মুরগির খাবার ব্যবস্থাপনা: পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের সেরা উপায়

মুরগির খাবার ব্যবস্থাপনা

মুরগির খাবার ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে না জানলে মুরগীর বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই একজন লাভবান খামারী হতে চাইলে খাবারের দিক নিয়ে অবশ্যই দক্ষ হতে হবে।পোলট্রি ফার্মে মুরগ খাবার ব্যবস্থাপনা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুরগীর খাদ্য পরিকল্পনা করতে চাইলে আপনাকে হতে হবে কৌশলী এবং পোলট্রি খাদ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে দক্ষ। এতে একদিকে যেমন আপনার মুরগীর স্বাস্থ্য সুরক্ষ নিশ্চি হবে, তেমনি ফার্মের লাভের পরিমাণও বাড়তে থাকবে।

পোলট্রি খামারে খাদ্য ব্যবস্থাপনার ভূমিকা

একটি পোলট্রি খামার লাভজনকভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে বেশ কিছু দিক সম্পর্কে সচেতন থাকা আবশ্যক। আর তার মধ্যে একটি হলো খাদ্য ব্যবস্থাপনা। কিন্তু কেনো খাদ্য ব্যবস্থাপনা এত গুরুত্বপূর্ণ? তাহলে এখন এই বিষয়টি সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক-

  • পোলট্রি মুরগীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এবং সঠিকভাবে বৃদ্ধির জন্য সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা একান্ত প্রয়োজন। সঠিক পুষ্টি না পেলে তার শরীরে বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা দেখা যেতে পারে।
  • মাংস এবং ডিমের গুণগত মান বৃদ্ধি করার পাশাপাশি মুরগীর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রয়োজন সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হলো পোলট্রি খামারের খাদ্য ব্যবস্থাপনা। 
  • দক্ষতার সাথে খাদ্য ব্যবস্থাপনা করতে পারলে খাদ্যের অপচয় হয় না। এতে খরম কমানো সম্ভব হয়।
  • আগেই বলেছি, খাদ্যের গুণগত মান এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা মুরগীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেয়। ফলে মুরগীর রোগ প্রতিরোধ কম হয় যা ওষুধের খরচ কমাতে পারে।

এসকল কারণেই পোলট্রি খামারে সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করলে একটি টেকসই ব্যবসা পরিচালনার জন্য তা সহায়ক হয়।

মুরগির খাবার পরিকল্পনার মৌলিক বিষয়

আমরা জেনে নিয়েছি যে কেনো পোলট্রি খামারে মুরগীর খাবার ব্যবস্থাপনা এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কিন্তু খাদ্য ব্যবস্থাপনা করতে চাইলে প্রথমেই জানতে হবে এই পরিকল্পনাতে কী কী বিষয় থাকতে হবে। তাই এই মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো-

১. মুরগীর খাদ্য হতে হবে সুষম। মুরগী যেহেতু প্রোটিনের উৎস, তাই প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য তাকে অবশ্যই দিতে হবে। পাশাপাশি কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন এবং খনিজ লবণের চাহিদা মেটে এমন খাদ্যও দিতে হবে।

২. খাবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে মুরগীর জাত, মুরগীর আকার এবং বয়সের দিকগুলো খেয়াল রাখতে হবে। ডিম পাড়তে পারে এমন মুরগীগুলো সাধারণত একটি বেশি খাবার খায় ছোট এবং বৃদ্ধের তুলনায়।

৩. মুরগীর জন্য প্রতিদিন কী পরিমাণে খাবার লাগবে তা নির্ধারণ করতে হবে। এটি নির্ধারণ করার আগে অবশ্যই পুষ্টি চাহিদা সম্পর্কে সঠিকভাবে বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে।

৪. মুরগীর খাদ্য গ্রহণের অভ্যাসের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। যদি দেখা যায় যে খাবার পরিকল্পনা করা হয়েছে তা সঠিকভাবে পুষ্টি চাহিদা মেটাতে পারছে না, সেক্ষেত্রে খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনতে হবে।

৫. সর্বক্ষেত্রেই মুরগীর পুষ্টি বিষয়টিকে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে।

এভার মুরগীর খামার করার পরপরই মুরগীর খাবারের ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে বুঝে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

পোলট্রি মুরগীর সঠিক পুষ্টির চাহিদা

মুরগির খাবার ব্যবস্থাপনা বা কোন খাদ্য কতটুকু পরিমাণে প্রয়োজন তা বুঝতে হলে প্রথমেই মুরগীর পুষ্টির চাহিদা সম্পর্কে জানতে হবে। বয়স অনুযায়ী মুরগীর এ চাহিদা পরিবর্তিত হয়। তাই আমরা এখন মুরগীর পুষ্টি চাহিদা সম্পর্কে জেনে নিব।

 

  • প্রোটিন- একটি বাচ্চা মুরগীর মোট খাবারের ১৮-২০% প্রোটিনের প্রয়োজন এবং একটি পূর্ণবয়স্ক মুরগীর জন্য এ চাহিদা ১৫-১৮%।

 

  • মুরগীকে প্রতিদিন নিয়মিত কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাদ্য দিতে হবে। মুরগীর শরীর পরিচালনার জন্য যে শক্ত দরকার তা মুরগী কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য থেকেই পেয়ে থাকে।

 

  • শরীরে তাপ উৎপাদনের মাধ্যমে শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি প্রদান করা এবং বিভিন্ন ভিটামিন শরীরে শোষণ করার জন্য চর্বির প্রয়োজনীয়তা অনেক। প্রতিদিন মোট খাবারের ২-৫% অবশ্যই চর্বিজাতীয় খাদ্য প্রদান করতে হবে।

 

