বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে সস্তা খাদ্যপণ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আলু। কৃষকেরা চলতি মৌসুমে অধিক লাভের আশায় বিপুল পরিমাণে আলু চাষ করলেও এখন তারা লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না।
রেকর্ড পরিমাণে চাষ ও ফলন
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুসারে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে রেকর্ড ৫ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) মতে, এ বছর মোট আলু উৎপাদন এক কোটি ২০ লাখ টন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এক কোটি ছয় লাখ টন উৎপাদনের পূর্বাভাস দিয়েছে। দেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন হওয়ায় উৎপাদিত আলুর একটি বড় অংশ উদ্বৃত্ত থাকছে।
কম দামে বিক্রির চাপে কৃষকরা
টিসিবি’র হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় প্রতি কেজি আলুর খুচরা দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকেরা ১১ টাকারও কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
দিনাজপুর, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া ও জয়পুরহাটের কৃষকেরা জানান, তারা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে ১৫ টাকা, যা গত বছরের ১৩ টাকা ছিল।
কৃষকরা জানাচ্ছেন, বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর আলুর বীজের দাম ছিল ৩৫-৪০ টাকা কেজি, যা এবার ৮০ টাকায় পৌঁছেছে। ফলে চাষের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
আলু সংরক্ষণ ব্যয়ও বৃদ্ধি
কৃষকরা বলছেন, হিমাগারে আলু সংরক্ষণের খরচ গত বছরের তুলনায় প্রতি কেজিতে ৪ টাকা বেড়েছে। ফলে কৃষকেরা ন্যায্য দামে আলু বিক্রি করতে পারছেন না। জয়পুরহাটের কৃষক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘সত্যি বলতে কী, চাষবাস চালিয়ে যাচ্ছি কারণ আমাদের লজ্জা নেই।’
সরকারি হস্তক্ষেপের দাবি
কৃষকেরা আলুর দাম বাড়াতে এবং ক্ষতি পোষাতে সরকারি উদ্যোগের দাবি জানাচ্ছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়া বলেছেন, ‘দেশের বাজার ব্যবস্থার প্রকৃতি বিবেচনায় পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জটিল কাজ।’ হিমাগার ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার নজরে রেখেছে এবং এ বিষয়ে মূল্যায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বাণিজ্য ও বিপণন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কৃষকের ক্ষতি মোকাবিলায় সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মাসুদ করিম আশা প্রকাশ করেন, অদূর ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও করণীয়
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আলুর দাম কমার এই অবস্থা সাময়িক। তবে কৃষকেরা যাতে ভবিষ্যতে এমন ক্ষতির সম্মুখীন না হন, সে জন্য সরকার দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তার পরিকল্পনা করছে। কৃষকদের জন্য হিমাগার সুবিধা সম্প্রসারণ, উৎপাদন পরিকল্পনা উন্নয়ন এবং ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন।

কৃষককন্ঠ ডেস্ক 










