ফসলের রোগ-বালাই: নতুন প্রযুক্তি ও গবেষণার প্রভাব

ফসলের রোগ

ফসলের রোগ-বালাই সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করা এবং সে অনুযায়ী উপযুক্ত নতুন প্রযুক্তি এবং গবেষণার প্রভাব সম্পর্কে ধারণা রাখা প্রত্যেক কৃষকের জন্য অত্যাবশ্যক। এর ফলে ফসলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।ফসলের রোগ-বালাই নিরাময়ে নতুন প্রযুক্তি ও গবেষণার প্রভাব উল্লেখযোগ্য। আমাদের কৃষিক্ষেত্রে পূর্বের তুলনায় যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে এবং তা সম্ভব হয়েছে এই প্রযুক্তির কারণে। 

কিন্তু দু:খের বিষয় হলো এই প্রযুক্তিগত বিষয় গুলোতে আমাদের কৃষক ভাইয়েরা এখনো পুরোপুরি প্রবেশ কর‍তে পারেননি। এ সকল প্রযুক্তি সম্পর্কে  আজ আমরা আলোচনা করব।

ফসলের রোগ-বালাই প্রতিরোধে প্রযুক্তির প্রভাব

আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি মাধ্যমে রোগ-বালাই প্রতিরোধ করা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি প্রক্রিয়াকে স্মার্ট ফার্মিং বলা হয়। কিন্তু স্মার্ট ফার্মিং কেন জরুরি?

এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এগুলো হলো-

  • বর্তমানে আবহাওয়া কৃষিকাজের জন্য আগের মত অনুকূল নয়। বিশেষত করোনা পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া এবং জলবায়ুর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। 
  • অত্যাধিক হারে কীটনাশক প্রয়োগের ফলে পোকামাকড় কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে যাকে বলা হয় ‘’রেসিটেন্ট”.।এক্ষেত্রে পূর্বের মত কীটনাশক দ্বারা পোকা, রোগ ইত্যাদি নির্মূল করা যাচ্ছে না।
  • কৃ্‌ষকের উৎপাদন খরচ মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেননা এত উচ্চ পরিমাণ রোগব্যাধির সাথে মোকাবেলা করতে নিয়মিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন খরচ বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে পরিবেশ দূষণ।
  • কৃষিজমি গুলোতে আগের মত উর্বরতা নেই। অতিরিক্ত কর্ষণ এবং রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে জমির প্রাকৃতিক উর্বরতা হুমকির সম্মুখীন।

ফলস্বরূপ, ফসলের রোগ-বালাই প্রতিরোধে প্রযুক্তির ব্যবহার আবশ্যক হয়ে উঠছে।

ফসলের রোগ-বালাই গবেষণা ও বিশ্লেষণ 

রোগমুক্ত ফসল উৎপাদনের উপায় হলো ফসলের রোগ-বালাই গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে নতুন নির্মূল পদ্ধতির আবিষ্কার করা।উদাহরণস্বরূপ, বেগুনের কিছু বন্য জাত আছে। সেখান থেকে বেগুণের রোগ-প্রতিরোধী জিন চাষযোগ্য জাতের মধ্যে বৈজ্ঞানিক উপায়ে দেয়া সম্ভব হওয়ায় নতুন জাতের বেগুন এসেছে যা “ছিদ্র পোকা”প্রতিরোধী।

এখন, বেগুনের কোন জিনের উপস্থিতিতে এটা সম্ভব হবে তা না জানলে তো বিজ্ঞানীরা নতুন ভালো জাত উৎপাদন করতে পারবেন না। একারণে ফসলের রোগ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা হওয়া আবশ্যক।

আবার, রোগ বালাই সম্পর্কে যথাযথ গবেষণা করলে ফসল তোলার আগেই আগাম ধারণা পাওয়া যায় যে কেমন ফসল হতে পারে। এর ফলে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধী গ্রহণ করা সহজ হয়।

ফসলের রোগ প্রতিরোধ প্রযুক্তি

ফসলের রোগ প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে কৃষি বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়ে আসছেন ক্রমাগত। এগুলো সম্পর্কে কিছু বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক-

  • জৈবিক বালাইনাশক

এসকল বালাইনাশক উদ্ভিদ বা প্রাণির দেহাংশ থেকে তৈরী হওয়ায় এগুলো উপকারী এবং নিরাপদ। বর্তমানে এর প্রচলন বেড়েছে বহুগুণে।আবার, কিছু শিকারী পোকা আছে যারা ফসলের ক্ষতিকর পোকাগুলোকে খেয়ে শেষ করে দেয়। এরা আক্ষরিক অর্থে বালাইনাশক না হলেও ভাবার্থে বালাইনাশক হিসেবেই গণ্য। 

  • কৃষিতে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার

কৃষিতে ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে প্রত্যেকটি গাছে সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব। এতে রোগ নিরাময় সহজ হয়।এই প্রযুক্তি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফসলের রোগ নির্ণয় করতে সাহায্য করে। 

  • ফসলের রোগ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি

ফসলের রোগ শনাক্ত করার জন্য বিভিন্ন ন্যানো প্রযুক্তি সমৃদ্ধ মেশিন আবিষ্কৃত হচ্ছে।

  • ফসলের রোগ প্রতিরোধী বীজ রোগ নিরাময়ে বেশ উপকারী। 

কিছুক্ষণ আগের আলোচনা থেকে আমরা জেনেছি যে রোগ প্রতিরোধে নতুন প্রতিরোধী জাত আমাদের কতটা প্রয়োজনীয়। 

এসব জাত যদি ভালো ফলন দেয়, তবে কম রাসায়নিক বস্তু প্রয়োগে আমাদের ফসল ফলানো সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন আমাদের মাটি বাঁচবে, তেমনি বাঁচব আমরা। 

কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নের প্রভাব

ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর উপায় নির্ণয় করতে হলে কৃষকদের জন্য প্রযুক্তিগত সমাধান বেছে নেয়াই সর্বোত্তম উপায়। কৃষি প্রযুক্তি সীমিত হারে হলেও প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে।কিছু কিছু জায়গার কৃষক যারা কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে পরামর্শ করেন।তারা এসব প্রযুক্তি সম্পর্কে জানছেন এবং গ্রামের অন্য কৃষকদের জানাচ্ছেন।

এছাড়াও প্রাকৃতিক নিরাময় পদ্ধতিগুলোও প্রয়োগ হচ্ছে নিয়মিত। ফসল বোনার পূর্বে এবং পরের করণীয় কাজগুলো সম্পর্কে বর্তমানে কৃষক ভাইয়েরা যথেষ্ট সচেতন। এই কারণে কিছুটা হলেও আমরা আমাদের অভাব মেটাতে পারছি। তবে এই প্রযুক্তিগত প্রয়োগ আরও দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। তাহলেই আমাদের কৃষিব্যবস্থা এবং কৃষকদের উন্নতি হবে।

অবশেষে, একটি কথাই বলা যায়, কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যতীত কৃষিতে উন্নয়ন অসম্ভব। তাই আমাদের সরকার এবং কৃষিক্ষেত্রে যারা কর্মরত আছেন, তাদের উচিৎ অবিলম্বে কৃষক ভাইদের এসব সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং সচেতন করে তোলা।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *