ঢাকা ০২:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
আশুলিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ইয়াবা ও গাঁজাসহ ৫ জন মাদক ব্যবসায়ী আটক। বায়োফ্লক প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের নতুন সম্ভাবনা  নদী দখল ও দূষণে হুমকিতে দেশীয় মাছের প্রজাতি  আতা ফলের ফল ছিদ্রকারি পোকা: কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আদার গাছ ছিদ্রকারি পোকা – জীবনচক্র, ক্ষয়ক্ষতি ও টেকসই সমাধান বাংলাদেশে আতা ফলের আগা মরা রোগ: কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আনারসের হার্ট রট রোগ – কারণ, লক্ষণ ও টেকসই সমাধান আমলকির কান্ড ছিদ্রকারি পোকা – জীবনচক্র, ক্ষতি ও সমন্বিত সমাধান আমলকির গল মাছি – জীবনচক্র, ক্ষতি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আমলকির স্কেল পোকা – জীবনচক্র, ক্ষতি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা

ফসলের রোগ-বালাই: চিহ্নিতকরণ ও প্রতিকার পদ্ধতি

  • কৃষককন্ঠ ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৯:০১:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৪
  • ৫৪৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে প্রত্যেক বছর বেশ ভালো পরিমাণ ফলন নষ্ট হয় শুধু ফসলের রোগ-বালাই এর কারণে। তাই ফসলের রোগ-বালাই: চিহ্নিতকরণ ও প্রতিকার পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ ধারণা রাখা আবশ্যক।ফসলের রোগ-বালাই: চিহ্নিতকরণ ও প্রতিকার পদ্ধতি আমাদের কৃষি ব্যবস্থাপনার জন্য চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। প্রতি বছর আমাদের কৃষক ভাইদের এসব নিয়ে বেশ ভালো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

তাই এই রোগ-বালাই এর প্রতিরোধ এবং প্রতিকার পদ্ধতি সম্পর্কে জানার মাধ্যমে আমাদের কৃষি ক্ষেত্রকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

ফসলের রোগ চিহ্নিতকরণের গুরুত্ব

ফসলের রোগ চিহ্নিত করে সেগুলোর প্রতিকার করা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমাদের খাদ্যে ঘাটতি থেকেই বোঝা যায়। বাংলাদেশের কৃষি বর্তমানে বিশ্ব বাজারে সমাদৃত এবং এর সাফল্য অভূতপূর্ব। 

কিন্তু তারপরেও আমাদের প্রত্যেক বছরই বেশ ভালো পরিমাণ খাদ্য ঘাটতি দেখা যায়। এত এত নতুন প্রযুক্তি এবং চাষ পদ্ধতির ব্যবহারেও পরেও আমরা এ অবস্থা থেকে উত্তরণের সুযোগ পাচ্ছি না।প্রত্যেক বছরই প্রায় ১৫-২০% ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শুধু এই ব্যবস্থাপনার অভাবে। আলাদা আলাদা ফসল ভিত্তিক এ পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ। 

গত বছর জুন মাসে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপিত হয় যার নাম “বাংলাদেশে উদ্ভিদ রোগ-বালাই এর বর্তমান পরিস্থিতি এবং আগামীর চ্যালেঞ্জ।”

উক্ত প্রতিবেদনে দেখানো হয় যে, বাংলাদেশের মোট ফসলের ১৫-২০% নষ্ট হয় শুধু রোগ এবং পোকামাকড়ের কারণে যা আগামী কয়েক বছরে ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

যদি আলাদাভাবে দেখা হয়, তবে ক্ষতির পরিমাণ দেখা যায়-

  • পাটের কান্ড পঁচা রোগে ৫০%
  • টমেটোর পাতা কুঁকড়ানো রোগে ৪০%-১০০% 
  • ধানের নেক ব্লাস্ট, ফলস স্মাট (লক্ষ্মীর গু বা ভুয়াঝুল রোগ)
  • গমের ব্লাস্ট
  • সবজির কান্ড বাদামি রোগ
  • পেপের গোল দাগ রোগ

শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং বিশ্বব্যাপী রোগ-বালাই এর কারণে প্রচুর ফসল নষ্ট হয়। যেমন-

  • ধান ৩০.৩%
  • গম ২১.৫%
  • ভুট্টা ২২.৬৬%
  • আলু ১৭.২%
  • সয়াবিন ২১.৪% 

এছাড়াও এমন আরও অনেক ফসলই অন্তত ৫-১০% নষ্ট হয় শুধু রোগ-বালাই এর কারণে। এছাড়াও আকস্মিক বন্যা, খরা সহ অন্যান্য দুর্যোগ তো আছেই। এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আমাদের হাতে নেই। তাই আমরা চাইলেও এখান থেকে বেশি পরিমাণ ফসল বাঁচাতে পারব না। 

কিন্তু রোগ-ব্যাধি সম্পর্কে যদি আমরা সচেতন হই এবং উপযুক্ত প্রতিকার করি, তাহলে অনেকাংশেই এই ক্ষতি কমানো সম্ভব। একারণেই ফসলের রোগ-বালাই চিহ্নিতকরণ ও প্রতিকার এত গুরুত্বপূর্ণ। 

 

ফসলের রোগ-বালাই চিহ্নিতকরণের উপায়

এবার তাহলে জেনে নেই ফসলের রোগ-বালাই চিহ্নিতকরণের উপায়গুলো-

ফসলের ছত্রাক জনিত রোগ 

ছত্রাক জনিত ভাইরাসের আক্রমণ আমাদের ফসলগুলোতে সবচেয়ে বেশি। প্রত্যেকটি ফসলই একটি নির্দিষ্ট সময় ছত্রাক দ্বারা সংক্রমণ ঘটে থাকে। ছত্রাকজনিত আক্রমণে ফসলের লক্ষণগুলো নিচে বর্ণনা করা হলো-

  • পাতার উপর হলুদাভ দাগ বা স্পট দেখা যায়।
  • ধীরে ধীরে এ দাগের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং তা বাদামি আকার ধারণ করতে থাকে। 
  • আক্রান্ত পাতা এক পর্যায়ে ছিদ্র হয়ে যায় 
  • প্রথমে পূর্ণবয়স্ক পাতা আক্রমণ হয় এবং পরে তা কচি পাতায় ছড়িয়ে পড়ে।
  • অনেক সময় পাতার বা কান্ডের উপরে ছত্রাকের ক্ষুদ্র সাদা অংশ দেখা যায়।
  • অধিক সংক্রমণে গাছ মারা যায়। 

ফসলের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ 

এরপর আসা যাক ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের ক্ষেত্রে। ব্যাকটেরিয়া জনিত আক্রমণে গাছের বৈশিষ্ট্য গুলো হলো-

  • কচি পাতাগুলো প্রথমে আক্রান্ত হয়।
  • গাছের কান্ডও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত হয়।
  • আক্রান্ত পাতা বা কান্ডে বাদামি দাগ দেখা যায় যা আস্তে আস্তে কালো হয়ে যায়। 
  • আক্রান্ত পাতা এক পর্যায়ে ছিদ্র হয়ে যায় এবং  ছিদ্রের আশপাশে ভেজা পঁচা স্থান দেখা যায়।
  • আক্রামড কান্ডের ক্ষেত্রেও এমন বাদামি গোলাকার দাগ দেখা যায়।

ফসলের ভাইরাস জনিত রোগ

এরপর আসে ভাইরাস জনিত রোগ যেগুলোর নিরাময় বেশ কঠিন। এগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো-

  • পাতার উপরের নিচে হলুদ এবং সবুজ রঙের আড়াআড়ি ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। 
  • কচি পাতা প্রথমে আক্রান্ত হয়।
  • আক্রমণের কিছুদিন পর পাতা আস্তে আস্তে কুঁকড়ে যায় যেনো নিচের দিক থেকে কেউ টেনে ধরেছে।
  • পাতার উপরের দিকে কালো আবরণ দেখা যায় যা সালোকসংশ্লেষণ করতে বাধা দেয়।
  • গাছ এক পর্যায়ে নেতিয়ে পড়ে এবং সসম্পূর্ণ গাছ মারা যায় 

ফসলে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ

ফসলের রোগ-বালাই হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে দেখি আমরা। তবে এর কিছু কারণ রয়েছে। ফসলের রোগ প্রতিরোধে এই কারণগুলো জানা প্রয়োজন।

  • ফসল যে জীবাণু দ্বারাই আক্রান্ত হোক না কেনো তাদের ক্ষুদ্র একক এতটাই হালকা যে তা বাতাস কিংবা পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে খুব দ্রুত এক গাছ থেকে আরেক গাছে সংক্রমণ হয়।
  • রোগগুলোর মধ্যে ভাইরাসজনিত রোগ ফসলে প্রবেশ করে পোকামাকড়ের মাধ্যমে। যেকোনো মাঠের আক্রান্ত ফসল থেকে পোকা তাদের খাদ্য সংগ্রহ করে যদি ভালো ফসলে বসে এবং খাদ্য নিতে চায়, তবে তার মাধ্যমে রোগের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। তাই পোকামাকড় দ্রুত রোগ ছড়ানোর একটি অন্যতম কারণ।
  • ফসলের জীবাণুগুলো কয়েক বছর পর্যন্ত মাটিতে থাকতে পারে। ফলে সঠিক ব্যবস্থাপনা না নিলে ফসল তোলার পর পুনরায় বুনলে এ ফসলেও রোগ ছড়িয়ে যায়। 
  • সেচ দেওয়ার মাধ্যমে রোগের স্পোর ছড়িয়ে পড়ে পুরো মাঠে।

ফসলের রোগ প্রতিকার কৌশল

ফসলের মাঠে রোগ-বালাই দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সামান্য রোগ দেখা গেলেই কি আমরা ছত্রাকনাশক বা রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার করব?

কখনো না। রোগ-ব্যাধি একটি প্রাকৃতিক বিষয়। তাই যেকোনো ফসলে ৫% রোগ থাকলে তার জন্য অন্য প্রতিকার ব্যবস্থা নেয়ার দরকার নেই। সুষমভাবে সার প্রদান করলে এবং যত্ন নিলে গাছ নিজের প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়ে এ রোগ সারিয়ে নেবে।

তবে এর থেকেও বেশি হয় গেলে ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-

  • প্রথমেই আক্রান্ত গাছগুলো তুলে ফেলতে হবে।
  • মাঠে পানি থাকলে (যেমন ধানক্ষেতে) দ্রুত সে পানি নিষ্কাশন করে ফেলতে হবে। 
  • নিম বীজের রস ছড়িয়ে দিলে প্রাথমিক ক্ষেত্রে ভাইরাসজনিত রোগে উপকার পাওয়া যায়। কৃষিতে প্রাকৃতিক কীটনাশক ব্যবহার রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ কমিয়ে ফসলকে অধিক পুষ্টিযুক্ত করতে সাহায্য করে।
  • পরিমিত হারে ছত্রাকনাশক বা ব্যাকটেরিয়ানাশক প্রয়োগ করতে হবে। অতিরিক্ত করা যাবে না।
  • ভাইরাস জনিত রোগ নিয়ন্ত্রণে জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে উপকার পাওয়া যায়।

কৃষিক্ষেত্রে রোগ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ব্যবস্থা

কিন্তু, শুধু কি প্রতিকার করলেই হবে? না প্রতিরোধও হওয়া চাই। কেননা রোগ প্রতিকার অপেক্ষা ফসলের রোগ প্রতিরোধ সর্বদা উপকারী এবং ক্ষতির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম। তাই সমন্বিত রোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই প্রতিরোধ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে।

ফসল উৎপাদনের আগে

এক্ষেত্রে করণীয়গুলো হলো-

  • ফসল উৎপাদনের পূর্বে জমিতে গভীর চাষ দিয়ে নিতে হবে যেনো জীবাণু থাকলেও তা মাটিতে চাপা পড়ে যায়।
  • একই ফসল বারবার চাষ চাষ করা যাবে না। কোনো নির্দিষ্ট ফসল ২/১ বছর পর পর চাষ করতে হবে।
  • যেকোনো ফসল ফলানোর পূর্বে সেই ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি ব্যবস্থাপনা কৌশল, ঐ ফসলের রোগের প্রাথমিক লক্ষণ এবং উক্ত ফসলের সঠিক পরিচর্যা পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে নিতে হবে।

মাঠে ফসল থাকাকালীন 

  • অতিরিক্ত ঘন করে মাঠে ফসল লাগানো যাবে না। পরিমিত জায়গা রাখতে হবে।
  • বেশিরভাগ ফসল মাঠে জমে থাকা পানি সহ্য করতে পারে না। তাই সেচ দিলে দ্রুত সে পানি নিষ্কাশন করতে হবে।
  • পরিমিত হারে সার প্রয়োগ করতে হবে। অতিরিক্ত সার দেয়া যাবে না।
  • ফসলের যত্নের কাজে যেসকল যন্ত্র যেমন নিড়ানি, কোদাল, বীজ বপন যন্ত্র ইত্যাদি সকল মেশিন জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।
  • ফসল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি রোগব্যবস্থাপনার আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ড্রোন ব্যবহার করা যায়। এতে ফসলের রোগ নিরীক্ষণ সহজ হয়।

ফসল উৎপাদনের পরে

  • ফসল মাঠ থেকে তোলার পরে সমগ্র মাঠ চাষ দিয়ে ফেলতে হবে। এতে মাটির উপরের স্তরে কোনো জীবাণু থাকতে পারবে না। 
  • ফসলের উচ্ছিষ্ট অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
  • নতুন ফসল লাগানোর আগে অন্তত ১ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।

অতএব, আমাদের খাদ্য ঘাটতি কমাতে ফসলের রোগ চিহ্নিতকরণ উপায়গুলো জানতে হবে এবং ফসলের রোগ প্রতিকার পদ্ধতি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। একইসাথে কৃষিতে ডিজিটাল রোগনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সংযুক্ত করতে হবে। এতে ফসলের রোগ নির্ণয় পদ্ধতি সহজ হবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

অথরের তথ্য

Abrar Khan

জনপ্রিয় সংবাদ

আশুলিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ইয়াবা ও গাঁজাসহ ৫ জন মাদক ব্যবসায়ী আটক।

ফসলের রোগ-বালাই: চিহ্নিতকরণ ও প্রতিকার পদ্ধতি

আপডেট সময় ০৯:০১:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৪

বাংলাদেশে প্রত্যেক বছর বেশ ভালো পরিমাণ ফলন নষ্ট হয় শুধু ফসলের রোগ-বালাই এর কারণে। তাই ফসলের রোগ-বালাই: চিহ্নিতকরণ ও প্রতিকার পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ ধারণা রাখা আবশ্যক।ফসলের রোগ-বালাই: চিহ্নিতকরণ ও প্রতিকার পদ্ধতি আমাদের কৃষি ব্যবস্থাপনার জন্য চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। প্রতি বছর আমাদের কৃষক ভাইদের এসব নিয়ে বেশ ভালো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

তাই এই রোগ-বালাই এর প্রতিরোধ এবং প্রতিকার পদ্ধতি সম্পর্কে জানার মাধ্যমে আমাদের কৃষি ক্ষেত্রকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

ফসলের রোগ চিহ্নিতকরণের গুরুত্ব

ফসলের রোগ চিহ্নিত করে সেগুলোর প্রতিকার করা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমাদের খাদ্যে ঘাটতি থেকেই বোঝা যায়। বাংলাদেশের কৃষি বর্তমানে বিশ্ব বাজারে সমাদৃত এবং এর সাফল্য অভূতপূর্ব। 

কিন্তু তারপরেও আমাদের প্রত্যেক বছরই বেশ ভালো পরিমাণ খাদ্য ঘাটতি দেখা যায়। এত এত নতুন প্রযুক্তি এবং চাষ পদ্ধতির ব্যবহারেও পরেও আমরা এ অবস্থা থেকে উত্তরণের সুযোগ পাচ্ছি না।প্রত্যেক বছরই প্রায় ১৫-২০% ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শুধু এই ব্যবস্থাপনার অভাবে। আলাদা আলাদা ফসল ভিত্তিক এ পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ। 

গত বছর জুন মাসে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপিত হয় যার নাম “বাংলাদেশে উদ্ভিদ রোগ-বালাই এর বর্তমান পরিস্থিতি এবং আগামীর চ্যালেঞ্জ।”

উক্ত প্রতিবেদনে দেখানো হয় যে, বাংলাদেশের মোট ফসলের ১৫-২০% নষ্ট হয় শুধু রোগ এবং পোকামাকড়ের কারণে যা আগামী কয়েক বছরে ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

যদি আলাদাভাবে দেখা হয়, তবে ক্ষতির পরিমাণ দেখা যায়-

  • পাটের কান্ড পঁচা রোগে ৫০%
  • টমেটোর পাতা কুঁকড়ানো রোগে ৪০%-১০০% 
  • ধানের নেক ব্লাস্ট, ফলস স্মাট (লক্ষ্মীর গু বা ভুয়াঝুল রোগ)
  • গমের ব্লাস্ট
  • সবজির কান্ড বাদামি রোগ
  • পেপের গোল দাগ রোগ

শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং বিশ্বব্যাপী রোগ-বালাই এর কারণে প্রচুর ফসল নষ্ট হয়। যেমন-

  • ধান ৩০.৩%
  • গম ২১.৫%
  • ভুট্টা ২২.৬৬%
  • আলু ১৭.২%
  • সয়াবিন ২১.৪% 

এছাড়াও এমন আরও অনেক ফসলই অন্তত ৫-১০% নষ্ট হয় শুধু রোগ-বালাই এর কারণে। এছাড়াও আকস্মিক বন্যা, খরা সহ অন্যান্য দুর্যোগ তো আছেই। এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আমাদের হাতে নেই। তাই আমরা চাইলেও এখান থেকে বেশি পরিমাণ ফসল বাঁচাতে পারব না। 

কিন্তু রোগ-ব্যাধি সম্পর্কে যদি আমরা সচেতন হই এবং উপযুক্ত প্রতিকার করি, তাহলে অনেকাংশেই এই ক্ষতি কমানো সম্ভব। একারণেই ফসলের রোগ-বালাই চিহ্নিতকরণ ও প্রতিকার এত গুরুত্বপূর্ণ। 

 

ফসলের রোগ-বালাই চিহ্নিতকরণের উপায়

এবার তাহলে জেনে নেই ফসলের রোগ-বালাই চিহ্নিতকরণের উপায়গুলো-

ফসলের ছত্রাক জনিত রোগ 

ছত্রাক জনিত ভাইরাসের আক্রমণ আমাদের ফসলগুলোতে সবচেয়ে বেশি। প্রত্যেকটি ফসলই একটি নির্দিষ্ট সময় ছত্রাক দ্বারা সংক্রমণ ঘটে থাকে। ছত্রাকজনিত আক্রমণে ফসলের লক্ষণগুলো নিচে বর্ণনা করা হলো-

  • পাতার উপর হলুদাভ দাগ বা স্পট দেখা যায়।
  • ধীরে ধীরে এ দাগের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং তা বাদামি আকার ধারণ করতে থাকে। 
  • আক্রান্ত পাতা এক পর্যায়ে ছিদ্র হয়ে যায় 
  • প্রথমে পূর্ণবয়স্ক পাতা আক্রমণ হয় এবং পরে তা কচি পাতায় ছড়িয়ে পড়ে।
  • অনেক সময় পাতার বা কান্ডের উপরে ছত্রাকের ক্ষুদ্র সাদা অংশ দেখা যায়।
  • অধিক সংক্রমণে গাছ মারা যায়। 

ফসলের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ 

এরপর আসা যাক ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের ক্ষেত্রে। ব্যাকটেরিয়া জনিত আক্রমণে গাছের বৈশিষ্ট্য গুলো হলো-

  • কচি পাতাগুলো প্রথমে আক্রান্ত হয়।
  • গাছের কান্ডও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত হয়।
  • আক্রান্ত পাতা বা কান্ডে বাদামি দাগ দেখা যায় যা আস্তে আস্তে কালো হয়ে যায়। 
  • আক্রান্ত পাতা এক পর্যায়ে ছিদ্র হয়ে যায় এবং  ছিদ্রের আশপাশে ভেজা পঁচা স্থান দেখা যায়।
  • আক্রামড কান্ডের ক্ষেত্রেও এমন বাদামি গোলাকার দাগ দেখা যায়।

ফসলের ভাইরাস জনিত রোগ

এরপর আসে ভাইরাস জনিত রোগ যেগুলোর নিরাময় বেশ কঠিন। এগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো-

  • পাতার উপরের নিচে হলুদ এবং সবুজ রঙের আড়াআড়ি ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। 
  • কচি পাতা প্রথমে আক্রান্ত হয়।
  • আক্রমণের কিছুদিন পর পাতা আস্তে আস্তে কুঁকড়ে যায় যেনো নিচের দিক থেকে কেউ টেনে ধরেছে।
  • পাতার উপরের দিকে কালো আবরণ দেখা যায় যা সালোকসংশ্লেষণ করতে বাধা দেয়।
  • গাছ এক পর্যায়ে নেতিয়ে পড়ে এবং সসম্পূর্ণ গাছ মারা যায় 

ফসলে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ

ফসলের রোগ-বালাই হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে দেখি আমরা। তবে এর কিছু কারণ রয়েছে। ফসলের রোগ প্রতিরোধে এই কারণগুলো জানা প্রয়োজন।

  • ফসল যে জীবাণু দ্বারাই আক্রান্ত হোক না কেনো তাদের ক্ষুদ্র একক এতটাই হালকা যে তা বাতাস কিংবা পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে খুব দ্রুত এক গাছ থেকে আরেক গাছে সংক্রমণ হয়।
  • রোগগুলোর মধ্যে ভাইরাসজনিত রোগ ফসলে প্রবেশ করে পোকামাকড়ের মাধ্যমে। যেকোনো মাঠের আক্রান্ত ফসল থেকে পোকা তাদের খাদ্য সংগ্রহ করে যদি ভালো ফসলে বসে এবং খাদ্য নিতে চায়, তবে তার মাধ্যমে রোগের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। তাই পোকামাকড় দ্রুত রোগ ছড়ানোর একটি অন্যতম কারণ।
  • ফসলের জীবাণুগুলো কয়েক বছর পর্যন্ত মাটিতে থাকতে পারে। ফলে সঠিক ব্যবস্থাপনা না নিলে ফসল তোলার পর পুনরায় বুনলে এ ফসলেও রোগ ছড়িয়ে যায়। 
  • সেচ দেওয়ার মাধ্যমে রোগের স্পোর ছড়িয়ে পড়ে পুরো মাঠে।

ফসলের রোগ প্রতিকার কৌশল

ফসলের মাঠে রোগ-বালাই দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সামান্য রোগ দেখা গেলেই কি আমরা ছত্রাকনাশক বা রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার করব?

কখনো না। রোগ-ব্যাধি একটি প্রাকৃতিক বিষয়। তাই যেকোনো ফসলে ৫% রোগ থাকলে তার জন্য অন্য প্রতিকার ব্যবস্থা নেয়ার দরকার নেই। সুষমভাবে সার প্রদান করলে এবং যত্ন নিলে গাছ নিজের প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়ে এ রোগ সারিয়ে নেবে।

তবে এর থেকেও বেশি হয় গেলে ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-

  • প্রথমেই আক্রান্ত গাছগুলো তুলে ফেলতে হবে।
  • মাঠে পানি থাকলে (যেমন ধানক্ষেতে) দ্রুত সে পানি নিষ্কাশন করে ফেলতে হবে। 
  • নিম বীজের রস ছড়িয়ে দিলে প্রাথমিক ক্ষেত্রে ভাইরাসজনিত রোগে উপকার পাওয়া যায়। কৃষিতে প্রাকৃতিক কীটনাশক ব্যবহার রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ কমিয়ে ফসলকে অধিক পুষ্টিযুক্ত করতে সাহায্য করে।
  • পরিমিত হারে ছত্রাকনাশক বা ব্যাকটেরিয়ানাশক প্রয়োগ করতে হবে। অতিরিক্ত করা যাবে না।
  • ভাইরাস জনিত রোগ নিয়ন্ত্রণে জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে উপকার পাওয়া যায়।

কৃষিক্ষেত্রে রোগ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ব্যবস্থা

কিন্তু, শুধু কি প্রতিকার করলেই হবে? না প্রতিরোধও হওয়া চাই। কেননা রোগ প্রতিকার অপেক্ষা ফসলের রোগ প্রতিরোধ সর্বদা উপকারী এবং ক্ষতির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম। তাই সমন্বিত রোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই প্রতিরোধ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে।

ফসল উৎপাদনের আগে

এক্ষেত্রে করণীয়গুলো হলো-

  • ফসল উৎপাদনের পূর্বে জমিতে গভীর চাষ দিয়ে নিতে হবে যেনো জীবাণু থাকলেও তা মাটিতে চাপা পড়ে যায়।
  • একই ফসল বারবার চাষ চাষ করা যাবে না। কোনো নির্দিষ্ট ফসল ২/১ বছর পর পর চাষ করতে হবে।
  • যেকোনো ফসল ফলানোর পূর্বে সেই ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি ব্যবস্থাপনা কৌশল, ঐ ফসলের রোগের প্রাথমিক লক্ষণ এবং উক্ত ফসলের সঠিক পরিচর্যা পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে নিতে হবে।

মাঠে ফসল থাকাকালীন 

  • অতিরিক্ত ঘন করে মাঠে ফসল লাগানো যাবে না। পরিমিত জায়গা রাখতে হবে।
  • বেশিরভাগ ফসল মাঠে জমে থাকা পানি সহ্য করতে পারে না। তাই সেচ দিলে দ্রুত সে পানি নিষ্কাশন করতে হবে।
  • পরিমিত হারে সার প্রয়োগ করতে হবে। অতিরিক্ত সার দেয়া যাবে না।
  • ফসলের যত্নের কাজে যেসকল যন্ত্র যেমন নিড়ানি, কোদাল, বীজ বপন যন্ত্র ইত্যাদি সকল মেশিন জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।
  • ফসল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি রোগব্যবস্থাপনার আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ড্রোন ব্যবহার করা যায়। এতে ফসলের রোগ নিরীক্ষণ সহজ হয়।

ফসল উৎপাদনের পরে

  • ফসল মাঠ থেকে তোলার পরে সমগ্র মাঠ চাষ দিয়ে ফেলতে হবে। এতে মাটির উপরের স্তরে কোনো জীবাণু থাকতে পারবে না। 
  • ফসলের উচ্ছিষ্ট অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
  • নতুন ফসল লাগানোর আগে অন্তত ১ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।

অতএব, আমাদের খাদ্য ঘাটতি কমাতে ফসলের রোগ চিহ্নিতকরণ উপায়গুলো জানতে হবে এবং ফসলের রোগ প্রতিকার পদ্ধতি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। একইসাথে কৃষিতে ডিজিটাল রোগনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সংযুক্ত করতে হবে। এতে ফসলের রোগ নির্ণয় পদ্ধতি সহজ হবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।