Category: ফল চাষ

  • আমের ফল ঝরে যাওয়া সমস্যা: কারণ, প্রতিকার ও সমাধানের বিস্তারিত গাইড

    আমের ফল ঝরে যাওয়া সমস্যা: কারণ, প্রতিকার ও সমাধানের বিস্তারিত গাইড

    আম হলো বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও অন্যান্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের একটি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফল। তবে আম চাষের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো “ফল ঝরে পড়া” (Fruit Drop)। এই সমস্যায় গাছে ধরা ফলের একটি বড় অংশ পরিপক্ব হওয়ার আগেই ঝরে যায়, যা চাষিদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়। এই ব্লগ পোস্টে আমের ফল ঝরে যাওয়ার বিভিন্ন কারণ, এর প্রভাব, এবং সমাধানের কার্যকরী কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

    ১. আমের ফল ঝরে পড়ার প্রকারভেদ: ফল ঝরা প্রধানত তিনটি পর্যায়ে ঘটে:
    1. প্রাথমিক পর্যায় (ফুল ঝরা): ফুল ফোটার পর পরাগায়ন না হলে বা পরিবেশগত চাপে ফুল ঝরে যায়।
    2. কচি ফল ঝরা (মার্বেল সাইজ): ছোট ফল (১০৩০ দিন বয়সী) ঝরে পড়ে।
    3. পরিপক্বতার পূর্বে ঝরা (PreHarvest Drop): ফল প্রায় পাকতে শুরু করলেও ঝড়, বৃষ্টি বা পোকামাকড়ের আক্রমণে ঝরে যায়।

    ২. ফল ঝরে পড়ার প্রধান কারণসমূহ

    ক. প্রাকৃতিক/শারীরবৃত্তীয় কারণ
    হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: অক্সিন, জিব্বেরেলিন ও সাইটোকাইনিনের অপর্যাপ্ততা ফল ধারণে ব্যর্থতা তৈরি করে।
    পুষ্টির অভাব: বিশেষ করে বোরন, জিংক, ক্যালসিয়াম ও পটাসিয়ামের ঘাটতি ফল ঝরার মূল কারণ।
    প্রতিযোগিতা: গাছে অত্যধিক সংখ্যক ফল ধারণ করলে গাছ পুষ্টি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, ফলে দুর্বল ফলগুলো ঝরে যায়।

    খ. পরিবেশগত কারণ
    তাপমাত্রার ওঠানামা: ফুল ফোটার সময় অত্যধিক গরম বা ঠাণ্ডা পরাগায়ন ব্যাহত করে।
    আদ্রতা ও বৃষ্টিপাত: মুষলধারে বৃষ্টি বা কুয়াশায় ফাঙ্গাসের প্রাদুর্ভাব (যেমন: অ্যানথ্রাকনোজ) বাড়ে।
    খরা ও পানির স্ট্রেস: শুষ্ক মৌসুমে সেচের অভাব ফল ঝরার হার বাড়ায়।

    গ. জৈবিক কারণ (পোকামাকড় ও রোগবালাই)
    পোকা:
    ফলছিদ্রকারী পোকা (Mango Fruit Borer): লার্ভা ফল ভেতরে ঢুকে ক্ষতি করে।
    হপার (Hopper): পাতার রস চুষে গাছ দুর্বল করে দেয়।

    রোগ:
    অ্যানথ্রাকনোজ: ছত্রাকজনিত রোগে ফল কালো দাগ পড়ে ঝরে যায়।
    পাউডারি মিলডিউ: সাদা গুঁড়া আবরণ ফল ও পাতাকে নষ্ট করে।

    ঘ. ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি
    অতিরিক্ত রাসায়নিক স্প্রে: কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার পরাগায়নকারী পোকা (মৌমাছি) মেরে ফেলে।
    ভুল সময়ে সেচ: ফুল ফোটার সময় সেচ দিলে ফুল ঝরে যেতে পারে।
    প্রুনিংয়ের অভাব: ঘন ডালপালা বাতাস ও আলো চলাচলে বাধা দেয়, ফলে রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

    ৩. ফল ঝরা রোধে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা (IPM)

    ক. সঠিক পুষ্টি ব্যবস্থাপনা
    মাটির পরীক্ষা: প্রতি বছর মাটির pH (৬.০৭.৫ বজায় রাখুন) ও পুষ্টির মাত্রা পরীক্ষা করে জৈবসার (গোবর, কম্পোস্ট) ও রাসায়নিক সারের সমন্বয় করুন।
    বোরন ও জিংক স্প্রে: ফুল ফোটার আগে ০.৫% বোরাক্স ও ০.২% জিংক সালফেট স্প্রে করুন।

    খ. জৈব বন্ধনী (Hormonal Treatment)
    NAA (ন্যাপথালিন অ্যাসেটিক অ্যাসিড): ১০ ppm ঘনত্বে স্প্রে করলে ফল ধারণ ক্ষমতা বাড়ে।
    ইথিফোন: পরিপক্ব ফল ঝরা কমাতে সাহায্য করে (ব্যবহারবিধি严格遵守).

    গ. রোগ ও পোকা দমন
    ফাঙ্গাস নিয়ন্ত্রণ:
    কপার অক্সিক্লোরাইড (০.৩%) বা নিমের তেল স্প্রে করুন।
    পোকা দমন:
    ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে ফলছিদ্রকারী পোকার প্রজনন চক্র ভাঙুন।
    নিম বেসড কীটনাশক (azadirachtin) প্রাকৃতিকভাবে পোকা নিয়ন্ত্রণ করে।

    ঘ. সেচ ও নিকাশী ব্যবস্থা
    ড্রিপ ইরিগেশন: গোড়ায় পানি সরবরাহ করে পানির স্ট্রেস কমায়।
    বৃষ্টির পানি নিকাশ: জলাবদ্ধতা যেন না হয়, সেজন্য গাছের চারপাশে ড্রেন তৈরি করুন।

    ঙ. মালচিং ও ছাঁটাই
    জৈব মালচ: গাছের গোড়ায় খড় বা পাতা বিছিয়ে মাটির আদ্রতা ধরে রাখুন।
    প্রুনিং: রোগাক্রান্ত ডালপালা কেটে ফেলুন এবং গাছের মধ্যেকার ঘন অংশ পাতলা করুন।

    ৪. কেস স্টাডি: বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের সফল চাষি
    চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষি রফিকুল ইসলাম তার ৫ একর জমিতে সমন্বিত বাগান ব্যবস্থাপনা চালু করেছেন:

    পদ্ধতি:
    প্রতি ১৫ দিনে নিমের স্প্রে।
    ফুল ফোটার সময় মৌ বাক্স স্থাপন করে পরাগায়ন বাড়ানো।
    ফল ধরা শুরু করলে নেট দিয়ে গাছ ঢেকে পাখি ও বাতাসের ক্ষতি রোধ।
    ফলাফল: ফল ঝরা ৭০% কমেছে এবং উৎপাদন ৪০% বেড়েছে।

    ৫. ফল ঝরা রোধে আধুনিক প্রযুক্তি
    সেন্সর ভিত্তিক সেচ: মাটির আদ্রতা সেন্সর দিয়ে স্মার্টফোনে নোটিফিকেশন পেয়ে সেচ দেওয়া।
    জিএআইএস ম্যাপিং: ড্রোন ব্যবহার করে বাগানের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং সমস্যা চিহ্নিতকরণ।

    ৬. চাষিদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
    1. ফুল ফোটার সময় গাছে যেকোনো স্প্রে করা থেকে বিরত থাকুন।
    2. স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ নিন।
    3. জৈব চাষ পদ্ধতি গ্রহণ করে দীর্ঘমেয়াদি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করুন।

