জমির রোগের ঝুঁকি: কীভাবে কৃষকরা তাদের ফসল রক্ষা করবেন

জমির রোগের ঝুঁকি

ফসল উৎপাদনের মাত্রা বাড়াতে চাইলে জমির রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জেনে নেয়া আবশ্যক। কেননা, যে জমিতে ফসল উৎপাদন করা হবে তা যদি দূষিত থাকে, তবে শুরুতেই ফসলের মধ্যে রোগ সংক্রমিত হয়ে ফসলের ক্ষতি করে। জমির রোগের ঝুঁকি বলতে মূলত মাটিতে অণুজীব মিশ্রিত থাকার প্রক্রিয়াকে বোঝায়। গবেষণা থেকে জানা যায়, আমাদের দেশের ১৫-২০% ফসল নষ্ট হয় এসকল রোগের কারণে। 

এই রোগগুলোর মধ্যে কিছু কিছু জমির মাটি থেকে ফসলে সংক্রমিত হয়, যার মূল কারণ সঠিক চাষ পদ্ধতির অভাব। একারণেই,মাটির রোগ নির্ণয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানা আবশ্যক। 

জমির রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জানা কেন গুরুত্বপূর্ণ

পুর্ববর্তী অংশ থেকে আমরা বুঝেছি যে জমির রোগের ঝুঁকি বলতে মূলত কোন বিষয়টিকে নির্দেশ করছে। কিন্তু কেনো এ বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ সেটাও জানা প্রয়োজন। এখন তাহলে সেগুলো জেনে নেয়া যাক- 

  • জমির রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জানলে আপনি বুঝতে পারবেন, কোন জমিতে ফসল ফলালে ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। ফলে এ নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হবে না।
  • জমি শোধন করার মাধ্যমে ফসলকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে পারবেন। 
  • জমির মাটি অনুযায়ী ফসলের কতটা পুষ্টি দরকার এসব সম্পর্কে বিষদভাবে জানতে পারবেন। ফলে পদক্ষেপ নেয়া সহজ হবে,
  • ফসলের পরিচর্যা করা সহজ হবে।
  • ফসল উৎপাদনের খরচ কমিয়ে আনতে পারে জমির রোগ সম্পর্কিত ধারণা।
  • জমি বা মাটির রোগ সম্পর্কে জানা থাকলে ফসল রক্ষার কৌশল এবং ফসলের রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে ব্যবস্থা নেয়া যায়।

 

জমির রোগ ফসলের উপর কীভাবে প্রভাব ফেলে

জমির রোগের সাথে যে ফসলের ব্যাপারটি জড়িত তা আপনি অবশ্যই বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু ফসলের ওপর এর প্রভাব কেমন তা সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। দেখে নিন সেগুলো-

  • মাটির সাথে ফসলের সম্পর্ক কতটা নিবিড় তা নিশ্চয়ই বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই। এতে বোঝা যাচ্ছে, মাটি যদি দূষিত হয়, তাহলে ফসল হুমকির মুখে পড়বে।
  • জমির গুণাগুণ কেমন তা অনুযায়ী ফসলের পুষ্টির পরিমাণ নির্ভর করে। অর্থাৎ জমিতে অণুজীব বেশি থাকলে ফসল মাটি থেকে পরিমিত পুষ্টি পাবে না।
  • জমির গুণাগুণ ভালো হলে ফসলের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, ফলে কীটনাশক প্রয়োজন হয় কম। অন্যথায়, ফসল সহজেই আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
  • জমির রোগ-ব্যাধি বেশি থাকলে সেই জমিতে দো-ফসলি বাঁ তিন ফসলি উৎপাদন সম্ভব হয়না। ফলে লাভ অত্যন্ত কম হয়।

জমির রোগের সাধারণ কারণ 

জমির রোগের মূল কারণ হলো মাটিতে অণুজীবের আক্রমণ। মূলত কিছু ছত্রাক এবং ব্যাকটেরিয়া আছে যারা মাটিতে বসবাস করে। এরা মাটিতে গুপ্ত অবস্থায় থাকে।যখনই কৃষক ভাই মাটিতে ফসল ফলান তখন তারা সজীব হয়ে ওথে এবং ফসলে সংক্রমণ ঘটায়। এরা এতটাই ভয়াবহ যে বছরের পর বছর সেখানে অবস্থান করে এবং রোগ সৃষ্টি করে। কোনো এক মাধ্যমে যেমন বাতাস, পানি, পোকামাকড় কিংবা মানুষ- যে মাধ্যমই হোক না কেনো তারা যদি তার মাধ্যমে জমিতে পৌঁছাতে পারে তবে সেখানেই স্থায়ী হয়ে যায়, পাশাপাশি, বছরের পর বছরের ফসলের ক্ষতি করতে থাকে।

 

ফসলের রোগ নির্ণয়ের প্রাথমিক লক্ষণ

অতএব, আমরা বুঝতে পারছি যে জমির রোগ নিয়ন্ত্রণ কতটা জরুরী। ফসলের রোগ নিরাময় করতে হলে আগে জমি শোধন করতে হবে। আর এ কাজে অর্থাৎ জমির রোগ নির্ণয়ে কৃষকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।কৃষক ভাইয়েরা ফসলের প্রাথমিক অবস্থা দেখলেই বুঝতে পারেন যে ফসল রোগাক্রান্ত হয়েছে কিনা। মূলত যেসব লক্ষণগুলো দেখা যায় সেগুলো হলো-

  • ফসলের পাতা হলুদ হয়ে যাওয়া
  • ফসলের পাতা কিংবা কান্ডে কালো বা বাদামী দাগ 
  • কান্ড পচে যাওয়া
  • শিকড় দুর্বল হয়ে যাওয়া
  • গাছ স্বাভাবিকের তুলনায় আকারে ছোট বাঁ খর্ব হওয়া
  • আগুনে পোড়ালে যেমন দাগ হয় তেমন দাগ পাতায় থাকা
  • ঠিকমত ফুল না আসা ইত্যাদি।

এসকল সমস্যা ফসলে দেখা গেলে বোঝা যাবে, তা রোগাক্রান্ত। সেক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বোঝা যাবে ফসলের এই রোগ মাটির সংক্রমণের কারণে হয়েছে কিনা। 

জমির রোগ চিহ্নিতকরণের আধুনিক পদ্ধতি

জমির পুষ্টি এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ করা ফসলের জন্য আবশ্যক তা আমরা আগেই জেনেছি। আর কৃষি প্রযুক্তি এবং রোগ নির্ণয় বিষয় দুইটি যে পরস্পর সম্পর্কিত সে ধারণাও আমরা কিছুক্ষণ আগেই পেয়েছি। একারণে আমাদের জানতে হবে ফসলের রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে কোন কোন আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। জিপিএস এর সাহায্যে আমরা মাটির গুণাগুণ সম্পর্কে ধারণা পেতে পারি। 

এটি একটি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি। এর দ্বারা মাটির পুষ্টি উপাদান নির্ণিত হয়। আর যদি পুষ্টি কম থাকে, তাহলে সেই মাটিতে অণুজীবের আক্রমণ আছে এ ধারণা পাওয়া যাবে। তাছাড়াও, পিএইচ মিটার দিয়ে মাটির পিএইচ মাপা যায়, অম্ল মাটি হলে তাতে অণুজীবের আধিক্য বেশি থাকে। 

কৃষকদের জন্য জমির রোগ প্রতিরোধ কৌশল

এতক্ষণ আমরা জমির রোগ সম্পর্কিত অনেক কিছু জানলাম। এবার জানতে হবে আসল উপায় যার মাধ্যমে জমির স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে। তাহলে এবার এগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা যাক-

  • জমির মাটি অতিরিক্ত দুষিত হয়ে গেলে রাসায়নিক উপাদান দ্বারা শোধন করতে হবে।
  • জমির রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রাকৃতিক উপায় অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ
    • একই জমিতে বারবার একই ফসল করা যাবে না। বিভিন ফসল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে করতে হবে।
    • কীটপতঙ্গ প্রতিরোধ কৌশল অবলম্বন করতে হবে যেনো এরা রোগ ছড়াতে না পারে। তার জন্য আলোক ফাঁদ, বিষ ফাঁদ, আঠালো ফাঁদ ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে।
    • জমিতে ফসল বোনার আগে গভীর চাষ দিয়ে মাটি ওলট-পালট করে দিতে হবে। এতে জীবাণু নিচে চলে যাবে এবং ফসলে সংক্রমণ ঘটাতে পারবে না।
    • রোগ প্রতিরোধে সঠিক চাষাবাদ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান দেয়া যাবে না।
  • জমির রোগ প্রতিরোধে জৈব সার ব্যবহার
  • মাটির পিএইচ ভারসাম্য ও রোগ প্রতিরোধ পরস্পর সম্পর্কিত। তাই পাটি নিরপেক্ষ বা হালকা ক্ষারীয় রাখতে হবে। এ কাজে চুনাপাথর ব্যবহার করা যায়।

এতক্ষণ আমরা জানলাম, জমির রোগের ঝুঁকি এবং কৃষকদের রোগ প্রতিরোধ পদ্ধতি সম্পর্কে। জমির রোগ নিয়ন্ত্রণে কৃষকদের করণীয় এই কাজগুলো অবশ্যই করতে হবে। জমির সুস্থতা নিশ্চিতকরণে ফসলের পরিচর্যা বিষয়টিও নিশ্চিত হবে যা ফলন বাড়াতে সাহায্য করবে।

 

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *