পোলট্রি খামারে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন কাজ। তাই নতুন খামারীদের জন্য অভিজ্ঞ খামারীদের প্রধান পরামর্শ থাকে যেনো তারা রোগ প্রতিকার অপেক্ষা প্রতিরোধের দিকে বেশি খেয়াল রাখেন।
নতুন খামারীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পোলট্রি খামারে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা। বিশেষত যারা কখনোই মুরগী পালন বিষয়ক কোনো কাজ করেননি তাদের জন্য এটি একটি গুরুতর সমস্যা।তাই আপনি যখনই খামার তৈরীর পরিকল্পনা করবেন, তখনই আপনাকে পোলট্রির রোগ প্রতিরোধ পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে নিতে হবে। এ ব্যাপারে বিষদ তথ্য দেয়ার জন্যই আমাদের এই আর্টিকেলটি।
পোলট্রি খামারে রোগ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব
খামারে রোগের প্রাদুর্ভাব কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনার পূর্বে এই বিষয়টি জানা প্রয়োজন যে খামারে রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ কেনো এত গুরুত্বপূর্ণ।
মূলত মুরগীর যেসকল রোগ হয় তা অত্যন্ত সংক্রমণশীল। বেশ কিছু রোগ যেমন রাণিক্ষেত, গামবারা ইত্যাদি মলের মাধ্যমে ছড়ায়। ফলে একটি মুরগী রোগাক্রান্ত হলে খুব সহজেই অন্য মুরগীগুলোও আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এই সংক্রমণ এত দ্রুত ছড়ায় যে রাণিক্ষেত এর মত কিছু ওগে আক্রমণের ১ সপ্তাহের মধ্যে মুরগী মারা যায়। অর্থাৎ এমনও হতে পারে যে আপনি বুঝে ওঠার আগেই সম্পূর্ণ খামার শেষ হয়ে যাবে।আবার কোনো মুরগী আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হলে কিছুদিন তার ডিম উৎপাদনও কম থাকে। শরীর পুরোপুরি না সারা পর্যন্ত খাওয়া দাওয়া এবং অন্যান্য কাজ সঠিক ভাবে করে না। এতে আপনার খামারে লাভের পরিমাণ কমে যাবে।
তাছাড়াও মুরগীর ওষুধের জন্য আপনাকে বেশ ভালো পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হবে। এ সকল কারণেই মুরগীর রোগ প্রতিকার অপেক্ষা প্রতিরোধ বেশি কার্যকরী হয়। এতে আপনার খরচ সীমিত থাকে।
মুরগীর খামারে রোগ বৃদ্ধির কারণ

ইতোমধ্যে, মুরগীর রোগ প্রতিরোধ কেনো গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা জেনে নিয়েছি। তবে প্রতিরোধ করার পূর্বে আপনাকে জেনে নিতে হবে যে খামারে রোগ বৃদ্ধির কারণগুলো কী। এতে আপনার প্রতিরোধ কাজ সহজ হবে।কারণসমূহ এখানে তুলে ধরা হলো-
- মুরগীর ঘর নিয়মিত পরিষ্কার না করা। মুরগীর মল, বেঁচে যাওয়া খাবার এবং অন্যান্য উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার না করা।
- মুরগীর রোগ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকা।
- পোল্ট্রি পালন ও ব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত দক্ষতার অভাব।
- পোলট্রি খামারে বায়োসিকিউরিটি কৌশল অবলম্বন না করা। অর্থাৎ মুরগীর সুরক্ষার জন্য যেভাবে ব্যবস্থাপনা থাকা উচিৎ তা না মেনে চলা।
- মুরগীর আচার-আচরণ সঠিকভাবে এবং দক্ষতার সাথে পর্যবেক্ষণ না করা।
মুরগীর রোগ প্রতিকারে করণীয়
কিন্তু, যদি এমন হয় যে কোনো মুরগী ইতোমধ্যে রোগে আক্রান্ত হয়ে গেছে তবে তার ক্ষেত্রে প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে। তাহলে সেসব ক্ষেত্রে করণীয় কী? আসুন জেনে নেই সেগুলো-
- প্রথমেই আক্রান্ত মুরগীকে আলাদা করে ফেলতে হবে যেনো রোগ ছড়িয়ে পড়তে না পারে। সাধারণত যেসব মুরগী রোগে আক্রান্ত হয়, তারা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এ ধরণের মুরগী দেখলেই তৎক্ষনাৎ আলাদা করে অন্য জায়গায় রাখতে হবে।
- আক্রান্ত মুরগীকে পূর্ণ চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। নিম পাতার গুঁড়া এক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। প্রাথমিকভাবে এটা দেয়ার পর দ্রুত পশু চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে রোগীকে ওষুধ খাওয়াতে হবে।
- আক্রান্ত মুরগীর খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে যেনো দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
- মুরগীর সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত অন্য মুরগীগুলো সাথে রাখা যাবে না।
- পুরো খামার বিশেষত যেখানে আক্রান্ত মুরগী ছিল ঐ জায়গা জীবাণুমুক্ত করে ফেলতে হবে।
- পোলট্রি রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে।
মুরগীর রোগ প্রতিরোধের উপায়সমূহ
অভিজ্ঞ খামারী পরামর্শ অনুযায়ী পোল্ট্রি মুরগী ব্যবসা করতে হলে এবং তাতে লাভ পেতে হলে মুরগীর প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়া আবশ্যক। যেনো মুরগী রোগ ব্যাধি থেকে দূরে থাকে। এবার আমরা জেনে নেবো মুরগীর রোগ প্রতিরোধের উপায়সমূহ
- মুরগীর রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রথমেই নজর দিতে হবে মুরগীর পরিবেশের প্রতি। মুরগীকে সর্বদা পরিষ্কার স্থানে রাখতে হবে।
- মুরগীর জন্য সময়মত ভ্যাক্সিনেশন এর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
- প্রতিদিন সকাল এবং বিকালে প্রত্যেকটি মুরগী ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে যে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কিনা।
- মুরগীর জন্য কৃমির ওষুধ এর ব্যবস্থা করার পর রাণিক্ষেত এর টীকা দিতে হবে।
- হলুদের গুঁড়া কিংবা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট নিয়ে পানি পরিষ্কার করে তা খাওয়ানো যাবে।
- পোলট্রিতে সাধারণ এবং প্রতিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে এসব রোগসমূহ যেনো না হতে পারে তা নিশ্চিত করা।
- খামারে রোগের ঝুঁকি কমানো কৌশল জানতে হবে।
মুরগীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কৌশল
মুরগীর রোগ প্রতিরোধের কৌশল জানার পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও কিছু জেনে রাখা ভালো যেনো রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
- পোলট্রি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা টিপস গুলোর মধ্যে প্রধান হলো মুরগীর ঘরের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং জীবাণুমুক্ত করা।
- পোলট্রি খামারে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরী করতে হবে। যেমন তাপমাত্রা সর্বদাই নিয়ন্ত্রিত থাকতে হবে। খামারের তাপমাত্রা ২৫-২৮° সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে হবে। আলোর ব্যবস্থা থাকতে হবে সঠিকভাবে।
- মুরগীকে সুষম খাবার দিতে হবে। এতে মুরগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
- মুরগীর জন্য নিয়মিত চেক আপের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
উপর্যুক্ত বিশ্লেষণের আলোকে আমরা বুঝতে পারলাম যে পোলট্রি খামারে সফলতা পেতে চাইলে প্রতিকার অপেক্ষা প্রতিরোধ বেশি কার্যকর। তাই এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষককন্ঠ ডেস্ক 










