মৎস্য খামারে সাধারণ রোগ-বালাই সম্পর্কে না জানলে মাছের রোগ প্রতিরোধ করা কঠিন। একারণে রোগের কারণ, লক্ষণ এবং প্রতিকার-প্রতিরোধ উপায়সমূহ ভালোভাবে জানা আবশ্যক।মৎস্য চাষে সাধারণ রোগ নির্ণয় করার বেশ কিছু পদ্ধতি রয়েছে। তবে তার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত এবং গভীর পর্যবেক্ষণ৷ এতে মৎস্য খামারে সাধারণ রোগ-বালাই নির্মূল করা সম্ভব।
মৎস্য খামারে রোগ-বালাইয়ের গুরুত্ব
ম ৎস্য খামারে রোগ-বালাই নিয়ে খামারীদের বেশ সচেতন থাকতে হয়। কেননা পানিতে সহজেই বিভিন্ম ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, পরজীবী ইত্যাদির আক্রমণ দেখা যায়।এসব রোগের মধ্যে প্রায় প্রত্যেকটি রোগেই সঠিক ব্যবস্থা না নিলে মাছের মড়ক দেখা যায়। তাই মাছ চাষের রোগ-বালাই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। আর তার জন্য মাছের রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা থাকা আবশ্যক। একারণেই এখন আমরা মাছের বিভিন্ন রোগ এবং সেগুলোর সম্পর্কে ধারণা নেয়ার চেষ্টা করব।
মাছের প্রধান রোগ-বালাই
মৎস্য খামারে রোগ ব্যাধির সমস্যা প্রথম থেকেই বিদ্যমান। এর মধ্যে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। তাই মাছের সংক্রামক রোগসমূহ সম্পর্কে ধারণা না থাকলে মৎস্য খামারে রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
মাছের ভাইরাসজনিত রোগ
প্রথমেই আমরা জানব, মাছের কিছু ভাইরাসজনিত রোগ সম্পর্কে।
- মাছের ক্ষত রোগ
- মাছের গায়ে গোলাকার এবং লাল ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়।
- ক্রমে আক্রান্ত স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হয়।
- মাংসপেশী খসে পড়ে অতিরিক্ত আক্রান্ত হলে
- মাছ পুকুরে অস্বাভাবিকভানে ছোটাছুটি করে।
মাছের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ
মাছের বেশ কিছু ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ দেখা যায়। এগুলো সম্পর্কে এখন আমরা জেনে নিব-
- মাছের লেজ ও পাখনা পঁচা রোগ
- এ রোগ সাধারণত, রুই মাছ, শিং, মাগুর কৈ ইত্যাদি মাছে দেখা যায়।
- মাছের লেজ ও পাখনার পর্দা ছিঁড়ে যায়।
- মাছের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
- মাছে ব্যাপক মড়ক দেখা যায়
- মাছের ফুলকা পঁচা রোগ
- ফুলকা ফুলে যায় এবং সেখানে অতিরিক্ত তরল পদার্থ জমে।
- ফুলকা থেকে রক্তক্ষরণ হয়।
- মাছের শ্বাসকষ্ট দেখা যায়।
- স্ট্রেপটোকক্কিস
- তেলাপিয়ার ক্ষেত্রে এ রোগ দেখা যায়।
- মাছ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।
- শরীরের বিভিন্ন স্থানে লালচে দাগ দেখা যায়।
- মাছ খাদ্য গ্রহণ বন্ধ করে দেয়।
- চোখ ঘোলা হয়ে যায়
- মাছের পেট ফোলা রোগ
- আঁশ খাড়া হয়ে যায়।
- মাছের শরীরের ভেতর পানি জমে।
মা ছে র ছত্রাকজনিত রোগ
এরপর আমরা জানব মাছের কিছু ছত্রাকজনিত রোগ সম্পর্কে।
- স্যাপ্রোলেগনিয়াসিস
- কোনো কারণে মাছে ক্ষত সৃষ্টি হলে সাদা সুতোর মত এক ধরণের ছত্রাক সেখানে বাসা বাধে। এতে মাছ দুর্বল হয়ে পড়ে।
- হোয়াইট ফিলামেন্টাস টাফট রোগ
- মাছের উপর ছত্রাকের আক্রমণ ঘটে
- মাছের পাখনা, দেহ, ফুলকা ইত্যাদি জায়গায় সাদা দাগ দেখা যায়।
- দেহে ক্ষত সৃষ্টি হয়।
প্যারাসাইট বা পরজীবী আক্রমণ
অণুজীব ছাড়াও মাছের আরেকটি বড় রকমের রোগ হলো পরজীবী দ্বারা আক্রমণ। এসব পরজীবী জাতীয় রোগের মধ্যে পাঙ্গাসের লালচে দাগ রোগ সবচেয়ে গুরুতর। এ রোগে মাছের ত্বকের গোড়ায় এবং পাখনায় লালচে দাগ দেখা যায়। মাছের চোখ বাইরে বেরিয়ে আসে এবং দেহের বিভিন্ন জায়গায় ক্ষত দেখা যায়। এছাড়াও কানকো, মুখমন্ডল এবং পেটের দিকে রক্তক্ষরণ দেখা যায়। পায়ুপথ লাল হয় এবং সেখানে ফ্লুইড বা তরল জাতীয় জিনিস জমা হয়।
আক্রান্তের পরিমাণ অধিক হলে মাছের শরীরে ফোস্কা দেখা যায়। এছাড়াও মাছে উকুন জাতীয় পরজীবীর আক্রমণ ঘটে। এতে মাছ শক্ত কিছুর সাথে গা ঘষলে তাতে ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং রক্তক্ষরণ হতে পারে।
রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি
মাছের প্রধান প্রধান রোগ সম্পর্কে আমরা বেশ ভালো একটি ধারণা পেয়ে গেছি। তবে রোগের কারণ জানার পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি সম্পর্কে জানাও আবশ্যক। তা না হলে মাছের পরিচর্যা করা সম্ভব নয়।আর এ প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা আবশ্যক। মাছ সুস্থ আছে কিনা বা তার শরীরে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কিনা তা নিয়মিত মনিটরিং এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়। এর জন্য সর্বোত্তম জায়গা হলো পরীক্ষাগার। পরীক্ষাগার বা ল্যাবে কোনো মাছে কোন রোগ হয়েছে এবং কীভাবে হয়েছে তা বিস্তারিত জানা যায়। এছাড়াও খামারীকে তার মাছ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
প্রতিকারের কার্যকরী পদ্ধতি
মাছের রোগসমূহ হলে তা যত দ্রুত সম্ভব প্রতিকার করা প্রয়োজন। তা না হলে রোগ দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে এবং এক পর্যায়ে পুরো ফার্মকে বিষাক্ত করে তোলে।আর এ কাজে প্রয়োজনী পদ্ধক্ষেপগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-
- মাছ চাষে সঠিক ওষুধ ব্যবহার। বিভিন্ন মাছ বিভিন্ন ধরণের রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। প্রত্যেকটির জন্য আলাদা আলাদা ওষুধ রয়েছে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে।
- প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পুকুর পরিষ্কার রাখা চেষ্টা করতে হবে। সম্ভব হলে পুকুরের পানি পালটে তাতে চুন ব্যবহার করলে বেশ ভালো উপকার পাওয়া যায়। মাছ চাষে ব্যাধি নিরাময় পদ্ধতি এভাবে মেনে চলা সম্ভব।
- খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং পুষ্টি নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। মাছের খাদ্য যথাযথভাবে এবং সঠিক সময়ে দিতে হবে। মাছের পুষ্টি যেনো নিশ্চিত হয় দে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবব্র।
রোগ প্রতিরোধের উপায়
যেকোনো রোগের ক্ষেত্রেই প্রতিকার অপেক্ষা প্রতিরোধ বেশি উত্তম তা আমরা সবাই জানি। মৎস্য খামারের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। তাই রোগ হওয়ার পূর্বেই মাছের পরিচর্যা সঠিকভানে করতে হবে। এতে খামারের খরচও কমবে।আর মৎস্য খামারের সঠিক পরিচর্যা কাজে করণীয়গুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-
- মাছ যে জলাশয়ে চাষ করা হবে সেখানে পরিমিত রোদের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাই আশপাশে বড় গাছপালা রাখা যাবে না।
- পানি মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পানিতে গ্যাস বৃদ্ধি পেলে পর্যাপ্ত চুন দ্বারা তা নির্মল করতে হবে।
- নিয়মিত জলাশয়ের নিচের পাক বা কাদা তুলে ফেলতে হবে।
- মাছের ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পুকুর অনুযায়ী মাছের ঘনত্ব বেশি হওয়া যাবে না। অতিরিক্ত পোনা মজুদ করা যাবে না।
- খামারের সঠিক পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। বাইরের নোংরা পানি পুকুরে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। অত্যাধিক খাদ্য দেয়া যাবে না। এতে খাবার পঁচে দূষণ সৃষ্টি করতে পারে।
- মৎস্য খামারে পরিবেশ এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
উপর্যুক্ত আলোচমা থেকে আমরা বুঝলাম মাছের রোগ চিহ্নিতকরণ পদ্ধতি এবং মাছের রোগের প্রতিকার সম্পর্কে ভালোভাবে জানা আবশ্যক।তার পূর্বে প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলো সম্পর্কে বেশি সচেতন হতে হবে যেনো রোগের আক্রমণ না হয়। এভাবে মৎস্য খামারে মাছের রোগ কমানো সম্ভব।

Leave a Reply