ফসলের রোগ-বালাই দূর করতে হলে সচেতনা, প্রতিকার ও প্রতিরোধ পদ্ধতির সম্মিলন ঘটাতে হবে। তাহলেই আমরা একটি সাফল্যমন্ডিত কৃষি যাত্রার দিকে অগ্রসর হতে পারব।ফসলের রোগ-বালাই দিন দিন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। তাই কৃষকদের রোগ প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের আধুনিক পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে জানা এবং প্রয়োগ করা আবশ্যক।
একারণেই এই প্রতিকার এবং প্রতিরোধ পদ্ধতিগুলো নিয়ে আমরা আমাদের এই আলোচনা সাজিয়েছি।
ফসলের রোগ-বালাই নিধনে সচেতনতা কেনো প্রয়োজন?
ফসলের রোগ-বালাই প্রতিকারের উপায় হিসেবে কৃষক ভাইয়েরা নিয়মিত মাঠে কীটনাশক এবং ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেন। কিন্তু ফসলের রোগ-বালাই হওয়ার কারণ এবং সেগুলো কীটনাশক ছাড়া সমাধান করা যায় কিনা এসব পদ্ধতি অবলম্বন করতে দেখা যায় না তেমন।
এর ফলে একদিকে যেমন কৃষকের খরচের পরিমাণ বাড়ছে। তেমনি খাদ্য রাসায়নিক ক্রিয়া বেশি থাকায় আমাদের জন্য খাদ্য বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। একারণে রোগ-প্রতিকারে সব ধরণের পদ্ধতি সম্পর্কে জানা আবশ্যক।
কৃষকদের জন্য রোগ প্রতিকার টিপস
ফসলের রোগ হলে যত দ্রুত সম্ভব প্রতিকার পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। তবে শুধু রাসায়নিক বস্তু ব্যবহারই একমাত্র প্রতিকার নয়। আর কিছু বিষয় মেনে চলা আবশ্যক। এগুলো নিচে দেয়া হলো-
- কৃষকদের অবশ্যই রোগ প্রতিরোধ করার চেষ্টা করতে হবে।
- রোগ হলে রোগের লক্ষণ চিহ্নিত করে তার জন্য প্রাকৃতিক প্রতিকার কৌশল যেমন নিম বীজের দ্রবণ ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে।
- মাঠে পোকামাকড় নিধনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন ফাঁদ, নেট জাল, শিকারী পোকা ইত্যাদির দ্বারা এগুলো করা যায়।
- জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে।
এগুলো ব্যবহারের পাশাপাশি যদি প্রয়োজন হয় তাহলে পরিমিত হারে কীটনাশক এবং ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
ফসলের রোগ প্রতিরোধ করার কৌশল
ফসলের রোগ-বালাই দূর করার জন্য প্রতিকারের চেয়েও বেশি উপযোগী হলো প্রতিরোধ পদ্ধতি। কারণ কোনো ফসলের ক্ষতি ৫-১৫% কমানো সম্ভব শুধুবেই প্রতিরোধ পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে।
জমির যথাযথ যত্ন
প্রতিরোধ কৌশলের প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে জমির দিকে। এখানে জমি বলতে মূলত মাটির গুণাগুণ রক্ষাকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এ সম্পর্কিত করণীয়গুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-
- জমির পিএইচ এবং ফসলের রোগ পরস্পর সম্পর্কিত। অম্লীয় মাটিতে জীবাণুর পরিমাণ বেশি থাকে। তাই এক্ষেত্রে চুনাপাথর প্রয়োগ করে অম্লত্ব কমাতে হবে।
- মাটির পুষ্টিগুণ বিচার করতে হবে। মাটির রঙ গাঢ় হলে বোঝা যাবে তাতে অর্গানিক বা জৈব উপাদান বেশি। এই মাটিতে সার লাগে কম।
- মাটি দো-আঁশ হলে মূল গভীরে যেতে পারে, ফলে অনেক গভীর থেকে খাদ্য নিতে পারে। একারণে এই মাটির ফসলের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে।
- ফসল বোনার নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। একই ফসল বারবার না করে ভিন্নতা আনতে হবে।
- জমিতে নিয়মিত ডালজাতীয় ফসল চাষ করতে হবে। এতে নাইট্রোজেন এর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
- জমিতে জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। এতে রাসায়নিক উপাদানের সংস্পর্শ থাকে না বলে জমিতে স্বাস্থ্যকর উপায়ে বেশি উর্বর হয়।
ফসল বোনার আগের পদক্ষেপ
জমির যত্ন সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত হলে মানতে হবে ফসল বোনার আগের পদক্ষেপগুলো। সেগুলো হলো-
- জমিতে ফসল বোনার আগে ভালোভাবে চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। গভীর চাষ দিলে উপরের স্তরে থাকা জীবাণুগুলো মাটির বেশি নিচে চলে যাহ, ফলে ফসলের সংস্পর্শে আসতে পারে না।
- পূর্বের ফসল তোলার ৭-১০ দিন পর নতুন ফসল বোনা উচিৎ।
- ফসল বোনার আগে ভালোভাবে জৈব সার মিশিয়ে নিতে হবে।
- ফসল বোনার ক্ষেত্রে গাছের মধ্যে যে দূরত্ব রাখা উচিত তা মেনে চলতে হবে।
- ফসল ঐ সময়ের জন্য উপযোগী কিনা তা বিবেচনা করে বুনতে হবে।
ফসল মাঠে থাকাকালীন যত্ন
ফ.স.ল মাঠে থাকাকালীন সবচেয়ে বেশি যত্নের প্রয়োজন হয়। তাই ফসলের স্বাস্থ্য রক্ষার কৌশল হিসেবে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে মানতে হবে।
- ফসলে নিয়মিত আগাছা নিড়াতে হবে।
- নিয়মিত সেচ দিতে হবে, তবে অবশ্যই পানি জমে থাকতে দেয়া যাবে না।
- ফসলে পোকামাকড় যেনো প্রবেশ না করে তার জন্য দূরীকরণ গাছ যেমন গাদা, বেসিল এগুলো আইলের পাশ দিয়ে লাগানো যায়।
- ফসল নিয়মিত ফোরকাস্টিং বা পূর্বানুমান করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা নিয়ে বিচার করতে হবে যে ফসল ভালো হবে কিনা।
- ফসলে ভার্মিকম্পোস্ট জাতীয় জৈব সার ব্যবহার করতে হবে।
- যতটা সম্ভব রাসায়নিক বস্তু পরিহার করার চেষ্টা করতে হবে।
ফসল তোলার পর করণীয়
ফ.স.ল তোলার পর এর অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে দিতে হবে বা মাটির সাথে খুব ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এতে দু’রকম উপকার পাওয়া যাবে।
- প্রথমত, ফসলের পোকা-মাকড় এবং রোগের জীবণু দূর হবে।
- দ্বিতীয়ত, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে।
এভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ করে অনেকাংশে ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, ফসলের রোগ ব্যবস্থাপনা ও টিপস অতি সহজেই আপনি ক্ষেতে প্রয়োগ করতে পারবেন। তাই অতিরিক্ত খরচ করে রাসায়নিক উপায় অবলম্বন না করে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা আবশ্যক।

Leave a Reply