝে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত, ব্যাংক ঋণে সুদের হার বেশি এবং বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। নরসিংদীর একটি হ্যাচারির মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, “জেনারেটর চালানোর ডিজেল খরচ মেটাতে গিয়ে লাভের অঙ্কটা কমে যায়। সরকার যদি সোলার এনার্জি সাবসিডি দেয়, তাহলে খরচ কমানো যেত।”

    ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় সরকার ই-ফিশারিজ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে পোনার চাহিদা-জোগান, মূল্য ও মান নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এ ছাড়া ‘ব্লু ইকোনমি’ কর্মসূচির আওতায় সামুদ্রিক মাছের পোনা উৎপাদনে গবেষণা বাড়ানো হবে।

    সর্বোপরি, মাছের পোনা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কেবল মৎস্য খাতের জন্যই নয়, সমগ্র অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদার ও রপ্তানি আয় বাড়াবে। গবেষণা, প্রযুক্তি ও নীতিগত সমর্থনের সমন্বয়ে বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জন করে বিশ্বে রোল মডেল হয়ে উঠতে পারে।

  • রেনু পোনার প্রস্তুতি

    রেনু পোনার প্রস্তুতি

    মাছ চাষে মানসম্মত পোনার ভূমিকা প্রশ্নাতীত। মজুদ পুকুরে ছাড়ার জন্য নির্বাচিত পোনা আলাদাভাবে লালন-পালন করে চাষের উপযোগী করা হয়। এ জন্য আলাদাভাবে বিশেষ যত্নে পালনের জন্য রেণু সংগ্রহ করা হয়। সাধারণত দুটো উৎস থেকে রেণু সংগ্রহ করা সম্ভব। একটি উৎস হচ্ছে নদী এবং অন্যটি হ্যাচারি। হালদা, পদ্মা, যমুনা, আড়িয়াল খাঁ প্রভৃতি নদী থেকে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে বিভিন্ন মাছের রেণু ধরা পড়ে। যাঁরা হ্যাচারি থেকে রেণু সংগ্রহ করে পালন করে থাকেন, তাঁরা এখন থেকেই কাজ শুরু করতে পারেন।

    ভালো রেণু : মানসম্মত রেণু কোথায় পাব বা কিভাবে পাওয়া যাবে এটা অনেকেরই প্রশ্ন। তা ছাড়া নদী থেকে প্রাপ্ত বা প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরিত রেণু ভালো, নাকি হ্যাচারির উৎপাদিত রেণু ভালো-এটাও অনেকেরই প্রশ্ন। সাধারণত পরিপূর্ণ এবং অনুকূল পরিবেশে পরিপক্ব মাছের প্রজনন ঘটে বলে স্বাভাবিকভাবেই নদী থেকে প্রাপ্ত রেণুর মান ভালো হয়। তবে এ ক্ষেত্রে যে সমস্যা হতে পারে তা হচ্ছে, বিভিন্ন প্রজাতির রেণুর মিশ্রণ থাকে বলে তা বাছাই করা সহজ হয় না। অন্যদিকে হ্যাচারির রেণুতে প্রজাতির মিশ্রণ না ঘটিয়ে নির্দিষ্ট প্রজাতির রেণু সংগ্রহ ও লালন-পালন করা সম্ভব, তবে ব্রুড মাছের মান নিয়ন্ত্রণ না করলে এবং হ্যাচারির ব্যবস্থাপনায় সতর্ক না হলে নিম্নমানের রেণু বা সংকর জাতের মাছের রেণু উৎপাদিত হতে পারে, যা পরে চাষির ক্ষতির কারণ হতে পারে।

    রেণু লালনের পুকুর প্রস্তুত সাধারণত অগভীর বার্ষিক পুকুর বা চাষের মৌসুমে পানি থাকে এমন মৌসুমি পুকুর রেণু লালনের জন্য উত্তম। রেণু লালনের জন্য পুকুর হবে-পুকুরের চার পাড় উঁচু, বন্যামুক্ত ও মজবুত হতে হবে এবং পুকুরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকবে। বর্ষাকালে পানির গভীরতা দুই মিটারের বেশি হবে না। পুকুরের তলদেশে বেশি কাদা থাকবে না। পুকুরের আয়তন ১০-৫০ শতাংশ হতে পারে।

    পুকুর : পুকুর নতুনভাবে প্রস্তুত বা কাটা হলে রাক্ষুসে মাছ বা অন্যান্য মাছ অপসারণের ঝামেলা থাকে না, তবে পুরনো পুকুর হলে সম্পূর্ণ পানি শুকিয়ে তলদেশে রোদ লাগাতে হবে এবং একই সঙ্গে পুকুরের পাড় মেরামত এবং পাড়ের গাছপালা বা আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। যদি পানি শুকানো সম্ভব না হয়, তাহলে রোটেনন (নির্ধারিত মাত্রায়) ব্যবহারের মাধ্যমে রাক্ষুসে মাছ এবং আগাছাসহ সব জলজ প্রাণী নির্মূল করা আবশ্যক।

    চুন সার : পুকুর প্রস্তুতির দ্বিতীয় ধাপে প্রতি শতাংশে এক কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে। নতুন ও পুরনো উভয় পুকুরেই সার প্রয়োগ করতে হবে, প্রথমে রাক্ষুসে মাছ অপসারণ বা সম্ভব হলে পুকুর শুকানোর পর প্রতি শতাংশে পাঁচ-সাত কেজি গোবর বা কম্পোস্ট আট-দশ কেজি বা হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা তিন-পাঁচ কেজি এবং ১০০-১৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৫০-৭৫ গ্রাম টিএসপি একই সঙ্গে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।

    পানি প্রবেশ : সার প্রয়োগের পরপরই নিরাপদ উৎস থেকে ২-২.৫ ফুট পরিমাণ পানি সরবরাহ করতে হবে। তবে অবশ্যই প্রাকৃতিক উৎস থেকে পানি প্রবেশ করালে তার আগে পাইপের মুখে বা নালায় জাল স্থাপন করতে হবে, যাতে এ পানির সঙ্গে অন্য কোনো জলজ প্রাণী বা কীট বা মাছ প্রবেশ করতে না পারে। পানি প্রবেশের চার-পাঁচ দিন পর পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য বা প্লাংটন জন্মাবে এবং এ সময় পানির রং হালকা সবুজ হবে।

    কীটপতঙ্গ দমন : সার প্রয়োগের পর বেশ কিছু প্রজাতির কীটপতঙ্গও দেখা যায়, যা রেণুর জন্য ক্ষতিকর। যেমন- ক্লাডোসিরা, হাঁসপোকা প্রভৃতি। এসব কীট থাকলে রেণুর মড়ক হয়। এ কারণে রেণু ছাড়ার আগে এদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সাধারণত রেণু ছাড়ার দু-এক দিন আগে ৬-১২ গ্রাম/শতাংশ/প্রতি ৩০ সেমি পানি হিসেবে ডিপটারেক্স ব্যবহার করতে হবে, তাহলে ক্লাডোসিরা, হাঁসপোকা এবং কপিপোড মারা যাবে। তবে রেণুর খাদ্য রটিফার ঠিকই বেঁচে থাকবে। ডিপটারেক্স পাওয়া না গেলে রেণু ছাড়ার ১২-১৫ ঘণ্টা আগে পুকুরে ২-৩ মিলি/শতাংশ/৩০ সেমি পানি হিসেবে সুমিথিয়ন প্রয়োগ করলেও সুফল পাওয়া যাবে। তা ছাড়া শতাংশ প্রতি ১২০-১২৫ মিলি হারে কেরোসিন বা ডিজেল প্রয়োগ করেও জলজ পোকা আংশিক দমন করা যায়। জলজ পোকা দমনের জন্য ডিপটারেক্স বা সুমিথিয়ন ব্যবহারের পর মশারির জাল টেনে মরা পোকা ছেঁকে তুলে নেওয়া আবশ্যক।

    রেণু মজুদ : রেণু মজুদ ঘনত্ব নির্ভর করে রেণু পালনের সময়কাল এবং পুকুরের আয়তনের ওপর ভিত্তি করে। যদি একই পুকুরে রেণু পোনা ছেড়ে চারা পোনা (৭-১৫ সেমি) পর্যন্ত বড় করা হয়, তাহলে তাকে ‘এক স্তর পদ্ধতি’ বলে আবার যদি একটি ছোট পুকুরে রেণু ছেড়ে কয়েক দিন পর অন্য কয়েকটি পুকুরে কম ঘনত্বে ধানি পোনা স্থানান্তর করা হয়, তাহলে সে পদ্ধতিকে বলে ‘দ্বি-স্তর পদ্ধতি’। এ ক্ষেত্রে প্রথম পদ্ধতির প্রায় তিন গুণ রেণু মজুদ করা যায়। একস্তর পদ্ধতিতে রেণু পালনের ক্ষেত্রে শতাংশে ৬-৮ গ্রাম এবং দ্বি-স্তর পদ্ধতিতে ২৫-৩০ গ্রাম রেণু মজুদ করা সম্ভব।

    সতর্কতা : অক্সিজেন ব্যাগে রেণু পরিবহন করতে হবে এবং পরিবহনকালীন ধকল যত কম হবে, পোনা মৃত্যুর হার তত কম হবে। রেণু ছাড়ার আগে পুকুরের পানি এবং রেণুর ব্যাগের পানির তাপমাত্রা সমতায় আনতে হবে। পুকুরের পাড়ের কাছাকাছি রেণু ছাড়তে হবে। সকাল বা বিকেলে ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় রেণু ছাড়া উচিত।

    খাবার : রেণুর পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য থাকা আবশ্যক। এ কারণে রেণু পালন পুকুরে নিয়মিতভাবে সার প্রয়োগে ভালো ফল পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতি শতাংশে দৈনিক গোবর ২০০ গ্রাম বা কম্পোস্ট ৩০০-৪০০ গ্রাম বা হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ১৫০-২০০ গ্রাম এবং ইউরিয়া চার-পাঁচ গ্রাম ও টিএসপি তিন গ্রাম একত্রে পানিতে গুলে তা প্রয়োগ করা যেতে পারে। তা ছাড়া সম্পূরক খাবার হিসেবে চালের কুঁড়া এবং সরিষার খৈল প্রয়োগ করা যায়। এ ক্ষেত্রে কুঁড়া ও খৈল ৫০: ৫০ অনুপাতে প্রয়োগ করা যায়।
    লেখক: মোহাম্মদ তারেক সরকার