পরিকল্পনাবিহীন যেকোনো ব্যবসাতেই লাভের থেকে ক্ষতির পরিমাণটাই বেশি থাকে। আর এই বিষয়টি মুরগি পালন ব্যবসা বিষয়ে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। তাই পরিমিত কিংবা অধিক যে লাভই আপনি চান না কেনো আপনাকে অবশ্যই সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী আগাতে হবে। মুরগি পালন ব্যবসা শুরু করার পর কিছু মাস যেতে না যেতেই দেখা যায় অনেকে ব্যবসা ছেড়ে দেন। এর অন্যতম কারণ হলো সঠিক পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনার অভাব।
একটি লাভজনক মুরগী খামার করতে চাইলে মুরগী খামারে বিনিয়োগ থেকে শুরু করে মুরগী খামার পরিচালনা পর্যন্ত সকল বিষয়ে দক্ষতা থাকা চাই। আর তার জন্য প্রথম প্রয়োজন নির্দেশনা যে কোন বিষয়ের উপর দক্ষতা প্রয়োজন।
সেই নির্দেশনা নিয়েই হবে আমাদের আজকের আলোচনা। মুরগী পালন ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সকল বিষয় নিয়ে আমরা বিস্তারিত জানতে চেষ্টা করব।
মুরগি খামার ব্যবসার পরিকল্পনা কেনো গুরুত্বপূর্ণ?
মুরগী খামারের গুরুত্ব কতটা তা আমাদের কৃষক ভাইদের লাভের হার এবং প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর উল্লেখযোগ্যতা দেখলেই বোঝা যায়। তবে এ লাভ অর্জন করতে হলে মুরগী পালন পরিকল্পনা একটি আবশ্যিক বিষয়। কিন্তু কেনো এর গুরুত্ব? কেননা-
- খামার ব্যবসা পরিকল্পনার মাধ্যমে মুরগীর জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরী করা যায়।
- মুরগীর রোগ-ব্যাধির পরিমাণ বেশ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।
- ডিমের এবং মাংসের গুণগত মান বৃদ্ধি পায়।
- মুরগীর জন্য প্রয়োজনীয় সকল কিছুর ব্যবস্থাপনা সঠিক সময়্র এবং সঠিকভাবে করা যায়।
- মুরগীর যাবতীয় সুরক্ষা নিশ্চিত হয় যা আমাদের ডিম এবং মাংসের যোগানকেও সুরক্ষিত রাখে।
তাই অনায়াসেই বোঝা যায়, মুরগী খামার ব্যবসার পরিকল্পনা কেনো এত গুরুত্বপূর্ণ।
মুরগী খামার কীভাবে শুরু করবেন?
মুরগী খামার পরিচালনার ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক ধাপ শুরু হয় মুরগী খামার শুরু থেকেই। তাই খামার নির্মাণের পূর্বেই খামার এবং মুরগীর জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিসের একটি লিস্ট করতে হবে।এরপর সেই লিস্ট অনুযায়ী কোন কাজে কেমন খরচ হবে তা নিশ্চিত করতে হবে। মুরগী পালন খরচ সম্পর্কে না জেনেই খামার নির্মাণ করা বোকামি।
হিসাব করা হয়ে গেলে এবার প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহ এনে খামার নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি মুরগীর বাচ্চা, খাবার, ওষুধ, ভ্যাক্সিন ইত্যাদি কিনতে হবে এবং যথাযথ স্থানে তা স্থাপন করতে হবে। এভাবেই আপনি একটি খামার গড়ে তুলতে পারবেন।
মুরগী খামার পরিচালনা করবেন কীভাবে?
