ঢাকা ১২:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
আশুলিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ইয়াবা ও গাঁজাসহ ৫ জন মাদক ব্যবসায়ী আটক। বায়োফ্লক প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের নতুন সম্ভাবনা  নদী দখল ও দূষণে হুমকিতে দেশীয় মাছের প্রজাতি  আতা ফলের ফল ছিদ্রকারি পোকা: কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আদার গাছ ছিদ্রকারি পোকা – জীবনচক্র, ক্ষয়ক্ষতি ও টেকসই সমাধান বাংলাদেশে আতা ফলের আগা মরা রোগ: কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আনারসের হার্ট রট রোগ – কারণ, লক্ষণ ও টেকসই সমাধান আমলকির কান্ড ছিদ্রকারি পোকা – জীবনচক্র, ক্ষতি ও সমন্বিত সমাধান আমলকির গল মাছি – জীবনচক্র, ক্ষতি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আমলকির স্কেল পোকা – জীবনচক্র, ক্ষতি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা

এলএসপি প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উদ্যোক্তা ভূমিকা পালন

  • কৃষককন্ঠ ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০২:৩১:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৫
  • ২৮১ বার পড়া হয়েছে

সাইফুল ইসলাম,পটুয়াখালী  প্রতিনিধি  বাউফল উপজেলার গোসিংগা গ্রামে শেরেবাংলা জন সমবায় দলের নেতা খাদিজা বেগম। বয়স ২৮, বৈবাহিক জীবনে বিধবা। ছোটবেলায় সংসার শুরু করে এক পুত্র সন্তানকে মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কারণে মাত্র তিন বছর পর তার স্বামী ক্যানসার রোগে মারা যান। এত ছোট বয়সে বিধবা হওয়ার পর খাদিজা যেন জীবনের অন্ধকারে চলে গিয়েছিলেন। তবে, প্রকৃতির নিয়মে যেন তাকে আবারও নতুন এক পথের সন্ধান দিলো, যা তাকে তার জীবনের উদ্দেশ্য ও দিশা খুঁজে দিতে সহায়তা করলো।

গোসিংগা গ্রামে শেরেবাংলা জন সমবায় দলের এক বৈঠকে খাদিজা প্রথমবারের মতো কৃষি এবং প্রাণিসম্পদ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা শুনেন। এর পরপরই তিনি দলীয় বৈঠকে নিয়মিত উপস্থিত হতে থাকেন এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নিজের সহায়তা প্রদান করতে থাকেন। এই দলের মাধ্যমে তার জীবনে নতুন আলো এসে পড়েছিল।

বিএলআরআই প্রশিক্ষণ: এক নতুন সূচনা

খাদিজা বেগম ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিএলআরআই কর্তৃক আয়োজিত একটি পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, যেখানে ক্ষুদ্র খামারী এবং যুবকদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি গরু, ছাগল, হাঁস ও মুরগী পালন এবং তাদের চিকিৎসা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান লাভ করেন। প্রশিক্ষণের পর খাদিজা একটি গরু ক্রয় করে, যার মূল্য ছিল ৬০ হাজার টাকা, এবং তিন মাসের মধ্যে সেটি ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে একটি গরু এবং দুটি ছাগল ক্রয় করেন। তিনি শুধু নিজেই গবাদি পশু পালন করেন না, বরং এলাকাবাসীকে হাঁস-মুরগীর জন্য ভ্যাকসিন প্রদান করে এলাকায় সেবা প্রদান করছেন।

ভ্যাকসিন প্রদান: স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উপকারিতা

খাদিজা বেগম জানালেন, এলাকার প্রায় ৪০ জন দলীয় সদস্য এবং তার প্রতিবেশী পরিবারের হাঁস-মুরগী ভ্যাকসিন পুষ করে উপকৃত হচ্ছেন। তিনি বলেন, “প্রথম দিকে কিছুটা সমস্যা হলেও এখন আমি পুরোপুরি ভ্যাকসিন প্রদান করতে সক্ষম। এটা আমার বাড়তি আয় হিসেবে প্রতি মাসে ৪০০-৫০০ টাকা করে আয় হচ্ছে।” খাদিজা আরও জানান, এর মাধ্যমে এলাকার মানুষ হাঁস-মুরগীর জন্য ভ্যাকসিনের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে, যদিও কিছু মানুষ এখনও পুরানো প্রথায় হাঁস-মুরগী পালন করে থাকে।

