আসিয়া আফরিন চৌধুরী যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের মুজগুন্নী গ্রামে আব্দুল করিম, একজন সফল কৃষক হিসেবে পরিচিত। তিনি আজ একটি বড় কৃষি উদ্যোক্তা, যিনি বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকার বেশি আয় করছেন। তবে তার এই সফলতার পিছনে রয়েছে একদিকে পরিশ্রম ও অন্যদিকে নতুনত্বের অনুসন্ধান। আব্দুল করিমের কৃষির দুনিয়ায় প্রবেশের গল্পটি কেবলই অনুপ্রেরণা। শুরুটা ছিল খুবই ছোট, তবে এখন তার বাগান প্রায় ২৭ বিঘা জমি জুড়ে বিস্তৃত। মাল্টা, কমলা, ও বরই চাষ করে তার আয়ের পরিমাণ রীতিমত ঈর্ষণীয়।
শুরু হয়েছিল পোলট্রি খামার দিয়ে
আব্দুল করিমের জীবনের শুরুটা ছিল অন্য রকম। পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি শুরু করেছিলেন পোলট্রি খামার, যেখানে তিনি মুরগির খামার করে লাভের আশায় অনেক পরিশ্রম করেছিলেন। তবে প্রকৃতির নির্মমতা আর অপ্রত্যাশিত রোগের কারণে, তার খামারটি বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হয়, যা তাকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে। এই দুর্দিনেই তার জীবনে এক পরিবর্তন আসে।
একদিন তার বন্ধু মৃত্যুঞ্জয় রায়, যিনি কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন, তাকে পরামর্শ দেন কৃষির দিকে মনোযোগ দিতে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে, আব্দুল করিম মাল্টা ও কমলার চাষ শুরু করেন। তিনি আশা করেছিলেন, এ চাষে হয়তো ক্ষতির সম্মুখীন হবেন না। আর তাই, ২০১৩ সালের শেষের দিকে তিনি খুলনার কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে মাল্টা ও কমলার চারা কিনে আনেন। তার শুরু ছিল মোটেই বড় নয়। মাত্র ১২৫টি মাল্টা ও ২৫টি কমলার চারা লাগিয়ে তিনি তার কৃষি যাত্রা শুরু করেন।
সফলতার প্রথম ধাপ
অবশেষে, তার পরিশ্রম সফলতা পায়। আড়াই বছরের মধ্যে তার মাল্টা ও কমলার গাছগুলো ফল দিতে শুরু করে। প্রথম বছরে খরচ ও বিক্রির মধ্যে সমানটা ছিল, কিন্তু পরের বছর লাভের পরিমাণ ছিল আড়াই লাখ টাকা। এবং এরপর, প্রতি বছর তার লাভের পরিমাণ দ্বিগুণ হতে থাকে। ২০২৪ সালে, তিনি মাল্টা ও কমলা বিক্রি করে ২৮ লাখ টাকার বেশি আয় করেছেন।
বর্তমানে, তার বাগানটি সাড়ে পাঁচ বিঘা জমি জুড়ে বিস্তৃত এবং সেখানে প্রতি বছর মাল্টার ফলন হচ্ছে। মাল্টার ফলগুলো অন্যান্য বাগানের মাল্টার চেয়ে বড় এবং স্বাদে অনেক বেশি ভালো। তবে বিদেশি মাল্টার তুলনায় রঙটা কিছুটা কম হলেও আকারে এগুলো অনেক বড় হয়। এখানকার মাল্টা ও কমলা স্থানীয় বাজারে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং ক্রেতাদের কাছে এর চাহিদা বাড়ছে।
বরই চাষেও সাফল্য
এছাড়া, মাল্টা ও কমলার পাশাপাশি আব্দুল করিম ২০ বিঘা জমিতে থাই প্রজাতির বরই চাষ করছেন। গত বছর বরই বিক্রি থেকে তিনি ২০ লাখ টাকার বেশি আয় করেছেন। যদিও এ বছর বরইয়ের ফলন কিছুটা কম, তবে তার দাম বেশি হওয়ায়, তিনি আশা করছেন যে, লাভের পরিমাণ গত বছরের মতোই হবে। বরই চাষের এই সফলতা তার কৃষি উদ্যোগকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে।
খরচ ও লাভের হিসাব
আব্দুল করিম জানান, এক বিঘা জমিতে মাল্টা ও কমলা চাষ করতে খরচ হয় প্রায় ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। প্রতি বছর এই দুই ফল বিক্রি করে প্রায় চার লাখ টাকার লাভ হয়। তিনি আরও বলেন, তার বাগানে নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়, যার মধ্যে জৈব সার, কীটনাশক, ছত্রাকনাশক এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করা হয়। এই ব্যাকটেরিয়া গাছের পক্ষে সহায়ক, কারণ এটি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো মেরে ফেলে এবং গাছের রোগ-ব্যাধি রোধ করে।
এছাড়া, মাল্টা ও কমলার ফলন হতে শুরু করে, তার খামারে নিয়মিত ১৫ জন কর্মী কাজ করেন। যারা জমির নিড়ানি, স্প্রে, সার প্রয়োগ এবং ফল আহরণের কাজ করেন। পাশাপাশি, আব্দুল করিম তার নার্সারির মাধ্যমে চারা বিক্রি করেন, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যায়। এই ছয় বছরে, তার চারা বিক্রি থেকে ১২ লাখ টাকার বেশি আয় হয়েছে।
কৃষি বিভাগের দৃষ্টি
আব্দুল করিমের এই সফল কৃষি উদ্যোগে মণিরামপুর উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা খুবই আশাবাদী। ঋতুরাজ সরকার, মণিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, জানান, আব্দুল করিমের মতো সফল কৃষকদের দেখাদেখি মণিরামপুরের আরও অনেক কৃষক এখন মাল্টা, কমলা ও বরই চাষ শুরু করেছেন। তার সফলতা দেখে স্থানীয় কৃষকরা এখন এই কৃষি উদ্যোগে আগ্রহী হয়ে উঠেছে এবং তাদের মধ্যে অনেকেই তার বাগানে গিয়ে চারা কিনছেন।
সফলতার মূল রহস্য
আব্দুল করিমের সফলতার মূল রহস্য হলো তার কঠোর পরিশ্রম, নতুনত্বের প্রতি আগ্রহ এবং কৃষির প্রতি তার নিখুঁত দৃষ্টি। তিনি বলেন, “কৃষি ক্ষেত্রে সফল হতে হলে, নিয়মিত পরিচর্যা এবং সঠিক পদ্ধতিতে চাষ করতে হবে। প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হলেও, সঠিক পরিকল্পনা এবং শ্রমের মাধ্যমে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।”
তবে তার এই সফলতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি এলাকার কৃষকদের জন্যও একটি বড় প্রেরণা। তার সংগ্রাম এবং সফলতা অনেক কৃষককে নতুন উদ্যোক্তা হওয়ার পথে উৎসাহিত করছে। মণিরামপুরের শ্যামকুড় ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকায় এখন মাল্টা, কমলা এবং বরই চাষের প্রতি আগ্রহ ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
এখন আব্দুল করিমের গল্প শুধুমাত্র তার নিজস্ব নয়, বরং একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যিনি একসময় পোলট্রি খামারে বিপর্যস্ত হয়ে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা দেখেছেন। তার পরিশ্রম, পরিকল্পনা এবং সঠিক পদক্ষেপের কারণে আজ তিনি ৫০ লাখ টাকার বেশি আয় করছেন। আর তার সফলতা অনেক কৃষককে অনুপ্রাণিত করেছে, যারা এখন তার পথ অনুসরণ করে নিজেদের কৃষি উদ্যোগ শুরু করেছেন।