আসিয়া আফরিন চৌধুরী গত তিন বছরে বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। মূল্যস্ফীতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গরিব ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি। সরকারের ভ্যাট ও শুল্ক বৃদ্ধির পরিণাম আরও খারাপ হয়ে উঠেছে, যা আগামীতে জীবনযাত্রার খরচ আরও বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে।
একটি বাস্তব উদাহরণ:
ধরা যাক, জাকির হোসেন নামের একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষ, যিনি ২০২২ সালে ৪০ হাজার টাকা বেতন পেতেন। তিনি ঢাকায় তার স্ত্রীর সাথে বসবাস করেন এবং এক সন্তানের বাবা। মাসিক খরচের মধ্যে রয়েছে বাসাভাড়া, খাবার, সন্তানের পড়াশোনা ও অন্যান্য খরচ। এসবের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মাঝে মাঝে সঞ্চয়ও করতেন। তবে গত তিন বছরে তাঁর বেতন বেড়েছে মাত্র ১০ হাজার টাকা, অর্থাৎ এখন তিনি ৫০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। কিন্তু একই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ৩০-৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এর ফলে, ৫০ হাজার টাকায় সংসার চালানো তার জন্য এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির অমিল:
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর তথ্যানুসারে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৮৬ শতাংশ, এবং ওই সময় মজুরি বৃদ্ধি হয়েছিল ৫.৯২ শতাংশ। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বেড়েছিল সামান্য বেশি। তবে সেই সময় থেকে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। ২০২২ সালের আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম ৪০ শতাংশ বাড়ানো হলে, মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, আর তারপর থেকে তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে।
২০২৩ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৪৮ শতাংশ, কিন্তু মজুরি বৃদ্ধি কোনো মাসেই ৮ শতাংশের বেশি হয়নি। ২০২৪ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৩৪ শতাংশে পৌঁছায়, এবং জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪.১০ শতাংশে পৌঁছায়, যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই অবস্থায়, মানুষের আয় বেড়ে গেলে তবুও মূল্যস্ফীতি তার থেকে অনেক বেশি। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য জীবনযাত্রার খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের দুঃখ:
সরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, “যখন মূল্যস্ফীতি এত বেশি এবং মজুরি বৃদ্ধির গতি এত কম থাকে, তখন দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়।” গত তিন বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ১০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে, যাদের মোট সংখ্যা প্রায় ১.৫ কোটি। এই মানুষগুলো প্রতিনিয়ত কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।
মজুরিনির্ভর জনগণের অবস্থা:
বিশেষত নিম্ন দক্ষতার পেশায় নিয়োজিত ১৪৫টি পেশার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যার মধ্যে প্রায় ৬ কোটি মানুষ মজুরি নির্ভর কাজ করেন। তাদের জন্য মূল্যস্ফীতি একধরনের “কর” এর মতো, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই চলে যায় সংসারের খরচে। একদিকে আয় না বাড়লে এবং অন্যদিকে পণ্যের দাম বাড়লে, এই মানুষদের জন্য আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যায়।
অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব:
মূল্যস্ফীতি বাড়লে, পরিবারগুলোকে নানা খাতে খরচ কমাতে বাধ্য হতে হয়। যেমন খাদ্য, পোশাক, যাতায়াত, শিক্ষা ইত্যাদি। তাছাড়া, ঋণ নিয়ে সংসার চালানোর অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে, মানুষের জীবনযাত্রা মান কমে যাচ্ছে, আর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ বাড়ছে।
বাংলাদেশে গত তিন বছর ধরে মূল্যস্ফীতি এবং মজুরি বৃদ্ধির মধ্যে অমিল অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক সংকট প্রবলভাবে দেখা দিয়েছে। যেসব পরিবার আগে সঞ্চয় করতে পারত, তাদের জন্যও এখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আয়ের বৃদ্ধির ওপর নজর দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে পারে।

কৃষককন্ঠ ডেস্ক 









