স্বাস্থ্যবান মুরগি পালন পোলট্রি ব্যবসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা আপনার মুরগী যদি ব্যাধীমুক্ত এবং স্বাস্থ্যবান না হয় তবে কখনোই আপনি লাভ করতে পারবেন না। তাই এ সম্পর্কিত বিস্তারিত জানা আবশ্যক।
স্বাস্থ্য বান মুরগি পালন সম্পর্কে জানতে হলে আপনাকে প্রথমেই বুঝতে হবে মুরগীর সঠিক যত্নের কৌশল।তাই মুরগীর এসকল বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করব এখানে।
স্বাস্থ্যবান মুরগি পালন এর উপযোগীতা
২০১৫ সালের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, দেশে ঐ সময় সরকারী খামার ছিল ৪৫ টি এবং বেসরকারিভাবে নিবন্ধিত খামারের সংখ্যা ছিল ৬৪,৭৫৯। সর্বমোট তাদের তথ্য নিবন্ধিত খামার ছিল ১,৬০,৫০৯ টি।
এছাড়াও ছোট পরিসরে গ্রামাঞ্চলে অনেকেই মুরগী পালন করে থাকেন যা নিবন্ধিত নয়। বর্তমানে ২০২৪ সাল চলমান। অতএব, নির্দিষ্ট কোনো হিসেব না থাকলেও এই মুরগীর ফার্মের সংখ্যা এখন কত বাড়তে পারে তা নিশ্চয়ই বর্ণনা করার প্রয়োজন।
এই অত্যাধিক মুরগী খামার বৃদ্ধির মূল কারণই হলো পোলট্রি ব্যবসার ক্রমবর্ধমান লাভ।তবে পোলট্রি ব্যবসায় আপনি তখনই লাভ করতে পারবেন যখন আপনার মুরগী স্বাস্থ্যবান হবে।
কেননা স্বাস্থ্যবান মুরগীর রোগের পরিমাণ থাকে কম। তাছাড়াও মাংস উৎপাদন এবং ডিম উৎপাদন এর হারও বেশি। একারণেই এসকল মুরগী থেকে বেশি লাভ করা যায়।
মুরগীর খাদ্য পরিকল্পনা
পূর্বানুসারে, স্বাস্থ্যবান মুরগী পালনের উপযোগীতা থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে মুরগীকে স্বাস্থ্যবান করা আবশ্যক। আর তার জন্য প্রয়োজন মুরগীর সঠিক খাদ্য পরিকল্পনা।
আসলে, আপনি যদি বাণিজ্যিকভাবে পোলট্রি উৎপাদনের কথা ভেবে থাকেন, তাহলে মুরগীর জন্য পুষ্টিকর খাবার উৎপাদন করতে হলে আপনাকে পুষ্টি বিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে। নয়ত আপনি বুঝবেন না যে কোন উপাদানটি মুরগীর জন্য বেশি দরকারী।
এক্ষেত্রে আমরা আপনার এই সমাধানটি আরও সহজ করে দিতে চাই। মুরগীর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন কার্বোহাইড্রেট এবং প্রোটিন উৎসজনিত খাদ্য যা মুরগীর পেশী, ত্বক, পালক এবং প্রতিটি অঙ্গ- প্রত্যঙ্গকে বৃদ্ধি করবে।
এরপর প্রয়োজন ভিটামিন এ, বি, সি, ডি, ই এবং কে। এসব ভিটামিন সঠিকভাবে খাওয়ানো গেলে ক্ষতিকারক ব্যকটেরিয়া সমূহ নিয়ন্ত্রিত হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ মুরগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায় হিসেবে অন্যতম হলো সুষম খাদ্য।
পাশাপাশি মুরগীর স্বাস্থ্যকর খাদ্য হিসেবে এ তালিকায় খনিজ লবণ জনিত খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম, ক্লোরিন, পটাসিয়াম, সালফার ইত্যাদি। এর মধ্যে ক্যালসিয়াম বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ডিমের প্রায় ১০ শতাংশ এবং মুরগীর শরীরের ৩-৪ শতাংশ এসকল খনিজ উপাদানের মাধ্যেম তৈরী হয়। তাই এসব উপাদান না থাকলে মুরগীর বিকাশ সম্ভব হবে না।
মুরগীর খাদ্য তালিকা
এবার আসা যাক, মুরগীর খাদ্য তালিকা প্রসঙ্গে। মুরগীর জন্য কোন কোন উপাদানের খাবার তালিকা প্রয়োজন তা আমরা জেনেছি। কিন্তু এসব উপাদান কোন ধরণের খাদ্যে পাওয়া যায় সে সম্পর্কে ধারণা থাকাও জরুরী। কেননা মুরগীর জন্য সুষম খাদ্য নিশ্চিত অপরিহার্য।
