Tag: Infohomeo

  • দাদ নাকি রিংওয়ার্ম? ছত্রাকের সংক্রমণে ত্বকের যত সমস্যা

    দাদ নাকি রিংওয়ার্ম? ছত্রাকের সংক্রমণে ত্বকের যত সমস্যা

    দাদ রোগ একটি পরিচিত চর্মরোগ। এই রোগটি ছত্রাক বা ফাঙ্গাল ইনফেকশনের কারণে ঘটে। একে মেডিকেল ভাষায় টিনিয়া কর্পোরিস (Tinea Corporis )বা রিং ওয়ার্ম(Ring worm) বলা হয় তবে আমরা একে দাউদ বা দাদ নামে চিনি। এটিকে Ring worm বলা হয় কারণ এটি একটি বৃত্তাকার ফুসকুড়ি (রিংয়ের মতো আকৃতির) হয় যা সাধারণত দেখতে লাল হয় এবং চুলকায়।

    দাদ এক ধরনের ছোঁয়াচে রোগ।

    তাই পরিবারের কেউ এমন রোগে আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা করা উচিত। না হলে অল্পদিনেই কিন্তু বাকিদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে দাদ এর প্রাদুর্ভাব থাকলেও আমাদের দেশের মতো গরম ও ঘামপ্রবণ দেশে বেশি দেখা দেয়। সব বয়সের মানুষই এতে আক্রান্ত হতে পারে এবং একবার আক্রান্ত হলে বারবার আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। মনে রাখবেন, এ রোগের চিকিৎসা হোমিওপ্যাথিতে খুবই সহজ এবং দ্রুত আরোগ্য হওয়া সম্ভব, তবে দেরি করলে অনেক সময় জটিলতা সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাই দাদ হলে যথাসম্ভব দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। এজন্য নিজে ভালো থাকতে এবং পরিবারের সদস্যদেরও দাদ থেকে ভালো রাখতে হলে দাদ সর্ম্পকে সাধারণ কিছু তথ্য আপনার জানা থাকা একান্ত প্রয়োজন। যেমন:

    দাদ কেন হয়?

    দাদের লক্ষণ কি কি?

    দাদ রোগ কীভাবে ছড়ায়?

    দাদ প্রতিরোধে আপনার করণীয় কি?

    দাদ রোগের ঘরোয়া চিকিৎসা কি?

    দাদ কেন হয়?

    ডার্মাটোফাইট (Dermatophyte) নামক ছত্রাকের সংক্রমণে এ রোগ হয়।

     দাদ রোগের লক্ষণসমূহঃ

    ১. দাদের প্রধান উপসর্গ হলো ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ। এই র‍্যাশ দেখতে সাধারণত আংটির মতো গোল হয়ে থাকে। রঙ হয় লালচে। তবে রোগীর ত্বকের বর্ণভেদে এটি রূপালি দেখাতে পারে। আবার আশেপাশের ত্বকের চেয়ে গাঢ় বর্ণও ধারণ করতে পারে।

    ২. আক্রান্ত স্থানটি বৃত্তাকার (গোলাকার চাকার ন্যায়) ধারন করে যার কিনারাগুলো সামান্য উঁচু হয়। দিনদিন চাকার আকৃতি বাড়তে থাকে আর কেন্দ্রের বা মাঝখানের দিকে ভালো হয়ে যেতে থাকে।

    ৩. ক্ষতস্থান থেকে খুঁশকির মত চামড়া উঠতে থাকে।

    ৪. কখনো কখনো পানি বা পুঁজ ভর্তি গোঁটা দেখা যায়।

    ৫. ক্ষতস্থান অত্যন্ত চুলকায়।

    ৬. ত্বক কিছুটা খসখসে বা শুকনো হয়ে যাওয়া।

    ৭. আক্রান্ত ত্বকের ওপরে চুল অথবা লোম থাকলে সেগুলো পড়ে যায়।

    দাদ বা রিংওয়ার্ম হওয়ার কারণ কি কি?

    ১) সাধারণত ভেঁজা, স্যাঁতস্যাঁতে ও আদ্র জায়গা ও আবহাওয়াতে, যেখানে পর্যাপ্ত আলোবাতাস পৌছায় না, এ ধরনের জায়গায় দাদ বা রিংওয়ার্ম সৃষ্টিকারী ছত্রাক জন্ম নেয়।

    ২) একই কাপড় না ধুঁয়ে দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে, নোংরা, অপরিস্কার কাপড়চোপড় পরিধান করলে।

    ৩) আক্রান্ত রোগীর জামা-কাপড়, গামছা, তোয়ালে, চিড়ুনি ইত্যাদি ব্যবহারেও দাঁদ হয়ে থাকে।

    ৪) আঁটসাঁট কাপড়চোপড় ও আঁটসাঁট অন্তর্বাস ব্যবহার করলে।

    ৫) পায়ের পুরনো মোজা দ্বারা সংক্রমণ হতে পারে।

    ৬) যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা সহজেই আক্রান্ত হতে পারেন।

    ৭) যারা বেশী ঘামেন।

    ৮) পোষ্য প্রাণী থেকেও ছড়াতে পারে।

    শরীরের কোন কোন স্থানে দাদ রোগ হয়?

    আমাদের শরীরের যেকোনো অংশে দাদ দেখা দিতে পারে। যেমন: কুঁচকি, মাথার ত্বক, হাত, পা, পায়ের পাতা, এমনকি হাত-পায়ের নখ। আক্রান্ত স্থানভেদে দাদের লক্ষণেও ভিন্নতা আসতে পারে। যেমন, র‍্যাশের আকারে ভিন্নতা থাকতে পারে। দাদের র‍্যাশ আস্তে আস্তে বড় হয়ে ছড়িয়ে যেতে পারে। আবার কখনো কখনো একাধিক র‍্যাশ দেখা দিতে পারে।

    নিচে শরীরের বিশেষ কিছু স্থানের দাদ রোগ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরা হয়েছে—

    মাথার ত্বক: মাথার ত্বকে দাদ দেখা দিলে সাধারণত আক্রান্ত অংশের চুল পড়ে টাক সৃষ্টি হয়। টাক পড়া অংশে লালচে, গোলাকার ও ছোটো ছোটো আঁইশযুক্ত র‍্যাশ তৈরি হয়। এতে চুলকানি থাকতে পারে।

    ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়লে টাক পড়া অংশের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে এবং মাথার ত্বকে দাদ রোগের একাধিক র‍্যাশ তৈরি হতে পারে।

    মাথার ত্বকের দাদ রোগ প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

    পা ও পায়ের আংগুলের ফাঁকে

    এক্ষেত্রে আক্রান্ত স্থানটি লাল হয়ে ফুলে ওঠে এবং সেখান থেকে চামড়া উঠে যেতে থাকে। সেই সাথে পায়ের আঙ্গুলগুলোর ফাঁকে ফাঁকে চুলকানি হয়। বিশেষ করে পায়ের সবচেয়ে ছোটো আঙুল দুটির মাঝখানের অংশে চুলকানি হয়ে থাকে।

    পায়ে দাদ হলে পায়ের পাতা ও গোড়ালিও আক্রান্ত হতে পারে। এমনকি গুরতর ক্ষেত্রে পায়ের ত্বকে ফোস্কা পড়তে পারে।

    (ছবি: পা ও পায়ের আংগুলের ফাঁকে দাদ রোগ)

    কুঁচকি

    কুঁচকিতে দাদ হলে সেটি সাধারণত ঊরুর ভেতরের দিকের ভাঁজে লাল লাল র‍্যাশ হিসেবে দেখা যায়। র‍্যাশে আঁইশ থাকে এবং চুলকানি হয়।

