নাজনীন নাহার অনন্যা
বাদাম চাষী ভাইদের খোঁজ-খবর নেওয়ার সময় তাদের একটি সমস্যা অনেক বেশি শোনা যায়। আর তা হলো বাদামের যত রোগ-ব্যাধি। তাই আজ এ বিষয়টি নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক।
বাদামে সবসময়ই রোগ-ব্যাধি বেশি হয়ে থাকে। এসব রোগের মধ্যে যেগুলো সচরাচর দেখা যায় সেগুলো হলো-পাতায় বাদামি ছোপ, রাস্ট, বাদামের কান্ড পঁচা রোগ, কুঁড়ি পঁচা রোগ,অলটারনেরিয়া ছত্রাক সংঘটিত রোগ ,অ্যানথ্রাকনোজ,এসপারজিলাস মুকুট পঁচা রোগ।
এখন আমরা বাদামের যত রোগ-ব্যাধি এই সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে জানব। প্রথমে আমরা এই রোগগুলোর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানব এবং সবশেষে এর সমাধানও জেনে নিব।
বাদামের যত রোগ ব্যাধি চিহ্নিতকরণ
পাতায় বাদামি ছোপ
সারকোস্পোরা নামক একটি ছত্রাকের আক্রমণে এই রোগ হয়ে থাকে। সাধারণত বীজ বপনের ১ মাস পর থেকেই এই রোগের আক্রমণ শুরু হয়।এ রোগে পাতার উপরে ছোট ছোট গোলাকার হলুদ ছোপ দেখা যায়।
ক্রমাগত দিন বাড়ার সাথে সাথে এই দাগগুলো বাদামি হতে থাকে এবং সবশেষে কালো রঙ ধারণ করে।পাতার নিচেও হালকা বাদামি দাগ দেখা যেতে পারে।
ধীরে ধীরে কান্ড এবং পাতার বোঁটাতেও এই ছোপ স্পষ্টভাবে দেখা যেতে থাকে।
সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে অল্প বয়সেই গাছ বৃদ্ধ হয়ে মারা যায়।
রাস্ট
এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ।রাস্ট এমন একটি রোগ যা আপনি দেখামাত্রই শনাক্ত করতে পারবেন এবং বাদাম চাষী ভাইয়েরা অনেক আগে থেকেই এর সাথে পরিচিত। পাতার নিচের দিকের পৃষ্ঠে কমলা রঙের তিলের মত কিছু গঠন দেখা যায় যা হালকা স্ফীত হয়ে ওঠে। অনেকটা মানুষের শরীরে যেমন ফুঁসকুড়ি ওঠে এমন।
এগুলো সাধারণত গোলাকৃতির হয় এবং ০.৫ থেকে ১.৪ মিলিমিটার পর্যন্ত ব্যাস হয়ে থাকে এদের।পাতার উপরের অংশেও এগুলো দেখা যেতে পারে।অনেক সময় ফুলেও দেখা যায়।অতিরিক্ত আক্রান্ত হয়ে গেলে পাতা পঁচে যায় এবং এতে গাছ মারা যায়।
বাদামের কান্ড পঁচা রোগ
এই কান্ড পঁচা রোগটির জন্য দায়ী স্ক্লেরোশিয়াম নামক এম ধরণের ছত্রাক।
এ রোগের কারণে কান্ডের কিছু নির্দিষ্ট জায়গাউ সাদা ছত্রাকজনিত সুতার মত অংশ সৃষ্টি হয়।গাছের মূল কান্ড হলুদ হয়ে যায় এবং গাছ ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়ে।
সাদা ছত্রাক সুতার মত অংশ মাটির কাছে কান্ডের যে অংশ সেখানে স্পষ্ট দেখা যায়। সরিষার বীজের মত আকারের বাদামি রঙের ছত্রাক স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বীজ নীলাভ রঙ ধারণ করে এবং পঁচে যায়।
অলটার নেরিয়া ছত্রাক সংঘটিত রোগ
এটিও একটি ছত্রাকজনিত রোগ যা অলটারনেরিয়া ছত্রাকের কারণে হয়ে থাকে।
এ রোগ হলে ছোট অনিয়তাকার কিছু স্পট বা দাগ সৃষ্টি হবে পাতায় যা প্রথমে হালকা বাদামি থাকবে এবং ক্রমাগত গাঢ় বাদামি দাগে পরিণত হবে। আক্রমণ আরও বেশি হলে পাতা কুঁচকে যাবে, পাতা ভঙ্গুর হয়ে যাবে এবং এবং তা গাছ থেকে আলাদা হয়ে যাবে।
পাতার উপরে যে দাগগুলো সৃষ্টি হবে তা ভেজা এবং পঁচা হবে যা ক্রমাগত পুরো পাতাতেই ছড়িয়ে পড়বে। পাতার সাথে যেসব শিরা সংযুক্ত থাকবে, সেই শিরাগুলোও ক্রমাগত নষ্ট হয়ে যেতে থাকবে।
বাদামের অ্যানথ্রাকনোজ
এটি কোলেটোট্রাইকাম নামক ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকেহলুদ ১-৩ মিলিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট ছোট এবং গোলাকার ছোপ দেখা যাবে পাতার কিনারায়। এ রোগ সাধারণত নিচের দিকের পাতাগুলোতে বেশি হয়ে থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশি আক্রমণ হলে পাতার পঁচা অংশগুলো বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তা পুরো পাতা এবং কান্ডতেই ছড়িয়ে পড়ে।
এসপারজিলাস মুকুট পঁচা রোগ
এই রোগটি দ্বারা বাদামের বীজ পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারে যা এসপারজিলার ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে।বীজ থেকে চারা উৎপাদনের আগেই মাটিতে বীজ নষ্ট করে দিতে পারে এই এসপারজিলাস ছত্রাক।চারা বের হলেও নতুন চারাগুলো খুব শীঘ্রই মারা যাবে এ ছত্রাক আক্রমণ করলে গাছে ভেজা পঁচা স্থানের সৃষ্টি করে এবং গাছ নেতিয়ে পড়ে সবশেষে মারা যায়।কলার অংশ বা কোষের অংশগুলো গাঢ় বাদামি হয়ে মারা যায়।
কুঁড়ি পঁচা রোগ
এ রোগটি PBNV (Peanut Bud Necrosis Virus) নামক এক প্রকার ভাইরাস দ্বারা সংঘটিত হয়ে থাকে।এ রোগের ক্ষেত্রে দেখা যাবে নতুন পাতার উপরে পঁচা গোলাকার স্থান দেখা যাবে এবং হলুদ ছোপ ছোপ দাগ দেখা যাবে। অনেক সময় লম্বা কিছু আড়া আড়ি দাগও পাতায় দেখতে পারেন। এর মূল কুঁড়িগুলো যেখান থেকে পাতা উৎপন্ন হয় সেগুলো নষ্ট করে দেয়।গাছ বড় হলেও আকারে অনেক খাটো হবে এবং ঠিকমত বাড়বে না।মূলত থ্রিপস পোকার সাহায্যে এই রোগগুলো ছড়ায়।
বাদামের উপরের রোগ গুলোর সমাধান নিন্মে তুলে ধরা হলো:-
আপনি যদি উপরের রোগগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখে থাকেন তাহলে দেখতেই পাচ্ছেন বাদামে ছত্রাকজনিত সমস্যা বেশি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আপনার করণীয় গুলো আমরা উল্লেখ করে দিচ্ছি। এবং সবচেয়ে ভালো ফলন পেতে এই সবগুলোই আপনাকে মেনে চলতে হবে।
বাদামের ছত্রাকজনিত রোগ
✅বাদামের তাপমাত্রা কম থাকলে, অধিক সময় পর্যন্ত বৃষ্টিপাত থাকলে এবং জমিতে বৃষ্টির পানি জমে থাকলে ছত্রাকজনিত রোগগুলো হয়ে থাকে। তাই জমিতে কোনোভাবেই পানি জমতে দেয়া যাবেনা, পানি নিষ্কাশন করে ফেলতে হবে।
✅এক জমিতে টানা কয়েকবার বাদাম চাষ না করে সরগম, জোয়ার বা বাজরা ইত্যাদি করলে রোগব্যাধি কমানো যায়।
✅ প্রত্যেকবার ফসল তোলার পর মাঠে অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
✅ পাতায় জলীয় নিমপাতার দ্রবণ (২-৫%) অথবা ৫% নিম বীজের রস প্রয়োগ করতে হবে মাঠে। এটি ২ সপ্তাহ পর পর ৩ বার করে করতে হবে। গাছের বয়স ৪ সপ্তাহ হলেই এটি শুরু করতে হবে।
✅ ছত্রাকনাশক হিসেবে কার্বেন্ডাজিম ০.১% বা ম্যানকোজেব ০.২% বা ক্লোরোথালোনিল ০.২% হারে প্রয়োগ করতে হবে।
✅বীজ শোধনের প্রয়োজন হলে ট্রাইকোডার্মা দিয়ে প্রতি কেজিতে ৪ গ্রাম অনুযায়ী প্রয়োগ করতে হবে এবং মাটি শোধনের জন্য প্রতি হেক্টরে ২৫-৬২.৫ কেজি পর্যন্ত ট্রাইকোডার্মা দিতে হবে। এর সাথে ক্যাস্টর কেক বা নিম কেক বা নিম কেক প্রতি হেক্টরে ৫০০ কেজি অনুসারে দিতে হবে।
ভাইরাসজনিত রোগ:
✅ভাইরাসজনিত রোগ যেমন কুঁড়ি পঁচা রোগ হলে প্রথমেই আগাছা তুলে ফেলতে হবে।
✅ কোনো গাছ আক্রান্ত হলে সাথে সাথে সেই গাছ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
✅ সাধারণত খরিফ মৌসুমের প্রথমেই বীজ বপন করলে এই রোগে গাছ কম আক্রান্ত হয়।
✅ বাজরা বা জোয়ারের সাথে সহ ফসল হিসেবে চাষ করা যেতে পারে ৭:১ অনুপাতে। যেখানে বাদাম হবে ৭ এবং বাজরা ১।
✅মোনোক্রোটোফোস ১.৬ মিলি/লিটার অথবা ডাইমিথোয়েট ২ মিলি/ লিটার হারে প্রয়োগ করতে হবে।
অতএব, এভাবে চাষ করলে বাদামের রোগব্যাধি থেকে আমাদের কৃষক ভাইয়েরা মুক্তি পেতে পারেন।
মুরগি পালনের সহজ উপায় সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply