Tag: মৎস্যজীবীর_আয়

  • পরিবেশবান্ধব বিপ্লবের গল্পে বিষাক্ত সাকার ফিশ থেকে প্রাণিখাদ্য

    পরিবেশবান্ধব বিপ্লবের গল্পে বিষাক্ত সাকার ফিশ থেকে প্রাণিখাদ্য

    বাংলাদেশের নদী, খাল, বিল ও হাওর অঞ্চলে এক সময় বৈচিত্র্যময় মাছের প্রাচুর্য ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জলজ পরিবেশে আগ্রাসী প্রজাতি সাকার ফিশের (চানা স্ট্রায়াটা) ব্যাপক বিস্তার এই ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। স্থানীয়ভাবে এই মাছকে বিষাক্ত ও নিম্নমানের হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর প্রভাবে নদীর স্বাভাবিক মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, জলজ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর মৎস্যজীবীদের জীবিকা সংকটাপন্ন হচ্ছে। কিন্তু এই সমস্যাকে সম্পদে রূপান্তর করার অভিনব সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) একদল উদ্যমী শিক্ষার্থী, গবেষক ও উদ্যোক্তা। তাদের গবেষণা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হলো সাকার ফিশ থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ প্রাণিখাদ্য তৈরির সফল প্রযুক্তি। এই দীর্ঘ প্রতিবেদনে আমরা জানব কীভাবে একটি পরিবেশবিধ্বংসী মাছকে কাজে লাগিয়ে টেকসই খাদ্য উৎপাদনের মডেল তৈরি করা সম্ভব হলো, এবং এই উদ্ভাবন কীভাবে দেশের অর্থনীতি ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

    সাকার ফিশ (স্ট্রাইডেড স্নেকহেড) দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় প্রজাতি হলেও বাংলাদেশের জলাশয়ে এর অস্তিত্ব ছিল সীমিত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নদীদূষণ ও অন্যান্য পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে গত দুই দশকে এটি দেশের প্রায় সব প্রধান নদী ও জলাভূমিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে—দূষিত পানি, অক্সিজেনের স্বল্পতা, এমনকি শুষ্ক মৌসুমে কাদার নিচেও এটি বেঁচে থাকতে পারে। প্রতিবছর একটি সাকার মাছ হাজার হাজার ডিম পাড়ে, যা এর বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে।

    সাকার ফিশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি স্থানীয় মাছের ডিম ও পোনা খেয়ে ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গা নদীতে গত পাঁচ বছরে স্থানীয় মাছের প্রজাতির সংখ্যা ৪০% কমেছে, যার মূল কারণ সাকার ফিশের আধিপত্য। হাওর অঞ্চলেও একই চিত্র। মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আগে যেখানে জালে নানান রকম মাছ উঠত, এখন সেখানে ৬০-৭০% সাকার ফিশ ধরা পড়ে। কিন্তু এই মাছের বাজারমূল্য প্রায় শূন্য—বিষাক্ততা ও দুর্গন্ধের কারণে মানুষ এটি খেতে চায় না, পশুখাদ্য হিসেবেও এর ব্যবহার সীমিত।

    নরসিংদীর মৎস্যজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, “আগে প্রতিদিন ৫০০-৬০০ টাকার মাছ বিক্রি করতাম। এখন সাকার ফিশ ছাড়া অন্য মাছ পাওয়াই দায়। বিক্রি করা যায় না বলে এগুলো ফেলে দিতে হয়।” এভাবে প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকার ক্ষতি হচ্ছে মৎস্যজীবীদের। পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন, সাকার ফিশের অপ্রতিরোধ্য বিস্তার যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তবে আগামী এক দশকে দেশের জলজ সম্পদ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

    ২০২২ সালের শুরুতে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের একদল শিক্ষার্থী ও গবেষক এই সমস্যা সমাধানের জন্য গবেষণা শুরু করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল সাকার ফিশকে এমনভাবে প্রক্রিয়াজাত করা যাতে তা পোষা প্রাণী, পোলট্রি ও মাছের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য তৈরি করা যায়। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইয়াস ওয়ার্ল্ড এই প্রকল্পে অর্থায়ন করে, যা “বর্জ্য থেকে সম্পদ” (ওয়েস্ট টু ওয়েলথ) এবং “সমস্যা থেকে সম্পদ” (প্রব্লেম টু ওয়েলথ) নামক বৈশ্বিক ধারণাকে অনুসরণ করে।

    সাকার ফিশ থেকে খাদ্য তৈরির প্রধান বাধা ছিল এর মধ্যে থাকা বিষাক্ত উপাদান ও দুর্গন্ধ। গবেষক দলটি নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে এই সমস্যা মোকাবেলা করেন:

    ১. ডিটক্সিফিকেশন (বিষাক্ততা দূরীকরণ): বিশেষ ফার্মেন্টেশন (গাঁজন) পদ্ধতি ব্যবহার করে মাছের টিস্যু থেকে ভারী ধাতু ও অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ দূর করা হয়।

    ২. পুষ্টি সংযোজন: প্রোটিন সমৃদ্ধ সাকার ফিশের মাংসের গুঁড়ার সাথে সয়াবিন মিল, ভুট্টা, ভিটামিন ও মিনারেল মিশিয়ে সুষম খাদ্যের ফর্মুলা তৈরি করা হয়।

    ৩. প্যালাটেবিলিটি বৃদ্ধি: প্রাণীদের কাছে আকর্ষণীয় করতে খাদ্যে প্রাকৃতিক ফ্লেভার যুক্ত করা হয়।

    গবেষণার প্রথম ধাপে বিড়ালের উপর পরীক্ষা চালানো হয়। প্রাথমিকভাবে ৭০% বিড়াল এই খাদ্য গ্রহণ করে, এবং তাদের স্বাস্থ্য ও ওজন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ফল দেখা যায়। দ্বিতীয় ধাপে ফর্মুলা উন্নত করে ৮৫% সাফল্য অর্জিত হয়। শেকৃবির অ্যানিম্যাল সায়েন্স বিভাগের ল্যাবরেটরিতে পোলট্রির জন্য প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য তৈরির পরীক্ষাও সফল হয়েছে।

    ২০২৪ সালে ইয়াস ওয়ার্ল্ডের গ্লোবাল প্রজেক্ট কম্পিটিশনে এই প্রকল্পটি বিশ্বের ১২০টি দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থান অর্জন করে। “সাকার ফিশ থেকে প্রাণিখাদ্য” থিমের অধীনে এই উদ্ভাবনী সমাধান আন্তর্জাতিক জাজ প্যানেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রতিযোগিতার একজন জাজ, ড. মারিয়া গোন্জালেজ বলেন, “এই প্রকল্পটি শুধু একটি স্থানীয় সমস্যার সমাধানই নয়, এটি বিশ্বব্যাপী আগ্রাসী প্রজাতি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি মডেল হতে পারে।”

    ফিশারিজ বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী নিয়ামুল ইসলাম, যিনি এই প্রকল্পের মূল সদস্য, বলেন: “আমরা দেখিয়েছি যে কোনো সমস্যাই সম্ভাবনায় রূপান্তরিত হতে পারে। সাকার ফিশকে সাধারণত শত্রু ভাবা হয়, কিন্তু আমরা এটিকে প্রাণিখাদ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য জয়-জয় পরিস্থিতি তৈরি করেছি। আমাদের লক্ষ্য হলো এই প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে দেশের পশুখাদ্যের আমদানি কমে এবং মৎস্যজীবীরা সাকার ফিশ বিক্রি করে আয় করতে পারে।”

    প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক ড. হাবীব বলেন, “সাকার ফিশ নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক বা জাল ব্যবহার করা অকার্যকর। আমরা বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোলের একটি মডেল তৈরি করেছি—এটি যত বেশি খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হবে, ততই এর জনসংখ্যা কমবে। বিড়ালের খাদ্য হিসেবে সাফল্যের পর আমরা এখন কুকুর, মুরগি ও মাছের খাদ্য নিয়ে কাজ করছি।”

    বাংলাদেশে পোষা প্রাণীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। শুধু ঢাকাতেই প্রায় ১৫ লক্ষ বিড়াল ও কুকুর রয়েছে, এবং প্রতি বছর ২০% হারে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে পশুখাদ্যের ৮০% আমদানি করা হয়, যা বছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে। শেকৃবির এই খাদ্য উৎপাদন শুরু হলে দাম স্থানীয় বাজারের তুলনায় ৩০-৪০% কম হবে, যা আমদানির উপর চাপ কমাবে।

    প্রকল্পটিকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে প্রয়োজন বড় আকারের উৎপাদন ইউনিট, সরকারি অনুমোদন, এবং বিপণন কৌশল। ইতিমধ্যে এগ্রো-প্রসেসিং কোম্পানি প্রাণ ও এসিআইয়ের সাথে আলোচনা চলছে। এছাড়া, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এই উদ্যোগকে সহায়তা করার জন্য প্রযুক্তিগত কমিটি গঠন করেছে।

    সাকার ফিশের জনসংখ্যা ৫০% কমানো গেলে, SAU-এর মডেলিং অনুযায়ী, আগামী ৫ বছরে স্থানীয় মাছের প্রজাতি ২৫-৩০% পুনরুদ্ধার হতে পারে। এছাড়া, এই প্রকল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমির জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ তৈরি করেছে।

    বাংলাদেশের এই সাফল্য বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও অনুপ্রেরণাদায়ক। উদাহরণস্বরূপ, ক্যারিবিয়ানে লায়নফিশের আগ্রাসন বা উত্তর আমেরিকায় স্নেকহেড মাছের সমস্যা সমাধানেও এই মডেল কাজে লাগানো যেতে পারে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. রবার্ট ক্লার্ক মন্তব্য করেন, “এটি প্রমাণ করেছে যে স্থানীয় উদ্ভাবন বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সংকট মোকাবেলায় কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে।”

    শেকৃবির এই গবেষণা শুধু একটি মাছের গল্প নয়—এটি একটি দৃষ্টান্ত যে বিজ্ঞান, উদ্ভাবনী চিন্তা ও স্থানীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো সংকটকে সুযোগে পরিণত করা সম্ভব। সাকার ফিশ থেকে প্রাণিখাদ্য তৈরির এই প্রযুক্তি যদি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়, তবে এটি বাংলাদেশের জলজ বাস্তুতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন, মৎস্যজীবীদের আয় বৃদ্ধি, এবং পশুখাদ্য শিল্পের স্থিতিশীলতায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পের সাফল্য আমাদের শেখায় যে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ না করে তার সাথে সহাবস্থান করাই টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি।