ওভারটাইম আর নাইট বিলের টাকায় গড়া একটি আলোকিত ভবিষ্যতের পাঠাগার”

আমার আজও মনে পড়ে, ছোটবেলা থেকে নতুন বইয়ের গন্ধ প্রচণ্ড ভালোবাসতাম, যা আজও বিন্দুমাত্র কমেনি। গাছ ও পানির অপর নাম যদি হয় জীবন, তাহলে চোখের অপর নাম দৃষ্টি। আমার কাছে বইয়ের অপর নাম আলো। জীবনের পদে পদে ঘন কুয়াশা ভেদ করে আলোর ছটা ছড়ায় যে সূর্য, তার নাম বই। বইয়ের জগতে যে একবার প্রবেশ করে একনিষ্ঠভাবে, সেই কুড়িয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মণিমুক্তা। আমি একজন বইয়ের ক্ষুদ্র গ্রাহক, পাঠক ও সংকলক।

আমার আব্বাজান এবং মরহুম দাদাজানও ছিলেন বইয়ের পোকা। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের জন্য করেছেন জমি দানসহ আরও অনেক অনেক মহৎ কাজ। যে কাজের জন্য গ্রামের মানুষের মাঝে আমার বাবা ও দাদার নাম শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় উঠে আসে। তাদের সন্তান ও নাতি হিসেবে অন্ধকারে আলো ছড়িয়ে দিতে লড়াই শুরু করেছিলাম ২০০৮ সালের ১ জানুয়ারি, দিনটি ছিল মঙ্গলবার। একটি ক্ষুদ্র পরিসর থেকে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম। আমাদের যাত্রা ক্ষুদ্র পরিসর থেকে হলেও আশা ছিল অনেক বড়। স্বপ্ন বুনেছিলাম বিশাল হৃদয় দিয়ে। আমাদের আশা ও স্বপ্ন জুড়ে ছিল অন্ধকারে আলো ছড়ানোর মতো। সেই আশাকে ধারণ করেই এক অজপাড়া গাঁয়ের ইছামতি নদী ও নজরুল সড়কের পাশে জরাজীর্ণ একটি বাঁশের মাঁচালে গ্রামের কিছু মুরুব্বির সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হয় পাঠাগারের নাম ও মেধা বিকাশে সোনালী স্লোগান।

পড়িলে বই আলোকিত হই, না পড়িলে বই অন্ধকারে রই। এই স্লোগানের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করি পাঠাগারটি। দিনের অনেকটা সময় এখন পাঠাগারে ব্যয় করি আমি। নিজ বাড়ির উঠানে ১৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৮ ফুট প্রস্থের একটি ঘরের ভেতরে ১টি টেবিল ও ১২টি চেয়ার বসে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে। তবে কোনোটা পাঠ্যবই নয়। কেউ ইতিহাস, কেউ সাহিত্য, কেউ ইসলামিক বই, কোরআনের মানচিত্র, আল-কোরআনের ভাষা, কেউ মিনার, মুনছুর স্যারের কবিতার বই, কেউ কালবেলা, মধুময় পাল স্যারের লেখা বই, কেউ পড়ছে আলোকিত মানুষ, কেউ পড়ছে উপন্যাস, কেউ গল্পের বই, আবার কেউ মনীষীদের জীবনীগ্রন্থ। আর কাঠের একটি বড় বুক-সেল্ফে থরে থরে সাজানো ১,০০০-১,২০০ এর অধিক বই। পাঠাগারের নাম ‘সবার জন্য পড়া উন্মুক্ত পাঠাগার’। একজন চাকরি জীবীর নিজ উদ্যোগে গড়ে তোলা। বর্তমানে পাঠাগারটি পরিচালিত হচ্ছে স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল ও কলেজ পড়ুয়া এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী শিক্ষার্থীর তত্ত্বাবধানে। তাদের সহযোগিতায় সদস্য হওয়া, বই নেওয়া, বই ফেরত দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন কার্যক্রম তারা পাঠাগারের রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করে রাখেন।

পাবনা জেলা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সাঁথিয়া উপজেলার ১০ কিলোমিটার দূরে ধুলাউড়ি ইউনিয়ন এর ধুলাউড়ি গ্রাম। সেই গ্রামে বাড়ি আমার। বিকেএসপিতে চাকরি করার সময় আমিনুল হক বুলবুলের ক্রিকেট খেলা শিক্ষা বই পড়ার মাধ্যমে বই পড়ার জগতে প্রথম প্রবেশ শুরু হয় ২০০৭ সালে এবং বিকেএসপির চাকরি ছেড়ে নারায়ণগঞ্জ মেগনার ঘাট মেঘনা গ্রুপে জয়েন্ট করি ইনিঃ মোঃ আওসান হাবিব স্যারের মাধ্যমে ২য় বই বেসিক ইলেকট্রিক্যাল ইন্টারভিউ নোট বই পড়ার মাধ্যমে কর্ম জীবনে যেমন সফলতা আসে বই পড়ার প্রতি আরো বেশি আসক্তি হয়ে পড়ি। এইভাবে দু’একটি করে বই কিনে পড়তে পড়তে একসময় আমার কাছে ৪০০-৫০০ বই জমা হয়ে যায়। এই সব বই যে পড়েছি তা কিন্তু নয়। যাই হোক, ২৫০-৩০০ বই রয়ে যায় উত্তরাতে এবং ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি নিজের গ্রামে ২৫০ বই নিয়ে যখন পাঠাগারটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করি। পরে বন্ধু, সহপাঠী, পাড়া–প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে সহায়তা চাইলে তাঁরা ব্যাপক সাড়া দেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বর্তমানে বই সংখ্যা এখন ২,২৬৩। চাকরির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে আছি। এবিএফ ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এছাড়া প্রতিষ্ঠাতা- বয়লার অপারেটর গ্রুপ, যার মাধ্যমে প্রতি মাসে দুই-চার পাট জন্য চাকরির ব্যবস্থা করে থাকি।

পাঠাগার তৈরির ইচ্ছাটা আমার ছোটবেলা থেকেই। চাকরি সুবাদে হাবিব সাহেবের উপহার দেওয়া বই ‘বেসিক ইলেকট্রিক্যাল ইন্টারভিউ নোট’ পড়েই জানতে পারি পাঠ্যবইয়ের বাইরে যে জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার রয়েছে, তা সেদিনই তাঁর সামনে উন্মোচিত হয়। তিনি বলেন, ‘অফিস ছুটির পর প্রায় দিনই বাসায় গিয়ে বই পড়তাম। এভাবেই অভ্যাস গড়ে ওঠে। কিন্তু গ্রামে ছেলেমেয়েদের জন্য বই পড়ার তেমন কোনো সুযোগ–সুবিধা নেই। তখন থেকেই মনে হতো গ্রামে একটি পাঠাগার করতে পারলে সবাই বই পড়ার সুযোগ পাবে।’

