আসিয়া আফরিন চৌধুরীঃ আজকের এই গল্পটি একজন তরুণ কৃষক উদ্যোক্তার, যার নাম মোঃ মাজহারুল ইসলাম। রাজশাহীর গোদাগাড়ি অঞ্চলের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করা মাজহারুল ইসলামের কৃষির প্রতি ভালোবাসা ও প্রতিশ্রুতি আজ তাকে একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার পথচলা শুরু হয়েছিলো বাবার হাত ধরে, যিনি তাকে ছোটবেলা থেকেই কৃষি কাজের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকটি আসে যখন তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়ে চাকরি করার সিদ্ধান্ত নেন।
২০১২ সালে সরকারিভাবে দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার পর, তিনি সেখানে পাঁচ বছর কাজ করেন এবং দেশে ফিরে আসেন ২০১৭ সালে। তার পরেই শুরু হয় তার কৃষি উদ্যোগের সফল যাত্রা। তবে এটি সহজ ছিল না, বিশেষ করে করোনা মহামারির সময়ে যখন কৃষি খাতের জন্য আরও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছিলো। ২০২০ সালে, তিনি গোদাগাড়িতে নিজের কৃষি খামার স্থাপন করেন, যা আজ তাকে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।

মাজহারুল ইসলামের কৃষি উদ্যোগে রয়েছে প্রায় ৪০ একর জমির ওপর বিস্তৃত একটি খামার, যেখানে প্রায় আট ধরনের ফলের বাগান ও বিশ ধরনের মাঠফসল রয়েছে। তার মধ্যে ধান, গম, ভুট্টা ও অন্যান্য অর্থকরী ফসলের চাষ রয়েছে। তিনি বাংলাদেশের কৃষি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছেন, বিশেষ করে বীজ উৎপাদন ও জিরা চাষের জন্য। বাংলাদেশে যেখানে জিরা সম্পূর্ণভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে তিনি দেশের প্রথম জিরা চাষী হিসেবে নিজের নাম লেখিয়েছেন।
বাজারের চাহিদা পূরণের জন্য নানা ধরনের রঙিন সবজি, যেমন মরিচ, টমেটো, শিম, শসা ইত্যাদি তার খামারে উৎপাদিত হয়। এই সবজি শুধু দেশে নয়, বিদেশেও রপ্তানি করার স্বপ্ন তার রয়েছে। তার খামারে কাজের জন্য বর্তমানে স্থায়ীভাবে চারজন কর্মী রয়েছে, আর ফসল তোলার সময় কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জনে পৌঁছে যায়।
মাজহারুল ইসলাম তার উদ্যোগে সর্বদা প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করেন, যা তাকে আরও সফলতার দিকে নিয়ে গেছে। দেশের প্রতিটি কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে তার রয়েছে গভীর ধারণা, যার কারণে তিনি প্রতিনিয়ত সফল হচ্ছেন। তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হচ্ছে মালটা চাষ, যেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন যে বাংলাদেশের জমিতেও সফলভাবে মালটা চাষ করা সম্ভব।

তবে, এসব সাফল্যের পাশাপাশি একটাই হতাশার বিষয় রয়েছে—সরকারি পর্যায়ে কৃষি খাতের পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাব। এর ফলে কৃষকরা তাদের প্রাপ্য লভ্যাংশ ঠিকমতো অর্জন করতে পারছেন না, এবং বাজারজাতকরণের সমস্যা কৃষক সমাজকে বিপদে ফেলেছে। মাজহারুল ইসলাম মনে করেন, সরকারের এই ক্ষেত্রে আরও কার্যকর মনিটরিং দরকার, যাতে কৃষকরা তাদের পরিশ্রমের প্রকৃত মূল্য পেতে পারে।
এছাড়া, তিনি বিদেশে পণ্য রপ্তানির পরিকল্পনাও করছেন, যাতে বাংলাদেশের কৃষি খাত আরও সমৃদ্ধ হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের সুনাম বৃদ্ধি পায়।
মাজহারুল ইসলামের সফলতা আমাদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা। তার মত উদ্যোক্তা এবং কৃষকরা যদি আরও উন্নত প্রযুক্তি ও সরকারি সহযোগিতা পেতেন, তাহলে তারা আরও বেশি সফল হতে পারতেন। আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ—কৃষিতে প্রবেশ করুন, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুন এবং দেশের কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করুন।

কৃষককন্ঠ ডেস্ক 