    আমের ফল ঝরা রোধে সমন্বিত উদ্যোগই কাঙ্ক্ষিত সমাধান। সঠিক পুষ্টি, রোগপোকা দমন, এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার চাষিদের উৎপাদন খরচ কমিয়ে লাভ বাড়াতে সাহায্য করবে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতা এবং চাষিদের সচেতনতাই পারে আম চাষকে আরও টেকসই করতে।

     

  • অরবরই গাছে জাবপোকা (এফিড): সমাধান ও প্রতিরোধে করণীয়

    অরবরই গাছে জাবপোকা (এফিড): সমাধান ও প্রতিরোধে করণীয়

    অরবরই (পেয়ারা) বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার একটি জনপ্রিয় ফল, যা পুষ্টিগুণে ভরপুর। কিন্তু এই গাছকে প্রায়ই আক্রমণ করে জাবপোকা বা এফিড (Aphid), একটি ক্ষুদ্র পরজীবী পোকা যা গাছের রস চুষে খেয়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে। এই ব্লগে আমরা অরবরই গাছে এফিডের আক্রমণ, জীববিজ্ঞান, ক্ষতির ধরন, জৈব ও রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং প্রতিরোধের কৌশল নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করব।

    ১. জাবপোকা (এফিড) পরিচিতি

    ক. বৈজ্ঞানিক নাম ও শ্রেণীবিভাগ

    পরিবার: Aphididae

    প্রজাতি: অরবরই গাছে সাধারণত Aphis gossypii (মেলন এফিড) এবং Toxoptera aurantii (কালো এফিড) আক্রমণ করে।

    আকার: ১-৩ মিমি, নরম শরীর, লম্বা পা ও দুটি কর্নিকল (পিছনের দুটি নলাকার অঙ্গ)।

    খ. বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য

    রঙ: সবুজ, কালো, হলুদ বা গোলাপী হতে পারে।

    পাখি: কিছু এফিডের ডানা থাকে (alate), যা বাতাসে উড়ে নতুন গাছে ছড়ায়।

    গ. জীবনচক্র

    এফিডের জীবনচক্র জটিল এবং অলৌকিক প্রজনন (Parthenogenesis) এর মাধ্যমে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে:

    ১. অণ্ডজ প্রজনন (Spring-Summer): স্ত্রী এফিড ডিম ছাড়াই সরাসরি বাচ্চা (নিম্ফ) প্রসব করে।

    ২. যৌন প্রজনন (Fall): শীতকালে ডিম পাড়ে, যা গাছের কান্ডে বা মাটিতে লেগে থাকে।

    ৩. নিম্ফ স্তর: ৪ বার খোলস বদল করে পূর্ণাঙ্গ হয় (৫-৭ দিনে)।

    ২. অরবরই গাছে এফিডের আক্রমণের লক্ষণ

    ক. প্রত্যক্ষ ক্ষতি

    রস চোষা: এফিড গাছের কচি পাতা, কুঁড়ি ও ডগার রস চুষে নেয়, ফলে:

    পাতা মোড়ানো বা কুঁচকে যাওয়া।

    গাছের বৃদ্ধি停滞 (Stunting)।

    ফুল ও ফল ঝরে পড়া।

    খ. পরোক্ষ ক্ষতি

    হানিডিউ নিঃসরণ: এফিডের মলমূত্রে চটচটে পদার্থ (হানিডিউ) জমে কালো ছাতরা ফাঙ্গাস (Sooty Mold) জন্মায়, যা পাতার সালোকসংশ্লেষণে বাধা দেয়।

    ভাইরাস সংক্রমণ: এফিড মোজাইক ভাইরাস এর মতো রোগবাহক (Vector) হিসেবে কাজ করে।

    গ. চিহ্নিতকরণ

    পাতার নিচের পিঠে ঘন দলবদ্ধ এফিডের উপস্থিতি।

    পিঁপড়ার চলাচল (পিঁপড়া এফিডের হানিডিউ খায় ও তাদের রক্ষা করে)।

    ৩. এফিডের প্রাকৃতিক শত্রু ও জৈব নিয়ন্ত্রণ

    ক. উপকারী পোকামাকড়

    লেডি বিটল (Ladybug): একটি লেডি বিটল দিনে ৫০টি এফিড খায়।

    লেসউইং (Lacewing): এর লার্ভা “এফিড লায়ন” নামে পরিচিত, যা এফিড শিকার করে।

    পরজীবী বোলতা (Aphidius colemani): এফিডের ভেতরে ডিম পেড়ে তাদের মেরে ফেলে।

    খ. জৈব কীটনাশক

    ১. নিম অয়েল (Neem Oil):

    প্রয়োগ মাত্রা: ২-৩ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে।

    কার্যকারিতা: এফিডের হরমোনাল সিস্টেম বিঘ্নিত করে।

    ২. সাবান-পানি দ্রবণ:

    প্রস্তুতি: ১ চা চামচ তরল সাবান + ১ লিটার পানি।

    প্রয়োগ: পাতার নিচে ভালোভাবে স্প্রে করুন।

    ৩. গাঁজানো তামাকের দ্রবণ:

    প্রস্তুতি: ১০০ গ্রাম তামাক ১ লিটার পানিতে ২৪ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখুন, তারপর ছেঁকে নিন।

    গ. উদ্ভিদ-ভিত্তিক প্রতিকার

    গাঁদা ফুল: গাঁদা গাছ পাশে রোপণ করলে এফিড দূরে থাকে।

    রসুন বা মরিচের স্প্রে: ১০০ গ্রাম বাটা রসুন + ১ লিটার পানি ফুটিয়ে ঠান্ডা করে স্প্রে করুন।

    ৪. রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ

    ক. কার্যকর কীটনাশক

    ইমিডাক্লোপ্রিড (Imidacloprid): সিস্টেমিক কীটনাশক, গাছের রসে মিশে এফিড মেরে ফেলে।

    অ্যাসিটামিপ্রিড (Acetamiprid): কন্টাক্ট ও সিস্টেমিক কাজ করে।

    ম্যালাথিয়ন (Malathion): দ্রুত কার্যকর, কিন্তু মৌমাছির জন্য ক্ষতিকর।

    খ. ব্যবহারের নিয়ম

    স্প্রে সময়: সকাল বা সন্ধ্যা (তাপমাত্রা কম থাকলে)।

    মাত্রা: লেবেল নির্দেশনা মেনে চলুন (অতিরিক্ত ব্যবহার এফিডে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়)।

    গ. সতর্কতা

    ব্যক্তিগত সুরক্ষা: গ্লাভস, মাস্ক ও গগলস ব্যবহার করুন।

    পরিবেশগত প্রভাব: রাসায়নিক মৌমাছি ও উপকারী পোকা মেরে ফেলতে পারে।

    ৫. সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM)

    ক. পর্যবেক্ষণ

    স্টিকি ট্র্যাপ: হলুদ রঙের আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করুন (এফিড হলুদ রঙে আকৃষ্ট হয়)।

    সপ্তাহে দুবার পাতা পরীক্ষা করুন, বিশেষত নতুন কুঁড়ি ও পাতার নিচে।

    খ. সাংস্কৃতিক পদ্ধতি

    নিয়মিত ছাঁটাই: আক্রান্ত ডালপালা কেটে ফেলুন ও পুড়িয়ে দিন।

    সুষম সার প্রয়োগ: অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার এফিডের প্রজনন বাড়ায়।