- কার্বোহাইড্রেট- ভূট্টা, গম, ধান, চাল, ভাত ইত্যাদি।
- প্রোটিন- মসুর দানা, ছোট কীড়াজাতীয় পোকামাকড়, তিসি বীজ, সরিষা বীজ, কেঁচো
- ভিটামিন- শাকসবজির নরম পাতা, ফুলকপির নরম অংশ
- খনিজ লবণ- ঝিনুকের গুঁড়া
- পানি
এসকল খাদ্য মুরগীর জন্য আদর্শ রূপে বিবেচিত। আপনি হাতের কাছে সহজেই যেগুলো পেতে পারেন তাই দিয়েই মুরগীর খাবারের তালিকা তৈরি করুন। তবে অবশ্যই সব ধরণের খাদ্য উপাদান থাকতে হবে কেননা মুরগীর যত্ন এবং খাদ্য পরস্পর জড়িত
মুরগীর যত্ন
মুরগী পালনে খাদ্যের ভূমিকা জানার পাশাপাশি, মুরগীর যত্ন সম্পর্কেও বেশ সচেতন হতে হবে। মুরগীর জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কম তাপমাত্রা। একারণেই শীতকালে মুরগীর ডিম পাড়ার হারও কমে যায়।
আবার অধিক তাপমাত্রাও মুরগীর জন্য সুবিধাজনক নয়। তাই খামারে সর্বদা স্বাভাবিক তাপমাত্রা যেনো থাকে এই ব্যবস্থা করতে হবে।
পাশাপাশি, খামারে অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে অনেক মুরগী রাখা যাবে না। মুরগী রাখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে যেনো প্রত্যেক মুরগী অন্ততপক্ষে ১.৫/২ বর্গফুট জায়গা পেতে পারে।
একইসাথে, মুরগীর জায়গা অত্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। নিয়মিত বিষ্ঠা, উচ্ছিষ্ট খাদ্য এবং অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলতে হবে।
মুরগীকে খাওয়ানো এবং ডিম সংগ্রহের কাজের ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত খরচ পড়ে গেলে বা অর্থসংকুলান না হলে প্রচলিত পদ্ধতিতেও করা যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
সবগুলো মুরগী একইসাথে না রেখে খাঁচা তৈরী করে একটি খাঁচায় ৩/৪ টি করে মুরগী রাখা যায়। এতে মুরগীর রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
মুরগীর রোগ-প্রতিরোধ ও চিকিৎসা
খাদ্যের পাশাপাশি, মুরগীর রোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কেও বিস্তারিত ধারণা রাখতে হবে। আপনি যদি এ বিষয়ে নতুন কিংবা অদক্ষ হন, তবে হাঁস মুরভী পালন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারেন।
এভাবে দক্ষতা অর্জন করে মুরগীর অসুখ এবং মুরগীর ঔষধের তালিকা তৈরী করে আপনার খামার উজাড় হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারেন। একইসাথে, কোন রোগের জন্য মুরগীকে কখন টীকা দিতে হবে এবং কী টিকা দিতে হবে সেটাও জানতে হবে।
আপনার যদি এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকে কিংবা আপনি দক্ষ না হন তবে অবশ্যই যেকোনো পশু ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তবেই আগাবেন। নয়ত ভুল হলে ক্ষতির সম্মুখীন আপনাকেই হতে হবে।
শেষ কথা
স্বাস্থ্যবান মুরগী পালন সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আমরা জানলাম এতক্ষণ। এভাবে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবান মুরগী পালনের উপায় সঠিকভাবে পালন করুন। এতে আপনার লাভের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাবে।

Leave a Reply