প্রতিদিন অফিস যাওয়া-আসা ও টিফিন বিল জমা করে ও মাস শেষে বেতন তুলে আরো নতুন নতুন বই কেনা ও পড়া শুরু করি। অন্যদিকে মাস শেষে বাকি টাকা বাবাকে পাঠাই। গ্রামের কৃষক পরিবার আমাদের। বাবা নিজ জমিতে কৃষি কাজ করে যা আয় হত তা দিয়েই মা ও চার বোন ও আমাদের সংসার চলে। আমি যখন ৫ম শ্রেণীর ছাত্র, তখন হঠাৎ করেই মা অসুস্থ হয়ে মারা যান। তখন পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে জমিতে কাজ শুরু করি। এইভাবে চলছিলো, কিন্তু বাবা আবার ২য় বিবাহ করলেন। তখনও ভালোই চলছিলো তবে যখন ৭ম শ্রেণীর ছাত্র, তখন থেকে বাবা ও সৎ মায়ের আচার-আচরণ কেমন যেন পরিবর্তন হতে শুরু করে। আমি যখন ৮ম শ্রেণীতে পড়ি, তখন বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হই। এরপর পরিচিত এক ভাইয়ের মাধ্যমে প্রথম চাকরি শুরু করি বিকেএসপিতে, সেখান থেকে কিছু অর্থ জমিয়ে বইয়ের পেছনে ব্যয় করা শুরু করি। এভাবেই ধীরে ধীরে নিজের সংগ্রহে অসংখ্য বই জমা হতে থাকে। পাঠাগারের জন্য আসবাব, বই রাখার বুক-সেল্ফ ও প্রয়োজনীয় সবই কিনেছি নিজের টাকায়। ‘করোনার সময় শুরুর দিকে কর্মস্থল বন্ধ হয়ে গেলে গ্রামের চলে আসি। গ্রামের সকল মানুষ, ছাত্র-ছাত্রী ও সকল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ মানুষ ফেসবুক, ইমু, টিকটক, লাইকি, ভিডিও গেইমসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রযুক্তিকে যেমন বাদ দেওয়া যাবে না, তেমনি বই পড়াকে ত্যাগ করা যাবে না। কারণ বই আপনার অজ্ঞাতার প্রাচীর ডিঙিয়ে জ্ঞানের আলোয় আপনাকে করবে আলোকিত মানুষ। তাই এ কথা মাথায় রেখে চিন্তা করতে থাকি কীভাবে সবাইকে আবারও বইমুখী করা যায়। একদিন মনে হলো আমার কাছে যত বই আছে, সেগুলো দিয়ে একটি পাঠাগার শুরু করা সম্ভব। সবার সঙ্গে কথা বললাম, মোঃ মোনাইম খাঁন কাকা তাতে সায়ও দিয়েছেন। তারপর পাড়ার সবাইকে নিয়ে বসে পাঠাগারের নাম ঠিক করা হয়। তারপর আমার পরিচিত অনেকে বই দিয়েছেন। এভাবেই পথচলা শুরু ও এখনো চলছে।

পাঠাগারের শিশুতোষ গ্রন্থ থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য, বিনোদন, রাজনীতি, অর্থনীতি, উপন্যাস, প্রবন্ধ, রচনাসমগ্র, জীবনী, ছোটগল্প, কবিতা, ভাষাতত্ত্বসহ সাহিত্যের সব ধারার বই রয়েছে। প্রতিদিন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১০-১৫ জন পাঠক এসে নিয়মিত বই পড়েন ও নিজ বাড়িতে বই নিয়ে পড়ার সুযোগ পান।

পাঠাগারের আরেক সদস্য তেজগাঁও কলেজের ছাত্র সুমন বলেন, আমাদের গ্রামের মানুষের জন্য কিংবা ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আশেপাশে তেমন কোনো পাঠাগার না থাকায় বই পড়তে হলে আমাদের ৩৫-৪০ কিলোমিটার দূরে পথ পাড়ি দিয়ে জেলা সরকারি গ্রন্থগারে যেতে হয়। যা আমাদের জন্য অনেক কষ্টসাধ্যও দুরহ ব্যাপার। কিন্তু “সবার জন্য পড়া উন্মুক্ত পাঠাগার” থাকায় আমরা যখন খুশি তখন যে কোনো ধরণের বই পড়ে আনন্দিত হতে পারি ও জ্ঞান আরোহণ করতে পারি।

পাঠাগারের সহযোগিতায় থাকা Alif Boiler Company-এর এমডি জি এম ইলিয়াস হাসান বলেন, পাঠাগারটি ধুলাউড়ি ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের মধ্যে পাঠ্যভ্যাস তৈরীতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বই পড়েন শিক্ষার্থীরা। পাঠাগারটি জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ করছে, যা তাদের ভবিষ্যতে আলোকিত মানুষ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। তাই পাঠাগারটির উন্নয়নে সমাজের শিক্ষানুরাগী ও বিত্তবানদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহবান জানাচ্ছি।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *