ঢাকা ০১:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
আশুলিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ইয়াবা ও গাঁজাসহ ৫ জন মাদক ব্যবসায়ী আটক। বায়োফ্লক প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের নতুন সম্ভাবনা  নদী দখল ও দূষণে হুমকিতে দেশীয় মাছের প্রজাতি  আতা ফলের ফল ছিদ্রকারি পোকা: কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আদার গাছ ছিদ্রকারি পোকা – জীবনচক্র, ক্ষয়ক্ষতি ও টেকসই সমাধান বাংলাদেশে আতা ফলের আগা মরা রোগ: কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আনারসের হার্ট রট রোগ – কারণ, লক্ষণ ও টেকসই সমাধান আমলকির কান্ড ছিদ্রকারি পোকা – জীবনচক্র, ক্ষতি ও সমন্বিত সমাধান আমলকির গল মাছি – জীবনচক্র, ক্ষতি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আমলকির স্কেল পোকা – জীবনচক্র, ক্ষতি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা

বিজয়নগরের বিষ্ণুপুর গ্রামে ‘লালি’ উৎপাদন: ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

  • কৃষককন্ঠ ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৯:১১:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৫
  • ২৭৫ বার পড়া হয়েছে

আসিয়া আফরিন চৌধুরী   ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের লালি উৎপাদন একটি পুরনো ঐতিহ্য। প্রতি শীত মৌসুমে আখের রস থেকে তৈরি হয় এই সুস্বাদু তরল গুড়, যা স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ‘লালি’ নামের এই গুড়টি শুধুমাত্র খাবারের জন্য নয়, একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবেও পরিচিত। এখানকার আখ চাষি ও শ্রমিকরা এক সাথে কাজ করে এটি উৎপাদন করে, যা শুধু গ্রাম নয়, জেলার বাইরেও চাহিদা রয়েছে।

প্রতিবছর শীত মৌসুমে (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) বিষ্ণুপুর ও আশপাশের গ্রামে আখ চাষের কার্যক্রম শুরু হয়। মহিষের ঘানি দিয়ে আখের রস সংগ্রহ করা হয় এবং তা চুল্লিতে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল করে তরল গুড় বা লালি তৈরি করা হয়। লালির স্বাদ ও গুণমান এতটাই ভালো, যে, বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা এখানে আসেন শুধুমাত্র এই তরল গুড় কিনতে।

আখের রস সংগ্রহের পর, এটি ৩-৩.৫ ঘণ্টা ধরে মাটির চুল্লিতে জ্বাল করা হয়, যাতে এর পানি ঝরতে থাকে এবং ঘন হয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো রঙ বা কৃত্রিম উপাদান মেশানো হয় না, ফলে এটি একেবারে প্রাকৃতিক গুড়। এক কেজি লালি তৈরি করতে ৪০০ কেজি আখ প্রয়োজন। স্থানীয় বাজারে ১ কেজি লালির মূল্য ১৫০ টাকা, এবং এক বছরেও প্রায় ৮০ থেকে ১০০ টন লালি উৎপাদিত হয়, যার বাজার মূল্য প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা।

উপজেলায় লালি উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে ৮০-৯০ জন ব্যবসায়ী ও ১৫০ জন কৃষক জড়িত। তাঁদের মধ্যে একজন, মো. শাহনেওয়াজ বলেন, “এ বছর আমরা ৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি, এবং আশা করছি ৩ লাখ টাকা লাভ হবে।” স্থানীয় কৃষকরা জানাচ্ছেন, তাঁদের ব্যবসা শুধু লাভজনক নয়, এটি তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

বিষ্ণুপুর গ্রামের লালি অনেক জনপ্রিয়, এবং তা শুধু এলাকার মধ্যে নয়, বাইরের লোকজনও এ অঞ্চলে এসে লালি কিনতে আসেন। স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, “লালি দিয়ে রুটিসহ পিঠা খেতে অনেক স্বাদ পাওয়া যায়।” এই ঐতিহ্যবাহী তরল গুড়ের প্রতি সারা দেশের মানুষের আগ্রহ দিন দিন বেড়ে চলেছে, এবং এর উৎপাদন প্রক্রিয়াও একটি দর্শনীয় উপকরণ হয়ে উঠেছে।

বিজয়নগর উপজেলায় প্রতিবছর প্রায় ৮০০-১,০০০ মেট্রিক টন আখ উৎপাদন করা হয়, যা ১৬-২০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়। কৃষি কর্মকর্তা আবদুল ওদুদ জানান, প্রতি হেক্টর জমিতে ৫০ টন আখ উৎপাদিত হয়। আখ চাষ ও লালি উৎপাদন শুধু কৃষকদের জন্য নয়, এটি একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে।

বিজয়নগরের বিষ্ণুপুর গ্রামের লালি উৎপাদন শুধু একটি খাদ্য প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং এলাকার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য কৃষক, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় প্রশাসন একযোগে কাজ করছেন, যাতে এই সুস্বাদু তরল গুড় আরও বড় পরিসরে বিক্রি করা যায় এবং আরও লোকের কাছে পৌঁছানো যায়।

এটি শুধু বিজয়নগর নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে।

অথরের তথ্য

Abrar Khan

জনপ্রিয় সংবাদ

আশুলিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ইয়াবা ও গাঁজাসহ ৫ জন মাদক ব্যবসায়ী আটক।

বিজয়নগরের বিষ্ণুপুর গ্রামে ‘লালি’ উৎপাদন: ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

আপডেট সময় ০৯:১১:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৫

আসিয়া আফরিন চৌধুরী   ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের লালি উৎপাদন একটি পুরনো ঐতিহ্য। প্রতি শীত মৌসুমে আখের রস থেকে তৈরি হয় এই সুস্বাদু তরল গুড়, যা স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ‘লালি’ নামের এই গুড়টি শুধুমাত্র খাবারের জন্য নয়, একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবেও পরিচিত। এখানকার আখ চাষি ও শ্রমিকরা এক সাথে কাজ করে এটি উৎপাদন করে, যা শুধু গ্রাম নয়, জেলার বাইরেও চাহিদা রয়েছে।

প্রতিবছর শীত মৌসুমে (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) বিষ্ণুপুর ও আশপাশের গ্রামে আখ চাষের কার্যক্রম শুরু হয়। মহিষের ঘানি দিয়ে আখের রস সংগ্রহ করা হয় এবং তা চুল্লিতে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল করে তরল গুড় বা লালি তৈরি করা হয়। লালির স্বাদ ও গুণমান এতটাই ভালো, যে, বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা এখানে আসেন শুধুমাত্র এই তরল গুড় কিনতে।

আখের রস সংগ্রহের পর, এটি ৩-৩.৫ ঘণ্টা ধরে মাটির চুল্লিতে জ্বাল করা হয়, যাতে এর পানি ঝরতে থাকে এবং ঘন হয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো রঙ বা কৃত্রিম উপাদান মেশানো হয় না, ফলে এটি একেবারে প্রাকৃতিক গুড়। এক কেজি লালি তৈরি করতে ৪০০ কেজি আখ প্রয়োজন। স্থানীয় বাজারে ১ কেজি লালির মূল্য ১৫০ টাকা, এবং এক বছরেও প্রায় ৮০ থেকে ১০০ টন লালি উৎপাদিত হয়, যার বাজার মূল্য প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা।

উপজেলায় লালি উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে ৮০-৯০ জন ব্যবসায়ী ও ১৫০ জন কৃষক জড়িত। তাঁদের মধ্যে একজন, মো. শাহনেওয়াজ বলেন, “এ বছর আমরা ৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি, এবং আশা করছি ৩ লাখ টাকা লাভ হবে।” স্থানীয় কৃষকরা জানাচ্ছেন, তাঁদের ব্যবসা শুধু লাভজনক নয়, এটি তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

বিষ্ণুপুর গ্রামের লালি অনেক জনপ্রিয়, এবং তা শুধু এলাকার মধ্যে নয়, বাইরের লোকজনও এ অঞ্চলে এসে লালি কিনতে আসেন। স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, “লালি দিয়ে রুটিসহ পিঠা খেতে অনেক স্বাদ পাওয়া যায়।” এই ঐতিহ্যবাহী তরল গুড়ের প্রতি সারা দেশের মানুষের আগ্রহ দিন দিন বেড়ে চলেছে, এবং এর উৎপাদন প্রক্রিয়াও একটি দর্শনীয় উপকরণ হয়ে উঠেছে।

বিজয়নগর উপজেলায় প্রতিবছর প্রায় ৮০০-১,০০০ মেট্রিক টন আখ উৎপাদন করা হয়, যা ১৬-২০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়। কৃষি কর্মকর্তা আবদুল ওদুদ জানান, প্রতি হেক্টর জমিতে ৫০ টন আখ উৎপাদিত হয়। আখ চাষ ও লালি উৎপাদন শুধু কৃষকদের জন্য নয়, এটি একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে।

বিজয়নগরের বিষ্ণুপুর গ্রামের লালি উৎপাদন শুধু একটি খাদ্য প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং এলাকার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য কৃষক, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় প্রশাসন একযোগে কাজ করছেন, যাতে এই সুস্বাদু তরল গুড় আরও বড় পরিসরে বিক্রি করা যায় এবং আরও লোকের কাছে পৌঁছানো যায়।

এটি শুধু বিজয়নগর নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে।