ঢাকা ০১:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
আশুলিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ইয়াবা ও গাঁজাসহ ৫ জন মাদক ব্যবসায়ী আটক। বায়োফ্লক প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের নতুন সম্ভাবনা  নদী দখল ও দূষণে হুমকিতে দেশীয় মাছের প্রজাতি  আতা ফলের ফল ছিদ্রকারি পোকা: কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আদার গাছ ছিদ্রকারি পোকা – জীবনচক্র, ক্ষয়ক্ষতি ও টেকসই সমাধান বাংলাদেশে আতা ফলের আগা মরা রোগ: কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আনারসের হার্ট রট রোগ – কারণ, লক্ষণ ও টেকসই সমাধান আমলকির কান্ড ছিদ্রকারি পোকা – জীবনচক্র, ক্ষতি ও সমন্বিত সমাধান আমলকির গল মাছি – জীবনচক্র, ক্ষতি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আমলকির স্কেল পোকা – জীবনচক্র, ক্ষতি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা

নদী-খাল পুনরুদ্ধারে মাছ চাষের সম্ভাবনা

  • কৃষককন্ঠ ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৫:৫২:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ মার্চ ২০২৫
  • ২৬৫ বার পড়া হয়েছে

নদী-খাল পুনরুদ্ধারে মাছ চাষের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় মাছ চাষের ভূমিকা অপরিসীম। তবে নদী-খাল দূষণ, অবৈধ দখল ও ভরাটের কারণে দেশের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এতে ঐতিহ্যবাহী মাছ চাষ বিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও তীব্রতর হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী-খাল পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে মাছ চাষের হার বাড়ানো সম্ভব। এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি।

গত এক দশকে বাংলাদেশের নদীগুলোর অবস্থা উদ্বেগজনক হারে অবনতি হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪০ শতাংশ নদীই এখন মৃতপ্রায়। খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে দেশে উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছের উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। এই সংকট মোকাবিলায় নদী-খাল পুনরুদ্ধারকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন পরিবেশবিদ ও অর্থনীতিবিদরা।

নদী দখল ও দূষণ রোধে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। নদী খনন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এসব উদ্যোগ সফল হচ্ছে না। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নদী-খাল পুনরুদ্ধারে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব। এ জন্য সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বেসরকারি সংস্থাগুলোও নদী পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলি নদীর তীরে বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও কমিউনিটি ভিত্তিক নদী পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। ঢাকার কাছে তুরাগ নদী পুনরুদ্ধারে স্থানীয় যুবকদের নিয়ে কাজ করছে ‘নদী বাঁচাও আন্দোলন’। তাদের একজন কর্মী বলেন, “নদী বাঁচলে মাছ ফিরে আসবে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। আমরা স্থানীয় মানুষদের নিয়ে প্রতি সপ্তাহে নদী পরিষ্কার করি।”

মাছ চাষের সঙ্গে নদী-খালের সম্পর্ক গভীর। প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের খাদ্য ও প্রজননের সুযোগ থাকে, যা বদ্ধ পুকুরে সম্ভব নয়। মৎস্য চাষিরা বলছেন, নদী-খাল সংস্কার হলে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে রুই, কাতলা, মৃগেল ও স্থানীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন। নরসিংদীর গোড়াইন গ্রামের মৎস্য চাষি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমাদের এলাকার খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে গিয়েছিল। গত বছর খালটি খনন করা হয়েছে, এখন আবার মাছের চাষ বাড়ছে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী-খাল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি টেকসই মাছ চাষের কৌশল গ্রহণ করতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক খাদ্য শৃঙ্খল রক্ষা করা জরুরি। এ ছাড়া স্থানীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “নদীর স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে হলে এর পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাছের অভয়াশ্রম তৈরির মাধ্যমে জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে।”

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নদী-খাল পুনরুদ্ধার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখলে বন্যা ও খরার ঝুঁকি কমে। এ ছাড়া মাছ চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাও সচল রাখা যায়। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই নদী রক্ষা শুধু পরিবেশের জন্য নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও জরুরি।

সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ‘নদী ও খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ এর আওতায় দেশের ৬৪ জেলায় ২০০টির বেশি জলাধার সংস্কারের কাজ চলছে। এ ছাড়া ‘জলাশয় সংরক্ষণ আইন-২০২৩’ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নদী-খাল দখল বা দূষণ করলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তবে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও তৎপর হতে হবে।

নদী-খাল পুনরুদ্ধারে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিউনিটি ভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে তাদেরকে নদী রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সুন্দরবন অঞ্চলের ‘ম্যানগ্রোভ বনায়ন’ মডেল অনুসরণের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় মানুষদের সম্পৃক্ত করে কাজ করলে দখল ও দূষণ রোধে সচেতনতা তৈরি হবে।

মাছ চাষের সম্প্রসারণে নদী-খালের পাশাপাশি হাওর, বাওড় ও বিল সংরক্ষণেরও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭০ লাখ হেক্টর জলাশয়ের মধ্যে মাত্র ২০ লাখ হেক্টরে নিয়মিত মাছ চাষ হয়। অব্যবহৃত জলাশয়গুলোকে কাজে লাগানো গেলে মাছের উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ।

নদী-খাল পুনরুদ্ধার ও মাছ চাষের সমন্বিত উদ্যোগকে টেকসই করতে শিক্ষা ও গবেষণার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মৎস্য চাষের আধুনিক পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে। এ ছাড়া ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করে নদীর পানির গুণাগুণ পর্যবেক্ষণ, মাছের রোগ নির্ণয় ও বাজার সংযোগের কাজও বাড়ানো হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, নদী-খাল পুনরুদ্ধার কেবল পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জলবায়ু সহিষ্ণুতা অর্জনের মূল হাতিয়ার। সরকারি নীতি, বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগ ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের নদী আবার প্রাণ ফিরে পেলে মাছ চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

 

অথরের তথ্য

Abrar Khan

জনপ্রিয় সংবাদ

আশুলিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ইয়াবা ও গাঁজাসহ ৫ জন মাদক ব্যবসায়ী আটক।

নদী-খাল পুনরুদ্ধারে মাছ চাষের সম্ভাবনা

আপডেট সময় ০৫:৫২:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ মার্চ ২০২৫

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় মাছ চাষের ভূমিকা অপরিসীম। তবে নদী-খাল দূষণ, অবৈধ দখল ও ভরাটের কারণে দেশের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এতে ঐতিহ্যবাহী মাছ চাষ বিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও তীব্রতর হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী-খাল পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে মাছ চাষের হার বাড়ানো সম্ভব। এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি।

গত এক দশকে বাংলাদেশের নদীগুলোর অবস্থা উদ্বেগজনক হারে অবনতি হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪০ শতাংশ নদীই এখন মৃতপ্রায়। খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে দেশে উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছের উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। এই সংকট মোকাবিলায় নদী-খাল পুনরুদ্ধারকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন পরিবেশবিদ ও অর্থনীতিবিদরা।

নদী দখল ও দূষণ রোধে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। নদী খনন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এসব উদ্যোগ সফল হচ্ছে না। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নদী-খাল পুনরুদ্ধারে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব। এ জন্য সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বেসরকারি সংস্থাগুলোও নদী পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলি নদীর তীরে বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও কমিউনিটি ভিত্তিক নদী পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। ঢাকার কাছে তুরাগ নদী পুনরুদ্ধারে স্থানীয় যুবকদের নিয়ে কাজ করছে ‘নদী বাঁচাও আন্দোলন’। তাদের একজন কর্মী বলেন, “নদী বাঁচলে মাছ ফিরে আসবে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। আমরা স্থানীয় মানুষদের নিয়ে প্রতি সপ্তাহে নদী পরিষ্কার করি।”

মাছ চাষের সঙ্গে নদী-খালের সম্পর্ক গভীর। প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের খাদ্য ও প্রজননের সুযোগ থাকে, যা বদ্ধ পুকুরে সম্ভব নয়। মৎস্য চাষিরা বলছেন, নদী-খাল সংস্কার হলে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে রুই, কাতলা, মৃগেল ও স্থানীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন। নরসিংদীর গোড়াইন গ্রামের মৎস্য চাষি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমাদের এলাকার খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে গিয়েছিল। গত বছর খালটি খনন করা হয়েছে, এখন আবার মাছের চাষ বাড়ছে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী-খাল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি টেকসই মাছ চাষের কৌশল গ্রহণ করতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক খাদ্য শৃঙ্খল রক্ষা করা জরুরি। এ ছাড়া স্থানীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “নদীর স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে হলে এর পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাছের অভয়াশ্রম তৈরির মাধ্যমে জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে।”

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নদী-খাল পুনরুদ্ধার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখলে বন্যা ও খরার ঝুঁকি কমে। এ ছাড়া মাছ চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাও সচল রাখা যায়। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই নদী রক্ষা শুধু পরিবেশের জন্য নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও জরুরি।

সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ‘নদী ও খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ এর আওতায় দেশের ৬৪ জেলায় ২০০টির বেশি জলাধার সংস্কারের কাজ চলছে। এ ছাড়া ‘জলাশয় সংরক্ষণ আইন-২০২৩’ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নদী-খাল দখল বা দূষণ করলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তবে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও তৎপর হতে হবে।

নদী-খাল পুনরুদ্ধারে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিউনিটি ভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে তাদেরকে নদী রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সুন্দরবন অঞ্চলের ‘ম্যানগ্রোভ বনায়ন’ মডেল অনুসরণের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় মানুষদের সম্পৃক্ত করে কাজ করলে দখল ও দূষণ রোধে সচেতনতা তৈরি হবে।

মাছ চাষের সম্প্রসারণে নদী-খালের পাশাপাশি হাওর, বাওড় ও বিল সংরক্ষণেরও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭০ লাখ হেক্টর জলাশয়ের মধ্যে মাত্র ২০ লাখ হেক্টরে নিয়মিত মাছ চাষ হয়। অব্যবহৃত জলাশয়গুলোকে কাজে লাগানো গেলে মাছের উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ।

নদী-খাল পুনরুদ্ধার ও মাছ চাষের সমন্বিত উদ্যোগকে টেকসই করতে শিক্ষা ও গবেষণার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মৎস্য চাষের আধুনিক পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে। এ ছাড়া ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করে নদীর পানির গুণাগুণ পর্যবেক্ষণ, মাছের রোগ নির্ণয় ও বাজার সংযোগের কাজও বাড়ানো হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, নদী-খাল পুনরুদ্ধার কেবল পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জলবায়ু সহিষ্ণুতা অর্জনের মূল হাতিয়ার। সরকারি নীতি, বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগ ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের নদী আবার প্রাণ ফিরে পেলে মাছ চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।