মুরগির বিভিন্ন প্রজাতি সম্পর্কে জানলে আপনি নিশ্চিতভাবে আপনার পছন্দনীয় জাতটি বাছাই করতে পারবেন। যার মাধ্যমে অল্প খরচেই বেশ ভালো লাভ করে খামার বৃদ্ধি করা সম্ভব।পোলট্রি ব্যবসায় লাভের পরিমাণ যে কত বেশি তা ক্রমাগত হারে পোলট্রি ফার্ম বৃদ্ধির পরিমাণ দেখলেই বোঝা যায়। আর একারণেই নিয়মিত নতুন নতুন খামারি যুক্ত হচ্ছেন এই লিস্টে।
তবে যারা পোলট্রি ফার্ম করবেন বলে ভাবছেন তাদের প্রথম সমস্যা হলো কোন প্রজাতির মুরগী আনবেন। মুরগীর বিভিন্ন প্রজাতি বর্তমানে বাজারে পাওয়া যায়। পাশাপাশি বিজ্ঞানীগণ আরও নতুন নতুন জাতের মুরগী আনার চেষ্টা করছেন।
তবে এসকল জাতের মধ্যে আপনাকে বাছাই করতে এমন একটি জাত যাতে তুলনামূলক কম খরচে আপনি বেশি লাভ করতে পারেন। তাই আপনার পছন্দনীয় জাতটি বাছাই করতে জেনে নিন মুরগীর বিভিন্ন প্রজাতি সম্পর্কে।
মুরগীর প্রজাতি অনুযায়ী শ্রেণিবিভাগ
পৃথিবীতে প্রায় কয়েকশ প্রজাতির মুরগী রয়েছে। কিন্তু যেহেতু আমরা খামারের উদ্দেশ্যে মুরগী সম্পর্কে জানছি, তাই এই কয়েকশ প্রজাতির মুরগী সম্পর্কে জানার প্রয়োজন নেই। এখন আমরা উল্লেখযোগ্য কিছু মুরগীর জাত সম্পর্কে জানব।
আমেরিকান
রোড আইল্যান্ড রেড, ওয়েনডট ইত্যাদি
এদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-
- এদের গায়ের চামড়ার রঙ হলুদ।
- এদের ডিমের খোসার রঙ বাদাম।
- কানের লতির রঙ লাল।
- এদের পায়ের নালাতে পশম থাকে না এবং হলুদ বর্ণের।
এশিয়াটিক
ব্রাহমা, কোচিন, ল্যাংসেন ইত্যাদি
এদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-
- পায়ের নালা পশমযুক্ত।
- কানের লতির রঙ লাল।
- পালক বেশি থাকে।
- ডিমের রঙ বাদামি।
- ডিম উৎপাদন হার কম।
- কুঁচে হওয়ার প্রবণতা বেশি
ভূমধ্যসাগরীয়
লেগহর্ন, মিনর্কা, ফাওমি, অ্যানকোনা, আন্দালুসিয়ান ইত্যাদি
এদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-
- আকারে ছোট হয়।
- এদের ডিমের খোসার রঙ সাদা।
- কানের লতির রঙ সাদা।
- এদের পায়ের নালাতে পশম থাকে।
- কুঁচে হওয়ার প্রবণতা একেবারেই নেই।
- ডিম উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
ইংলিশ
সাসেক্স, অস্ট্রালপ, কর্নিশ ইত্যাদি।এদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-
- কর্নিশ ছাড়া বাকি সবগুলো জাতের গায়ের চামড়ার রঙ সাদা
- এদের ডিমের খোসার রঙ বাদামি
- কানের লতির রঙ লাল।
- এদের পায়ের নালাতে পশম থাকে না।
- এদের আকার মাঝারি।
ডিম উৎপাদনকারী মুরগির প্রজাতি
পূর্ববর্তী অংশ থেকে, প্রচলিত বেশ কয়েকটি মুরগীর জাত সম্পর্কে আমরা জেনে নিলাম। এবার আমরা জানব ডিম উৎপাদনের ক্ষেত্রে কোন জাতগুলো বেশি কার্যকর। কেননা অনেক খামারী শুধু ডিম উৎপাদনের উদ্দেশ্যে মুরগী পালন করেন।
ডিম উৎপাদনকারী মুরগীর প্রজাতি হলো ভূমধ্যসাগরীয় জাতের মুরগীগুলো অর্থাৎ লেগহর্ন, ফাওমি, আন্দালুসিয়ান ইত্যাদি।এর মধ্যে লেগহর্ন জাতীয় যেসকল সাদা প্রজাতির মুরগী দেখা যায়, তারা ডিম উৎপাদনের জন্য বিশ্বখ্যাত। এগুলো কিছুটা ছোট আকারের হয় এবং ডিমের খোসার রঙ বাদামি হয়।
মাংস উৎপাদনকারী মুরগির প্রজাতি
এরপর, আমরা জেনে নিব কিছু মাংস উৎপাদনকারী মুরগীর প্রজাতি সম্পর্কে। আপনারা যদি বাণিজ্যিকভাবে ডিম উৎপাদন না করে শুধু মাংস উৎপাদনে আগ্রহী হন, তবে এই জাতগুলো আপনাদের জন্য।মাংসের জন্য ব্যবহৃত মুরগীগুলো মধ্যে প্রধান দুটি জাত হলো আসিল এবং ব্রাহমা। আসিল মুরগী লড়াইয়ের জন্যও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। চামড়ার রঙ হলুদ এবং ডিমের খোসার রঙ বাদামি সমৃদ্ধ এই মুরগীগুলো আকারে সাধারণত ছোট হয়। তবে এদের মাংসের পরিমাণ থাকে বেশি।
এছাড়াও মালয়ী, কোচিন, ল্যাংসেন ইত্যাদি অর্থাৎ এশিয়াটিক যেকোনো জাতের মুরগী থেকেই বেশ ভালো মাংস পাওয়া যায়।
ডিম এবং মাংস উৎপাদনকারী মুরগীর প্রজাতি
উপর্যুক্ত বর্ণনা অনুসারে, ডিম উৎপাদনকারী এবং মাংস উৎপাদনকারী খামারিরা তাদের প্রয়োজনীয় জাত জেনে গিয়েছেন ইতোমধ্যে। কিন্তু যারা দুটোই উৎপাদন করতে চান তারা কি আলাদাভাবে দুটো জাত পালন করবেন?
না! তার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা এখন এমন কয়েকটি জাতের নাম বলব যারা ডিম এবং মাংস উভয়ই উৎপাদন করতে পারে। এমন জাতগুলো হলো
- রেড আইল্যান্ড
- দেহের ওজন ৩ থেকে ৪ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
- বার্ষিক ডিম উৎপাদন ক্ষমতা ১৮০ টি
- অস্ট্রালর্প
- দেহের ওজন ২.৯-৩.৯ কেজি
- বার্ষিক ডিম উৎপাদন ক্ষমতা ১৫০-২০০ টি
তাই আপনি চাইলেই এই দুটির যেকোনো একটি জাত নির্বাচন করতে পারেন যদি ডিম এবং মাংস উভয়ই চান। মূলত আমেরিকান জাতের মুরগীগুলো এই উদ্দেশ্যে বেশি উপযোগী। বাণিজ্যিক মুরগী পালন কৌশল অবলম্বন করলে এসব বিদেশী মুরগীর জাত পালন করা যায়।
মুরগির প্রজাতি অনুযায়ী পালন পদ্ধতি
প্রজাতি অনুযায়ী মুরগীর পালন পদ্ধতি বিভিন্ন হয়ে থাকে। তবে এই প্রজাতির শ্রেণিবিভাগ করা হয় দেশী বা স্থানীয় এবং লেয়ার মুরগী উৎপাদন ভিত্তিতে।
দেশী মুরগী পালন পদ্ধতি
দেশী মুরগী সাধারণত ছেড়ে পালন করা হয়। এক্ষেত্রে খামারির বাড়িতে ১০ টি মুরগী এবং ১ টি মোরগ থাকতে হবে। নয়ত ডিম ফুটানোর পরিমাণ কম হতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে মুরগীর জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের ব্যবস্থাপনা করতে হয়। এছাড়াও এরা আশপাশ থেকে কেঁচো বা নরম পাতা জাতীয় খাদ্য গ্রহণ করে।তবে দেশী মুরগীর উৎপাদনশীলতা কম হলেও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে যেমন লিটার পদ্ধতি বা মাচা পদ্ধতির ব্যবহারে এর থেকে আয় বাড়ানো সম্ভব।মুরগীর বয়স ০-৩ দিন পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা আলোতে থাকলে খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ বেশি হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে সময় কমিতে আনতে হয়। পাশাপাশি তার বাসস্থান হতে হবে দুর্গন্ধমুক্ত এবং পরিষ্কার।
দেশী মুরগীকে কৃমির ঔষধ খাওয়ানোর ৭ দিন পর প্রথমে রাণিক্ষেত এবং এর আরও ৭ দিন পর বসন্ত রোগের টীকা দিতে হবে। এভাবে রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।
বাণিজ্যিক মুরগী উৎপাদন
বাণিজ্যিক বা লেয়ার মুরগী উৎপাদনের মূল উদ্দেশ্য থাকে ডিম উৎপাদন। বিদেশী জাতের মুরগীগুলো সাধারণত একাজে ব্যবহার করা হয়। একারণেই এদের খাদ্য প্রোটিনের পরিমাণ বেশি থাকা আবশ্যক। মুরগীর খাদ্যে পুষ্টিমান হিসেবে ৬ টি খাদ্য উপাদানই থাকতে হবে।
তবে লেয়ার মুরগীর খাদ্য আমিষের আধিক্য থাকতে হবে। এক্ষেত্রে একটি চার্ট ফলো করা উচিৎ। মুরগীর ডিম পাড়ার অবস্থা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ আমিষ তার খাদ্যে থাকা জরুরী। এই তালিকা এখানে দেয়া হলো-
- ডিম পাড়ার পূর্বে ১৩%
- ডিম পাড়া শুরু করলে ১৬%
- ডিম পাড়া সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে ১৭-১৯%
- ডিম উৎপাদন চক্রের শেষ পর্যায়ে ১৪%
মোট খাদ্য তালিকার এই পরিমাণ অংশ আমিষ হতে হবে। বাকি সব ক্ষেত্রে দেশী মুরগীর মত মুরগীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এতে মুরগীর প্রজনন এবং যত্ন নিশ্চিত হবে।মুরগীর বিভিন্ন প্রজাতি এবং প্রজাতি সম্পর্কিত পালন পদ্ধতি সম্পর্কে সব কিছু জানার পরই কোন মুরগী পালন করবেন তা নিশ্চিত করা উচিৎ। এভাবে পরিকল্পনা করলে পোল্ট্রি ব্যবসায় লাভ করা সম্ভব।

কৃষককন্ঠ ডেস্ক 