মুরগী খামার পরিচালনার মূলমন্ত্র হলো একজন দক্ষ মানুষ। আপনার যদি মুরগী পালন সম্পর্কে ধারণা কম থাকে তবে অবশ্যই আগে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নেবেন।
আর যদি আপনি আগে থেকেই এ বিষয়ে দক্ষ হয়ে থাকেন তবে তো আর কোনো সমস্যাই নেই। মুরগী পালনের জন্য সঠিক খাদ্য এবং খামারের মুরগীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার সাথে অন্যান্য সকল কাজ জড়িত।
তাই মুরগীর জন্য অবশ্যই পুষ্টিকর খাদ্য নির্বাচন করতে হবে। দানাজাতীয় বীজ, শস্য যেমন ধান ভূট্টা, গম, নরম শাক জাতীয় পাতা, ঝিনুকের গুঁড়া, বাড়ির বেঁচে যাওয়া রান্না করা ভাত ইত্যাদি মুরগীর জন্য উপযোগী খাদ্য।
তাই এগুলো অবশ্যই মুরগীকে প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি মুরগীর খামার জীবাণুমুক্ত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং আলো-বাতাসসমৃদ্ধ হতে হবে। এতে মুরগীর খামার পরিচালনা সফল হবে।
ছোট পরিসরে মুরগি পালন করার উপায়
বিনিয়োগের পরিমাণ কম থাকায় অনেকেই ছোট পরিসরে মুরগী পালন করতে চান। তবে এ পদ্ধতিতেও বেশ ভালো পরিমাণ লাভ আনা সম্ভব যদি আপনি সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারেন।
মুরগী ছেড়ে পালন করলেও মুরগীর বিচরণের জায়গা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং বিষ্ঠাও নিয়মিতভাবে সরিয়ে ফেলতে হবে। খাবার সকল মুরগীর ক্ষেত্রে একই এবং অর্গানিক এসকল খাবার মুরগীর জন্য পুষ্টিকরও বটে।
আপনার বাড়ির সদস্যদেরও এ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে পারেন যেনো তারাও তাদের অবসর সময়ে আপনার এই খামারের দেখভাল সঠিকভাবে করতে পারে। এতে আপনাকে বাইরে থেকে লোক নিয়োগ করতে হবে না।
মুরগী পালনের লাভজনক পদ্ধতি
আমরা তো ছোট পরিসরে মুরগী পালন সম্পর্কেও জানলাম। কিন্তু সবচেয়ে লাভজনক পদ্ধতি কোনটি? জেনে নিন তাহলে এটিও।
মুরগী পালনের তিনটি পদ্ধতি প্রচলিত আছে। এগুলো হলো-
১. ছাড়া পদ্ধতি
২. অর্ধ ছাড়া বা মাচা পদ্ধতি
৩. খাচা পদ্ধতি
এর মধ্যে খাচা বা খামার পদ্ধতিতে মুরগী পালনে বেশি লাভ করা যায়। কেননা মুরগীর যাবতীয় বিষয় এই পদ্ধতিতে খামারির তত্ত্বাবধানে থাকে। ফলে কোনো সমস্যা হলে তিনি তখনই দেখতে পারেন এবং ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা কমাতে পারেন।
মুরগী পালনে ঝুঁকি এবং সমাধান
মুরগী পালনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এর রোগ-বালাই। কেননা কোনো একটি মুরগীরও যদি রোগ হয় এবং তা সঠিকভাবে চিকিৎসা না করা হয়, তবে সব মুরগীই মারা যেতে পারে।
বর্তমানে মুরগীর খাদ্য এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মুরগী পালন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হচ্ছে। তবে এখনো তা আমাদের কৃষক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই নিয়মিত এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে মুরগীর রোগ নির্ণয় করতে হবে।রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি অভিজ্ঞ পশু ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী রোগের সমাধানও করতে হবে। এতে মুরগী পালন্র বেশ লাভ করা সম্ভব।
মুরগী পালনের সুবিধা এবং খামারে সঠিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা এতক্ষণ জানলাম। সচেতনা এবং পরিপূর্ণ জ্ঞানই পারে মুরগী পালন থেকে ভালো পরিমাণ লাভ নিয়ে আসতে। তাই এ বিষয়ে সঠিক গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক।

কৃষককন্ঠ ডেস্ক 