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়া

খাদিজা বেগম বলেন, “প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর আমার জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমি এখন আর অন্যের উপর নির্ভরশীল নই। আমার উদ্যোগ এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে আমি স্বাবলম্বী হতে পেরেছি।” তিনি তার সফলতার পিছনে স্পিড ট্রাস্ট ও এএলআরডি এর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন, যারা তাকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং সহায়তা প্রদান করেছে। এছাড়া, তিনি বলেন, “এখন আমি নিয়মিত উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপসহকারী কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ রেখে পশুদের চিকিৎসা এবং ভ্যাকসিন সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করি।”

চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

খাদিজা বেগম জানালেন, প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরেও কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাদের গ্রামের মানুষ অল্প শিক্ষিত, তাই প্রশিক্ষণের অনেক কিছুই মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে, আমি আশা করি আরও সহজ ও প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে এই সমস্যার সমাধান হবে।” এছাড়া, তিনি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মচারীদের গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন, যা কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি করেছে।

খাদিজা তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং প্রত্যাশা নিয়ে বলেন, “আমি চাই আরও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে এবং ভেটেনারী সেবা সংক্রান্ত ওষুধের সরবরাহ যাতে পাই। এভাবে আমি আরও স্বাবলম্বী হতে চাই।” খাদিজার এই উদ্যোগ এবং আত্মবিশ্বাস তাঁর জীবনে নতুন দিশা দিয়েছে এবং তিনি আরও অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন।

খাদিজা বেগমের জীবন একটি প্রকৃত উদাহরণ যে, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও একটি প্রজ্ঞাবান মনোভাব, সঠিক প্রশিক্ষণ এবং সঠিক উদ্যোগে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবনে পরিবর্তন আনা সম্ভব। তার সফলতার গল্প শুধু তাঁর নিজস্ব জীবনই বদলায়নি, বরং গোসিংগা গ্রামে অন্যান্য কৃষক ও খামারিদের জন্যও এক নতুন দিশা দেখিয়েছে।

অথরের তথ্য

Abrar Khan

জনপ্রিয় সংবাদ

আশুলিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ইয়াবা ও গাঁজাসহ ৫ জন মাদক ব্যবসায়ী আটক।

এলএসপি প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উদ্যোক্তা ভূমিকা পালন

আপডেট সময় ০২:৩১:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৫

সাইফুল ইসলাম,পটুয়াখালী  প্রতিনিধি  বাউফল উপজেলার গোসিংগা গ্রামে শেরেবাংলা জন সমবায় দলের নেতা খাদিজা বেগম। বয়স ২৮, বৈবাহিক জীবনে বিধবা। ছোটবেলায় সংসার শুরু করে এক পুত্র সন্তানকে মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কারণে মাত্র তিন বছর পর তার স্বামী ক্যানসার রোগে মারা যান। এত ছোট বয়সে বিধবা হওয়ার পর খাদিজা যেন জীবনের অন্ধকারে চলে গিয়েছিলেন। তবে, প্রকৃতির নিয়মে যেন তাকে আবারও নতুন এক পথের সন্ধান দিলো, যা তাকে তার জীবনের উদ্দেশ্য ও দিশা খুঁজে দিতে সহায়তা করলো।

গোসিংগা গ্রামে শেরেবাংলা জন সমবায় দলের এক বৈঠকে খাদিজা প্রথমবারের মতো কৃষি এবং প্রাণিসম্পদ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা শুনেন। এর পরপরই তিনি দলীয় বৈঠকে নিয়মিত উপস্থিত হতে থাকেন এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নিজের সহায়তা প্রদান করতে থাকেন। এই দলের মাধ্যমে তার জীবনে নতুন আলো এসে পড়েছিল।

বিএলআরআই প্রশিক্ষণ: এক নতুন সূচনা

খাদিজা বেগম ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিএলআরআই কর্তৃক আয়োজিত একটি পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, যেখানে ক্ষুদ্র খামারী এবং যুবকদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি গরু, ছাগল, হাঁস ও মুরগী পালন এবং তাদের চিকিৎসা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান লাভ করেন। প্রশিক্ষণের পর খাদিজা একটি গরু ক্রয় করে, যার মূল্য ছিল ৬০ হাজার টাকা, এবং তিন মাসের মধ্যে সেটি ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে একটি গরু এবং দুটি ছাগল ক্রয় করেন। তিনি শুধু নিজেই গবাদি পশু পালন করেন না, বরং এলাকাবাসীকে হাঁস-মুরগীর জন্য ভ্যাকসিন প্রদান করে এলাকায় সেবা প্রদান করছেন।

ভ্যাকসিন প্রদান: স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উপকারিতা

খাদিজা বেগম জানালেন, এলাকার প্রায় ৪০ জন দলীয় সদস্য এবং তার প্রতিবেশী পরিবারের হাঁস-মুরগী ভ্যাকসিন পুষ করে উপকৃত হচ্ছেন। তিনি বলেন, “প্রথম দিকে কিছুটা সমস্যা হলেও এখন আমি পুরোপুরি ভ্যাকসিন প্রদান করতে সক্ষম। এটা আমার বাড়তি আয় হিসেবে প্রতি মাসে ৪০০-৫০০ টাকা করে আয় হচ্ছে।” খাদিজা আরও জানান, এর মাধ্যমে এলাকার মানুষ হাঁস-মুরগীর জন্য ভ্যাকসিনের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে, যদিও কিছু মানুষ এখনও পুরানো প্রথায় হাঁস-মুরগী পালন করে থাকে।

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়া

খাদিজা বেগম বলেন, “প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর আমার জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমি এখন আর অন্যের উপর নির্ভরশীল নই। আমার উদ্যোগ এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে আমি স্বাবলম্বী হতে পেরেছি।” তিনি তার সফলতার পিছনে স্পিড ট্রাস্ট ও এএলআরডি এর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন, যারা তাকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং সহায়তা প্রদান করেছে। এছাড়া, তিনি বলেন, “এখন আমি নিয়মিত উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপসহকারী কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ রেখে পশুদের চিকিৎসা এবং ভ্যাকসিন সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করি।”

চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

খাদিজা বেগম জানালেন, প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরেও কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাদের গ্রামের মানুষ অল্প শিক্ষিত, তাই প্রশিক্ষণের অনেক কিছুই মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে, আমি আশা করি আরও সহজ ও প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে এই সমস্যার সমাধান হবে।” এছাড়া, তিনি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মচারীদের গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন, যা কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি করেছে।

খাদিজা তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং প্রত্যাশা নিয়ে বলেন, “আমি চাই আরও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে এবং ভেটেনারী সেবা সংক্রান্ত ওষুধের সরবরাহ যাতে পাই। এভাবে আমি আরও স্বাবলম্বী হতে চাই।” খাদিজার এই উদ্যোগ এবং আত্মবিশ্বাস তাঁর জীবনে নতুন দিশা দিয়েছে এবং তিনি আরও অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন।

খাদিজা বেগমের জীবন একটি প্রকৃত উদাহরণ যে, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও একটি প্রজ্ঞাবান মনোভাব, সঠিক প্রশিক্ষণ এবং সঠিক উদ্যোগে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবনে পরিবর্তন আনা সম্ভব। তার সফলতার গল্প শুধু তাঁর নিজস্ব জীবনই বদলায়নি, বরং গোসিংগা গ্রামে অন্যান্য কৃষক ও খামারিদের জন্যও এক নতুন দিশা দেখিয়েছে।