    গ. যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ

    পানি দিয়ে ধোয়া: হালকা চাপের জলের স্প্রে দিয়ে এফিড ঝেড়ে ফেলুন।

    ৬. ক্ষেত্র পর্যায়ের সফল কেস স্টাডি

    ক. বাংলাদেশের রাজশাহীর পেয়ারা বাগান

    সমস্যা: ২০২১ সালে ৬০% বাগানে এফিড আক্রমণ, ফলন ৪০% কম।

    সমাধান: নিম অয়েল + লেডি বিটল মুক্তির সমন্বয়।

    ফলাফল: ৩ মাসে এফিড জনসংখ্যা ৮০% কম, ফলন পুনরুদ্ধার।

    খ. ভারতের মহারাষ্ট্রের জৈব চাষি

    পদ্ধতি: গাঁদা ফুল + রসুন স্প্রে + প্রতিমাসে লেসউইং মুক্তি।

    সাফল্য: ২ বছরে রাসায়নিক ব্যবহার ৯০% কম।

    ৭. এফিড নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রযুক্তি

    ন্যানো-কীটনাশক: ন্যানো-সিলভার কণা এফিডের কোষ ধ্বংস করে।

    ফেরোমোন ট্র্যাপ: এফিডের যৌন ফেরোমোন ব্যবহার করে পুরুষ এফিড ফাঁদে আটকানো।

    ড্রোন স্প্রেয়িং: বড় বাগানে দ্রুত ও সমানভাবে স্প্রে।

    ৮. এফিড সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা

    এফিড শুধু বর্ষায় হয়”: গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় এফিডের বংশবৃদ্ধি বেশি হয়।

    পিঁপড়া ক্ষতিকর”: পিঁপড়া এফিডের মিত্র, তাই এফিড নিয়ন্ত্রণে পিঁপড়াও দমন করুন।

    রাসায়নিকই একমাত্র সমাধান”: জৈব পদ্ধতি ও IPM-এ দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব।

    ৯. প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

    এফিড কি মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?

    না, তবে হানিডিউ-জমে কালো ছাতরা ফাঙ্গাস শ্বাসনালীতে অ্যালার্জি তৈরি করতে পারে।

    অরবরই গাছ একবার আক্রান্ত হলে কি মারা যাবে?

    সাধারণত না, তবে দীর্ঘস্থায়ী আক্রমণে গাছ দুর্বল হয়ে ফলন কমে যায়।

    কীভাবে এফিডের প্রতিরোধ ক্ষমতা এড়ানো যায়?

    কীটনাশক ঘুরিয়ে (Rotation) ব্যবহার করুন ও জৈব পদ্ধতির সাথে সমন্বয় করুন।

    অরবরই গাছে এফিড নিয়ন্ত্রণ একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি দাবি করে—জৈব পদ্ধতি, রাসায়নিকের বিজ্ঞানসম্মত ব্যবহার এবং পরিবেশ বান্ধব চর্চার সমন্বয়। মনে রাখবেন, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করেই টেকসই কৃষি সম্ভব। এফিড মোকাবিলায় সচেতনতা, সময়মতো পদক্ষেপ এবং স্থানীয় সম্পদের ব্যবহারই হল সাফল্যের চাবিকাঠি।

  • ফলের মধ্যে অ্যান্থোসায়ানিন: বিস্তারিত তথ্য ও গুরুত্ব

    ফলের মধ্যে অ্যান্থোসায়ানিন: বিস্তারিত তথ্য ও গুরুত্ব

    অ্যান্থোসায়ানিন (Anthocyanin) হল এক ধরনের প্রাকৃতিক জল-দ্রবণীয় রঞ্জক পদার্থ (পিগমেন্ট), যা ফলের লাল, নীল, বেগুনি এবং গোলাপী রঙের জন্য দায়ী। এটি ফ্ল্যাভোনয়েড (Flavonoid) পরিবারের অন্তর্গত এবং উদ্ভিদের সেকেন্ডারি মেটাবোলাইট হিসেবে কাজ করে। নিচে অ্যান্থোসায়ানিনের রসায়ন, উৎস, স্বাস্থ্য উপকারিতা, এবং গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

    ১. অ্যান্থোসায়ানিনের রাসায়নিক গঠন

    • মৌলিক কাঠামো: অ্যান্থোসায়ানিন গ্লাইকোসাইড (Glycoside) যৌগ, অর্থাৎ এতে একটি অ্যান্থোসায়ানিডিন (Anthocyanidin) অ্যাগ্লাইকোন (Aglycone) অংশ এবং এক বা একাধিক শর্করা (Glucose, Rhamnose, Galactose) অণু যুক্ত থাকে।
    • প্রধান অ্যান্থোসায়ানিডিন:
      • সায়ানিডিন (Cyanidin): লাল-বেগুনি রঙের জন্য দায়ী (যেমন: আঙুর, ব্লুবেরি)।
      • ডেলফিনিডিন (Delphinidin): নীল-বেগুনি রঙের জন্য দায়ী (যেমন: ব্ল্যাককারেন্ট)।
      • পেলারগনিডিন (Pelargonidin): গাঢ় লাল রঙের জন্য দায়ী (যেমন: স্ট্রবেরি)।
    • pH-এর প্রভাব: অ্যান্থোসায়ানিনের রঙ পরিবেশের অম্লত্ব (pH) এর উপর নির্ভরশীল।
      • অম্লীয় (pH < 3): লাল।
      • নিরপেক্ষ (pH 7-8): বেগুনি বা নীল।
      • ক্ষারীয় (pH > 11): সবুজ বা হলুদ।

    ২. অ্যান্থোসায়ানিন সমৃদ্ধ ফল

    ফলের নাম অ্যান্থোসায়ানিনের পরিমাণ (mg/100g) রঙ
    ব্ল্যাকবেরি 300–400 গাঢ় বেগুনি
    ব্লুবেরি 150–250 নীল-বেগুনি
    ক্র্যানবেরি 50–100 গাঢ় লাল
    রাস্পবেরি 20–50 গোলাপী-লাল
    আঙুর (কালো) 30–750 বেগুনি
    চেরি 50–100 গাঢ় লাল
    ডালিম 10–20 লাল
    জাম 200–300 কালো-বেগুনি

    ৩. উদ্ভিদে অ্যান্থোসায়ানিনের ভূমিকা

    ১. সূর্যালোক থেকে সুরক্ষা: UV রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কোষকে রক্ষা করে।
    ২. পরাগায়নে সহায়তা: উজ্জ্বল রঙের মাধ্যমে পোকামাকড় ও পাখিকে আকর্ষণ করে।
    ৩. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: ফ্রি র্যাডিকেল নিরপেক্ষ করে কোষের অক্সিডেটিভ ক্ষতি রোধ করে।
    ৪. রোগ প্রতিরোধ: ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের আক্রমণ থেকে গাছকে সুরক্ষা দেয়।

    ৪. মানব স্বাস্থ্যে অ্যান্থোসায়ানিনের উপকারিতা

    ক. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা

    • ফ্রি র্যাডিকেল নিষ্ক্রিয়করণ: কোষের ডিএনএ, প্রোটিন, এবং লিপিডকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
    • অ্যান্টি-এজিং: ত্বকের কোলাজেন সংরক্ষণে সাহায্য করে বলিরেখা কমায়।

    খ. হৃদরোগ প্রতিরোধ

    • রক্তনালীর স্বাস্থ্য: এন্ডোথেলিয়াল ফাংশন উন্নত করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
    • কোলেস্টেরল কমানো: LDL (খারাপ কোলেস্টেরল) জারণ রোধ করে।

    গ. ক্যান্সার প্রতিরোধ

    • কোষের apoptosis: টিউমার কোষের স্বাভাবিক মৃত্যুকে উদ্দীপিত করে।
    • অ্যানজিওজেনেসিস বাধা: ক্যান্সার কোষে রক্ত সরবরাহ কমায়।

    ঘ. মস্তিষ্কের কার্যকারিতা

    • নিউরোপ্রোটেকটিভ: আলঝেইমার ও পারকিনসন রোগের ঝুঁকি কমায়।
    • স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি: হিপোক্যাম্পাসে রক্ত প্রবাহ উন্নত করে।

    ঙ. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ

    • ইনসুলিন সংবেদনশীলতা: রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্থিতিশীল রাখে।

    ৫. অ্যান্থোসায়ানিনের স্থায়িত্ব ও প্রক্রিয়াজাতকরণ

    • তাপ ও আলোর প্রভাব: উচ্চ তাপমাত্রা ও UV রশ্মি অ্যান্থোসায়ানিন ভেঙে দেয়।
    • সংরক্ষণ পদ্ধতি:
      • ফ্রিজে রাখলে অ্যান্থোসায়ানিনের ক্ষয় কমে।
      • শুকনো ফল বা জ্যামে অ্যান্থোসায়ানিনের পরিমাণ কমে যায়।
    • প্রক্রিয়াজাত খাবার: প্যাকেটজাত জুস বা ক্যানড ফলের তুলনায় তাজা ফল বেশি উপকারী।

    ৬. গবেষণা ও আধুনিক প্রয়োগ

    ১. প্রাকৃতিক খাদ্য রঞ্জক: কৃত্রিম রং (যেমন: টারট্রাজিন) এর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
    ২. ঔষধি গবেষণা: ক্যান্সার থেরাপি ও ন্যানো-ড্রাগ ডেলিভারি সিস্টেমে পরীক্ষামূলক ব্যবহার।
    ৩. কৃষি প্রযুক্তি: জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে উচ্চ অ্যান্থোসায়ানিনযুক্ত ফলের জাত উদ্ভাবন (যেমন: Purple Tomato)।

    ৭. সতর্কতা ও সীমাবদ্ধতা

    • অতিরিক্ত সেবন: প্রাকৃতিক উৎস (ফল) থেকে গ্রহণ করলে সাধারণত নিরাপদ, তবে সাপ্লিমেন্টের অত্যধিক ব্যবহারে পেটের সমস্যা হতে পারে।
    • অ্যালার্জি: কিছু মানুষের মধ্যে অ্যান্থোসায়ানিনে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

    ৮. অ্যান্থোসায়ানিন সম্পর্কে FAQs

    অ্যান্থোসায়ানিন এবং বিটা-ক্যারোটিনের মধ্যে পার্থক্য কী?

    বিটা-ক্যারোটিন একটি ক্যারোটিনয়েড (হলুদ-কমলা রঙের পিগমেন্ট), যা ভিটামিন-এ তে রূপান্তরিত হয়।       অ্যান্থোসায়ানিন ফ্ল্যাভোনয়েড গ্রুপের এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।

    কোন ফলে সবচেয়ে বেশি অ্যান্থোসায়ানিন থাকে?

        ব্ল্যাকবেরি ও ব্লুবেরিতে সর্বোচ্চ পরিমাণে অ্যান্থোসায়ানিন পাওয়া যায়।

    রান্না করলে অ্যান্থোসায়ানিন নষ্ট হয় কি?

    হ্যাঁ, দীর্ঘ সময় উচ্চ তাপে রান্না করলে এর পরিমাণ কমে যায়। বাষ্পে হালকা সেদ্ধ বা কাঁচা খাওয়া ভালো।

    অ্যান্থোসায়ানিন শুধু ফলের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এটি মানব স্বাস্থ্যের জন্য একটি প্রাকৃতিক সুপারহিরো। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ও রোগ প্রতিরোধক গুণাবলী আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ব্লুবেরি, জাম, বা আঙুরের মতো রঙিন ফল যোগ করে আপনি পেতে পারেন প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যবীমা!

  • ফুলে ভরপুর লিচু বাগান, রেকর্ড ফলনের আশা

    ফুলে ভরপুর লিচু বাগান, রেকর্ড ফলনের আশা

    লিচুর দেশ’ হিসেবে পরিচিত দিনাজপুর। জেলাজুড়ে হাজার হাজার লিচু গাছ সেজেছে সোনালি ফুলে। অনুকূল আবহাওয়া ও উন্নত চাষাবাদের কারণে এ বছর বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা।

    বসন্তে ফুল ফোটার সঙ্গে সঙ্গে দিনাজপুরের ১৩ উপজেলার পাঁচ হাজার ৪১৮ বাগান লিচু ফুলের মিষ্টি সুবাসে মৌ মৌ করছে। এদের অধিকাংশই দিনাজপুর সদর, চিরিরবন্দর, খানসামা ও বীরগঞ্জ উপজেলায়।

    দিনাজপুরের লিচু বাগানে সোনালি ফুলে ভরপুর।

    চায়না-১, ২ ও ৩, বেদানা, বোম্বে, মাদ্রাজি ও কাথালির মতো জাতগুলো এসব বাগানে আধিপত্য করছে। কৃষকরা ফসল রক্ষায় সেচ, কীটনাশক ও সারে বিনিয়োগ করছেন।দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নুরুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে। আগামীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে প্রচুর ফলনের আশা করছি।’

    বাজারে দিনাজপুরের লিচুর চাহিদা বেশি হওয়ায় রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে ব্যবসায়ীরা বাগানে গিয়ে চাষিদের আগাম টাকা দিচ্ছেন।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত বছর দিনাজপুরে পাঁচ হাজার ৭৮৭ হেক্টর জমিতে ৪২ হাজার টন লিচু পাওয়া গেছে। বাজার দাম ছিল ৮০০ কোটি টাকা।

    লিচু দিনাজপুরের অন্যতম মৌসুমি অর্থকরী ফসল। যদিও এর ব্যতিক্রমী স্বাদ রপ্তানির সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ফলটির পচনশীল প্রকৃতি ও যথাযথ প্রক্রিয়াকরণ সুবিধার অভাব রপ্তানি বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে।

    হিমাগার ও প্রক্রিয়াকরণ কারখানা গড়তে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন কৃষকরা।চিরিরবন্দর উপজেলার লিচু চাষি বাবলু মিয়া অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে আমরা লিচুর জুস রপ্তানি করতে পারছি।’

    গত বছর প্রতি পিস লিচুর দাম ছিল তিন থেকে ১৮ টাকা। কৃষকরা দামের ওঠানামা সম্পর্কে সতর্ক আছেন। কারণ বাজারের পরিস্থিতি ও পরিবহন খরচ তাদের মুনাফাকে প্রভাবিত করে।

    খানসামা উপজেলার লিচু চাষি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘কীটপতঙ্গের প্রাদুর্ভাব কিংবা একটা ঝড়ের কারণে কয়েক মাসের প্রচেষ্টা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের আবহাওয়া সম্পর্কে জানতে ও সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।’

  • কামরাঙা খাওয়া কি নিরাপদ?

    কামরাঙা খাওয়া কি নিরাপদ?

    কামরাঙা, যা স্টারফ্রুট নামেও পরিচিত, এক অনন্য আকৃতির ফল যা শুধু স্বাদেই নয়, পুষ্টিগুণেও অনন্য। এটি দেখতে তারার মতো, রসে ভরপুর এবং হালকা টক-মিষ্টি স্বাদের জন্য অনেকের পছন্দের তালিকায় থাকে। তবে এই ফলটি খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। যদিও কামরাঙা ভিটামিন C, ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ, তবুও এটি সবার জন্য নিরাপদ নয়। বিশেষ করে যাদের কিডনি সমস্যা আছে, তাদের জন্য এটি হতে পারে ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ।

    পুষ্টিগুণের দিক থেকে কামরাঙার অনেক উপকারিতা রয়েছে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে, হজমশক্তি উন্নত করে এবং শরীরকে বিষমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। যেহেতু এতে ক্যালোরি কম, তাই এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক। তবে বিপত্তি ঘটে তখনই, যখন কোনো ব্যক্তি কিডনি সমস্যায় ভুগছেন। কারণ কামরাঙায় অক্সালিক অ্যাসিড ও নিউরোটক্সিন থাকে, যা কিডনি ফিল্টার করতে না পারলে শরীরে জমে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে কামরাঙা খাওয়ার ফলে বমি, ঝিমুনি, মাথা ঘোরা, খিঁচুনি এমনকি কোমার মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই যাদের কিডনি কার্যকারিতা দুর্বল বা যারা ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন, তাদের জন্য এই ফল একেবারেই নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয়, কিছু ওষুধের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করার ক্ষমতাও রয়েছে কামরাঙার, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধের ক্ষেত্রে। তাই যাদের নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের প্রয়োজন হয়, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কামরাঙা না খাওয়াই ভালো।

    তবে, যারা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং কিডনির কোনো সমস্যা নেই, তারা পরিমিত পরিমাণে কামরাঙা খেতে পারেন। বেশি পরিমাণে না খাওয়াই ভালো, কারণ এতে থাকা অক্সালেট কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

    সর্বোপরি, কামরাঙা একটি দারুণ ফল, তবে এটি খাওয়ার আগে নিজের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করা উচিত। কিডনি রোগীরা একে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন, আর যারা সুস্থ তারা পরিমিত মাত্রায় খেতে পারেন। সচেতনতার মাধ্যমেই আমরা সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে পারি।

     

  • জাকিউরের বাগানে সারা বছরই আম পাওয়া যায়

    জাকিউরের বাগানে সারা বছরই আম পাওয়া যায়

    আমগাছের একটি ডালে ফুটেছে মুকুল। সেখানে ভিড় করেছে মৌমাছি। ওই গাছেরই আরেক ডালে ঝুলছে আম। হালকা সবুজ রঙের প্রতিটি আমের ওজন গড়ে ৩৫-১০০ গ্রাম। মে–সেপ্টেম্বর মাস আমের মৌসুম হিসেবে পরিচিত। তবে এই বাগানে সারা বছরই আম পাওয়া যায়। অসময়ে আসা এই জাতের আমের নাম ‘কাটিমন’। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী এক মাসের মধ্যে এই আম বাজারে বিক্রি করা যাবে।

    আমবাগানটির দেখা মিলবে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার পূর্ববর্ষা গ্রামে। বাগানমালিকের নাম জাকিউর আলম ওরফে জাকির (৪১)। তিনি কাহারোল উপজেলার জোত মুকুন্দপুর গ্রামের মৃত আবুল হোসেনের ছেলে।

    ২০১৬ সালে স্নাতক শেষ করে বাবার ধান–চালের ব্যবসার হাল ধরেন জাকিউর আলম। কিন্তু ব্যবসায় মনোযোগ দিতে পারেননি। কয়েক মাস পরেই পৈতৃক তিন বিঘা জমিতে শখ করে বারি-৪ জাতের এক হাজার আমের চারা লাগিয়ে বাগান করেছিলেন। পরের বছর ২০১৭ সালে তিন লাখ টাকার আম বিক্রি করেন। এরপর শখ হয়ে ওঠে পেশা এবং নেশা। বর্তমানে ৬৯ বিঘা জমিজুড়ে জাকিউরের আমবাগান। আম্রপালি, বারি-৪, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, ক্ষীরশাপাতি, থ্রি টেস্ট, হিমসাগর, কাটিমন, ল্যাংড়া, গৌড়মতি, ইলাবতীসহ বিভিন্ন জাতের ৩০ হাজারেরও বেশি আমগাছ রয়েছে। এর মধ্যে ২৪ বিঘা জমিতে কাটিমন জাতের আমগাছ রয়েছে ৩ হাজার ৮০০টি। আগামী দেড় মাসের মধ্যে ৪৫ লাখ টাকার শুধু কাটিমন আম বিক্রি হবে—এমনটিই প্রত্যাশা জাকিউরের।

    গত শুক্রবার জাকিউরের আমবাগান ঘুরে দেখা যায়, ৬-১০ ফুট উচ্চতার গাছগুলোর প্রায় প্রতিটি ডালে আম ও মুকুল বাতাসে দোল খাচ্ছে। উচ্চতা কম রাখতে নিয়মিত ডাল ছাঁটাই করা হয়। তাই গাছগুলোকে দূর থেকে দেখে মনে হয় মেলে থাকা ছাতা। পোকামাকড় থেকে সুরক্ষা এবং কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে আমগুলো বিশেষ কার্বন ম্যাঙ্গো ব্যাগ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। বাঁশের খুঁটি দিয়ে হেলে পড়া ডালগুলো ঠেক দেওয়া হয়েছে। পোকা ও মাছির আক্রমণ রোধে কৃষি প্রযুক্তি হিসেবে হলুদ আঠালো স্টিক ও ফেরোম্যান সেক্স ট্র্যাপ বসানোর কাজ করছেন শ্রমিকেরা। গাছের গোড়া পরিষ্কার ও সেচের কাজ করছেন কেউ। ফল ও গাছের সুরক্ষায় মরা ডাল ও পাতা ছাঁটাই করা হচ্ছে।

    বর্তমানে ৬৯ বিঘা জমিজুড়ে জাকিউরের আমবাগান। আম্রপালি, বারি-৪, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, ক্ষীরশাপাতি, থ্রি টেস্ট, হিমসাগর, কাটিমন, ল্যাংড়া, গৌড়মতি, ইলাবতীসহ বিভিন্ন জাতের ৩০ হাজারেরও বেশি আমগাছ রয়েছে। এর মধ্যে ২৪ বিঘা জমিতে কাটিমন জাতের আমগাছ রয়েছে ৩ হাজার ৮০০টি।

    আম নিয়ে জাকিউরের যত ধ্যানজ্ঞান। কখনো বাগানে, কৃষি অফিসে, কখনো আবার ইন্টারনেট ঘেঁটে আম নিয়ে পড়াশোনা করেন। জাকিউর জানান, মাঝেমাঝে দিন কয়েকের জন্য বেরিয়ে পড়েন তিনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, সাতক্ষীরাসহ আম চাষ হয় এমন সব এলাকা ঘুরে আসেন। সেখানকার চাষিদের সঙ্গে কথা বলেন। নতুন নতুন আমের জাতের সন্ধান করেন।

    মৌসুমে প্রথমে আম্রপালি জাতের আম বিক্রি করেন জাকিউর। আর মৌসুমের শেষ দিকে (আগস্টের শুরুতে) বাজারে আনেন বারি-৪ জাতের আম। জাকিউর বলেন, ‘বাজারে যখন অন্য কোনো আমের জোগান থাকে না, ঠিক তখনই বারি-৪ জাতের আম বিক্রি শুরু করি। তবে গত দুই বছরে এই আমের বাজার কমেছে; তাই প্রতি তিন সারি গাছ থেকে এক সারি কেটে ফেলেছি। ওই সারিতে এখন লাগানো হয়েছে কাটিমন। কাটিমনের বাজার ভালো, তা ছাড়া বছরজুড়ে ভোক্তাকে আম খাওয়াতে পারছি।’ তিনি জানান, বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ কাটিমন আমের দাম ১৫-১৮ হাজার টাকা। বাগানে অন্তত ৩০০ মণ আম আছে। হিসাব অনুযায়ী, ৪৫ লাখ টাকার আম বিক্রি করবেন আগামী দেড় মাসের মধ্যে। তবে শেষ সময়ে বাগান পরিচর্যায় যে ব্যয় হচ্ছে তাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। স্থানীয় একটি সরকারি ব্যাংক পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে।

    মাছি ও পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে আমে পরানো হচ্ছে বিশেষ কার্বন ম্যাঙ্গো ব্যাগ। গত শুক্রবার দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার পূর্ববর্ষা গ্রামে
    মাছি ও পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে আমে পরানো হচ্ছে বিশেষ কার্বন ম্যাঙ্গো ব্যাগ। গত শুক্রবার দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার পূর্ববর্ষা গ্রামেছবি: প্রথম আলো

    কাটিমন আম বিষয়ে গাজীপুর উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ফল বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শরফ উদ্দিন জানান, কাটিমন আমের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে গাছে মুকুল আসাটা একটি চলমান প্রক্রিয়া। ফলে একই সঙ্গে গাছে মুকুল দেখা যায়, আবার ফলও কর্তন করা যায়। চারা রোপণের দেড় বছরের মধ্যে মুকুল আসা শুরু করে। একেকটি আমের ওজন হয় ১৫০-৪৫০ গ্রাম। এই আমের চামড়া খুব পাতলা, আঁশ ছোট, খেতেও সুস্বাদু ও মিষ্টি। আকারে লম্বাকৃতির। দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে খাওয়ার উপযোগী হয় এবং হলুদ রং ধারণ করে। এই আমের ৭৮ শতাংশ খাওয়া যায়। অনায়াসে ১০-১২ দিন সংরক্ষণ করা যায়। হেক্টরপ্রতি ফল পাওয়া যায় ১২-১৫ মণ।

    শুক্রবার জাকিউরের বাগানে বেড়াতে এসেছিলেন মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘পাশেই একটা বিয়েবাড়িতে এসেছি। শুনলাম, এখানে বারো মাস আমগাছে আম ধরে। দুই বন্ধু দেখতে আসছি। দূর থেকে কিছুটা বোঝা যাচ্ছে। কাছে এসে দেখলাম কীভাবে আমগুলোকে প্যাকেট করে রাখা হয়েছে। বাগানমালিক একটি আম খেতেও দিয়েছেন। খুবই ভালো লাগছে এত বড় আমবাগান দেখে। অসময়ে পাকা আমও খেতে পারলাম।’

    বাজার বুঝে বিভিন্ন উন্নত জাতের আমগাছ দিয়ে বাগান সাজিয়েছি। বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন আমের জাত আবিষ্কার করছেন, সেগুলোর দিকে খেয়াল রাখছি।

    জাকিউর আলম, আম বাগানের মালিক

    আমবাগানে সফলতা পেয়েছেন জাকিউর। আট বছরের ব্যবধানে বাগানের আয় দিয়ে ৩৫ বিঘা জমি কিনেছেন। ছাদবিশিষ্ট পাকা বাড়ি তুলেছেন গ্রামে। গরুর খামার করার কাজে হাত দিয়েছেন। জাকিউর বলেন, ‘বাজার বুঝে বিভিন্ন উন্নত জাতের আমগাছ দিয়ে বাগান সাজিয়েছি। বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন আমের জাত আবিষ্কার করছেন, সেগুলোর দিকে খেয়াল রাখছি। অনেকে ফলের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও কীটনাশক ব্যবহার করেন। এতে ফল দ্রুত পাওয়া যায়; ওজনও বেশি হয়। এতে গাছের স্বাস্থ্যহানি ঘটে; দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। এটা আমচাষিদের বোঝা উচিত।’ তিনি পোকা ও মাছির আক্রমণ প্রতিরোধে কীটনাশকের পরিবর্তে কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

  • মুকুলে ছেয়ে গেছে রাজশাহীর আমগাছ, ভালো ফলনের আশা

    আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার রাজশাহীর আমগাছগুলো আগেভাগেই মুকুলে ছেয়ে গেছে। চাষিরা পোকামাকড় থেকে এসব গাছ বাঁচাতে বালাইনাশক দিচ্ছেন। সেইসঙ্গে আমের ভালো ফলন হওয়ার আশা করছেন। এজন্য গাছের যত্নে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে এই আনন্দের মাঝে ঘন কুয়াশায় মুকুল নষ্টের শঙ্কাও রয়েছে তাদের। যদিও মুকুল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কম বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

    চাষিরা বলছেন, গত বছর জেলার গাছগুলোতে মুকুল কম এসেছিল। এবার আগেভাগেই বেশি মুকুল আসতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে অধিকাংশ গাছের সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে মুকুল।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, কুয়াশার পর রোদ থাকায় নষ্টের পরিবর্তে মুকুল আরও সতেজ হবে। এজন্য কিছু ছত্রাক জাতীয় কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে চাষিদের।

    সরেজমিনে কয়েকটি আমবাগান ঘুরে দেখা যায়, বাগানগুলোর অধিকাংশ গাছে মুকুল এসেছে। যেসব গাছে এখনও আসেনি, সেগুলোর বাড়তি যত্ন নিচ্ছেন চাষিরা। এ ছাড়া ফড়িয়ারাও বাগানে বাগানে ঘুরতে শুরু করেছেন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মুকুল দেখে বাগান কেনা শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

    তবে আশঙ্কার কথা জানিয়ে চাষিরা বলছেন, আগাম মুকুল আসলে কুয়াশার কবলে পড়ার শঙ্কা বেশি থাকে। ঘন কুয়াশা দীর্ঘস্থায়ী হলে মুকুলে ‘পাউডারি মিলডিউ’ নামে এক ধরনের রোগ দেখা দেয়। এতে মুকুল ঝরে পড়ে। যার প্রভাব পড়ে ফলনে। এজন্য কীটনাশক ব্যবহার করছেন কেউ কেউ।

    Rajshahi Mango News 21.01 (2)

    জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, এ বছর রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর জেলায় ৯৩ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে আনুমানিক প্রায় সাড়ে ১২ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে রাজশাহী জেলায় ১৭ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান আছে। গত বছর এই অঞ্চলে মোট ১২ লাখ ৭ হাজার ২৬৩ টন আম উৎপাদন হয়।

    খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নগরের বুধপাড়া, পবা, চারঘাট ও বাঘা উপজেলার আমের বাগানগুলোতে আগাম মুকুল এসেছে। এর মধ্যে বুধপাড়া, চারঘাটের নিমপাড়া, ভায়ালক্ষ্মীপুর, চারঘাট সদর, সারদা, শলুয়া এবং বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম, বাউসা, গড়গড়িয়া ইউনিয়নের অনেকের বাগানে মুকুল এসেছে বলে জানান চাষিরা।

    বুধপাড়া এলাকার চাষি আয়নাল হক বলেন, ‌‘এবার আবহাওয়া ভালো। তেমন শীত নেই, কুয়াশাও কম। অনেক সময় কুয়াশার কারণে মুকুলের ক্ষতি হয়। কিন্তু এ বছর সেই ঝুঁকি কম। তাই আশা করছি, গাছে ভালো মুকুল আসবে। বর্তমানে লক্ষণভোগ ও গোপালভোগ জাতের গাছগুলোতে মুকুল দেখা যাচ্ছে।’

    সাত বিঘা জমিতে আমের বাগান রয়েছে নিমপাড়া ইউনিয়নের কালুহাটি গ্রামের বাহাদুর রহমানের। তিনি বলেন, ‘গত দুই বছর বাগানে মুকুল আসেনি। ফলে অনেক গাছ কেটে ফেলেছি। এখন যেসব গাছ আছে সেগুলোতে আগেভাগেই মুকুল এসেছে। কুয়াশায় মুকুল নষ্ট না হলে এবার আমের ভালো ফলন হবে।’

    Rajshahi Mango News 21.01 (1)

    ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের আম চাষি ও ব্যবসায়ী শামসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গাছে গাছে মুকুল আসতে শুরু করেছে। আরও ১০ দিন পর পুরো বাগানে মুকুল দেখা যাবে। তাই বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছি আমরা। এ ছাড়া আগাছা পরিষ্কারসহ পোকা দমনে কীটনাশক দেওয়া হচ্ছে। এতে পোকা যেমন দূর হবে, তেমনি গাছে দেখা দেবে স্বাস্থ্যকর মুকুল। এতে করে ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি।’

    পবার চাষি সাবিয়ার আলী বলেন, ‘গত দুই বছর গাছে তেমন মুকুল আসেনি। এবার দেখছি আগেভাগেই এসেছে। এতে খুশি হয়েছি। তবে শঙ্কাও আছে, কারণ কুয়াশার কবলে পড়লে মুকুল নষ্ট হয়।’

    চারঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমের জন্য বিখ্যাত চারঘাট উপজেলা। এখানে চার হাজার ৯০৩ হেক্টর জমিতে আমের বাগান আছে। চাষিদের মুকুল রক্ষায় ওষুধ স্প্রে করার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। চাষিরাও অধিক ফলনের আশায় সে অনুযায়ী কাজ করছেন।’

    আগাম মুকুল কুয়াশায় ঝরে যাওয়ার একটা শঙ্কা থাকে উল্লেখ করে রাজশাহী আম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর ভালো মুকুল আসলেও তা ঝরে পড়ায় উৎপাদন কমেছিল। এবার ভালো ফলনের আশা করছি। বাকিটা আবহাওয়ার ওপরে নির্ভর করবে। কিছুদিনের মধ্যে বাগান কেনাবেচা শুরু হবে।’

    rajsahi.2jpg

    তবে চাষিরা যত্ন নিলে মুকুল ঝরে পড়ার শঙ্কা কম বলে জানালেন রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গত বছর যেহেতু কম মুকুল এসেছিল, এবার বেশি আসা স্বাভাবিক। আর চাষিরা গাছের প্রতি যত্নশীল হলে ঝরে পড়ার শঙ্কা কম।’

    এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. মোতালেব হোসেন বলেন, ‘প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী কোনও বছর মুকুল কম আসলে পরের বছর বেশি আসে। সে হিসাবে এবার বেশি আসার কথা। এবারের আবহাওয়া আমের জন্য খুবই উপযোগী। আশা করছি, মুকুল-গুটি ও উৎপাদন ভালো হবে। আর কুয়াশার কবলে যদি ঝরে পড়ে সেক্ষেত্রে আগাম সতর্ক থাকতে হবে চাষিদের। আমরা প্রচারণা চালাচ্ছি। ফলে চাষিরা আগেভাগেই সচেতন হবেন আশা করি।’

  • মুকুল আসার আগেই আম গাছের যত্ন নিন

    মুকুল আসার আগেই আম গাছের যত্ন নিন

    সমীরণ বিশ্বাস , কৃষি ও পরিবে

    আম গাছের মুকুল সুস্থ রাখতে সঠিক যত্ন এবং সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। মুকুল ঠিকঠাক থাকলে ফলন যেমন ভালো হবে; তেমনই রোগ-বালাই থেকেও গাছ থাকবে নিরাপদ। চলুন, এই যত্নের সহজ কিছু উপায় জেনে নিই।

    মুকুল আসার আগে যত্ন
    মুকুল আসার আগে আম গাছের যত্ন নিন। আম গাছ সুস্থ রাখতে ছোট ছোট পদক্ষেপ অনেক বড় ভূমিকা রাখে।

    আগাছা পরিষ্কার
    আগাছা শুধু গাছের পুষ্টি কমায় না, রোগ-বালাইয়ের ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই মাটির চারপাশ একদম পরিষ্কার রাখুন।

    মরা ডালপালা কাটুন
    মরা বা শুকনো ডাল গাছে শুধু ওজন বাড়ায় কিন্তু কোনো কাজে আসে না। এগুলো কেটে গাছকে হালকা করুন।

    পরগাছা সরান
    গাছের শক্তি চুরি করে নেওয়া পরগাছা দূর করুন।

    সেচ বন্ধ করুন
    গাছে মুকুল আসার ২-৩ মাস আগে সেচ বন্ধ রাখলে গাছ আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হয়।

    প্রথম স্প্রে
    সময়মতো প্রথম স্প্রে করলে ভালো ফল পাবেন। মুকুল যখন ৪-৬ ইঞ্চি হয়; তখন সঠিকভাবে স্প্রে করলে গাছ রোগমুক্ত থাকে। এতে ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলিলিটার ইমিডাক্লোপ্রিড কীটনাশক ব্যবহার করবেন। এছাড়া ২ গ্রাম ম্যানকোজেব ছত্রাকনাশক ব্যবহার করবেন। এ সময় আম গাছের সব অংশ ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করবেন।

    মনে রাখবেন
    ফুল ফোটা অবস্থায় কোনো ধরনের স্প্রে করা যাবে না। প্রয়োজন হলে জানুয়ারিতে স্প্রে করুন। যদি জানুয়ারি মাসে কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া থাকে, তবে মুকুল আসার ১৫-২০ দিন আগে স্প্রে করতে পারেন।

    হপার পোকা থেকে সুরক্ষা
    ১ লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার সাইপারমেথ্রিন কীটনাশক এবং ২ গ্রাম সালফারযুক্ত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করবেন। এটি হপার পোকা থেকে সুরক্ষা করতে সাহায্য করবে। সুট্যি মোল্ড ছত্রাকের আক্রমণ কমানো যাবে।

    দ্বিতীয় স্প্রে
    যখন মুকুলে ফল আসবে, আমের মটর দানা আকৃতি তৈরি হলে দ্বিতীয় স্প্রে করতে হবে। ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলিলিটার ইমিডাক্লোপ্রিড কীটনাশক এবং ২ গ্রাম কার্বেন্ডাজিম ছত্রাকনাশক ব্যবহার করবেন। এসময় গাছের সম্পূর্ণ অংশ ভিজিয়ে স্প্রে করবেন।

    গাছের জন্য আপনার ভালোবাসাই আসল যত্ন। তাই সঠিকভাবে পরিচর্যা করা জরুরি। আম গাছের মুকুল সুরক্ষিত রাখতে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করুন। গাছের সঠিক যত্নই ভালো ফলনের চাবিকাঠি। কৃষি বিষয়ক প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্য কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

  • পেঁপের চারা ধ্বসা রােগ দমন

    পেঁপের চারা ধ্বসা রােগ দমন

    পেঁপের চারা ধ্বসা রােগ দমন

    পেঁপের চারার বেশ কিছু রোগ দেয়া দেয়। এর মধ্যে আজকে আমরা আলোচনা করবো পেঁপের চারা ধ্বসা রােগ দমন পদ্ধতি নিয়ে।পেঁপের চারা ধ্বসা রোগ দমন পদ্ধতিটি সবাই মনোযোগ দিয়ে পড়ুন এবং অন্য কৃষি উদ্যোক্তাদের কাছে শেয়ার করে দিন।

    লক্ষণ:
    আক্রান্ত চারার গােড়ার চারদিকে দাগ দেখা যায়।। শিকড় পচে যায়, চারা নেতিয়ে পড়ে গাছ মারা যায়। স্যাতস্যাতে মাটি ও মাটির উপরিভাগ শক্ত হলে রােগের প্রকোপ বাড়ে। রােগটি মাটিবাহিত বিধায় মাটি, আক্রান্ত চারা ও পানির মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। একবার রোগের প্রকোপ বাড়লে সহজে রোগ দমন করা যায় না। খুব কম সময়েই গাছের ধ্বংস দৃষ্টিগোচর হয়।

    প্রতিকার:
    ১. পানি নিষ্কাসনের ব্যবস্থা করা
    ২. আক্রান্ত চারা বীজতলা থেকে অপসারণ করা।

    পরবর্তীতে যা যা করবেন না:
    স্প্রে করার পর ১৫ দিনের মধ্যে সেই গাছের বা চারা আশেপাশে কোন শাকসবজি খাবেন না বা বিক্রি করবেন না।

    পরবর্তীতে যা যা করবেন:
    ১. রােগমুক্ত বীজ ব্যবহার করা
    ২.লাগানাের আগে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম
    কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন: ব্যাভিস্টিন বা নােইন অথবা ৪ গ্রাম ট্রাইকোডারমা ভিরিডি মিশিয়ে ১৫-২০মিনিট ধরে বীজ শােধন করে নিন।
    ৩. রৌদ্রযুক্ত উচু স্থানে বীজতলা তৈরী করুন।
    ৪. বীজতলায় বীজ বপনের ১৫ দিন আগে শতাংশ প্রতি ৮৫ গ্রাম হারে স্ট্যাবল ব্লিচিং পাউডার ছাই বা বালির সাথে মিশিয়ে ছিটিয়ে দিয়ে হালকা পানি দিয়ে বা চাষ দিয়ে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিন অথবা পলি ব্যাগের মাটি শােধন করে নিন।

    উপরোক্ত পদ্ধতিগুলো মেনে চললেই পেঁপের চারা ধ্বসা রোগ দমন খুব সহজেই করা সম্ভব। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পেঁপের চাষ করে লাভবান হতে তাই আমাদের উচিত উপরোক্ত পদ্ধতিগুলো মেনে পেঁপে চাষ করা। তবেই আমরা লাভবান হতে পারব।

  • সমতলে পাহাড়ি জাতের কমলার উচ্চ ফলন

    গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার সাতখামাইর পশ্চিমপাড়া এলাকায় কমলা চাষ করে সফল হয়েছেন চার উদ্যোক্তা। তারা আট বিঘা জমিতে দার্জিলিং ও মান্দারিন জাতের কমলা চাষ করেছেন।

    সমতল লাল মাটিতে এ বছর কমলার বাম্পার ফলন এসেছে। সুমিষ্ট-রসালো কমলা কিনতে বাগানে ভিড় দেখা গেছে ক্রেতাদের।

    উদ্যোক্তারা হলেন, ওয়ালিউল্লাহ বায়েজীদ, ফারুক আহমেদ, আবদুল মতিন ও আইনুল হক।

    বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাগানের প্রবেশমুখে ১০-১২ জন ক্রেতার লাইন। ৩০ টাকার টিকিট কেটে তারা বাগানে প্রবেশ করছেন। দূর থেকেই চোখে পড়ে, বাগানের গাছে গাছে থোকায় থোকায় হলুদ ও সবুজ বর্ণের কমলা ধরে আছে। কেউ কেউ গাছ থেকে কমলা ছিঁড়ে খাচ্ছেন। বাগানে গাছের নীচে ছোট ছোট মই রাখা আছে। মই বেয়ে অনেকে নিজের পছন্দমত কমলা ছিঁড়ছেন। শিশুরাও বেশ আনন্দ পাচ্ছে এতে।

     

    নিজ দেশে নিজ হাতে কমলা ছিঁড়ে খাওয়ার অনুভূতি স্বপ্নের মতো বলে জানিয়েছেন অনেকে।

    দার্জিলিং জাতের কমলা আকারে বড়। মৌসুমের শেষ দিকে হওয়ায় প্রতিটি গাছে বিচ্ছিন্নভাবে শোভা পাচ্ছে কমলা। চায়না জাতের হলুদ সবুজ বর্ণের মান্দারিন কমলা থোকায় থোকায় ঝুলে গাছের ডালপালা নুইয়ে দিয়েছে।

    ক্রেতা সাদিয়া সুলতানা বলেন, ‘গাজীপুরের মাটিতে কমলার চাষ হচ্ছে, এটা অনেক আনন্দের। কৃষি বিজ্ঞানীদের অবদানে কমলা উৎপাদন হচ্ছে।
    একসময় ধারণা ছিল দার্জিলিং জাতের কমলা শুধু পাহাড়ি অঞ্চলেই চাষ হয়। সেই ধারনা পাল্টে গেছে।’

    বাগান সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যায়, দর্শনার্থীরাই কমলা কিনে নিয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের কাছে কমলা বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার ক্রেতার ভিড় হয় বেশি। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত কমলা বিক্রি হয়। এর মাঝে দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত বিরতি।

    খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার মফিজুর রহমান বলেন, ‘এক সহকর্মী জানান গাজীপুরে কমলা বাগান রয়েছে। আজ এসে বিস্মিত হয়েছি।’

    শ্রীপুরের বাসিন্দা নুরে হাবীবা বলেন, ‘ফেসবুকে এই কমলা বাগানের ভিডিও দেখে এসেছি।’

    গার্ডেনার সবুজ মিয়া  বলেন, ‘চার বন্ধু মিলে বাগান করার পরিকল্পনা করি। নাটোরের কৃষিবিদ গোলাম মাওলাসহ অভিজ্ঞ কয়েকজনের কাছ থেকে চারা ও পরামর্শ নিয়ে সেখানে বাগান শুরু করি। আট বিঘায় ১৫০টি কমলার চারা রোপণ করি। ১০০ দার্জিলিং এবং ৫০টি চায়না মান্দারিন জাতের চারা। বাগানে দার্জিলিং জাতের ৭০টি গাছে ফলন এসেছে। প্রতিটি গাছে কমপক্ষে ২০ কেজি পরিমাণ কমলা এসেছে। ৩০০ টাকা কেজি দরে দার্জিলিং কমলা বিক্রি করছি।’

    উদ্যোক্তা ওয়ালীউল্লাহ বায়েজীদ বলেন, ‘দার্জিলিং এবং চায়না মান্দারিন কমলা মূলত ভারত ও সিলেটের লাল মাটিতে উৎপন্ন হয়। ২০০০ সালে ঝিনাইদহে কমলার উৎপাদন দেখেছি। সেখান থেকেই কমলা চাষে উদ্যোগী হই। এখানে রোপণের পর উৎপাদনের প্রথম বছরেই দু-তিনটি কমলা এক কেজি পরিমাণ ওজনের হয়েছে। ২০২৩ সালেও দার্জিলিং ও মান্দারিন দুটো জাতেরই ভালো উৎপাদন হয়েছে।’

    নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘লাল মাটির জমি ফেলে না রেখে কৃষি অফিসের সহায়তায় কমলা উৎপাদন সম্ভব। পরিচর্যা ঠিকমত করতে পারলে দেশের বাইরে থেকে আনা কমলার যে গুণগত মান তার থেকে আমাদের দেশের কমলার গুণগত মান সেরা হবে।’

    ওয়ালীউল্লাহ বায়েজীদ জানান, কমলার ফুল আসা থেকে শুরু করে ফল তোলা পর্যন্ত ওষুধ প্রয়োগ করতে হয় না। ফুল আসার আগে গাছের সুস্থতায় কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়।

    তিনি বলেন, ‘২০২১ সালে কমলার চাষ শুরু করেছি। এ বছর তৃতীয় ফলন। আট বিঘা পতিত জমি বছরে এক লাখ টাকায় লিজ নিয়েছি। আপাতত বছরে সাত লাখ টাকা খরচ করছি। গাছের মেয়াদ চার বছর। কমলা ১০ মাস বিক্রি করতে পারছি। আশাকরি লাভবান হব।’

    সবুজ মিয়া আরও বলেন, ‘উপজেলা কৃষি অফিসার হুমায়ুন কবীর একবার এসেছিলেন। বাগান পরিদর্শন করেছেন। ফলন ভালো হলে এসে দেখে যায়, পরে খোঁজ নেয় না। কৃষি অফিস থেকে গত তিন বছরে কোনো উপকরণ পাইনি। আমাদের বলেছিল কেঁচো সার তৈরির উপকরণ দেওয়া হবে। সেটাও পাইনি।’

    শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বলেন, ‘আমদানি নির্ভরতা কমানোর জন্য চাষিকে কমলা চাষে উৎসাহিত করছি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে কমলার চারা সরবরাহ করা হয়েছে। শ্রীপুর কমলা চাষে উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় জায়গা।’

    গাজীপুরের কমলা চাষিরা গত তিন বছরে সরকারি সহযোগিতা পায়নি, এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শ্রীপুরে মাল্টা বাগান রয়েছে, কিন্তু কমলা বাগান আছে তা জানা ছিল না। আমি শিগগির যাব। বাগান পরিদর্শন করে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’