Category: ফিশারিজ

  • বোয়াল মাছের কৃত্রিম প্রজনন

    বোয়াল মাছের কৃত্রিম প্রজনন

    বর্তমানে বিপন্ন প্রজাতির মাছ বোয়াল। প্রাকৃতিক অভয়াশ্রম নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে এই মাছটিকে আগের মত আর পাওয়া যায় না। অথচ সামান্য একটু উদ্যোগ নিলেই এই বোয়াল মাছটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা যায় অনায়াসে। বোয়াল একটি রাক্ষুসে স্বভাবের মাছ। কাজেই এ মাছটিকে প্রজননের আওতায় এনে উৎপাদন করতে কয়েকটি বিশেষ দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

    বোয়ালের প্রজনন মৌসুম:
    মধ্য এপ্রিল থেকে আগষ্ট মাস পর্যন- বোয়াল মাছ ডিম দিয়ে থাকে। প্রজননের সময় খুব সহজেই পুরুষ ও স্ত্রী মাছকে শনাক্ত করা যায়।

    প্রজননের জন্য উপযোগী স্ত্রী ও পুরুষ মাছ বাছাই:
    আগেই উল্লেখ করেছি, প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী মাছের পেট ভর্তি ডিম থাকে আর পুরুষ মাছের পেট সাধারণ মাছের মত থাকে। তাছাড়া পুরুষ মাছের পেটে চাপ দিলে সাদা মিল্ট বেরিয়ে আসে। এ থেকে সহজেই বোয়ালের পুরুষ ও স্ত্রী মাছ শনাক্ত করা যায়।

    হরমোন ইঞ্জেকশনের দ্রবণ তৈরি এবং ইঞ্জেকশন দেওয়ার পদ্ধতি:
    বোয়াল মাছকে পি.জি. (পিটইটারী গ্ল্যান্ট) হরমোন দিয়ে ইঞ্জেকশন করলেই ডিম দিয়ে থাকে। প্রথম ডোজের সময় শুধুমাত্র স্ত্রী মাছকে ইঞ্জেকশন দিতে হয়। ডোজের মাত্রা ২ মি: গ্রা: কেজি। ৬ ঘন্টা পর দ্বিতীয় ডোজ দিতে হয় ৪ মি: গ্রা:/ কেজি। ২টি পদ্ধতিতে বোয়ালের ডিম সংগ্রহ করা যায়।

    প্রথম পদ্ধতি (চাপ প্রয়োগ পদ্ধতি):
    মাছকে পি.জি হরমোন ইঞ্জেকশন দেওয়ার পর পুরুষ ও স্ত্রী মাছকে আলাদা আলাদা হাউজে রাখতে হবে। দ্বিতীয় ডোজের ৬ ঘন্টা পর সাধারণত বোয়াল মাছ ডিম দিয়ে থাকে। মাছের ডিম পাড়ার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যে, যখনই ২/১টি ডিম বের হতে দেখা যাবে তখনই মাছগুলোকে একে একে হাউজ থেকে তুলে আনতে হবে। এবার স্ত্রী মাছের পেটে আস্তে করে চাপ দিলেই ডিম বের হতে থাকবে। স্ত্রী মাছের ডিম বের করার পর তাৎক্ষণিকভাবে পুরুষ মাছের পেটে চাপ দিয়ে মিল্ট বের করে ডিমের উপর পাখির পালক দিয়ে ভালভাবে মিশাতে হবে। এরপর ডিমগুলোকে ২/৩ বার বিশুদ্ধ পানিতে পরিষ্কার করে ৩/৪ ইঞ্চি উচ্চতার পানির হাউজে রাখতে হবে। চিকন প্লাষ্টিক পাইপকে ছিদ্র করে ঝর্ণার ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে ২০/২২ ঘন্টার মধ্যেই ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হবে।
    বোয়াল মাছের কৃত্রিম প্রজনন
    দ্বিতীয় পদ্ধতি (প্রাকৃতিক পদ্ধতি):
    প্রথম পদ্ধতিতেই মাছকে হরমোন ইঞ্জেকশন দিয়ে পুরুষ ও স্ত্রী মাছকে একসাথে একটি বড় হাউজে ছেড়ে দিতে হবে। তাতে দ্বিতীয় ডোজের ৬ ঘণ্টার মধ্যেই প্রাকৃতিকভাবে এরা ডিম পারবে। ডিম পারা শেষ হলে ব্রুডমাছগুলোকে সর্তকতার সাথে সরিয়ে নিতে হবে। তারপর হাউজের পানি কমিয়ে ৩/৪ ইঞ্চি রেখে ছিদ্রযুক্ত পাইপ দিয়ে পানির ঝর্ণা দিতে হবে। এখানেও ২০/২২ ঘন্টার মধ্যে ডিম থেকে বাচ্চা বের হবে।

    পোনা লালন-পালন পদ্ধতি:
    বোয়ালের পোনা খুবই রাক্ষুসে স্বভাবের। ডিম থেকে ফুটার ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই একটি আরেকটিকে খেতে শুরু করে। পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, অন্যান্য মাছের রেনু পোনা ডিমের কুসুম বা ক্ষুদ্র আকৃতির প্ল্যাংকটন খেলেও বোয়ালের পোনা ডিমের কুসুম বা কোন ধরনের প্ল্যাংকটন খায় না। সে ক্ষেত্রে তাদেরকে জীবিত অবস্থায় মাছের রেনু বা পোনাকে খেতে দিতে হয়। এভাবে ৮/১০ দিনেই ২ ইঞ্চি সাইজের পোনায় পরিণত হয়।

    বোয়াল মাছের চাষ পদ্ধতি:
    গবেষণায় দেখা গেছে যে, বোয়াল মাছ এককভাবে চাষ করা যায় না। একটা আরেকটাকে খেতে খেতে শেষ পর্যন- আর বাকি থাকে না। তা ছাড়া কৃত্রিম খাবার না খাওয়ায় মাছগুলো খুব একটা বড়ও হয় না। তাই এদেরকে বিভিন্ন মাছের সাথে মিশ্র চাষ করে ভাল ফলাফল পাওয়া যায়। মজুদ ঘনত্ব মিশ্রচাষে প্রতি ৫ শতাংশে ১টি মাছ। মাছ ছাড়ার সময় একটা দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে যে, বোয়ালের পোনা যেন কোন অবস্থাতেই পুকুরের অন্যান্য মাছের আকারের সমান না হয়। সে ক্ষেত্রে অন্যান্য মাছের ওজন যখন ১৫০/২০০ গ্রাম ওজন হবে সেখানে ২ ইঞ্চি সাইজের বোয়ালের পোনা ছাড়তে হবে। আর তা না হলে বোয়াল দ্রুত বড় হয়ে অন্যান্য মাছ খেয়ে ফেলতে পারে।

  • মাছের রেণু পোনা চাষ পদ্ধতি: চারা পোনা চাষে ক্ষতিকারক রোগ-বালাই দমণ

    মাছের রেণু পোনা চাষ পদ্ধতি: চারা পোনা চাষে ক্ষতিকারক রোগ-বালাই দমণ

    মাছ চাষে মানসম্মত পোনার ভুমিকা অপরিসীম। হ্যাচারি থেকে রেণু পোনা সংগ্রহ করে তা লালন পালন করার জন্য পুকুরে রেখে ৫-১০ সেঃমিঃ বা ৭-১২ সেঃমিঃ পর্যন্ত বড় করে চাষের পুকুরে ছাড়ার পদ্ধতিকেই রেণু পোনা চাষ পদ্ধতি বলে। মাছ চাষের পূর্বশর্ত হচ্ছে সুস্থ্য সবল উন্নত জাতের পোনা সরবরাহ নিশ্চিত করা।

    রেণু অবস্থায় মাছের জীবন চক্র অত্যন্ত নাজুক থাকে। এজন্য আলাদাভাবে বিশেষ যত্নে পালনের জন্য রেণু সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। সাধারণত দুই ভাবে রেণু পোনা সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। একটি উৎস হচ্ছে নদী অন্যটি হ্যাচারি। হালদা, পদ্মা, যমুনা, আড়িয়াল খাঁ প্রভৃতি নদী থেকে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে বিভিন্ন মাছের রেণু ধরা পড়ে।

    ভালো রেণু পোনা

    ভালো রেণু বা মানসম্মত রেণু কোথায় পাওয়া যাবে তা কিভাবে পাওয়া যাবে এটা অনেকেরই প্রশ্ন থাকে। এবং নদী নালা থেকে প্রাপ্ত বা প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরিত রেণু পোনা ভালো নাকি হ্যাচারির উৎপাদিত রেণু পোনা ভালো এটাও অনেকেরই প্রশ্ন। স্বাভাবিকভাবেই নদী থেকে প্রাপ্ত রেণু পোনার মান ভাল হয়ে থাকে কারণ পরিপূর্ণ এবং অনুকুল প্ররিবেশে পরিপক্ক মাছের প্রজনন ঘটে থাকে নদীতে।

    নদীর আহরিত রেণুতে বিভিন্ন প্রজাতির মিশ্রণ থাকে তাই বাছাই করা সহজ হয় না বলে এ ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। অন্যদিকে হ্যাচারির রেণুতে প্রজাতির মিশ্রন না ঘটিয়ে নিদিষ্ট প্রজাতির রেণু সংগ্রহ ও লালন-পালন করা সম্ভব হয়ে থাকে। তবে ব্রুড মাছের মান ঠিক মত নিয়ন্ত্রন না করা হলে এবং হ্যাচারি ব্যাবস্থাপনায় অসতর্ক হলে নিম্নমানের রেণু বা সংকর জাতের রেণু উৎপাদিত হতে পারে। যা পরে চাষীর ক্ষতির কারণ হতে হবে।

    রেণু লালন পালনের পুকুর প্রস্তুত

    রেণু পোনা লালন পালনের জন্য বিভিন্ন ধরনের অগভীর বার্ষিক পুকুর বা চাষাবাদ মৌসুমে পানির ব্যবস্থা থাকে এমন পুকুর রেণু লালনের জন্য উত্তম। রেণু মজুদ পুকুর সংলগ্ন বা পার্শ্ববর্তী স্থানে অপেক্ষাকৃত ঢালু এবং যে স্থানে সবসময় পানি প্রাপ্তির সুবিধা আছে এমন স্থানে রেণু প্রতিপালনের পুকুর নির্মাণ করা ভাল। পোনার চাহিদা অনুযায়ী কয়েকটি মজুদ পুকুরের পাশে রেণু প্রতিপালনের পুকুর তৈরি করলে বেশি লাভবান হওয়া যায়।

    প্রতিপালন স্থানের অবকাঠামো

    রেণু পোনা প্রতিপালন পুকুর নির্বাচনে যে বিষয় গুলোর উপর খেয়াল রাখতে হবে-

    • পুকুরের চারপাশ উচু, মজবুত থাকতে হবে
    • পুকুর বন্যামুক্ত হতে হবে
    • পুকুরে পর্যাপ্ত রোদ, আলো-বাতাস থাকবে
    • পুকুরে ছায়া সৃষ্টি করে কিংবা পাতা পানিতে পড়ে পানি নষ্ট হয় এমন কোন গাছপালা পুকুরপাড়ে থাকা যাবেনা
    • বর্ষাকালে পুকুরের পানির গভীরতা দুই মিটারের বেশি হওয়া যাবে না
    • পুকুরের তলদেশে বেশি পরিমানে কাঁদা থাকবে না
    • রেণু প্রস্তুতের পুকুরের আয়তন ১০-১৫ শতাংশ হতে পারে।

    চুন সার প্রয়োগ

    পুকুর প্রস্তুতির দ্বিতীয় ধাপে পুকুরের তলদেশের মাটি সূর্যালোকে শুকিয়ে গেলে পুকুরের তলদেশে লাঙ্গল দিয়ে ভালভাবে চাষ করে শতাংশ প্রতি ১ কেজি হারে চুন পাড়সহ সমস্ত পুকুরে প্রয়োগ করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় পুকুরের তলদেশের পরজীবি প্রাণী মারা যায় এবং পুকুরের পানি কিছুটা খারযুক্ত হয়। যদি পানি নিস্কাশন না করে রোটেনন প্রয়োগ করা হয় তাহলে রোটেনন প্রয়েগের ৩-৫ দিন পর চুন দিতে হবে।

    নতুন ও পুরাতন উভয় পুকুরেই সার দিতে হবে প্রথমে রাক্ষুসে মাছ অপসারণ বা সম্ভব হলে শুকানের পর শতাংশ প্রতি ৫-৭ কেজি গোবর বা ৮-১০ কেজি কম্পোস্ট সার অথবা হাঁস মুরগির বিষ্ঠা ৩-৫ কেজি এবং ১০০-১৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৫০-৭৫ গ্রাম টিএসপি একই সঙ্গে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। প্রতি তিনমাস পরপর চুন প্রয়োগ করলে পুকুরের স্বাস্থ্যকর অবস্থা বজায় থাকে। এক্ষেত্রে চুনের মাত্রা হবে প্রাথমিক মাত্রার ১/৪ ভাগ থেকে ১/২ ভাগ।

    পুকুরে পানি সেচ দেওয়া

    পুকুর শুকানো হলে চুন প্রয়োগের ২-৩ দিন পর পুকুরে নিরাপদ উৎস থেকে ২-২.৫ ফুট পরিমাণ পানি প্রবেশ করাতে হবে। পানি উত্তোলেনের ক্ষেত্রে গভীর নলকুপের বা শ্যালো ইঞ্জিনের দ্বারা মাটির নীচের পানি প্রবেশ করানো ভালো।

    যদি পুকুর বা অন্য ডোবা থেকে পানি প্রবেশ করানো হয় সেক্ষেত্রে অবশ্যই আগে পাইপের মুখে ফিল্টার নেট বা নালায় জাল দিয়ে পানি ছেঁকে প্রবেশ করাতে হবে, যাতে এ পানির সঙ্গে অন্য কোনো জলজ প্রাণী, কীতপতঙ্গ, রাক্ষুসে ও অচাষকৃত মাছ প্রবেশ করতে না পারে।

    ক্ষতিকর জলজ কীতপতঙ্গ দমন

    নার্সারি পুকুরে সার প্রয়োগের ৩-৪ দিনের মধ্যেই পানির বর্ণ সবুজ হয় এবং প্লাংক্টনসহ অন্যান্য বেশকিছু প্রজাতির ক্ষতিকর জলজ কীতপতঙ্গ জন্মায়। যেমন- হাঁসপোকা, ব্যাঙাচী, ক্লাডেসিরা, বড় প্রানীকনা (মাখন পোকা) ইত্যাদি।

    এসব কীতপতঙ্গ থাকলে রেণুর মড়ক হয়, রেণু পোনা খেয়ে ফেলে অথবা পেটকেটে মেরে ফেলে এবং খাদ্যের জন্য রেণুর সাথে প্রতিযোগিতা করে। এজন্যই রেণু ছাড়ার আগে এদের নিয়ন্ত্রন করতে হবে।

    ৬-১২ গ্রাম শতাংশ প্রতি ৩০ মে.মি. পানি হিসাবে ডিপটারেক্স ব্যবহার করতে হবে তাহলে হাঁসপোকা, ব্যাঙাচী, ক্লাডেসিরা, বড় প্রানীকনা (মাখন পোকা) কপিপোড ইত্যাদি মারা যাবে। কিন্তু রেণু পোনার খাদ্য রটিফার ঠিকই বেঁচে থাকবে।

    এছাড়া পুকুরে প্রতি শতাংশে ১২০-১৩০ মিলি হারে কেরোসিন বা ডিজেল প্রয়োগ করলে জলজ কীতপতঙ্গ আংশিক দমন পাওয়া যায়। জলজ কীতপতঙ্গ দমনের জন্য ডিপটারেক্স ব্যবহারের পর জাল টেনে মরা পোকা ছেঁকে তুলে দিতে হবে।

    রেণু পোনা মজুদ

    রেণু পালনের সময়কাল এবং পুকুরের আয়তনের উপর ভিত্তি করে রেণু মজুদের ঘনত্ব নির্ভর করে। রেণু থেকে চারা পোনা (৭-১৫ সে.মি.) পর্যন্ত একই পুকুরে বড় করার পদ্ধতিকে এক স্তর পদ্ধতি বলে।

    আবার যদি একটি ছোট পুকুরে রেণু পোনা ছেড়ে ১০-১৫ দিন লালন পালন করে অন্য কয়েকটি পুকুরে কম ঘনত্বে ধানি পোনা স্থানান্তর করা হয়, তাহলে সে পদ্ধতিকে দ্বি-স্তর পদ্ধতি বলে।

    প্রথম পদ্ধতি থেকে তিনগুন বেশি রেণু পোনা মজুদ করা যায়। একস্তর পদ্ধতিতে রেণু পালনের জন্য শতাংশে ৬-৮ গ্রাম ও দ্বি-স্তর পদ্ধতির জন্য ২৫-৩০ গ্রাম রেণু পোনা মজুদ করা সম্ভব।

    সর্তকতা

    রেণু পরিবহনকালীন সময় অক্সিজেন ব্যাগে বহন করতে হবে এবং পরিবহনের সময় ধকল যত কম হবে, রেণু পোনার মৃত্যুর হার তত কম হবে। পুকুরে রেণু ছাড়ার আগে রেণুর ব্যাগের পানির এবং পুকুরের পানির তাপমাত্রা সমতায় নিয়ে আসতে হবে। রেণু ছাড়ার সময় পুকুরের পাড়ের কাছাকাছি ছাড়তে হবে। রেনু ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় সকালে বা বিকালে ছাড়া উচিত ।

    উপরোক্ত বিষয় গুলি ভাল ভাবে মেনে রেণু পোনা চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করলে চাষী লাভবান হবে।

  • মাছের পোনা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা

    মাছের পোনা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা

    বাংলাদেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে মাছের ভূমিকা অপরিসীম। দেশের প্রায় ৮০% মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছের পোনা সংগ্রহ দিনদিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পাশাপাশি রুই, কাতলা, মৃগেল ও শিং-মাগুরের মতো চাহিদাসম্পন্ন প্রজাতির পোনা উৎপাদনে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়, প্রশিক্ষিত জনবল ও টেকসই বিনিয়োগ।

    বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১.৪ লাখ কেজি মাছের পোনা উৎপাদন হয়, যার মধ্যে ৬৫% আসে সরকারি ও বেসরকারি হ্যাচারি থেকে। বাকিটা নির্ভর করে নদী ও প্রাকৃতিক উৎসের ওপর। কিন্তু প্রাকৃতিক উৎসের পোনার গুণগত মান ও সরবরাহ অনিশ্চিত। বিশেষ করে ইলিশের পোনা সংগ্রহ নিষিদ্ধ হওয়ায় এবং নদীদূষণ বেড়ে যাওয়ায় হ্যাচারির গুরুত্ব বেড়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৯৮২টি রেজিস্টার্ড হ্যাচারি রয়েছে, যার মধ্যে ৮০টিই সরকারি। তবে এসব হ্যাচারির সিংহভাগই আধুনিক প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে পোনার মান নিয়ন্ত্রণহীনতা, রোগবালাই ও উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় চাষিদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

    স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রথম শর্ত হলো উন্নত মানের পোনা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৩০% হ্যাচারিতে পোনার মৃত্যুর হার ৫০% ছাড়িয়ে যায়, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। এ সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানীরা জেনেটিক্যালি সুপিরিয়র ব্রুডস্টক (মা-মাছ) তৈরি, রোগ প্রতিরোধী পোনা উৎপাদন ও হ্যাচারি ব্যবস্থাপনায় অটোমেশনের ওপর জোর দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে বিএফআরআই ‘জিএসটি’ নামে রুই মাছের একটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে, যা সাধারণ পোনার চেয়ে ২০% দ্রুত বাড়ে। এ ধরনের উদ্ভাবন উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক।

    প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোও জরুরি। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম (আরএএস) ব্যবহার করে অল্প পানি ও জায়গায় উচ্চমাত্রায় পোনা উৎপাদন করা হয়। এই প্রযুক্তি পানির পিএইচ, অক্সিজেন ও তাপমাত্রা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যা পোনার বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে কয়েকটি বেসরকারি হ্যাচারিতে আরএএস পদ্ধতি চালু হয়েছে। খুলনার একটি হ্যাচারির মালিক মো. সাকিব হাসান বলেন, “আরএএস ব্যবহার করে পোনার উৎপাদন তিন গুণ বেড়েছে। বিদ্যুৎ খরচ বেশি হলেও লাভের পরিমাণ সন্তোষজনক।”

    দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে হলে পোনার মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। মৎস্য অধিদপ্তরের হ্যাচারি ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতিটি হ্যাচারিতে ওয়াটার টেস্টিং ল্যাব, কোয়ারেন্টাইন সিস্টেম ও ট্রেন্ড টেকনিশিয়ান থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই নিয়মের প্রয়োগে শিথিলতা রয়েছে। অনেক হ্যাচারি মালিক অভিযোগ করেন, লাইসেন্স নবায়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া জটিল এবং দুর্নীতিগ্রস্ত। এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. খলিলুর রহমান বলেন, “হ্যাচারিগুলোকে আধুনিকায়নে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে, যারা নিয়মিত পরিদর্শন করবে।”

    গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশে মাত্র ০.৫% জিডিপি গবেষণায় ব্যয় হয়, যার খুব সামান্যই মৎস্য খাতের জন্য বরাদ্দ। অথচ থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের জিডিপির ২% এর বেশি গবেষণায় খরচ করে, যা তাদেরকে বিশ্বব্যাপী পোনা রপ্তানিতে শীর্ষ位置上 এনেছে। বাংলাদেশে ক্রাইওপ্রিজারভেশন (শুক্রাণু হিমায়ন) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিরল প্রজাতির মাছের জেনেটিক মেটেরিয়াল সংরক্ষণ, আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন ও হাইব্রিড পোনা উৎপাদনের মতো প্রকল্প হাতে নেওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

    প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি এই খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। দেশে প্রায় ৫০ হাজার হ্যাচারি কর্মী রয়েছেন, যাদের মধ্যে মাত্র ১৫% ফরমাল ট্রেনিং পেয়েছেন। এ অবস্থা改善 করতে মৎস্য অধিদপ্তর ও এনজিওগুলোর যৌথ উদ্যোগে প্রশিক্ষণ কর্মশালা বাড়ানো হচ্ছে। কুমিল্লার একটি হ্যাচারিতে কাজ করা শিমুল মিয়া বলেন, “প্রশিক্ষণের পর পোনার খাবার দেওয়া ও রোগ চিহ্নিত করার দক্ষতা বেড়েছে। এখন পোনার মৃত্যুহার ১০% এর নিচে।”

    সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও এগিয়ে আসছে। ইস্পাহানি অ্যাগ্রো লিমিটেডের মতো কোম্পানিগুলো উচ্চপ্রোটিন সম্পন্ন পোনার খাবার তৈরি করছে, যা বৃদ্ধির হার বাড়ায়। এ ছাড়া স্টার্টআপগুলো হ্যাচারি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ও আইওটি-ভিত্তিক মনিটরিং সিস্টেম চালু করেছে, যা ডিজিটাল পদ্ধতিতে উৎপাদন তদারকি করে।

    স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের আরেকটি বড় পদক্ষেপ হলো স্থানীয় প্রজাতির পোনা সংরক্ষণ। বাংলাদেশে ২৬০টি দেশীয় মাছের প্রজাতি রয়েছে, যার অনেকগুলোই বিলুপ্তির পথে। মিঠাপানির শিং, মাগুর, পাবদা ও গুলশা মাছের কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি ইতিমধ্যে উদ্ভাবিত হয়েছে। ময়মনসিংহের একটি হ্যাচারিতে গুলশা মাছের পোনা উৎপাদন করে সাফল্য পেয়েছেন ড. মো. আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, “দেশীয় মাছের চাহিদা বাড়ছে। এসব পোনার উৎপাদন বাড়ালে আমদানিনির্ভরতা কমবে।”

    জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নেওয়া হচ্ছে বিশেষ উদ্যোগ। লবণাক্ততা সহিষ্ণু পোনা উৎপাদনের জন্য সাতক্ষীরা ও খুলনার হ্যাচারিগুলোতে গবেষণা চলছে। ইতিমধ্যে ‘সালাইন-রেজিস্ট্যান্ট রুই’ এর ট্রায়াল সফল হয়েছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলে চাষের জন্য উপযোগী।

    তবে এই পথে এখনো কিছু বাধা রয়ে গেছে। ক্ষুদ্র হ্যাচারি মালিকদের মাঝে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত, ব্যাংক ঋণে সুদের হার বেশি এবং বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। নরসিংদীর একটি হ্যাচারির মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, “জেনারেটর চালানোর ডিজেল খরচ মেটাতে গিয়ে লাভের অঙ্কটা কমে যায়। সরকার যদি সোলার এনার্জি সাবসিডি দেয়, তাহলে খরচ কমানো যেত।”

    ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় সরকার ই-ফিশারিজ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে পোনার চাহিদা-জোগান, মূল্য ও মান নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এ ছাড়া ‘ব্লু ইকোনমি’ কর্মসূচির আওতায় সামুদ্রিক মাছের পোনা উৎপাদনে গবেষণা বাড়ানো হবে।

    সর্বোপরি, মাছের পোনা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কেবল মৎস্য খাতের জন্যই নয়, সমগ্র অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদার ও রপ্তানি আয় বাড়াবে। গবেষণা, প্রযুক্তি ও নীতিগত সমর্থনের সমন্বয়ে বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জন করে বিশ্বে রোল মডেল হয়ে উঠতে পারে।

  • হাওরে বিলুপ্তির পথে দেশি মাছ

    হাওরে বিলুপ্তির পথে দেশি মাছ

    সিলেট প্রতিনিধি: হাওর, চা, ধান, বালু, পাথর এগুলো মিলিয়ে জেলা সিলেট। প্রকৃতির অন্যতম সৌন্দর্যের ও দেশী মাছের জন্য বিখ্যাত জেলা সিলেট। তবে, এই সময় হাওর অঞ্চলগুলোতে প্রচুর পরিমান দেশি মাছ পাওয়া যেত। এক সময় অনেক পরিমান মাছ পাওয়া যেত শীত মৌসুমে। বর্তমানে বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুড়ে দেখা যায়, দেশী মাছ খুব কম পরিমান পাওয়া যায়, যে টুকু পাওয়া, তাও অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। দাম বেশির কারন হিসাবে বিক্রেতাগন বলেন, আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না তাই দাম বেশি।

    হাওরের বিপর্যয়: হাওরের প্রাকৃতিক বিপর্যয় এর মূল কারন, এখন হাওর অঞ্চলগুলোতে আর মাছের অভয়ারণ্যে নেই বললেই চলে। হাওরগুলো পানি শুকিয়ে মাছ ধরা হয়ে থাকে। যার কারনে দিন কে দিন মাছের বংশ বৃদ্ধি কমে যাচ্ছে, এর চেয়ে বড় সমস্যা গুলো হচ্ছে কারেন্ট জালের ব্যবহার, ইদুর নাশক জাতীয় গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার এবং পাশাপাশি হাওরের জমিতে গুলোতে মাত্রারিক্ত বালাইনাশক ব্যবহার। মাছের বংশ বৃদ্ধি নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যথা নেই। যার যার অবস্থানে নেই কোন চিন্তা। সবাই শুধু মাছ ধরা নিয়ে ব্যস্ত, নেই সরকারী কোন প্রচারণা বা সচেতনা মুলক কোন প্রোগ্রাম, এভাবে চলতে থাকলে বিলুপ্ত হয়ে যাবে দেশী প্রজাতির মাছ গুলো।। একমাত্র নির্ভর করতে হবে চাষের মাছের উপর, যা অধিক দামে কেনা লাগে এবং স্বাদ পাওয়া যায় না।

    দেশীয় মাছের বংশ বৃদ্ধি জন্য প্রয়োজন আমাদের মা মাছ বা ছোট পোনা জাতীয় ধরা থেকে বিরত থাকা, পাশাপাশি সরকারীভাবে বিভিন্ন গন সচেতনতামূলক প্রচারনা চালানো, আসুন “ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কে অনেক মাছের সাথে পরিচয় করে দিতে হাওরের মা এবং পোনা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকি। নিজে সচেতন হই অন্য কে ও সচেতন করি”

  • কাপ্তাই হ্রদের মাছ যায় সারা দেশে

    কাপ্তাই হ্রদের মাছ যায় সারা দেশে

    বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদের ভাণ্ডার হিসেবে কাপ্তাই হ্রদ এক অনন্য নাম। রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত এই হ্রদ কেবল পাহাড়, জল আর সবুজের সমারোহই নয়, এখানকার মৎস্য সম্পদ দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কাপ্তাই হ্রদের মাছ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়—গ্রাম থেকে শহর, হাটবাজার থেকে সুপারশপ পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি। এই প্রবাহের পেছনে কাজ করে একটি জটিল কিন্তু সুসংগঠিত ব্যবস্থা, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, দেশের মৎস্য শিল্প এবং জাতীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।

    ১ / ১২

    মাঝ দ্বীপে কাপ্তাই হ্রদে জাল ফেলা হয়েছে
    মাঝ দ্বীপে কাপ্তাই হ্রদে জাল ফেলা হয়েছে

    কাপ্তাই হ্রদের জন্ম ইতিহাস জানতে গেলে ফিরে যেতে হবে ষাটের দশকে। তখনকার পূর্ব পাকিস্তান সরকার কর্ণফুলী নদীতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এই বাঁধ তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, কিন্তু এর ফলে পাহাড়ি অঞ্চল ডুবে যায় এবং সৃষ্টি হয় একটি বিশাল জলাধার—যা আজ কাপ্তাই হ্রদ নামে পরিচিত।

    ২ / ১২

    ছোট মাছ ধরা হচ্ছে। রাবার বাগান এলাকা
    ছোট মাছ ধরা হচ্ছে। রাবার বাগান এলাকা

    প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এই হ্রদে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মৎস্যের অভয়ারণ্য। স্থানীয় মাছের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এখানে চাষ ও ধরা শুরু হয়। সময়ের সাথে সাথে কাপ্তাই হ্রদ শুধু স্থানীয় জেলেদের জীবিকা নয়, গোটা দেশের মৎস্য চাহিদা পূরণের একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

    ৩ / ১২

    হ্রদে আগের দিন সন্ধ্যায় ফেলা জাল সকালে তুলে আনছেন এক মৎস্যশিকারি। ধরা পড়েছে লুন্ডু মাছ। খেপ্পোপাড়া এলাকা
    হ্রদে আগের দিন সন্ধ্যায় ফেলা জাল সকালে তুলে আনছেন এক মৎস্যশিকারি। ধরা পড়েছে লুন্ডু মাছ। খেপ্পোপাড়া এলাকা

    এই হ্রদের মাছ দেশজুড়ে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় ভোরে, যখন জেলেরা তাদের নৌকা নিয়ে হ্রদের বুকে ছড়িয়ে পড়ে। традиিক জাল, আধুনিক ফিশিং গিয়ার—বিভিন্ন উপায়ে মাছ ধরা হয়। স্থানীয় জেলেরা তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রজন্মান্তরে লালিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে মাছের চলাচল, প্রজনন সময় এবং গভীরতা বুঝে কাজ করেন।

    ৪ / ১২

    হ্রদ থেকে ধরা তরতাজা ট্যাংরা মাছ
    হ্রদ থেকে ধরা তরতাজা ট্যাংরা মাছ

    ধরা পড়া মাছগুলো প্রথমে স্থানীয় আড়তে জমা হয়। এখানে থেকে মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ীরা মাছ ক্রয় করে সারা দেশের বাজারে পাঠানোর প্রস্তুতি নেন। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রামের স্থানীয় বাজারগুলোতে কাপ্তাই হ্রদের মাছের চাহিদা সবসময়ই উচ্চ। তবে এর পরিধি শুধু স্থানীয়তেই সীমাবদ্ধ নয়—রেফ্রিজারেটেড ট্রাক, আইস বক্স, দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে মাছ পৌঁছে যায় ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটের মতো বড় শহরগুলোতে।

    ৫ / ১২

    হ্রদের কাতলা ও চিতল মাছ
    হ্রদের কাতলা ও চিতল মাছ

    মাছের এই যাত্রাপথে অনেক চ্যালেঞ্জ也存在। প্রথমত, সংরক্ষণ সমস্যা। তাজা মাছ দ্রুত পচনশীল, তাই পরিবহনের সময় বরফ ব্যবহার অপরিহার্য। কিন্তু গ্রামীণ পর্যায়ে কখনো কখনো পর্যাপ্ত বরফের অভাব দেখা দেয়, যা মাছের গুণগত মান কমিয়ে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া মনোপলি।

    ৬ / ১২

    কাপ্তাই হ্রদের বাচা ও পাবদা মাছ। বনরূপা বাজার
    কাপ্তাই হ্রদের বাচা ও পাবদা মাছ। বনরূপা বাজার

    স্থানীয় জেলেরা প্রায়ই ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন, যা তাদের আর্থিক সংকট তৈরি করে। তৃতীয়ত, পরিবেশগত হুমকি। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত মাছ চাষ এবং দূষণের কারণে হ্রদের জীববৈচিত্র্য ঝুঁকির মুখে। এসব সমস্যা সত্ত্বেও কাপ্তাই হ্রদের মাছের ব্যবসা টিকে আছে স্থানীয় জনগণের অদম্য প্রচেষ্টা এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে।

    ৭ / ১২

    ফলই মাছ। কলেজ গেট মাছ বাজার
    ফলই মাছ। কলেজ গেট মাছ বাজার

    কাপ্তাই হ্রদের মাছ শুধু অর্থনৈতিক সম্পদই নয়, এটি সংস্কৃতিরও অংশ। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রায় মাছের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর। তাদের উৎসব, অনুষ্ঠান, এমনকি দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসেও কাপ্তাইয়ের মাছের উপস্থিতি লক্ষণীয়।

    ৮ / ১২

    কাপ্তাই হ্রদের কাজলি মাছ। রিজার্ভ বাজার লঞ্চঘাটে
    কাপ্তাই হ্রদের কাজলি মাছ। রিজার্ভ বাজার লঞ্চঘাটে

    শহুরে ভোজনরসিকদের কাছেও এই হ্রদের মাছ বিশেষ প্রিয়। রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউসের মতো মাছগুলো রেস্তোরাঁ থেকে ঘরোয়া রান্নাঘর—সবখানেই সমান কদর। সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাপ্তাইয়ের মাছ সরাসরি ক্রয়-বিক্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা শহরবাসীর জন্য সুবিধাজনক।

    টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। মাছের প্রজনন সময়ে জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, পরিবেশবান্ধব চাষ পদ্ধতি প্রণোদনা, জেলেদের জন্য প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা—এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে হ্রদের সম্পদ সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে। এছাড়া, পর্যটন শিল্পের সাথে মৎস্য চাষের সমন্বয় করে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

    ৯ / ১২

    আইড় মাছ। রিজার্ভ বাজার লঞ্চঘাট
    আইড় মাছ। রিজার্ভ বাজার লঞ্চঘাট

    কাপ্তাই হ্রদ ও এর মৎস্য সম্পদ বাংলাদেশের জন্য এক অফুরন্ত প্রাকৃতিক উপহার। তবে এই সম্পদ টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সরকার, স্থানীয় জনগণ, পরিবেশবিদ এবং ভোক্তা—সকলের সমন্বিত ভূমিকা নিশ্চিত করলে কাপ্তাইয়ের মাছের প্রবাহ দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে, পুষ্টি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখবে।

    ১০ / ১২

    ড্রামভর্তি মাছ বরফে ঢাকা হচ্ছে, এই মাছ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাবেন ব্যবসায়ীরা। কাঁঠালতলি ফিশারি কার্যালয় প্রাঙ্গণ
    ড্রামভর্তি মাছ বরফে ঢাকা হচ্ছে, এই মাছ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাবেন ব্যবসায়ীরা। কাঁঠালতলি ফিশারি কার্যালয় প্রাঙ্গণ
    ১১ / ১২
    বরফ দিয়ে ড্রামভর্তি মাছ ট্রাকে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কাঁঠালতলি ফিশারি কার্যালয় প্রাঙ্গণ
    বরফ দিয়ে ড্রামভর্তি মাছ ট্রাকে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কাঁঠালতলি ফিশারি কার্যালয় প্রাঙ্গণ
    ১২ / ১২
    কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণের জন্য নতুন পুরোনো কাচকি জাল বুনেছেন মৎস্যশিকারিরা। বিলাইছড়িপাড়া
    কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণের জন্য নতুন পুরোনো কাচকি জাল বুনেছেন মৎস্যশিকারিরা। বিলাইছড়িপাড়া
  • মাছ চাষের জন্য আদর্শ পুকুর তৈরি করবেন যেভাবে