  • ডিম উৎপাদনের জন্য ভিটামিনের ভূমিকা অপরিসীম। তাই ভিটামিন জাতীয় খাদ্য উপাদান দিতে হবে। এছাড়াও প্রয়োজনে খাদ্যের বাইরে সাপলিমেন্ট হিসেবে ভিটামিন দেওয়া যায়।

 

  • মুরগীর জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, জিংক এবং আয়রন পরিমিত হারে দিতে হবে। ক্যালসিয়াম ডিমের খোলসের গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খনিজ লবণের অভাবে ডিম নষ্ট হয়ে যেতে পারে। 

 

  • ডিমের জন্য অবশ্যই প্রয়োজনীয় এমন উপাদানগুলোর মধ্যে আরেকটি হলো পানি। বিশুদ্ধ পানি পরিমিত হারে নিয়মিত ভাবে মুরগীকে দিতে হবে। তা না হলে মুরগীর শারীরিক কার্যকলাপ সঠিকভাবে পরিচালিত হবে না। 

 

একজন পোলট্রি খামারিকে অবশ্যই এ বিষয়গুলো ভালোভাবে জানতে হবে। অন্যথায় মুরগীর সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত হবে না।

 

মুরগীর পুষ্টিকর খাদ্য ব্যবস্থাপনা 

পোলট্রি পুষ্টি ব্যবস্থাপনা একটি সুষ্ঠু খামার পরিচালনার জন্য শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, বরং আবশ্যক। সঠিক পুষ্টির উপর নির্ভর করছে মুরগীর স্বাস্থ্য,উৎপাদনশীলতা এবং লাভজনকতা নিশ্চিত করা উপায়। মুরগীর সুষম খাদ্য বণ্টনে কী কী পুষ্টিকর খাদ্য দেয়া প্রয়োজন তা যদি আপনি না জেনে থাকেন, তাহলে অবশ্যই এখান থেকে দেখে নিন-

 

  • প্রোটিন- সয়াবিন, মাছের খাবার, সরিষা বীজ, সূর্যমুখী বীজ, তিসি বীজ ইত্যাদি
  • কার্বোহাইড্রেট- ধান, চাল, গম, ভূট্টা এবং শস্য জাতীয় খাদ্য।
  • ভিটামিন- সবুজ শাক, সাপলিমেন্টারি ভিটামিন
  • খনিজ লবণ- ঝিনুকের খোসাজাতীয় গুঁড়া, শেল ইত্যাদি।
  • পরিমিত পানি
  • শুধু এক ধরণের খাবার না দিয়ে বিভিন্ন খাবার একসাথে মিশিয়ে দিলে তা পুষ্টিমান রক্ষায় বেশি উপকারী হয়। যেমন, সয়াবিন, ভূট্টা, রাইস ব্রান এবং অন্যান্য শস্যের সমন্বয়ে একটি মৌলিক খাদ্য মিশ্রণ তৈরি করা।
  • বাচ্চা, প্রাপ্তবয়স্ক মুরগী এবং লেয়ার মুরগীর জন্য আলাদা আলাদা খাদ্য পরিকল্পনা করতে হবে যেনো পুষ্টি চাহিদা সঠিকভাবে মেনে চলা যায়।

 

মুরগীর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা 

ইতিমধ্যে আমরা বিস্তারিতভাবে জেনে গেছি যে মুরগীর জন্য কোন কোন পুষ্টিকর খাদ্য কেমন পরিমাণে দরকার। তাহলে এখন মুরগীর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়েও কিছু জেনে নেয়া যাক-

 

  • প্রথমেই উপরে বর্ণিত নিয়মাবলী অনুসারে সঠিক খাদ্য নির্বাচন করতে হবে। 
  • পুষ্টিমান নিশ্চিত করে মুরগীর আলাদা খাদ্য মিশ্রণ পদ্ধতি অবলম্বন যেনো তাতে সব খাবার নির্দিষ্ট হারে মিশ্রিত থাকে।
  • প্রতিদিন কত টুকু খাদ্য দেয়া হবে এবং কখন দেয়া হবে সেই সময়সূচি নির্ধারণ।
  • খাবারের পাশাপাশি পানিও যেনো সঠিক পরিমাণে দেয়া হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। 
  • খাদ্য বিতরণের জন্য অটোমেটেড ফিডার বা ম্যানুয়াল ফিডার এই দুই ধরণের পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শুধু খাদ্য দিলেই হবে না। মুরগী খাবার ঠিকমত খাচ্ছে কিনা সেটাও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
  • যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে যেনো খাদ্য সরবরাহে অপচয় কম হয়। এতে খরচ কমানো যাবে।

এভাবেই সঠিকভাবে মুরগীর খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

 

শেষ কথা

পোলট্রি মুরগীর পুষ্টিকর খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং মুরগীর খাদ্য সরবরাহ একটি বেশ দক্ষতামূলক কাজ। মুরগীর খাদ্যে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন সহ সব কিছুর সমন্বয় যেনো ঘটে সে কারণে মুরগীর খাবার পরিকল্পনা একান্ত প্রয়োজনীয়। মুরগীর খাবার ও বৃদ্ধি পরস্পর যে একসাথে জড়িত তা আমরা জানি। তাই পোলট্রি মুরগীর সঠিক খাবার নিশ্চিত করে আপনিও খামারের আয় বৃদ্ধি করতে পারবেন।

ভিজিট ফেইজবুক পেইজ: ক্লিক হেয়ার

Comments

One response to “মুরগির খাবার ব্যবস্থাপনা: পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের সেরা উপায়”

  1. […] আসা যাক, মুরগীর খাদ্য তালিকা প্রসঙ্গে। মুরগীর জন্য কোন কোন […]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *