গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের উন্নতির পথে কলা চাষের অগ্রযাত্রা

 সাইফুল ইসলাম, পটুয়াখালী প্রতিনিধি  পটুয়াখালী জেলার বাউফল, গলাচিপা, দশমিনা ও দুমকি এলাকার কৃষকদের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিয়েছে কলা চাষ। ১০ বছর আগে যেখানে কলা চাষের বিস্তার ছিল একেবারে কম, সেখানে এখন এসব অঞ্চলে এক নতুন কৃষি বিপ্লব ঘটেছে। বর্তমানে কলার চাষের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে গেছে, আর গ্রামের প্রতিটি বাড়ির পাশের জমি থেকেও শুরু করে উচু ভিটের জমিতেও কলার চাষ দেখা যাচ্ছে। এই চাষের অভ্যন্তরে কৃষকদের মধ্যে এমন আগ্রহ বেড়েছে যে, কলা এখন শুধু স্থানীয় চাহিদা পূরণের জন্য নয়, বরং বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করাও হচ্ছে ব্যাপকভাবে।

কলা চাষের বিস্তার ও প্রকারভেদ

বাউফল, গলাচিপা, দশমিনা, দুমকি, এমনকি পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রতিটি গ্রামে কলা চাষের ধারা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের হাজিররহাট, নাজিরপুর ইউনিয়নের ধান্দী বন্দরের বিলবিলাস, চরমিয়াজান এলাকায় কলা চাষ ব্যাপক আকারে পরিচালিত হচ্ছে। এসব এলাকার কৃষকরা এখন জানাচ্ছেন, বিভিন্ন ধরণের কলা চাষ করছেন, যার মধ্যে কাঠালী, আনাচ, ও সবরী কলার প্রাধান্য বেশি। তবে কাঠালী এবং আনাচ কলা চাষই সবচেয়ে বেশি হচ্ছে।

বাউফল উপজেলার কৃষক জালাল জানান, “এখন বিভিন্ন ধরনের জমিতে শাক-সবজি, কাঁচা তরিতরকারী ফসলের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণ কলা চাষ হচ্ছে। কলা চাষে এখন কৃষকেরা বাণিজ্যিকভাবে ঝুঁকছেন এবং এটি তাদের আয়ের একটি বড় উৎস হয়ে উঠেছে।”

স্থানীয় চাহিদা ও বাজারে কলার জনপ্রিয়তা

এমনকি স্থানীয় বাজারেও কলার চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাউফল উপজেলা সদর বাজারে দেখা গেছে, সবজির মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আনাচ কলা। কৃষকরা এখন তাদের উৎপাদিত কলা খুচরা ও পাইকারিভাবে বিক্রি করছেন। গোসিংগা গ্রামের কৃষক মতলেব গাজী জানান, “৪-৫ বছর আগেও বাউফল, গলাচিপা, দশমিনা, দুমকি অঞ্চলে কলা আমদানি করা হতো যশোর, খালিশপুর, পিরোজপুর, বানারীপাড়া এলাকা থেকে। কিন্তু বর্তমানে এখানকার কৃষকরা নিজেদের জমিতেই কলা উৎপাদন করছেন এবং স্থানীয় চাহিদা পূরণ হয়ে যাচ্ছে।”

কলা চাষের সহজতা ও মুনাফা

পটুয়াখালী জেলার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কলা চাষের জন্য উপযুক্ত সময় সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস। জমিতে কলার চারা লাগানোর ৯ থেকে ১০ মাসের মধ্যে ফলন শুরু হয়ে যায়, এবং ১১-১২ মাসে তা বিক্রির উপযুক্ত হয়। প্রতিটি কলা গাছ থেকে এক ছড়ি কলা বের হয়, যা কৃষকরা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কলা চাষে কৃষককে কিটনাশক বা অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করতে হয় না, তবে সামান্য পরিচর্যা করলেই গাছ ভালভাবে বেড়ে ওঠে এবং ফলনও ভালো হয়।

কলা চাষে সম্ভাবনা

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনছার উদ্দিন জানান, উপজেলায় কলার চাষের জন্য জনপ্রিয় তিনটি জাত রয়েছে। এগুলি হলো সাগর, নেপালী, মেঘসাগর এবং মালভোগ জাত। এসব জাতের কলার চাহিদা অনেক বেশি এবং বাজারে তাদের মূল্যও ভালো। কলা চাষে অতিরিক্ত খরচ না থাকায় কৃষকরা লাভজনকভাবে এটি চাষ করছেন এবং উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

বাউফলসহ পটুয়াখালী জেলার গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা কলা চাষের মাধ্যমে একটি নতুন কৃষি শিল্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। উন্নত প্রযুক্তি ও কৃষি জ্ঞানের মাধ্যমে তারা তাদের কৃষি জমিকে আরও উৎপাদনশীল ও লাভজনক করে তুলছেন। বর্তমানে কলা চাষ শুধু কৃষকদের জন্য লাভজনক একটি ফসল নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *