আসিয়া আফরিন চৌধুরী
গহিন সুন্দরবনের শিবসা নদীতে আমাদের নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। উজান থাকা সত্ত্বেও স্রোতের ধারা কম থাকায় নৌকার বইঠা বেয়ে চলা খুব কষ্টকর হচ্ছে না। সূর্যদেব তখন তার কোমলতা ঝেড়ে উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। নদীজুড়ে সূর্যের লাল আভা প্রতিফলিত হয়ে সোনালি রঙ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। হালকা কুয়াশা গায়ে মেখে একদল চিত্রা হরিণ নদীপাড়ে বিচরণ করছে। এই সময় চোখে পড়ল একটি অদ্ভুত ফল, যা দেখতে কেওড়া বা ডুমুরের মতো হলেও আকারে বড় এবং গাঢ় সবুজ ডিম্বাকার পাতার মধ্যে ঝুলে ছিল।
এই ফলটি সম্পর্কে স্থানীয় জেলে লিয়াকত আলী বললেন, ‘‘এটি ছইলা ফল। এর স্বাদ কেওড়ার মতো টক। আমাদের মতোই সুন্দরবনের হরিণ ও বানররা এই ফল খুব পছন্দ করে। বানরের দল গাছ থেকে ফল ও পাতা ফেলে আর হরিণ সেগুলো খেয়ে নেয়।’’ ছইলা ফলটি সুন্দরবনের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের একটি অমূল্য উপহার হিসেবে পরিচিত।
ছইলা গাছের বৈশিষ্ট্য:
ছইলা গাছটি সুন্দরবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের একটি। এটি লবণাক্ত জল ও মাটি সহ্য করতে সক্ষম। নরম কাদার উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই গাছটি প্রবল হাওয়া ও স্রোতে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, কারণ এর শিকড়গুলো একে মজবুতভাবে মাটির সাথে সংযুক্ত রাখে। ছইলাগাছের গোড়ায় শ্বাসমূল থাকে, যা বাতাস থেকে অক্সিজেন ও জলীয়বাষ্প গ্রহণ করতে সহায়তা করে। এটি সাধারণত ১০ থেকে ১৫ মিটার উচ্চতায় বেড়ে উঠে এবং চিরসবুজ হয়ে থাকে।
ছইলা ফল ও ফুল:
ছইলা গাছের ফলের আকার কেওড়ার চেয়ে বড় এবং টক স্বাদের। ফল পাকলে হলদে রঙ ধারণ করে। সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ছইলা ফল পাওয়া যায়, যা প্রায় এক কেজি ওজনের হয়ে থাকে। ছইলা গাছের ফুলের মধ্যে অনেকটা লোমশ কলি থাকে, যা সাদা ও গোলাপি রঙের মধ্যে ফুটে থাকে। ছইলা ফুল রাতের বেলায় সুন্দরবনের জোনাকি পোকার অন্যতম আশ্রয়স্থল।
ছইলা ফলের ব্যবহার:
ছইলা ফল সুন্দরবনের মানুষের কাছে অতি জনপ্রিয়। কাঁচা ছইলা ফল চিংড়ি বা মসুর ডাল দিয়ে রান্না করা হয়। এছাড়াও, এটি আচার ও চাটনি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ভর্তা করেও খাওয়ার রীতি রয়েছে। ছইলা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়, যা সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।
এছাড়াও, এই ফলটি সুন্দরবনের হরিণ, বানর, এবং পাঙাশ মাছের খাদ্য হিসেবে পরিচিত। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ছইলা গাছ ও তার ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সুন্দরবনের এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের কাছে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দেয়, যেখানে মানুষের সাথে প্রকৃতি ও জীবজন্তুর এক নিবিড় সম্পর্ক প্রতিফলিত হয়।

কৃষককন্ঠ ডেস্ক 








