নোমান আহম্মেদ :ফুল কার না পছন্দ, ফুলকে পছন্দ করে না এমন মানুষের দেখা মেলা ভার। হাজার বছর ধরেই মানুষের পরিবেশের সৌন্দর্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে নানান রঙের ফুল। তাই তো কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তার কবিতায় লিখেছেন। জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি’ দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী !
ফুল ভালোবাসা, পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। তবে ফুল এখন আর সৌখিনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ফুলকে এখন বাণিজ্যিক ফসল হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। বর্তমানে দেশে ফুল চাষ করে সাবলম্বী হয়েছেন অনেক কৃষক, পিছিয়ে নেই পাবনার কৃষকেরাও।
যেখানে সবজি চাষের খরচ তুলতে কৃষক বেসামাল, ঠিক সেখানেই বাণিজ্যিক ভাবে গোলাপ চাষে সফলতা পেয়েছেন পাবনা সদর মালিগাছা ইউনিয়নের ভজেন্দ্রপুর এলাকার কৃষক খন্দকার শরিফুল আলম রানা, খন্দকার আশরাফুল বারী শাহীন ও খন্দকার জাফর উল্লাহ নামের তিন ভাই। ২০২১ সালে তিন বিঘা জমিতে গড়ে তোলা বাণিজ্যিক গোলাপ বাগানে এখন তাদের মাসিক গড় আয় তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা। এমন সাফল্যে জেলায় গোলাপ চাষে ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছেন কৃষিবিভাগও।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঘের শীতের বিদায় বেলায়, ঘন কুয়াশা ভেদ করে ভোরের আলো ফুটতেই গাছ থেকে ফুল তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমীকেরা। লাল, সাদা, হলুদ, গোলাপীসহ বাহারি নানা রঙের গোলাপ বাগান থেকে সংগ্রহ ও বাছাই করে চলছে বাজারের নির্ধারিত দোকানে পৌঁছানোর প্রস্তুতি। সুবাসিত গোলাপের এই রঙিন বাগানটি দেখে, বাণিজ্যিক সম্ভাবনার নতুন আশা জাগাচ্ছে অন্যান্য কৃষকের মনেও।
জানা যায়, বাগান মালিক ভজেন্দ্রপুর গ্রামের তিন ভাই। ৪ বছর আগে পৈত্রিক তিন বিঘা জমিতে ভারত, যশোর ও গাজীপুর থেকে প্রায় ৩৬ হাজার চারা সংগ্রহ করে গড়ে তোলেন গোলাপ বাগান। প্রথম বছরেই চারা থেকে আসে ফুল। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ভালো লাভ হওয়ায় সবজি চাষের নির্ভরতা কমিয়ে প্রতি বছরই বাড়াচ্ছেন তাদের বাগানের পরিধি।
কথা হয় বাগান মালিক খন্দকার আশরাফুল বারী শাহীন’র সাথে তিনি জানান, এক সময় বাঁশঝারে পরে থাকা এই বাগানটিতে এখন চায়না, হাইব্রিড জুমুলিয়া, বিউটি, ভারগো ও বমবম এই চার জাতের সাতটি পৃথক রঙের গোলাপ চাষ করছেন তিনি। তিনি জানান, দুজন কর্মচারী নিয়ে কাজ শুরু করা এই বাগানে এখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ছয় জনের। তাঁদের মাসিক বেতন বাবদ খরচ প্রায় ৭০ হাজার টাকা। শীত মৌসুমে বিয়ে ও উৎসব পার্বনে ফুলের চাহিদা বাড়ায় দামও পান ভালো। এছাড়া ফুল কিনতে ক্রেতাও সরাসরি বাগানে আসেন বলে জানান তিনি।

বাগান মালিকের ছেলে সাকিবের সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমার বাবা-চাচা মিলে এই ফুলের বাগান শুরু করে। আমি পড়াশোনার পাশাপাশি বাগানে পরিচর্যার কাজ করে থাকি। তিনি জানান, বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ফুলের চাহিদা বেশি থাকে। তিনি জানান, বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস এবং মার্চে মহান স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে
বেড়ে যায় ফুলের চাহিদা। তাই এই সময়টাতে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করে থাকেন তারা। তিনি জানান, শুধু পাবনা, চাটমোহর, সুজানগর, সাঁথিয়া, কাশিনাথপুর ও বেড়া নয় ঢাকাতেও ফুল বিক্রি করে থাকেন তারা।
গোলাপ বাগানের ম্যানেজার ইউনুফ সরদার জানান, চারা রোপনের দুই মাস পরেই বাগানে প্রচুর ফুল আসতে শুরু করে। বাজারে চাহিদা থাকায়, ভালো দামও পান তারা। তিনি জানান, আগে ফুলের দোকানিরা যশোর থেকে ফুল আনতো। এতে করে তাদের খরচও হতো বেশি। এখন আমাদের বাগান থেকে ফুল নেওয়ায়, তাদের খরচ ও সময় দুইটিই বেঁচে যায়। তিনি আরও জানান, এখন বিভিন্ন সবজি চাষে দাম না পেয়ে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। তাই সবজি চাষে নির্ভরতা না বাড়িয়ে কৃষকদের ফুল বাগান গড়ার পরামর্শ দেন এই চাষি।
কথা হয় বাগান শ্রমিক শাহীন প্রামানিকের সাথে তিনি জানান, আগে ক্ষেত-খামারে কৃষি কাজ করে কোনরকমে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। পরে মাসিক ১৩ হাজার টাকা বেতনে গাছ পরিচর্যার চাকরি নেন । বর্তমানে মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতন পেয়ে সচ্ছলতা ফেরান সংসারে।
কথা হয় টেবুনিয়া থেকে ফুল কিনতে আসা তিথী’র সাথে তিনি জানান, ফুল তার খুব পছন্দের, তাই সকালে গাছ থেকে উঠানো সতেজ ফুল কিনতে ও দেখতে বাগানে ছুটে এসেছেন তিনি।
এবিষয়ে পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক, কৃষিবিদ মো. রোকনুজ্জামান বলেন, আগে পাবনায় গোলাপ ফুলের বাজার পুরোটাই ছিলো আমদানি নির্ভর। তবে সতেজ ও মানসম্পন্ন ফুল পাওয়ায়, এখন তার অনেকটাই তিন ভাইয়ের দখলে। তিনি জানান, এখন তাদের বাগানে সপ্তাহে ২- ৩ দিন, দুই থেকে আড়াই হাজার পিস গোলাপ সংগ্রহ করেন কর্মীরা। প্রতিটি ফুল পাইকারি ২০ টাকায় বিক্রি করেন তারা। তিনি বলেন, শুধু তারাই নয় এখন পাবনা সদর, চাটমোহর, সুজানগর, ঈশ্বরদী, বেড়া থেকে শুরু করে প্রায় উপজেলাতেই বাণিজ্যিক ভাবে ফুলের চাষ করা হচ্ছে। গোলাপের বাণিজ্যিক চাষ সম্প্রসারিত হলে এ জেলা থেকে ফুল রপ্তানি সম্ভব বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।









