পোলট্রি খামারী হিসেবে সফল হওয়ার গল্প তো আমরা শুনেছি। কিন্তু এবারের গল্পটা একটু ভিন্ন। একেবারেই শোচনীয় অবস্থা থেকে মাসিক ৭০-৮০ হাজার টাকা উপার্জনকারী এক নারী উদ্যোক্তার সফলতার গল্প জানব আজ।
একটি সফল পোলট্রি খামারের অনুপ্রেরণামূলক গল্প
পুরুষ হিসেবে সফল পোলট্রি খামারী আমাদের আশপাশে অনেককেই দেখা যায়। তবে নারীরাও যে এক্ষেত্রে আর পিছিয়ে নেই তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলেন রেহানা।চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পোল্লাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা রেহানা একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। শুধু কৃষিকাজের উপর নির্ভর থাকায় বেশ দৈন্যদশাতেই কাটত তাদের জীবন। কিন্তু এই নারী দৈন্যতার কাছে হার মেনে নেননি। মানবিক সাহায্য সংস্থা থেকে মহিলা ঋণদান কর্মসূচীর মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ করে স্বামী মোস্তফাকে নিয়ে শুরু করেন তাদের স্বপ্নের খামার।
বর্তমানে “মোস্তফা পোল্ট্রি ফার্ম” থেকে তার মাসিক ইনকাম ৭০-৮০ হাজার টাকা। কর্মচারী খরচসহ অন্য সব খরচ বাদ দিয়েও এ পরিমাণ অর্থ তার নিজের ইনকামের খাতায় জমা হচ্ছে। এতে এই দম্পতি স্বচ্ছলতার সাথে পরিবার চালানোর পাশাপাশি কিছু কিছু সঞ্চয় করতেও সক্ষম হচ্ছেন। যার ফলে তার সংসারে এসেছে আর্থিক স্থিতিশীলতা।
পোলট্রি ব্যবসার শুরু

রেহানার পোলট্রি ফার্ম তার জন্য যে সৌভাগ্য বয়ে এনেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এই সফল হওয়ার যাত্রা এতটা সহজ ছিল না। নিতান্ত দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এক গৃহিণীর আজ নারীদের আদর্শ হওয়ার পেছনের গল্পটা বেশ পরিশ্রমের।যেহেতু তিনি ঋণ নিয়ে এই সামগ্রিক ব্যবসা শুরু করেছিলেন, তাই তাকে প্রথম দিকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে। সে সময় কর্মচারী রাখার সামর্থ্য না থাকায় এই দম্পতি দুজন মিলেই সব দেখাশুনা করেছেন।
শুরুর দিকে অভিজ্ঞতা না থাকায় কিছুটা লসের সম্মুখীনও হতে হয় তাদের। কিন্তু তারা হাল ছাড়েননি। নিজেদের লক্ষ্যে স্থির থেকে ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, নতুন নতুন সাফল্য লাভের উপায় বের করার চেষ্টা করেছেন।যার ফল এই সাফল্য
পোলট্রি খামারে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
পোলট্রি খামারে সাফল্য অর্জন করার এই পথে রেহানাকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে। এখন আমরা তার থেকেই জানব এই পোলট্রি খামারের গল্প।
- রেহানার জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল মুরগীর জাত নির্বাচন করা। দেশী মুরগী পালনে অভ্যস্ত রেহানা তাই চিন্তা করেন এমন কোনো জাতের ব্যবস্থা করতে হবে যা মাংস এবং ডিম উভয়ই উৎপাদন করতে পারে।
- এরপর খামার নির্মাণ পদ্ধতি নিয়ে তাকে বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না থাকায় কোন স্থানে খামার নির্মাণ করলে বেশি ভালো হবে তা তিনি প্রথমে বুঝতে পারেননি। পরে যদিও পর্যবেক্ষণ দ্বারা এ সম্পর্কে পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
- মুরগীর খাদ্যের জোগাড় করতে গিয়ে বেশ হিমশিম খেতে হয় তাদের। ফলে কৃষিকাজের মাধ্যমে দানা জাতীয় খাবারগুলো নিজেরাই উৎপাদন করতেন।
- মাত্র দুজন মিলে খামার পরিচালনা করতে হত বলে মুরগীর পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রচুর পরিশ্রম করতে হত।
- সবেচেয়ে বড় সমস্যা ছিল বাজারজাতকরণ। কেননা কীভাবে স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলবেন তা নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়।
পোলট্রি খামারের ঝুঁকি ও পুরষ্কার
রেহানার পোলট্রি খামারের উদ্যোক্তা কাহিনী শোনার পরে আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম যে তাকে খামার নিয়ে কোনো ঝুঁকিতে পড়তে হয়েছে কিনা। তিনি জানান তাকে ঝুঁকি নিতে হয় এবং এর জন্য পুরষ্কারও পেয়েছেন তিনি।কখামার শুরুর বেশ কিছুদিন পর তিনি ভাবেন মুরগীর জাত পরিবর্তন নিয়ে। দেশী মুরগীর পাশাপাশি বাণিজ্যিক লেয়ার কিছু জাতের মুরগী আনা আবশ্যক যা তার জন্য বেশ লাভ বয়ে আনবে।এক্ষেত্রে অর্থাৎ লেয়ার মুরগী পালনে একদম নতুন হওয়ায় এটা তার জন্য ছিল অনেক বড় ঝুঁকি। কেননা সফল না হতে পারলে আবারও সেই দৈন্যতায় ফিরতে হবে তাদের।
তবুও বেশ সাহস নিয়েই এই পদক্ষেপ নেন রেহানা এবং এতে পুরষ্কার হিসেবে যথেষ্ট সাফল্যও অর্জন করেছেন তিনি। যার ফলে তিনি এখন এত বড় খামারের মালিক।
সফল পোলট্রি খামারী হওয়ার টিপস
পোলট্রি খামারের জীবনযাত্রা সম্পর্কিত বেশ কিছু কথা আমরা এতক্ষণ জানলাম। রেহানা-মোস্তফা এই দম্পতি তরুণ সমাজ এবং নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার অনুপ্রেরণা দেন। আর সেই সুবাদেই পোলট্রি খামারী হিসেবে সফল হওয়ার পরামর্শ আমরা জানতে চাই তাদের কাছে।
খামারের ব্যবসায়িক টিপস সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-
- রেহানা এবং মোস্তফা উভয়েরই প্রথম পরামর্শ ছিল খামারীকে ধৈর্যশীল এবং পরিশ্রমী হতে হবে। প্রথম পর্যায়ে অনেক চড়াই-উৎরাই আসবে এবং তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। হাল ছাড়লে চলবে না।
- ব্যবসায়ের জন্য সঠিক পরিকল্পনা থাকতে হবে। বিশেষত বাজেটিং এর ব্যাপারটা। নয়ত খরচ সামলানো দুরূহ ব্যাপার হয়ে যাবে।
- খামারের মুরগীর জন্য ভ্যাক্সিনেশন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে। ভালো হয় কোনো দক্ষ মানুষের থেকে কিংবা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিলে।
- উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য মার্কেটিং কৌশল জানতে হবে।
রেহানার খামারে সফলতার গল্প এবং পোলট্রি খামারে উন্নতি কৌশল সম্পর্কে এতক্ষণ বিস্তারিত জানলাম আমরা। তাই নতুনদের জন্য পরামর্শ থাকবে সফল পোলট্রি খামারের টিপসগুলো মেনে পোলট্রি খামারের সাফল্য কৌশল রপ্ত করা। এতে আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় উভয় অর্থনীতিই লাভবান হবে।

কৃষককন্ঠ ডেস্ক 









