মুরগী খামার অনেকে করে থাকেন। কিন্তু মুরগি খামারের সাধারণ ভুল এড়াতে না পারার কারণে অনেকেই লাভবান হতে পারেন না। কিন্তু একটু সচেতন থাকলেই এই ভুলগুলো এড়ানো সম্ভব।পোলট্রি খামার এখন গ্রামাঞ্চলে কতটা জনপ্রিয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই যখন খামারিরা মুরগী খামারের সাধারণ ভুল এড়াতে পারে না। যার ফলস্বরূপ তাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। তাই আজ আমরা আলোচনা করব পোলট্রি খামারের কিছু সাধারণ ভুল এবং মুরগী খামারের ভুল এড়ানোর উপায় নিয়ে।
পোলট্রি খামারের জনপ্রিয়তার কারণ
আমাদের দেশে মুরগী পালন নতুন নয়। বহু আগে থেকেই এ চর্চা চলে আসছে সীমিত পরিসরে। কিন্তু বর্তমান সময়ে কৃষক ভাইদের টানাটানির সংসারে বাড়তি ইনকামের একটি অন্যতম উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে পোলট্রি খামার।
একারণেই আগের মত যত্ন ছাড়া মুরগী পালার থেকে খামারে মুরগী পালা নিয়ে এখন সকলেরই আগ্রহ বাড়ছে। পাশাপাশি তরুণ সমাজ যারা হাজার খুঁজেও একটা চাকরি জোগাড় করতে পারছেন না, তাদের জন্যও এটি একটি দারুণ সমাধান।পোলট্রি খামার শুধু পুরুষদেরই নয়, বরং নারীদের এনে দিয়েছে সাফল্য। তারা এখন চাইলেই পোলট্রি খামারের মাধ্যমে পরিবারের জন্য বাড়তি ইনকামের ব্যবস্থা করে চাহিদা মেটাতে পারছে।প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর সুবিধা তো আছেই। এসকল কারণেই পোলট্রি খামার এখন এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সব জায়গাতেই।
পোলট্রি খামারে নতুনদের ১০ টি সাধারণ ভুল এবং এড়ানোর উপায়

পোলট্রি ব্যবসায় ব্যর্থতার কারণ হিসেবে ১০ টি কারণ নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করব। পাশাপাশি এই ভুলগুলো আপনি কীভাবে এড়াবেন সে নির্দেশনাও এখানেই পেয়ে যাবেন।
১. খামারের জমি নির্বাচনে ভুল
আপনি যখন একটি মুরগী খামার নির্বাচন করবেন, তখন অবশ্যই দেখে শুনে জমি নির্বাচন করতে হবে। নিচু জমিতে খামার নির্মাণ করলে অতিবৃষ্টিতে পানি জমে পরিবেশ স্যাঁতসেঁতে করে তোলে।পাশাপাশি যদি হাওর এলাকা বা বন্যাপ্রবণ এলাকা হয় তাহলে খামার ডুবে যেতে পারে। এছাড়াও আলো-বাতাস জনিত সমস্যা বিদ্যমান।
সমাধান:
খামার তৈরীর জমি হতে হবে উঁচু এবং সেখানে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, সেখানে পরিমিত সূর্যের আলোও আসতে হবে।এমন জায়গা ডিম এবং মুরগীর স্বাস্থ্যের জন্য দরকার। ঘুপচি জায়গা বা কোনো বাঁশঝাড়ের পাশে করা যাবে না। এতে মুরগীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা হবে।
২. খামার তৈরীর সময় ভুল
মুরগীর খামার তৈরীর সময় জায়গার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। অনেকে অল্প জায়গার উপর খামার নির্মাণ করে গাদাগাদি করে সেখানে অনেক মুরগী রাখে। এতে মুরগীর স্বাস্থ্য বিঘ্নিত হয় চরমভাবে। তাছাড়াও খামারের মধ্যে পর্যাপ্ত লাইট না থাকলে বর্ষার দিনে বা শীতকালে যখন সূর্যের আলো কম থাকে, তখন মুরগীর রোগ-ব্যাধির সৃষ্টি হয়।
সমাধান:
প্রতিটি মুরগীর জন্য অবশ্যই ১.৫-২ ফিট জায়গা লাগবে এমন হিসেব করে খামার বানাতে হবে। খামারের বিভিন্ন স্থানে লাইট বসাতে হবে যেনো সূর্যের আলো কম থাকলেও মুরগী পরিমিত আলো পায়।
৩. মুরগী পালনের সঠিক পদ্ধতিতে ভুল
মুরগী ছেড়ে, মাঁচা পদ্ধতিতে বা খাচার মধ্যে পালন করা যায়। এর মধ্যে ছেড়ে মুরগী পালন করলে তার উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে কম। ফলে সহজেই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
সমাধান:
মুরগী পালনের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো খাঁচায় মুরগী পালন। তবে অতিরিক্ত অর্থ সংকট হলে মাচা বা ছেড়ে পালন করা যায়। তবে এসব মুরগীর প্রতি বিশেষ যত্ন আবশ্যক।
৪. মুরগীর প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহে ভুল
মুরগীর বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস রয়েছে। যেমন ডিম পাড়ার বাক্স, ফিডার ইত্যাদি। এসব যন্ত্র সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে মুরগীর স্বাস্থ্য এবং ডিম দুটোই হানির মুখে পড়ে।
সমাধান:
মুরগীর প্রয়োজনীয় সকল কিছুর ব্যবস্থা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ ডিম পাড়ার বাক্স না থাকলে মুরগী খোলা জায়গায় ডিম পাড়ে যা ডিমের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক।
৫.মুরগীর খাদ্যজনিত ভুল
মুরগীর চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান চাহিদা হলো খাদ্য। সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ খাদ্য এবং পানি যদি মুরগীকে সরবরাহ না করা হয় তাহলে মুরগীর স্বাস্থ্য খারাপ হয় এবং ডিম উৎপাদন কম হয়।
সমাধান:
মুরগীর জন্য ধান, গম, চাল, ভূট্টা, তিসি বীজ, সরিষা বীজ, শাক সবজি জাতীয় খাবার ইত্যাদি সব কিছু ব্যবস্থা করতে হবে এবং সঠিক সময়ে এ খাবার সরবরাহ করতে হবে।
৬.মুরগী খামারে পরিচ্ছন্নতার ভুল
খাদ্যের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাজনিত ভুলও মারাত্মক ভয়াবহ। মুরগীর আশপাশের পরিবেশ যদি পরিষ্কার না থাকে তাহলে মুরগীতে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদির সংক্রমণ ঘটে রোগ-বালাই ছড়িয়ে দেয়।
সমাধান:
পোলট্রি খামার নিয়ে সর্বদাই সচেতন থাকতে হবে। মুরগীর বিষ্ঠা, উচ্ছিষ্ট খাদ্য এবং অন্যান্য নোংরা জিনিস তা নিয়মত পরিষ্কার করতে হবে। কোনো প্রকার ময়লা আবর্জনা থালা যাবে না।
৭.সঠিক সময়ে ভ্যাক্সিন না দেয়া
মুরগী খামারে নতুনদের ভুল এর মধ্যে অন্যতম হলো সঠিক সময়ে ভ্যাক্সিন না দেয়া। অনেকেই জানে না কখন ভ্যাক্সিন দেয়া প্রয়োজন যার ফলে মুরগীর স্বাস্থ্য মারাত্মক হানির মুখে পড়ে এবং মারাও যায়।
সমাধান:
মুরগী পালনের আগে প্রশিক্ষণ নেয়া আবশ্যক। তাছাড়াও এ বিষয়ে অভিজ্ঞ পশু ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ভ্যাক্সিন দিতে হবে।
৮.মুরগী পালন ব্যবস্থাপনায় ভুল
মুরগী খামার পরিচালনা ভুল হলে সে খামার থেকে কখনোই আয় বৃদ্ধি সম্ভব না। মুরগীর দেখভাল সবসময়ই উত্তমরূপে করতে হয়। দক্ষতার সাথে পরিচালনা না করলে মুরগী অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং মারাও যেতে পারে।
সমাধান:
কোনো মুরগী অসুস্থ কিনা কিংবা ঠিকমত খাচ্ছে কিনা এই বিষয়গুলো ভালোভাবে নজর রাখতে হবে।
৯. মুরগী পালনের উদ্দেশ্য ঠিক না করা
মুরগী সাধারণত দুই উদ্দেশ্যে পালন করা হয়। এগুলো হলো মাংস উৎপাদন এবং ডিম উৎপাদন। ডিম উৎপাদন করতে হলে মুরগীর ক্যালসিয়াম এবং খনিজ লবণজনিত খাবার বাড়িয়ে দিতে হয় যা শুধু মাংস উৎপাদনে না দিলেও চলে।
সমাধান:
মুরগী পালন শুরুর পূর্বেই এর উদ্দেশ্য নিশ্চিত করে সেই অনুযায়ী খাদ্য দিতে হবে।
১০. মুরগীর বাজারজাতকরণে ভুল
অনেকে শুধু স্থানীয়ভাবেই মুরগী বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু এতে লাভ হয় কম। অনেক সময় ঐ এলাকায় খামার বেশি থাকলে চাহিদাও কমে যেতে পারে কেননা স্থানীয় বাজারে মুরগীর চাহিদা একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে থাকে।
সমাধান:
স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেল, রেঁস্তোরায় এবং শহরের ব্যবসায়ীদের কাছে মুরগী বিক্রির চেষ্টা করতে হবে।অতএব, আমরা মুরগী খামারে ভুল চিহ্নিত করার মাধ্যমে পোলট্রি খামার ব্যর্থতার কারণগুলো জানলাম এবং মুরগী পালনে সাধারণ সমস্যার সমাধান জেনে নিলাম।
তাই কৃষক ভাইয়েরা এবং উদ্যোক্তা যারা আছে তারা অবশ্যই পোলট্রি খামারে ত্রুটি সংশোধন করে ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবেন। এতে লাভের সম্ভাবনা শতভাগ।















