পোলট্রি খামারিদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রোগব্যাধি। মুরগীর বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে যা অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম। তাই পোলট্রি খামারে রোগ প্রতিরোধ উপায়সমূহ জানা আবশ্যক। তা না হলে লাভের চেয়ে লসের পরিমাণই বেশি হবে।
পোলট্রি খামারে রোগ প্রতিরোধ কেনো গুরুত্বপূর্ণ?
পোলট্রি খামারে রোগ প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি খামারের উৎপাদনশীলতা ও লাভজনকতা নির্ধারণ করে। রোগের সংক্রমণ হলে মুরগির স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা তাদের বৃদ্ধি, ডিম উৎপাদন এবং সামগ্রিক কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে।
রোগ-ব্যাধি থেকে মুরগীকে দূরে রাখতে পারলে আপনি যেভাবে লাভবান হবেন তা হলো-
- স্বাস্থ্যকর মুরগী দ্বারা অধিক পরিমাণে মাংস এবং ডিম উৎপাদন।
- রোগ প্রতিরোধ করতে পারলে রোগের চিকিৎসা বাবদ খরচ কমে যায়। তাছাড়াও মুরগী মৃত্যুর পরিমাণ কমে যাওয়ায় লাভ ভালো পাওয়া যায়।
- খামারিরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে লাভবান হতে পারেন।
- প্রোটিনের সঠিক জোগান নিশ্চিত হয়।
পোলট্রি খামারে সাধারণ রোগের তালিকা
পোলট্রি খামারে রোগ প্রতিরোধ করার পূর্বে রোগ সম্পর্কে সঠিকভাবে জেনে নেয়া আবশ্যক। এতে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। তাই প্রথমেই আমরা মুরগীর কিছু সচরাচর রোগের লক্ষণ সম্পর্কে জেনে নেই।
রাণিক্ষেত
- এটি ভাইরাসজনিত রোগ
- আক্রান্ত মুরগীর সবুজ রঙের তরল পায়খানা এর প্রধান লক্ষণ
- ঘাড় বাঁকা হয়ে যায় কিছু ক্ষেত্রে
- দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাস নেয়
- ঝিমিয়ে থাকে সবসময়
- মুরগী খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলে এবং ডিম পাড়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়।
- আক্রান্ত হবার এক সপ্তাহের মধ্যে মারা যায়।
মুরগীর বসন্ত/ কন্টাজিয়াস এপিথেলিওমা ও এভিয়ান ডিপথেরিয়া
- এটি ভাইরাসজনিত রোগ
- মুখের কোণায়, চোখের কোণায়, কানের লতিতে ছোট ছোট আঁচিলের মত অংশ দেখা যায়।
- প্রথমে ঐ স্থান লাল হয়ে যায় এবং রস জমে।
- এরপর কালো কালো গুঁটি দেখা যায়।
- বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বড় মুরগীগুলো ৩-৪ সপ্তাহ আক্রান্ত থেকে এরপর নিজে নিজেই ভালো হয়ে ওঠে। তবে ছোট মুরগীতে এ অসুখ হলে অনেক সময়ই মারা যায়।
মুরগীর কলেরা
- এটি একটি ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ
- আক্রান্ত মুরগীর মল দ্বারা অন্য মুরগীর মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।
- পালক খসখসে হয়ে যায়।
- পিপাসা বেড়ে যায়।
- পায়খানা সবুজ ও ফেনাযুক্ত হয়।
- কিছুদিনের মধ্যেই মুরগী মারা যায়।
ককসিডিওসিস
- ইমেরিয়া নামক এক প্রকার পরজীবী দ্বারা হয়।
- হজম শক্তি ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়।
- মুরগী সবসময় ঝিমাতে থাকে এবং অবসন্ন দেখা যায়।
গামবারো
- এ রোগে মুরগী পালক কুঁচকে যায় এবং অবসন্ন দেখায়।
- ময়লাযুক্ত পায়ুস্থান এবং ডায়রিয়াও দেখা যায়।
- এ রোগের ভ্যাকসিন না দিলে হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি
ইনফেকসাস ব্রংকাইটিস
- এটি প্রধানত বয়স্ক মুরগীর ক্ষেত্রে বেশি হয়ে থাকে।
- শ্বাসযন্ত্র আক্রান্ত হয় বলে শ্বাস প্রশ্বাস জোরে নেয়।
- অনেক সময় জোরে মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠে শব্দ করে।
পোলট্রি খামারে রোগ বিস্তারের কারণ
মুরগীর কিছু সাধারণ রোগ সম্পর্কে তো আমরা জেনেছি। কিন্তু এ রোগগুলো কেনো হয় এবং কীভাবে ছড়ায় এটি জামাও গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে প্রতিরোধ অসম্ভব।যে কারণগুলোর জন্য এসকল রোগের বিস্তার হয় সেগুলো হলো-
- মুরগীর বাসস্থান যদি অপরিষ্কার হয়, তাহলে বিভিন্ন জীবাণু সেখানে প্রবেশ করে।
- সুষম খাদ্যের অভাব
- সংকীর্ণ স্থানে গাদাগাদি করে অনেক বেশি মুরগী রাখলে
- ভেজাল এবং দূষিত খাদ্য
- খামারির পরিচর্যার অভাব
- অনভিজ্ঞ ব্যক্তির দ্বারা খামার পরিচালনা
- দূষিত পরিবেশের পানি, বায়ু, মাটি ইত্যাদির দ্বারা এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
পোলট্রি রোগ প্রতিরোধ কৌশল
পোলট্রি খাবারে রোগ প্রতিরোধ করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা আগেই দেখে নিয়েছি। এবার জেনে নিব এসব রোগ প্রতিরোধের কৌশল সম্পর্কে-
পোলট্রি খামারের পরিচ্ছন্নতা
আপনাকে অবশ্যই খামার সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। প্রতিদিনের উচ্ছিষ্ট অংশ প্রতিদিন ফেলে দিতে হবে। খামারে যেনো কোনোভাবেই স্যাতস্যাতে অবস্থার সৃষ্টি না হয় তা খেয়াল রাখতে হবে। কেননা এমন পরিবেশেই জীবাণুর বিস্তার ঘটে।পোলট্রি খামারে জীবাণুনাশক ব্যবহার করার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান অনেকটা করা সম্ভব। এতে ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগগুলো ছড়াতে পারবে না।
পোলট্রি খামারে স্বাস্থ্যবিধি
এটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খামারে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। পোলট্রি খামারে সঠিক ভ্যাকসিন প্রয়োগ আবশ্যক। জায়গা পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি ভ্যাক্সিন প্রয়োগে খামারের মুরগী রোগমুক্ত রাখা সহজ হয়। একই সাথে পোলট্রি খামারে যারা কাজ করেন তাদেরকেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং দক্ষ হতে হবে এ কাজে। খামারের যেকোনো কাজ সাবধানতার সাথে করতে হবে যেনো বাইরে থেকে জীবাণু না আসে।
পোলট্রি খামারের রক্ষণাবেক্ষণ
খামারের রক্ষণাবেক্ষণ এর দায়িত্ব যার থাকবে তাকে খামারের প্রতিটি মুরগীর প্রতি নজর রাখতে হবে। পোলট্রি রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা সম্পর্কে তাকে দক্ষ হতে হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হয় যদি একজন ভেটেরিনারি ডাক্তারের পরামর্শ নেন।তবে পোলট্রির জন্য এমন কাউকে না পেলে অন্তত রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবে এমন একজন দক্ষ মানুষ রাখতে হবে যেনো তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় স্থানে নিতে পারে।
পোলট্রি খামারে মুরগীর বিভিন্ন রকম রোগ-ব্যাধি হতে পারে। তাই এ ব্যাপারে সচেতন থাকা আবশ্যক। একবার রোগ ছড়িয়ে পড়লে সেই খামার রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। আর রক্ষা করতে পারলেও তা অনেক ব্যয়বহুল। তাই পোলট্রি খামারের রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে করা আবশ্যক।

Leave a Reply