Tag: টেকসই_খাদ্য_শৃঙ্খল

  • মাছে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার

    মাছে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার

    বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় মৎস্য খাতের ভূমিকা অপরিসীম। নদী-নালা, পুকুর-খামার ও সমুদ্র উপকূলজুড়ে বিস্তৃত এই খাত লাখো মানুষের আয়-রোজগার ও পুষ্টির চাহিদা মেটাচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মাছ চাষে অ্যান্টিবায়োটিকের অত্যধিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, মাছে মিশে যাওয়া এসব অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে প্রবেশ করে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিসট্যান্স (প্রতিরোধক্ষমতা) বাড়াচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণকেও প্রাণঘাতী করে তুলতে পারে। এছাড়া, বিষক্রিয়া ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মৎস্য খামারিদের একটি বড় অংশ রোগ প্রতিরোধ ও মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করছেন, যা খাদ্য শৃঙ্খলকে বিষিয়ে তুলছে।

    বাংলাদেশে মাছ চাষে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বাড়ার পেছনে মূল কারণ হলো নিবিড় চাষ পদ্ধতি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে স্বল্প জায়গায় অধিক উৎপাদনের লক্ষ্যে মাছের ঘনত্ব বাড়ানো হয়, যা পরিবেশগত চাপ ও রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ায়। রোগ নিয়ন্ত্রণে অনেক খামারি প্রতিরোধমূলক হিসেবেই নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে মাছের দ্রুত বৃদ্ধি ও আকৃতি বাড়াতে গোপনে গ্রোথ হরমোনের সঙ্গে মিশ্রিত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের প্রায় ৬০% মৎস্য খামারে মানবস্বাস্থ্যের জন্য অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে তেলাপিয়া, পাঙ্গাশ, শিং ও রুই জাতীয় মাছের চাষে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

    অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের ফলে মানবদেহে এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি। মাছ চাষের পানি ও মাটিতে জমে থাকা রাসায়নিক পদার্থ খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া মাছের নমুনার ৪০%-এ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি রয়েছে। এসব অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে প্রবেশ করে উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে মেরে ফেলে এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে সাধারণ ইনফেকশনেও প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ইতিমধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিসট্যান্সকে “নীরব মহামারি” হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে বছরে ১ কোটির বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

    স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের পরিকল্পনা করছে। মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ডা. নাজmul ইসলাম বলেন, “মাছে অ্যান্টিবায়োটিকের অবৈধ ব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারি বাড়ানো হবে। ইতিমধ্যে মৎস্য অধিদপ্তর ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে নমুনা পরীক্ষার কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে।” তিনি আরও জানান, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে খামারিদের জন্য গাইডলাইন তৈরি করা হচ্ছে এবং ভোক্তাদের সচেতন করতে গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানো হবে।

    তবে এই সমস্যার মূলে রয়েছে অজ্ঞতা ও লাভের আকাঙ্ক্ষা। অনেক খামারি অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ডোজ, প্রত্যাহারকাল (Withdrawal Period) বা মানবস্বাস্থ্যের উপর প্রভাব সম্পর্কে অজ্ঞ। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কম দামে পচনরোধ করতে মাছ সংরক্ষণে অ্যান্টিবায়োটিক স্প্রে করেন। রাজধানীর কাওরান বাজারের এক মাছ বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বড় মাছের দাম বেশি। তাই দ্রুত বাড়ানোর জন্য খামারিরা কী করছে, তা আমরা জানি না।” এদিকে, ভোক্তাদের সচেতনতার অভাবও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষ মাছে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারেন না বা এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানেন না।

    পরিস্থিতি উত্তরণে বিজ্ঞানভিত্তিক চাষ পদ্ধতি ও বিকল্প প্রযুক্তির প্রচলন জরুরি। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) প্রধান ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেছেন, “প্রোবায়োটিক, হার্বাল এক্সট্র্যাক্ট ও ইমিউনোস্টিমুল্যান্ট ব্যবহার করে অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প পদ্ধতি ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। বায়োফ্লক প্রযুক্তিও একটি নিরাপদ উপায়।” তিনি খামারিদের প্রশিক্ষণ ও প্রাকৃতিক চাষ পদ্ধতিতে উৎসাহিত করার উপর জোর দেন। এছাড়া, অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের দাবি উঠেছে। বর্তমানে পশুচিকিৎসার অ্যান্টিবায়োটিক সহজলভ্য হলেও মানবস্বাস্থ্যের জন্য নিষিদ্ধ ওষুধের ব্যবহার ঠেকাতে পর্যাপ্ত মনিটরিং নেই।

    এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে পশু ও মাছে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আমদানিকৃত অ্যান্টিবায়োটিকের একটি বড় অংশই অননুমোদিতভাবে মৎস্য খাতে ব্যবহৃত হয়। পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন সোসাইটি অব বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে চিংড়ি চাষে নিষিদ্ধ ক্লোরামফেনিকলের ব্যবহার仍在 চলছে। এই অ্যান্টিবায়োটিক লিউকেমিয়া ও অন্যান্য ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

    স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে মাছে অ্যান্টিবায়োটিকের সর্বোচ্চ অবশিষ্ট সীমা (এমআরএল) নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু ল্যাব সুবিধার অভাবে নিয়মিত পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নুরুল আলম বলেন, “খাদ্যে রাসায়নিকের উপস্থিতি পরীক্ষায় দেশে মাত্র ৫টি ল্যাব সক্রিয়, যা অপ্রতুল। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে ল্যাব নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে।”

    এই পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, মাছ কেনার সময় প্রাকৃতিক উৎসের মাছ বেছে নিতে। চাষের মাছের ক্ষেত্রে গন্ধ, রং ও গঠন স্বাভাবিক কি না, তা যাচাই করতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত মাছের প্রত্যয়ন চিহ্ন (সার্টিফিকেশন) চালু করা গেলে ভোক্তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, নিরাপদ_মাছ_চাই,, অ্যান্টিবায়োটিক_মুক্ত_খাদ্য হ্যাশট্যাগে সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ছে।

    মাছ চাষে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমাতে সফলতার উদাহরণও রয়েছে। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে একটি সমবায় গ্রুপ জৈব পদ্ধতিতে মাছ চাষ করছেন। তারা নিম পাতা, হলুদ ও মধু ব্যবহার করে মাছের রোগ নিয়ন্ত্রণ করেন। তাদের উৎপাদিত মাছ স্থানীয় বাজারে “অর্গানিক ফিশ” ট্যাগে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারলে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো সম্ভব।

    অ্যান্টিবায়োটিক সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। সরকারি নজরদারি, খামারিদের প্রশিক্ষণ, ভোক্তাদের সচেতনতা ও গবেষণার সমন্বয়ে একটি টেকসই কৌশল প্রয়োজন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করেছে। তবে আইনের প্রয়োগ ও দুর্নীতি রোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই নিশ্চিত করতে পারে নিরাপদ খাদ্যের ভবিষ্যৎ।