স্বাস্থ্যকর ডিম উৎপাদনে পোলট্রির গুরুত্ব কতটা এবং কীভাবে এই ডিম উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালনা করা যায় তা অনেক খামারিরাই সঠিকভাবে জানেন না।তাই এ বিষয়ে আলোচনা আবশ্যক। প্রোটিনের আধিক্যের কারণে ডিমকে ‘’সুপার ফুড” হিসেবে ধরা হয় তা আমরা সবাই জানি। তাছাড়াও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান তো রয়েছেই। আর এমন স্বাস্থ্যকর ডিম উৎপাদনে পোলট্রির গুরুত্ব অবর্ণনীয়। এখন আমরা এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানব-
ডিম উৎপাদনে পোলট্রির খাদ্য
সাধারণত দেশী মুরগীর ডিম বেশি পুষ্টিকর ধরা হয়। তবে বিজ্ঞান বলে দেশী মুরগী এবং পোলট্রি মুরগীর ডিমে খুব বেশি পার্থক্য নেই। দেশী মুরগী ছাড়া অবস্থায় থাকার কারণে কেঁচোসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান খেয়ে থাকে যা পুষ্টিমান বাড়ায়।তবে, পোলট্রি খামারেও বিভিন্ন ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার দেওয়া হয়। এছাড়াও বিভিন্ন খনিজ পদার্থসমৃদ্ধ খাবারও দেয়া হয়। যেমন খৈল, শামুকের গুঁড়া, গম, ভূষি, লবণ, শুঁটি মাছের গুড়া ইত্যাদি।
তাছাড়াও পোলট্রির মুরগীর ডিম দেশী মুরগীর তুলনায় বড়। তাই বলা যায়, পোলট্রি মুরগী থেকেও আপনি যথেষ্ট পরিমাণ পুষ্টি পেতে পারেন। একারণেই পোলট্রি ডিম উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত।
ডিম উৎপাদনের পোলট্রির পরিবেশগত প্রভাব
পোলট্রি সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। তাছাড়াও পোলট্রি খামারে মুরগীর জন্য প্রয়োজনীয় আলো-বাতাস, সঠিক তাপমাত্রা, সঠিক আর্দ্রতা, গুণসম্পন্ন খাদ্য এবং পানি ইত্যাদি বিষয় রক্ষা হয়। শুধু তাই নয়, প্রতিটি মুরগীর জন্য নির্ধারিত বাসস্থান এবং ডিম পাড়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয় বলেই এই পরিবেশ মুরগীর ডিম পাড়ার জন্য সহযোগী।
ডিম উৎপাদনে পোলট্রির স্বাস্থ্য এবং রক্ষণাবেক্ষণ
পোলট্রি ফার্মে মুরগীর স্বাস্থ্য নিয়ে যথেষ্ট সচেতন থাকা হয়। ঠিক সময় ভ্যাক্সিনেশন এর পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখা হয় যে সব মুরগীর স্বাস্থ্য ডিম উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত কিনা।
তাছাড়া, সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে কোনো মুরগী অসুস্থ হলে তাকে সঠিক চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে ডিম পাড়ার হার এবং ডিমের গুণগত মান বৃদ্ধির চেষ্টা তো রয়েছেই। এতেই বোঝা যায়, স্বাস্থ্যকর ডিম উৎপাদনে পোলট্রি যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে।
পোলট্রি ডিম উৎপাদন কৌশল
পোলট্রিতে ফার্মের ডিম উৎপাদন ব্যবস্থা হিসেবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হলো ডিম পাড়ার বাক্সে ডিম উৎপাদন। এক্ষেত্রে প্রতি ৪-৫ টি মুরগীর জন্য ১২*১২*১৪ (দৈর্ঘ্য* প্রস্থ* উচ্চতা) আয়তন বিশিষ্ট ডিম পাড়ার বাক্স রাখতে হবে। বাক্সগুলো মুরগীর ঘরের একদিকে যেখানে আলো পরিমাণ সামান্য কম সেখানে স্থাপন করতে হবে।
এই ডিম পাড়ার বাক্স ব্যবহার করলে খামারে লাভের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। কেননা ডিম নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না এবং মুরগীর মলদ্বার ঠোকড়ানোর অভ্যাসটি থাকে না।
পোলট্রি খামারের ডিম উৎপাদন বৃদ্ধির উপায়

পোলট্রি ফার্মে ডিম উৎপাদন বৃদ্ধি করতে প্রথমে একটি বিষয় ভালোভাবে বুঝতে হবে। আর তা হলো ডিম উৎপাদন কম হওয়ার কারণগুলো কী! কারণ এই কারণগুলো বুঝতে পারলেই ডিম উৎপাদন বৃদ্ধির উপায় বের করা যাবে।
তাহলে কী সেই কারণগুলো যা ডিম উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এক নজরে দেখে নেই সেগুলো-
- মুরগীর বয়স
- মুরগীর জাত
- পুষ্টিকর খাদ্য
- দিনের দৈর্ঘ্য
- পীড়ন
এবার এ সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করব এবং একইসাথে সমাধান দেখে নিব।
মুরগীর বয়স
পোলট্রি মুরগীগুলো সাধারণত ১৮-২০ সপ্তাহ বয়সে ডিম পাড়া শুরু করে এবং ৭২ সপ্তাহ পর্যন্ত ডিম পাড়ে। তবে ২৪-২৬ সপ্তাহ বয়সে সর্বোচ্চ ডিম পাড়ে। ৭২ সপ্তাহ বয়সে এই ডিমের পরিমাণ প্রায় ৭০% পর্যন্ত কমে আসে।
তাই আপনার মুরগীর বয়স সম্পর্কে জানতে হবে। বয়স বেশি হলে কোনো কিছু প্রয়োগেই ডিম উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব নয়।
মুরগীর জাত
বিভিন্ন ব্রিডার্স কোম্পানি অধিক উৎপাদনশীল জাতের মুরগী বাজারে নিয়ে এসেছে। তাই সর্বোচ্চ ভালো জাতটি ফার্মে আনার এবং তার জন্য কীরূপ পরিচর্যা দরকার তা নিশ্চিত করলে অধিক ডিম পাবার সম্ভাবনা থাকে।
পুষ্টিকর খাদ্য
ডিম পাড়ার সময়ে একটি মুরগী গড়ে ১১০-১২০ গ্রাম খাদ্য গ্রহণ করে। এই খাদ্যে অবশ্যই ভিটামিন এবং খনিজ থাকতে হবে। বিশেষত ক্যালসিয়ামের অভাবে ডিম পাড়ার হার কমে যায়।
সমাধান:মুরগী যাতে খাবার থেকে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। ঝিনুকচূর্ণ এবং লাইমস্টোন ক্যালসিয়ামের একটি ভালো উৎস।
পীড়ন
মুরগীর পীড়নের কারণগুলো প্রথমে জানা আবশ্যক। এগুলো হলো –
- মুরগীর ঘরের তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা অতিরিক্ত কম বা বেশি। ২৫-৩০° সেলসিয়াস তাপমাত্রা তাদের জন্য আদর্শ।
- মুরগীর ঘরে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকা
- ভ্যাক্সিনেশন, ঠোঁট কাটা বা ট্রিমিং
- পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা না থাকা
- খাদ্যের গুণগত মানে সমস্যা
- স্বাস্থ্যকর এবং পর্যাপ্ত পানি না থাকা
- ঘরে আলোর তীব্রতা অতিরিক্ত থাকলে
সমাধান:
যেসকল কারণে পীড়ন হয়ে থাকে এসকল বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে যেনো তা না হয়।
দিনের দৈর্ঘ্য
মুরগীর ডিম পাড়ার জন্য দিনে ১৪ ঘণ্টার বেশি আলো প্রয়োজন হয়। একারণে শীতকালে দিনের অংশ কম থাকায় মুরগী কম ডিম পাড়ে।
সমাধান:
কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা করতে হবে।
পোলট্রিতে ডিম উৎপাদন একটি বেশ লাভজনক ব্যবসা। পাশাপাশি, এর বাজার চাহিদাও অনেক বেশি। একারণেই সঠিকভাবে পোলট্রি পরিচালনা অতি আবশ্যক। আর ডিম উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশলগুলো অবলম্বন করে এই লাভের পরিমাণ আরও বাড়ানো সম্ভব।

Leave a Reply