আপনি কি বাণিজ্যিক পোলট্রি খামার শুরু করার কথা ভাবছেন? পোলট্রি ব্যবসায় সাফল্য গল্প এখন অতি পরিচিত আমাদের কাছে। তবে এই ব্যবসা শুরু করার আগে জেনে নিতে হবে পোলট্রি খামারের ৫ টি সাফল্যের রহস্য।
কেনো পোলট্রি খামার একটি লাভজনক ব্যবসা
একটি মুরগি খামার গড়ে তোলার আগে অবশ্যই আপনার জেনে নেয়া প্রয়োজন এটি কতটা লাভজনক হবে। বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি আপনি বুঝতে পারবেন। আমাদের দেশের দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে বেশিরভাগ মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটার মুরগীর মাংস এবং ডিম। ফলে আপনি যদি একটি পোলট্রি ফার্ম তৈরী করেন, তবে সেটার চাহিদা নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।
আর যেখানে পর্যাপ্ত চাহিদা আছে সেখানে সঠিক কৌশল অবলম্বন করলে অবশ্যই লাভ করা সম্ভব। তাছাড়াও তুলনামূলক অন্য ব্যবসার থেকে কম বিনিয়োগ করেই বেশ ভালো একটি লাভের পরিমাণ আপনি তুলে আনতে পারছেন অতি অল্প সময়ে।
নিশ্চয়ই এবার আপনার মনে আর সংশয় নেই যে পোলট্রি ব্যবসা কতটা লাভজনক।
কীভাবে পোলট্রি খামার শুরু করলে লাভ পাবেন
একটি সফল পোলট্রি খামার তৈরী করার প্রধান শর্ত হচ্ছে কৌশলগত পরিকল্পনা। আপনি যদি পোলট্রি খামার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন তাহলে এই বিষয়গুলো অবশ্যই পরিকল্পনায় রাখবেন।
জায়গা নির্বাচন
পোলট্রি খামারের জন্য জায়গা নির্বাচন করতে হলে আপনি যেগুলো দেখবেন তা হলো-
- জায়গা যেনো একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে না হয়ম শহরের আশেপাশে হলে ভালো যেখানে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো। এতে শহরাঞ্চলের দোকানগুলোতে ডিম এবং মুরগী সরবরাহ করা সুবিধা হবে। গ্রামে বেশিরভাগ মানুষের বাড়িতে মুরগী থাকে বলে চাহিদা একটু কমে যেতে পারে।
- আবাসিক এলাকায় খামার স্থাপন করবেন না। কারণ এসব পোলট্রি খামার থেকে অনেক দুর্গন্ধ পাওয়া যায়।
- তুলনামূলক কম দামে জমি পাওয়া যায় এমন জায়গা পাওয়ার চেষ্টা করবেন।
খামারের অবস্থান
- জায়গা নির্বাচন করার পর আপনাকে খামার স্থাপনের কাজে লেগে যেতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথম বিষয়টি হলো যেনো খামার উঁচু স্থানে হয়। বন্যাপ্রবণ এলাকা বলে পানি যেনো কোনোভাবেই ঢুকতে না পারে। তাছাড়াও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
- বিদ্যুৎ এবং বিশুদ্ধ পানি থাকতে হবে।
অর্থ-সংক্রান্ত বিষয়
- ফার্ম শুরু করার আগেই বাজেটের বিষয়টি নিয়ে ভেবে নিতে হবে।
- কতটুকু জায়গা আছে এবং তা কতগুলো মুরগীর জন্য বরাদ্দ করা যাবে এসব হিসেব করে বিনিয়োগ করতে হবে।
- তাছাড়াও আনুষঙ্গিক সকল খরচের বাজেট করে নিতে হবে।
জাত নির্বাচন
- এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। কোন জাতের মুরগীর ফার্ম করবেন তা আপনাকে অবশ্যই অনেক যাচাই বাছাই করে ঠিক করতে হবে যেনো ভালো জাতের পোলট্রি খামার করা যায়।
দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণ
- ফার্মে যারা কাজ করবে তারা কতটুকু দক্ষ তা যাচাই করে নিতে হবে। পরিপূর্ণ দক্ষ না হলে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।ব্যবসার মূল লক্ষ্যই হলো পণ্য বিক্রয়। আর পোলট্রি পণ্য বাজারজাতকরণ তুলনামূলক সহজ। তাই এই কাজটি কীভাবে এগিয়ে নেবেন তা আগেই ঠিক করে নিন।
পোলট্রি খামারের ব্যবস্থাপনা
পোলট্রি খামার পরিচালনা প্রাথমিকভাবে সহজ মনে হলেও এখানে বেশ কিছু জটিল বিষয় রয়েছে। তাই সঠিক পরিকল্পনার পরে পোলট্রি ব্যবসা পরিচালনার কৌশল সম্পর্কেও আপনার জানতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার করণীয় হবে-
- প্রথমত মুরগীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে কোনো মুরগী অসুস্থ আছে কিনা তা জানা যাবে।
- কোনো মুরগী অসুস্থ হলে দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে।
- ডিম উৎপাদনের লক্ষ্য থাকলে ব্রুডিং সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে।
- খামারের তাপমাত্রা, আলো-বাতাস এসব ঠিক আছে কিনা তা দেখতে হবে।
- মুরগীর খাবার পুষ্টিসমৃদ্ধ কিনা এবং ভ্যাক্সিনেশন ঠিকমত হয়েছে কিনা তা তদারকি করতে হবে।
পোলট্রি খামার সফল করার জন্য মৌলিক বিষয়গুলো

পোলট্রি খামারের মুনাফা বৃদ্ধির জন্য কিছু মৌলিক বিষয় আপনার অবশ্যই জেনে নেয়া উচিৎ যা আপনি পোলট্রি খামারের সাফল্যের রহস্য হিসেবেও বলতে পারেন। সেগুলো হলো-
- মুরগীর জন্য সঠিক বাসস্থান নির্মাণ।
- ভালো জাতের, উচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন মুরগী নির্বাচন।
- মুরগীর জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং পুষ্টি উপানাদের ব্যবস্থা সঠিক ভাবে করা।
- সময়মত ভ্যাক্সিনেশন এবং রোগ যেনো না হতে পারে এই ব্যাপারগুলো নিশ্চিত করা।
- নিয়মিত মুরগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা।
- ফার্ম সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা
- বাজারের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং সে অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনা করা।
পোলট্রি খামার পরিচালনা করার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো মেনে চললে আপনি অবশ্যই সফল হবেন।
পোলট্রি খামার শুরু করার সমস্যা এবং সমাধানের উপায়
পোলট্রি খামারের আয় বৃদ্ধি করার জন্য এর সমস্যাগুলোও আপনার জেনে নেয়া প্রয়োজন যেনো আপনি এর সহজ সমাধান পেতে পারেন-
- বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বড় সমস্যা হলো দরিদ্রতা। একারণে ইচ্ছে থাকার পরেও অনেক তরুণ এ কাজে আসছেন না।
- সুস্থ রোগমুক্ত বাচ্চার অভাবেও এই পোলট্রি খামারগুলো সঠিকভাবে গড়ে উঠতে পারে না।
- পোল্ট্রি খাদ্যের অত্যাধিক মূল্য থাকার কারণে অনেকের কাছে মূলধন থাকলেও তা দিয়ে ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না। শুধু খাদ্য নয়, টিকা এবং অন্যান্য সামগ্রীও মূল্যবান। এক্ষেত্রে লোন নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
- পোল্ট্রি ফার্মের এসকল মুরগীর জন্য নির্দিষ্ট কোনো বাজার নেই। তাই একটি নির্দিষ্ট বাজার করা প্রয়োজন যেনো খামারিরা তাদের ন্যায্যমূল্য পান।
- অনেক সময় কিছু ডিম অস্বাভাবিক আকৃতির হওয়ায় এগুলোকে নকল বলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের খামারে যত ডিম উৎপাদন হয়, তার ২-৪% কিছুটা অস্বাভাবিক। তাই বাণিজ্যিক পোলট্রি খামারগুলো এ ব্যাপারে জনগণকে জানাতে পারে।
- এছাড়াও পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ এবং দক্ষ জনবলের অভাবও লক্ষ করা যায়। এসব ক্ষেত্রে নজর দেয়া আবশ্যক।
পোলট্রি ব্যবসা সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই জানলাম। তবে আপনি যদি এই ব্যবসা শুরু করার কথা ভেবে থাকেন, তাহলে উল্লেখিত বিষয়গুলোর কোনোটিই বাদ দেয়া যাবে না। প্রয়োজনে আরও একবার ভালো করে দেখে নিন। নিশ্চিত থাকুন আপনি অবশ্যই লাভ পাবেন এই ব্যবসায়।

কৃষককন্ঠ ডেস্ক 