    মাছ চাষের জন্য আদর্শ পুকুর তৈরি করবেন যেভাবে

    পুকুর হচ্ছে ছোট ও অগভীর বদ্ধ জলাশয়, যেখানে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে মাছ চাষ করা যায় এবং প্রয়োজনে এটিকে সহজেই সম্পূর্ণভাবে শুকিয়ে ফেলা যায়। এক কথায় পুকুর হচ্ছে চাষযোগ্য মাছের বাসস্থান। পুকুরে পানি স্থির অবস্থায় থাকে। তবে বাতাসের প্রভাবে এতে অল্প ঢেউ সৃষ্টি হতে পারে। পুকুরের আয়তন কয়েক শতাংশ থেকে কয়েক একর হতে পারে। তবে ছোট ও মাঝারি আকারের পুকুর ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সুবিধাজনক এবং এরা অধিকতর উৎপাদনশীল হয়।

    আদর্শ পুকুরের বৈশিষ্ট্য

    মাছ চাষের পুকুরের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার যা চাষ প্রক্রিয়াকে লাভজনক করতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। একটি আদর্শ মাছ চাষের পুকুরের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা প্রয়োজন-
    ১। পুকুরটি বন্যামুক্ত হবে। এজন্য পুকুরের পাড় যথেষ্ট উঁচু হতে হবে।
    ২। পুকুরের মাটি দোআঁশ, পলি- দোআঁশ বা এঁটেল- দোআঁশ হলে সবচেয়ে ভালো।
    ৩। সারা বছর পানি থাকে এমন পুকুর চাষের জন্য অধিক উপযুক্ত।
    ৪। পুকুরের পানির গভীরতা ০.৭৫-২ মিটার সুবিধাজনক।
    ৫। পুকুরটি খোলামেলা স্থানে হলে ভালো হয় এবং পাড়ে বড় গাছপালা থাকবে না। এতে পুকুর প্রচুর আলো-বাতাস পাবে। ফলে পুকুরে সালোকসংশ্লেষণ বেশি হবে ও মাছের খাদ্য বেশি তৈরি হবে। পানিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন মিশবে। উত্তর-দক্ষিণমুখী পুকুর সুর্যালোক বেশি পাবে।
    ৬। পুকুরের তলায় অতিরিক্ত কাদা থাকা উচিত নয়। তলার কাদার পুরুত্ব ২০-২৫ সে.মি. এর বেশি হওয়া ঠিক নয়।
    ৭। চাষের পুকুরের আয়তন ২০-২৫ শতক হলে ব্যবস্থাপনা সহজ হয় । পুকুরের আকৃতি আয়তাকার হলে ভালো। এতে করে জাল টেনে মাছ আহরণ করা সহজ হয়।
    ৮। পুকুরের পাড়গুলো ১:২ হারে ঢালু হলে সবচেয়ে ভালো। অর্থাৎ পুকুরের তলা হতে পুকুরের পাড় যতটুকু উঁচু হবে পাড় ঢালু হয়ে পুকুরের তলার দিকে দ্বিগুণ দূরত্বে গিয়ে মিশবে।

    মাছ চাষের পুকুরের পানির গুণাগুণ

    মাছের বেঁচে থাকা, খাদ্যগ্রহণ ও আশানুরূপ বৃদ্ধির জন্য পুকুরের পানির গুণাগুণ অনুকূল মাত্রায় থাকা দরকার। পুকুরে পানির গুণাগুণকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
    ১) ভৌত গুণাগুণ
    ২) রাসায়নিক গুণাগুণ।
    মাছ চাষে এদের প্রভাব সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-

    ভৌত গুণাগুণ

    ক) গভীরতা : পুকুর বেশি গভীর হলে সূর্যের আলো পুকুরের অধিক গভীরতা পর্যন্ত পৌছাতে পারে না। ফলে অধিক গভীর অঞ্চলে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য প্লাংকটন তৈরি হয় না। আবার সেখানে অক্সিজেনের অভাব হতে পারে। অন্যদিকে পুকুর অগভীর হলে গ্রীষ্মকালে পুকুরের পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। এসব কারণে মাছের ক্ষতি হতে পারে ও উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

    খ) তাপমাত্রা: তাপমাত্রার বৃদ্ধির উপর মাছের বৃদ্ধির নির্ভর করে। যেমন- মাছের বৃদ্ধি কমে যায়। একারণে শীতকালে পুকুরে সার ও খাদ্য প্রয়োগের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হয়। রুই জাতীয় মাছের বৃদ্ধি ২৫-৩০ক্ক সে. তাপমাত্রা সবচেয়ে ভালো হয়।

    গ) ঘোলাত্ব : কাদা কণার কারণে পুকুরের পানি ঘোলা হলে পানিতে সূর্যালোক প্রবেশে বাধা পায়। এতে করে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়।

    ঘ) সূর্যালোক: যে পুকুরে সূর্যালোক বেশি পড়ে সেখানে সালোকসংশ্লেষণ ভালো হয়। ফলে সেখানে ফাইটোপ্লাংটন বেশি উৎপাদিত হয় ও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

    রাসায়নিক গুণাগুণ

    ক) দ্রবীভূত অক্সিজেন: পুকুরের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন মাছ চাষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানত ফাইটোপ্লাংকটন ও জলজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় যে অক্সিজেন তৈরি করে পুকুরের পানিতে দ্রবীভূত হয়। বায়ুমণ্ডল হতে সরাসরি পানির উপরিভাগেও কিছু অক্সিজেন মিশ্রিত হয়। পুকুরে বসবাসকারী মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণী এ অক্সিজেন দ্বারা শ্বাসকার্য চালায়। রাতে সূর্যালোকের অভাবে সালোকসংশ্লেষণ হয় না বলে পানিতে কোনো অক্সিজেন তৈরি হয় না। এজন্য সকালে পুকুরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় ও বিকেলে বেশি থাকে। মাছ চাষের জন্য পুকুরের পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমপক্ষে ৫ মিলি গ্রাম/লিটার (৫ পিপিএম বা ১ মিলিয়ন ভাগের পাঁচ ভাগ) থাকা প্রয়োজন।

    খ) দ্রবীভূত কার্বনডাই অক্সাইড: পুকুরে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য ফাইটোপ্লাংকটনের উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত দ্রবীভূত কার্বন ডাই অক্সাইড থাকা প্রয়োজন। তবে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড মাছের জন্য ক্ষতিকর। পানিতে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা ১২ মিলি গ্রাম/লিটারের (১২ পিপিএম) নিচে থাকলে তা মাছ ও চিংড়ির জন্য বিষাক্ত নয়। মাছের ভালো উৎপাদন পাওয়ার জন্য পুকুরের পানিতে ১-২ পিপিএম কার্বন ডাই অক্সাইড থাকা প্রয়োজন।

    গ) পিএইচ (pH): মাছ চাষের জন্য পুকুরের পানির পিএইচ ৬.৫ হতে ৮.০ এর মধ্যে হলে ভালো হয়। ৬.৫ এর নিচে পিএইচ হলে মাছের বৃদ্ধি কমে যায়। পিএইচ ৪ এর নিচে বা ১১ এর উপরে হলে মাছ মারা যায়। পানির পিএইচ কমে গেলে পুকুরে চুন (১-২ কেজি/শতক) প্রয়োগ করতে হবে। পুকুরে ক্ষারীয় অবস্থা বেশি বেড়ে গেলে এমোনিয়াম সালফেট বা তেতুঁল পানিতে গুলে পুকুরে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

    ঘ) ফসফরাস: প্রাকৃতিক পানিতে অতি অল্প পরিমাণ ফসফরাস থাকে। এই ফসফরাস ফসফেটে রূপান্তরিত হয়। পরিমিত ফসফেটের উপস্থিতিতে প্রচুর পরিমাণ ফাইটোপ্লাংটন জন্মায়।

     

  • অ্যাকুরিয়ামে মাছ পালনের মাধ্যমে আয়: শখ থেকে সফল ব্যবসায়

    অ্যাকুরিয়ামে মাছ পালনের মাধ্যমে আয়: শখ থেকে সফল ব্যবসায়

    বর্তমান বিশ্বে শৌখিন শোভাবর্ধন উপকরণ হিসেবে অ্যাকুরিয়াম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু, শুধু শোভা বাড়ানোতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি লাভজনক ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশেও অ্যাকুরিয়ামে মাছ পালনের মাধ্যমে আয়ের উৎস তৈরি হয়েছে, যা ব্যক্তি উদ্যোগে সফলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

    সূচনা: শখ থেকে ব্যবসার পথে

    অ্যাকুরিয়ামে মাছ পালন অনেকের শখ থেকে শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে এটি একটি লাভজনক পেশায় পরিণত হয়। ঢাকার গোপীবাগের সোহেল এর একটি উদাহরণ। শখের বসে গোল্ডফিশ পালন করতে গিয়ে তিনি একদিন লক্ষ্য করেন, মাছটি বাচ্চা দিয়েছে। সেই বাচ্চাগুলো বিক্রি করে তিনি প্রাথমিক মুনাফা অর্জন করেন এবং শখটিকে ব্যবসায় পরিণত করেন। এখন সোহেল মাসে ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা আয় করেন এবং কাঁটাবন মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় তার নিজস্ব দোকানও রয়েছে।

    অ্যাকুরিয়াম ব্যবসার বর্তমান চিত্র

    বাংলাদেশে অ্যাকুরিয়াম ফিশের বাজার ব্যক্তিগত উদ্যোগেই গড়ে উঠেছে। যেমন, তালুকদার সাহেব প্রথম বাংলাদেশে বাহারি মাছ আমদানি ও রপ্তানি শুরু করেন। এখন বাংলাদেশ থেকে জার্মানি সহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত বাহারি মাছ রপ্তানি করা হয়। দেশীয় মাছ যেমন টেংরা, পুঁটি, খলিসা ইউরোপীয় বাজারে জনপ্রিয় অ্যাকুরিয়াম ফিশ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

    একুয়ারিয়াম প্রস্তুত ও রক্ষণাবেক্ষণ

    একটি সফল অ্যাকুরিয়াম ব্যবসার জন্য সঠিকভাবে একুয়ারিয়াম তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।

    একুয়ারিয়াম প্রস্তুতির ধাপ:

    1. পরিষ্কার পানির মাধ্যমে একুয়ারিয়াম ধোয়া। সাবান বা ডিটারজেন্ট ব্যবহার নিষিদ্ধ।
    2. ধৌত করা মোটা দানার বালি তলদেশে ৪ ইঞ্চি গভীর করে বসানো।
    3. একুয়ারিয়াম স্থাপনের সেরা স্থান হলো উত্তর দিকে জানালার পাশে, যেখানে আংশিক সূর্যের আলো পৌঁছায়।
    4. ক্লোরিনমুক্ত পানি দিয়ে পূর্ণ করা এবং ৩-৪ ইঞ্চি ওপরে খালি রাখা।
    5. জলজ উদ্ভিদ, যেমন শাপলা, ঝাউঝাঁজি, এবং রঙিন নুড়ি ব্যবহার করে একুয়ারিয়াম সাজানো।

    মাছ পালনের নিয়ম:

    • ১ ইঞ্চি মাছের জন্য ১ গ্যালন পানি প্রয়োজন।
    • দেশীয় মাছের মধ্যে বউ মাছ, পুঁটি, চান্দা এবং বিদেশি মাছের মধ্যে গাপ্পি, সোর্ড টেইল, মলি ইত্যাদি পালা যেতে পারে।

    খাদ্য ব্যবস্থাপনা:

    • প্রতিদিন সকালে ও বিকালে মাছের দেহের ওজনের ৫% খাবার সরবরাহ।
    • ফিশমিল, ভূষি, এবং সেদ্ধ ডিমের কুসুম পেস্ট করে খাদ্য প্রস্তুত।

    গোল্ডফিশের চাষ ও প্রজনন

    গোল্ডফিশ প্রজননের মৌসুম মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর। প্রজননের আগে মাছকে আলাদা করে রাখা হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী মাছ প্রায় ২০০০ ডিম পাড়ে। ডিম ফোটার পর ২-৩ মাসে পোনা বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে। মাছকে সঠিক খাবার ও পরিচর্যার মাধ্যমে দ্রুত প্রজননক্ষম করা যায়।

    খাদ্য ও পরিচর্যা:

    • ডিম ফোটার পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় খাবার প্রয়োজন হয় না।
    • ২ সপ্তাহ পর ব্রাইন শ্রিম্প ও সেদ্ধ ডিমের কুসুম সরবরাহ করা হয়।
    • প্রতিদিন ২-৩ বার খাবার সরবরাহ করা যেতে পারেড়

    অ্যাকুরিয়াম ব্যবসার সম্ভাবনা

    বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে অ্যাকুরিয়াম ফিশের বাজার গড়ে উঠেছে। ব্যক্তি উদ্যোগে এ খাতটি প্রসার লাভ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে এটি আরও বিস্তৃত হবে। সরকারের সহযোগিতায় অ্যাকুরিয়াম ব্যবসা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

    শখ থেকে ব্যবসায় পরিণত হওয়া অ্যাকুরিয়াম মাছ পালন বাংলাদেশের যুবকদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। স্বল্প পুঁজিতে এই ব্যবসা শুরু করে আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জন সম্ভব। ব্যক্তি উদ্যোগে শুরু হওয়া এই শিল্পটি সরকারি সহায়তায় আরও সুসংগঠিত হয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম।

  • মাছের সম্পূরক খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা ও উৎস

    মাছের সম্পূরক খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা ও উৎস

    দেহের বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার জন্য মাছ পুকুরের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে ফাইটোপ্লাংকটন (উদ্ভিদকণা), জু-প্লাংকটন (প্রাণীকণা) ক্ষুদেপানা, ছোট জলজ পতঙ্গ, পুকুরের তলদেশের কীট, লার্ভা, কেঁচো, ছোট ছোট শামুক, ঝিনুক, মৃত জৈব পদার্থ ইত্যাদি খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে। কিনত্মু মাছ চাষের ক্ষেত্রে অধিক উৎপাদন পাওয়ার জন্য পুকুরে অধিক ঘনত্বে পোনা ছাড়া হয়। এ অবস্থায় শুধু প্রাকৃতিক খাদ্য মাছের দ্রুত বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক উৎপাদন পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এমনকি সার প্রয়োগ করে প্রাকৃতিক খাদ্য বৃদ্ধি করলেও তা যথেষ্ট হয় না। এজন্য প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশাপাশি মাছকে বাহির থেকে অতিরিক্ত খাদ্য দিতে হয়। একে সম্পূরক খাদ্য বলে। যেমন-চালের কুঁড়া, সরিষার খৈল, ফিশ মিল ইত্যাদি। গ্রাসকার্প ও সরপুঁটি মাছ উদ্ভিদভোজী বলে এদের জন্য ক্ষুদিপানা, কুটি পানা, শাকসবজির নরম পাতা, ঘাস কেটে সম্পূরক খাবার হিসাবে পুকুরে দেওয়া যায়। মাছকে সরবরাহকৃত সম্পূরক খাদ্যে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান যেমন-আমিষ, স্নেহ বা তেল, শর্করা, খনিজ লবণ ও ভিটামিনের মাত্রা যেন চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মাত্রায় থাকে সেদিকে লড়্গ রাখা প্রয়োজন। যে সম্পূরক খাবার এ সকল পুষ্টি উপাদান যথাযথ মাত্রায় রেখে তৈরি করা হয় তাকে সুষম সম্পূরক খাদ্য বলে।

    মাছের সম্পূরক খাদ্যের উৎস

    মাছের সম্পূরক খাদ্য তৈরির জন্য বিভিন্ন ধরনের খাদ্য উপাদান ব্যবহার করা হয়। উৎসের উপর ভিত্তি করে এসব উপাদানকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
    ক) উদ্ভিদজাত
    খ) প্রাণিজাত।
    নিচে এদের কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো-

    উদ্ভিদজাত

    উদ্ভিদজাত খাদ্য উপাদানের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য উপাদান হচ্ছে- চালের কুঁড়া, গম ও ডালের মিহিভুসি, সরিষার খৈল, তিলের খৈল, আটা, চিড়াগুড়, খুদিপানা, রান্না ঘরের উচ্ছিষ্ট, বিভিন্ন নরম পাতা যেমন- মিষ্টিকুমড়া, কলাপাতা, বাঁধা কপি ইত্যাদি।

    প্রাণিজাত

    প্রাণিজাত কয়েকটি খাদ্য উপাদান হচ্ছে শুটকি মাছের গুঁড়া বা ফিশমিল, রেশম কীট মিল, চিংড়ির গুঁড়া (স্রিম্প মিল), কাকড়ার গুঁড়া, হাঁড়ের চূর্ণ (বোন মিল), শামুকের মাংস, গবাদিপশুর রক্ত (ব্লাড মিল) ইত্যাদি।

    সম্পূরক খাদ্যের উপকারিতা

    » মাছকে নিয়মিত সম্পূরক খাবার সরবরাহ করলে অধিক ঘনত্বে পোনা ও বড় মাছ চাষ করা যায়।
    » অল্প সময়ে বড় আকারের সুস্থসবল পোনা উৎপাদন করা যায়।
    » পোনার বাঁচার হার বেড়ে যায়।
    » মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
    » মাছের দ্রুত দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে।
    » মাছ পুষ্টির অভাবজনিত রোগ থেকে মুক্ত থাকে।
    » সর্বোপরি কম সময়ে জলাশয় থেকে অধিক মাছ ও আর্থিক মুনাফা পাওয়া সম্ভব হয়।

  • দেশি পুঁটি, পুকুরে চাষ করবেন যেভাবে

    দেশি পুঁটি, পুকুরে চাষ করবেন যেভাবে

     

    ছোট মাছের মধ্যে পুঁটি মাছ খুবই জনপ্রিয়। নামটা সামনে এলেই খাল, বিল, জলাশয়ে সাদা রঙের রুপালি রঙয়ের ছোট মাছের ছবি ভেসে ওঠে। এ মাছটি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার ও চীনে পাওয়া যায়। এক সময় মাছটি বাংলাদেশের মিঠা পানিতে বিশেষ করে বিল, হাওড়-বাওড়, নদী-নালা, খাল-বিল, জলাভূমি ও ধানক্ষেতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। খাদ্য তালিকার মধ্যে মাছটি অনেকের খুবই পছন্দের ।

    আমাদের দেশে ছোট বড় প্রায় সকলেরই প্রিয় এই মাছ । আপনি ইচ্ছা করলে বাড়ির পুকুর অথবা ছোটখাট জলাশয়ে এই মাছ চাষ করতে পারেন । প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণের দক্ষতা, সম্পূরক খাবারের প্রতি আগ্রহ, বিরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকা ও অধিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে চাষিদের কাছে এর জনপ্রিয়তাও দিন দিন বাড়ছে । আবার, খুব সহজেই যেহেতু এই মাছ চাষ করা যায় তাই পুঁটি মাছ চাষে কৃষকদের লাভও হচ্ছে ভালোই | কারণ, সুস্বাদু এই মাছের বাজার চাহিদা প্রায় সারা বছর |

    পুঁটি মাছের বৈশিষ্ট্য

    জাত পুঁটি মাছের দেহ মাঝারি চাপা ও পেছনের অংশ সরু ও রুপালি বর্ণের হয়ে থাকে। আকারে প্রায় ১৫-২০ সে.মি. পর্যন্ত লম্বা হয়। কানকো পাখনার ঠিক পেছনেই পৃষ্ঠ পাখনার উপস্থিতি ও পৃষ্ঠ পাখনার নিচেই বক্ষ পাখনার অবস্থান।

    দেহের উপরিভাগ উজ্জ্বল ছাই থেকে সবুজাভ ছাই বর্ণের, নিচের ভাগ সাদা। দেহে দুটি কালো ফোঁটা। একটি বড় অপরটি ছোট। ছোট ফোঁটা কানকোর পেছনে ও বড় ফোঁটা পায়ু পাখনার ওপরে থাকে। শিরদাঁড়া রেখা অসম্পূর্ণ। এ মাছ বছরে দুই বার ও বর্ষাকালে প্রজনন করে।

    প্রজনন ঋতুতে পুরুষ মাছের দেহের উভয় পাশে গাড় লাল রংয়ের দাগ দেখা যায়। পুঁটি মাছ জলাশয়ের মধ্যস্তরে খাবার খেয়ে থাকে। ছোট কিংবা বড় সব ধরনের জলাশয়ে সহজেই চাষ করা যায়। অন্যান্য ছোট প্রজাতির মাছের সঙ্গে কিংবা কার্পজাতীয় মাছের সঙ্গেও মিশ্রচাষ করলে ভাল উৎপাদন পাওয়া যায়।

    পুঁটি মাছ চাষে পুকুর বাছাই

    পুঁটি মূলত মিষ্টি পানির মাছ। এটি সাধারণত খাল এবং বিল এ পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে আমাদের দেশে এই মাছকে পুকুর কিংবা ছোটখাট জলাশয়ে চাষ করা হচ্ছে। পুঁটি মাছ চাষ করার জন্য আপনাকে প্রথমে উপযুক্ত পুকুর নির্বাচন করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে পুকুরের পাড় যেন সর্বদা মজবুত ও বন্যামুক্ত থাকে। এছাড়াও পুকুরে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পড়ে ও পুকুরটি যেন জলজ আগাছামুক্ত থাকে।

    চাষের সময়

    সাধারণত, বছরের যেকোন সময়েই আপনি পুঁটি মাছের চাষ করতে পারেন। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, যে পুকুরে কিংবা যেকোন ধরণের ছোটখাট জলাশয়ে পুঁটির পোনা ছাড়ার ক্ষেত্রে সকাল অথবা সন্ধ্যা এই দুই সময়ের যেকোন একটি নির্বাচন করতে হবে। কারণ এ সময় তাপমাত্রা সহনীয় অবস্থায় থাকে। তা না হলে মাছ মরে যেতে পারে। এপ্রিল-মে মাসে পুঁটি মাছ ডিম ছাড়ে। তাই এ সময় পুঁটি মাছ চাষ করা উপযোগী |

    পোনা ছাড়ার নিয়ম

    বাড়িতে পুকুর কিংবা যেকোন ধরণের ছোটখাট জলাশয়ে পুঁটি মাছ চাষ করার জন্য আপনাকে প্রথমে পোনা সংগ্রহ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আপনি আপনার নিকটস্থ যেকোন নার্সারী থেকে পোনা সংগ্রহ করতে পারেন। এছাড়াও আপনি প্রাকৃতিক ভাবে খাল, বিল কিংবা যেকোন ধরণের জলাশয় থেকে পোনা সংগ্রহ করতে পারেন। তবে পোনা ছাড়ার পর আপনাকে পোনার সঠিক নিয়মে যত্ন নিতে হবে |

    পুঁটি মাছ চাষাবাদ পদ্ধতি/কৌশল

    পুঁটিমাছ সাধারণত পুকুর-নদীতে বছরে ২ বার ডিম দেয় বলে এদের পোনা মজুদের প্রয়োজন হয়না। পুকুরে পুঁটি চাষ করার জন্য আপনাকে সঠিক নিয়ম মানতে হবে |পুকুরে পোনা ছাড়ার ক্ষেত্রে প্রথমে অক্সিজেন ব্যাগে পরিবহন কৃত পোনা ব্যাগ সহ জলে ভাসিয়ে রাখতে হবে। এরপর পরিবহনকৃত ব্যাগের পানি এবং পুকুরের পানির তাপমাত্রা একই মাত্রায় আনতে হবে। তারপর ব্যাগের মুখ খুলে পুকুরের পানি অল্প অল্প করে ব্যাগে দিতে হবে এবং ব্যাগের পানি অল্প অল্প করে পুকুরে ফেলতে হবে। ৪০-৫০ মিনিট সময় ধরে এরূপভাবে পোনাকে পুকুরের পানির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে।

    খাবারের পরিমাণ ও সঠিক নিয়মে খাবার প্রয়োগ

    পুঁটি মাছ চাষে আপনাকে নিয়মিত উপযুক্ত খাবার প্রয়োগ করতে হবে। পুঁটি মাছ স্বাভাবিকভাবে প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে শেওলা খেয়ে থাকে। এছাড়াও পুঁটি মাছ সাধারণত সবধরনের খাবার খেয়ে থাকে। তাই এদের চাষ করার ক্ষেত্রে আলাদা কোন খাবার এর প্রয়োজন হয় না।

    জলাশয়ে সার প্রয়োগ

    পুঁটি মাছ চাষ করার জন্য আপনাকে পুকুরে বা জলাশয়ে সঠিক নিয়মে সার প্রয়োগ করতে হবে। মাঝেমধ্যে ইউরিয়া এবং অন্যান্য সার প্রয়োগ করতে হবে। এতে পানির গুণাগুণ বজায় থাকে এবং মাছের কোন ক্ষতি হয় না। বরং এতে মাছের বৃদ্ধি অনেক ভাল হয়।

    পুঁটি মাছের পরিচর্যা

    বাড়িতে পুকুর কিংবা যেকোন ধরণের ছোটখাট জলাশয়ে পুঁটি মাছ চাষ করার জন্য আপনাকে প্রথমে পুকুরের রাক্ষুসী মাছ দূর করতে হবে। যেমন শোল, টাকি, গজার, বোয়াল, মাগুর ইত্যাদি হল রাক্ষুসে মাছ। এই মাছ পুঁটি মাছের পোনা খেয়ে ফেলে। তাই সর্বপ্রথম রাসায়নিক সারের মাধ্যেমে এই সকল মাছ দূরীভূত করতে হবে। পুকুরের বা জলাশয়ের তলদেশ সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নন রাখতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে পুকুর বা জলাশয় সম্পূর্ণ শুকিয়ে ফেলতে হবে। মাছের যত্ন নিতে হবে। বৃষ্টির দিনে বা মেঘলা আবহাওয়ায় মাছের খাবার বেশি দেওয়া যাবেনা |

    মাছ আহরণ

    বাড়িতে পুকুর কিংবা যেকোন ধরণের ছোটখাট জলাশয়ে সঠিক নিয়মে পুঁটি মাছ চাষ করলে সেখান থেকে আপনি প্রচুর পরিমাণে পুঁটি মাছ পেতে পারেন। যা আপনার পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে বিপুল অর্থ পাওয়া যায় |

    পুঁটি মাছের খাদ্য গুণাগুণ

    পুঁটি মাছের মধ্যে অনেক ধরনের খাদ্য গুনাগুন রয়েছে। এই মাছে প্রচুর পরিমাণে আমিষ রয়েছে। যা আপনার শরীরের জন্য খুবই দরকারী। এছাড়াও প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ভিটামিন রয়েছে।

     

  • রেনু পোনার প্রস্তুতি

    রেনু পোনার প্রস্তুতি

    মাছ চাষে মানসম্মত পোনার ভূমিকা প্রশ্নাতীত। মজুদ পুকুরে ছাড়ার জন্য নির্বাচিত পোনা আলাদাভাবে লালন-পালন করে চাষের উপযোগী করা হয়। এ জন্য আলাদাভাবে বিশেষ যত্নে পালনের জন্য রেণু সংগ্রহ করা হয়। সাধারণত দুটো উৎস থেকে রেণু সংগ্রহ করা সম্ভব। একটি উৎস হচ্ছে নদী এবং অন্যটি হ্যাচারি। হালদা, পদ্মা, যমুনা, আড়িয়াল খাঁ প্রভৃতি নদী থেকে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে বিভিন্ন মাছের রেণু ধরা পড়ে। যাঁরা হ্যাচারি থেকে রেণু সংগ্রহ করে পালন করে থাকেন, তাঁরা এখন থেকেই কাজ শুরু করতে পারেন।

    ভালো রেণু : মানসম্মত রেণু কোথায় পাব বা কিভাবে পাওয়া যাবে এটা অনেকেরই প্রশ্ন। তা ছাড়া নদী থেকে প্রাপ্ত বা প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরিত রেণু ভালো, নাকি হ্যাচারির উৎপাদিত রেণু ভালো-এটাও অনেকেরই প্রশ্ন। সাধারণত পরিপূর্ণ এবং অনুকূল পরিবেশে পরিপক্ব মাছের প্রজনন ঘটে বলে স্বাভাবিকভাবেই নদী থেকে প্রাপ্ত রেণুর মান ভালো হয়। তবে এ ক্ষেত্রে যে সমস্যা হতে পারে তা হচ্ছে, বিভিন্ন প্রজাতির রেণুর মিশ্রণ থাকে বলে তা বাছাই করা সহজ হয় না। অন্যদিকে হ্যাচারির রেণুতে প্রজাতির মিশ্রণ না ঘটিয়ে নির্দিষ্ট প্রজাতির রেণু সংগ্রহ ও লালন-পালন করা সম্ভব, তবে ব্রুড মাছের মান নিয়ন্ত্রণ না করলে এবং হ্যাচারির ব্যবস্থাপনায় সতর্ক না হলে নিম্নমানের রেণু বা সংকর জাতের মাছের রেণু উৎপাদিত হতে পারে, যা পরে চাষির ক্ষতির কারণ হতে পারে।

    রেণু লালনের পুকুর প্রস্তুত সাধারণত অগভীর বার্ষিক পুকুর বা চাষের মৌসুমে পানি থাকে এমন মৌসুমি পুকুর রেণু লালনের জন্য উত্তম। রেণু লালনের জন্য পুকুর হবে-পুকুরের চার পাড় উঁচু, বন্যামুক্ত ও মজবুত হতে হবে এবং পুকুরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকবে। বর্ষাকালে পানির গভীরতা দুই মিটারের বেশি হবে না। পুকুরের তলদেশে বেশি কাদা থাকবে না। পুকুরের আয়তন ১০-৫০ শতাংশ হতে পারে।

    পুকুর : পুকুর নতুনভাবে প্রস্তুত বা কাটা হলে রাক্ষুসে মাছ বা অন্যান্য মাছ অপসারণের ঝামেলা থাকে না, তবে পুরনো পুকুর হলে সম্পূর্ণ পানি শুকিয়ে তলদেশে রোদ লাগাতে হবে এবং একই সঙ্গে পুকুরের পাড় মেরামত এবং পাড়ের গাছপালা বা আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। যদি পানি শুকানো সম্ভব না হয়, তাহলে রোটেনন (নির্ধারিত মাত্রায়) ব্যবহারের মাধ্যমে রাক্ষুসে মাছ এবং আগাছাসহ সব জলজ প্রাণী নির্মূল করা আবশ্যক।

    চুন সার : পুকুর প্রস্তুতির দ্বিতীয় ধাপে প্রতি শতাংশে এক কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে। নতুন ও পুরনো উভয় পুকুরেই সার প্রয়োগ করতে হবে, প্রথমে রাক্ষুসে মাছ অপসারণ বা সম্ভব হলে পুকুর শুকানোর পর প্রতি শতাংশে পাঁচ-সাত কেজি গোবর বা কম্পোস্ট আট-দশ কেজি বা হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা তিন-পাঁচ কেজি এবং ১০০-১৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৫০-৭৫ গ্রাম টিএসপি একই সঙ্গে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।

    পানি প্রবেশ : সার প্রয়োগের পরপরই নিরাপদ উৎস থেকে ২-২.৫ ফুট পরিমাণ পানি সরবরাহ করতে হবে। তবে অবশ্যই প্রাকৃতিক উৎস থেকে পানি প্রবেশ করালে তার আগে পাইপের মুখে বা নালায় জাল স্থাপন করতে হবে, যাতে এ পানির সঙ্গে অন্য কোনো জলজ প্রাণী বা কীট বা মাছ প্রবেশ করতে না পারে। পানি প্রবেশের চার-পাঁচ দিন পর পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য বা প্লাংটন জন্মাবে এবং এ সময় পানির রং হালকা সবুজ হবে।

    কীটপতঙ্গ দমন : সার প্রয়োগের পর বেশ কিছু প্রজাতির কীটপতঙ্গও দেখা যায়, যা রেণুর জন্য ক্ষতিকর। যেমন- ক্লাডোসিরা, হাঁসপোকা প্রভৃতি। এসব কীট থাকলে রেণুর মড়ক হয়। এ কারণে রেণু ছাড়ার আগে এদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সাধারণত রেণু ছাড়ার দু-এক দিন আগে ৬-১২ গ্রাম/শতাংশ/প্রতি ৩০ সেমি পানি হিসেবে ডিপটারেক্স ব্যবহার করতে হবে, তাহলে ক্লাডোসিরা, হাঁসপোকা এবং কপিপোড মারা যাবে। তবে রেণুর খাদ্য রটিফার ঠিকই বেঁচে থাকবে। ডিপটারেক্স পাওয়া না গেলে রেণু ছাড়ার ১২-১৫ ঘণ্টা আগে পুকুরে ২-৩ মিলি/শতাংশ/৩০ সেমি পানি হিসেবে সুমিথিয়ন প্রয়োগ করলেও সুফল পাওয়া যাবে। তা ছাড়া শতাংশ প্রতি ১২০-১২৫ মিলি হারে কেরোসিন বা ডিজেল প্রয়োগ করেও জলজ পোকা আংশিক দমন করা যায়। জলজ পোকা দমনের জন্য ডিপটারেক্স বা সুমিথিয়ন ব্যবহারের পর মশারির জাল টেনে মরা পোকা ছেঁকে তুলে নেওয়া আবশ্যক।

    রেণু মজুদ : রেণু মজুদ ঘনত্ব নির্ভর করে রেণু পালনের সময়কাল এবং পুকুরের আয়তনের ওপর ভিত্তি করে। যদি একই পুকুরে রেণু পোনা ছেড়ে চারা পোনা (৭-১৫ সেমি) পর্যন্ত বড় করা হয়, তাহলে তাকে ‘এক স্তর পদ্ধতি’ বলে আবার যদি একটি ছোট পুকুরে রেণু ছেড়ে কয়েক দিন পর অন্য কয়েকটি পুকুরে কম ঘনত্বে ধানি পোনা স্থানান্তর করা হয়, তাহলে সে পদ্ধতিকে বলে ‘দ্বি-স্তর পদ্ধতি’। এ ক্ষেত্রে প্রথম পদ্ধতির প্রায় তিন গুণ রেণু মজুদ করা যায়। একস্তর পদ্ধতিতে রেণু পালনের ক্ষেত্রে শতাংশে ৬-৮ গ্রাম এবং দ্বি-স্তর পদ্ধতিতে ২৫-৩০ গ্রাম রেণু মজুদ করা সম্ভব।

    সতর্কতা : অক্সিজেন ব্যাগে রেণু পরিবহন করতে হবে এবং পরিবহনকালীন ধকল যত কম হবে, পোনা মৃত্যুর হার তত কম হবে। রেণু ছাড়ার আগে পুকুরের পানি এবং রেণুর ব্যাগের পানির তাপমাত্রা সমতায় আনতে হবে। পুকুরের পাড়ের কাছাকাছি রেণু ছাড়তে হবে। সকাল বা বিকেলে ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় রেণু ছাড়া উচিত।

    খাবার : রেণুর পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য থাকা আবশ্যক। এ কারণে রেণু পালন পুকুরে নিয়মিতভাবে সার প্রয়োগে ভালো ফল পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতি শতাংশে দৈনিক গোবর ২০০ গ্রাম বা কম্পোস্ট ৩০০-৪০০ গ্রাম বা হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ১৫০-২০০ গ্রাম এবং ইউরিয়া চার-পাঁচ গ্রাম ও টিএসপি তিন গ্রাম একত্রে পানিতে গুলে তা প্রয়োগ করা যেতে পারে। তা ছাড়া সম্পূরক খাবার হিসেবে চালের কুঁড়া এবং সরিষার খৈল প্রয়োগ করা যায়। এ ক্ষেত্রে কুঁড়া ও খৈল ৫০: ৫০ অনুপাতে প্রয়োগ করা যায়।
    লেখক: মোহাম্মদ তারেক সরকার