বর্তমানে সচেতন কৃষক যারা তারা ফসলের রোগ-বালাই নিয়ন্ত্রণে প্রাকৃতিক উপায়ে প্রতিরোধের কৌশল সম্পর্কে জানতে চান। কেননা এতে একদিকে যেমন ফলন বাড়ে, তেমনি বেশ ভালো পরিমাণ ফলনও পাওয়া যায়।ফসলের রোগ-বালাই নিয়ে যদি আপনিও দুশ্চিন্তায় থাকেন তবে অবশ্যই আপনার জেনে নেয়া উচিত প্রাকৃতিক উপায়ে প্রতিরোধের কৌশল। কারণ এসব কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।
তাই এখন আমরা এ সম্পর্কে বিষদভাবে জানব যেনো আমাদের কৃষক ভাইয়েরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করতে পারেন।
ফসলের রোগ-বালাই: কৃষিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ
ফসলের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে কৃষক ভাইয়েরা দুশ্চিন্তায় দিন পার করেন, কারণ বর্তমানে এটি কৃষিক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের প্রায় ১৫-২০% ফসল নিয়মিত নষ্ট হয় রোগ-ব্যাধি এবং পোকামাকড়ের আক্রমণে। যার ফলে, বাংলাদেশ কৃষি এতটা উন্নত হওয়ার পরেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারছে না। একইসাথে, অনেক কৃষককেই লোকসান গুণে বেশ মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
পাশাপাশি, উৎপাদন কম থাকায় সাধারণ জনগণও ন্যায্যমূল্যে খাদ্য কিনতে পারছে না। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে নাভিশ্বাস উঠেছে সবারইম তাই ফসলের রোগ-বালাই নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।
প্রাকৃতিক উপায়ে রোগ প্রতিরোধের গুরুত্ব
উপরিউক্ত অংশ থেকে আমরা দেখেছি, রোগ-ব্যাধির কারণে আমাদের কৃষি কতটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। তাই কৃষি ক্ষেত্রে কর্মরত বিজ্ঞানী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এখন মূল উদ্দেশ্য ফসলের রোগ-বালাই চিহ্নিতকরণ এবং ফসলের রোগ-বালাইয়ের বিরুদ্ধে জৈব লড়াই।
কিন্তু কেনো জৈব লড়াই? কেননা বর্তমানে ফসলের রোগ বেশি। তাই কীটনাশকের পরিমাণও বেড়েছে। এত বেশি কীটনাশক ব্যবহারের ফলে খাদ্য দূষিত হয়ে যাচ্ছে।
তাৎক্ষণিক আমরা বুঝতে না পারলেও বেশ দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ছে শরীরে যা ক্যান্সার জাতীয় ভয়াবহ রোগের রূপ নিচ্ছে। একারণেই প্রাকৃতিক উপায়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ করাই এখন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
জৈবিক বালাইনাশক ব্যবহার এবং এর কার্যকারিতা
ইতোমধ্যে, আমরা জেনেছি প্রাকৃতিক উপায়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ কতটা জরুরী। আর তার অন্যতম একটি অংশ হলো জৈবিক বালাইনাশক। ছত্রাকজনিত রোগ প্রতিরোধ, ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে।জৈব বালাইনাশক তৈরী করা হয় উদ্ভিদ বা প্রাণির জৈব অংশ থেকে। ফলে এর থেকে কোনো দূষণ ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকেনা। প্যাকেটজাত উপায়ে বাজারে এগুলো বিক্রি হয় যা বিভিন্ন রোগে উপকারী।
প্রাকৃতিক সার এবং ফসলের রোগ প্রতিরোধ

জমিতে পরিমিত ফসল পেতে চাইলে এবং রোগ-ব্যাধি কমাতে চাইলে কম্পোস্ট এবং প্রাকৃতিক সার ব্যবহার অত্যন্ত উপযোগী একটি পদক্ষেপ। বর্তমানে বাংলাদেশে একটি উন্নত জৈবিক প্রযুক্তি এসেছে যার নাম “ভার্মিকম্পোস্ট”। এটি মূলত এক ধরণের জৈব সার যা কেঁচোর সংমিশ্রণ এর মাধ্যমে তৈরী করা হয়।
জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে এটি খুবই উপকারী বলে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন। তাই প্রাকৃতিক অন্যান্য জৈব সার এর পাশাপাশি ভার্মিকম্পোস্ট প্রয়োগের মাধ্যমে ফসলের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশ বাড়ানো যায়।
বায়োকন্ট্রোল এবং তার কার্যকারিতা
বায়োকন্ট্রোল বলতে মূলত বোঝায় ফসলের মাঠে এমন কোনো পোকার উপস্থিতি প্রয়োগ করা যা ক্ষতিকর পোকাকে খেয়ে শেষ করে, কিন্তু নিজে ক্ষতি করে না ফসলেএমন একটি পোকা হলো “লেডি বার্ড বিটল”। এটি ফসলের মাঠে আপনি অবশ্যই দেখে থাকবেন। এর শরীরের উপরের অংশ লাল এবং তাতে কালো ছোপ ছোপ দাগ থাকে।
এরা জাব পোকার মত ক্ষতিকারী পোকাকে খেয়ে ফেলে। কিন্তু ফসলের ক্ষতি করে না। এ জাতীয় পোকা যদি আপনার ক্ষেতে থাকে, তবে জাব পোকাজাতীয় ছোট পোকা মারার জন্য কোনো কীটনাশক দরকার হবে না।
অনেকে তো আবার কৃষি বিজ্ঞানীদের পরামর্শ অনুযায়ী চাষ করা লেডি বার্ড বিটল ছেড়ে দেন তার ক্ষেতে।
জমির রোগ প্রতিরোধে মিশ্র ফসল চাষ
এতক্ষণ আমরা বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে জেনেছি। এবার একটু ভিন্ন উপায় সম্পর্কে জানব যা ফসলের মাঠে বেশ উপযোগী। বলতে পারেন, ফসল দিয়েই পোকা তাড়ানোর পদ্ধতি।এ পদ্ধতিকে কৃষি বিজ্ঞানীরা তাদের ভাষায় “রিপেলেন্ট” বলে থাকেন যার অর্থ দূর করা। এটি মূলত কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের প্রাকৃতিক কৌশল যেখানে ফসলের মাঠের চারপাশ দিয়ে গাদা ফুল, বেসিল, ল্যাভেন্ডার ইত্যাদি গাছ লাগিয়ে দেয়া হয়।আমাদের দেশে ল্যাভেন্ডার তেমন প্রচলিত নয়। বেসিল এবং গাদা ফুলই সবচেয়ে প্রচলিত। এসব গাছের ওষধি তীব্রতার কারণে এদের আশপাশে পোকা আসতে পারে না। বিশেষত, প্রাকৃতিক কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ বিজ্ঞানীরা সমর্থন করেন।
ফলে এসব গাছ আশপাশ দিয়ে লাগিয়ে দিলে পোকা কীটপতঙ্গ দূর করা যায়। আর পোকা দূরে থাকলে রোগের পরিমাণও কমে যায়। কেননা পোকাই হলো ব্যাধির সবচেয়ে বড় বাহক।
রোগ প্রতিরোধে মাটির স্বাস্থ্য ও পুষ্টির গুরুত্ব
এরপর, মাটির গুণাগুণ নিয়ে কিছু জানা যাক। উদ্ভিদ রোগ প্রতিরোধের জৈবিক উপায় যেগুলো আছে তার মধ্যে এটি সর্বপ্রথম ধাপ। এই প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধের কৌশল অবলম্বনে শুধু যে পোকা দূরীভূত হবে তা নয়, বরং ফলনও বাড়বে। অর্গানিক ফার্মিং ও ফসলের রোগ প্রতিরোধ করতে হলে মাটির স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ মাটির পুষ্টিমান হতে হবে সর্বোচ্চ।
যে জমিতে ফসল ফলানো হবে তার মাটি যদি উন্নত হয় এবং পিএইচ মান যদি নিরপেক্ষ বা হালকা ক্ষারীয় হয়, তবে সেখানে জীবাণু সুবিধা করতে পারে না। একইসাথে, ফসলের অভ্যন্তরীণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে। যেমনটা আমাদের ক্ষেত্রে হয়। ঠিকমত খাবার খেলে আমরা যেমন সুস্থ থাকি, ঠিক তাদের ক্ষেত্রেও এমনি।
তাই মাটির পুষ্টি এবং রোগ প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। এতে আপনার খরচও কম হবে, অতিরিক্ত সার কীটনাশক কেনার টাকা সাশ্রয় হবে। তাই জমির রোগ নিয়ন্ত্রণে জৈবিক পদ্ধতি অবশ্যই অবলম্বন করুন।
সর্বশেষ বলা যায়, এই বিষদ আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝলাম যে কৃষকদের জন্য জৈবিক প্রতিরোধ পদ্ধতি সবচেয়ে উপযোগী। পাশাপাশি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যও এই রোগ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি আবশ্যক।কেননা, এসকল কীটনাশক এবং ভেজালের প্রভাব আমাদের শরীরে বেড়েই চলেছে। আর এসব কারণেই ক্রমেই আমরা দুরারোগ্য ব্যাধিতে বেশি আক্রান্ত হয়ে পড়ছি।
তাই প্রাকৃতিক প্রতিরোধমূলক পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমেই যেনো কৃষক ভাইয়েরা ফসল উৎপাদন করতে পারে সেই কাজেই আমরা তাদের উৎসাহী করব এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য করব।

Leave a Reply