    দাঁড়ি

    গাল, চিবুক ও গলার ওপরের অংশে এই ধরনের দাদ দেখা দেয়। এটিও লাল লাল র‍্যাশ হিসেবে দেখা যায়, যাতে আঁইশ থাকে এবং চুলকানি হয়। দাঁড়িতে দাদ হলে অনেক সময় র‍্যাশের ওপরে চলটা পড়ে।আবার ভেতরে পুঁজও জমতে পারে। একই সাথে আক্রান্ত অংশের চুল পড়ে যেতে পারে।)

    চামড়ার যে জায়গায় সংক্রমণ হয় সেই জায়গার নামানুসারে দাঁদের নামকরণ করা হয়। উদাহরণ স্বরুপঃ

    ১)টিনিয়া কর্পোরিসঃশরীরের যেকোন জায়গায় ছত্রাকের  সংক্রমণ হলে তাকে সাধারণত টিনিয়া কর্পোরিস বলা হয়।

    ২)টিনিয়া ক্যাপিটিসঃ মাথার তালুতে ছত্রাক সংক্রমণ।

    ৩)টিনিয়া ক্রুরিসঃকুঁচকিতে ছত্রাকের সংক্রমণ।

    ৪)টিনিয়া আঙ্গুইয়ামঃ নখের ছত্রাক সংক্রমণ।

    ৫)টিনিয়া ম্যানুমঃ হাতের ছত্রাক সংক্রমণ।

    ৫)টিনিয়া পেডিস(অ্যাথলেটস ফুট):পায়ের ছত্রাক সংক্রমণ।

    দাদ রোগ কীভাবে ছড়ায়?

    এটি মূলত তিনভাবে ছড়ায়—

    ১. আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা তার ব্যবহার্য জিনিসের সংস্পর্শ থেকে। যেমন: চিরুনি, তোয়ালে ও বিছানার চাদর।

    ২. দাদ আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শ থেকে। যেমন: কুকুর, বিড়াল, গরু, ছাগল ও ঘোড়া।

    ৩. দাদ রোগের জীবাণু আছে এমন পরিবেশ, বিশেষ করে স্যাঁতস্যাঁতে স্থান থেকে।

    প্রতিরোধঃ

    জীবন ধারা বা লাইফস্টাইলের পরিবর্তনের মাধ্যমে দাঁদ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। স্বাস্থ্যকর কিছু অভ্যাস এবং দৈনন্দিন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে দাঁদ সংক্রমণ রোধ করা যায়ঃ

    ১) ত্বক সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও শুষ্ক রাখুন।

    ২)পরিস্কার,ঢিলেঢালা এবং শুষ্ক কাপড় (বিশেষত সুতি কাপড়) এবং অন্তর্বাস পড়িধান করুন।

    ৩) আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহার্য জিনিস ব্যবহার করলেও দাদ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই দাদ আছে এমন কারও সাথে পোশাক, তোয়ালে, চাদর বা অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিস শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন।

    ৪) খুব আঁটসাঁট জুতা পরলে এবং অতিরিক্ত ঘাম হলে দাদ রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই এমন জুতো ব্যবহার করুন যা আপনার পায়ের চারপাশে অবাধে বাতাস চলাচল করতে দেয়।

    ৫)আক্রান্ত স্থান স্পর্শ করার পর সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিন,যাতে সংক্রমণ দেহের অন্যত্র না ছড়ায়।

    ৭) প্রতিদিনের পরিহিত কাপড়চোপড়, গেঞ্জি, মোজা, আণ্ডারওয়্যার প্রতিদিন ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

    ৯) পোষ্য-প্রাণীর সংস্পর্শে আসার পর হাত ধুয়ে ফেলুন।

    ১১) স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে দাদ রোগের ঝুঁকি বেশি। তাই জিম কিংবা চেঞ্জিং রুম ও পাবলিক গোসলখানা এর মতো স্থানে খালি পায়ে হাঁটা থেকে বিরত থাকা উচিত।

    দাদ রোগের ঘরোয়া চিকিৎসা

    যা করবেন

    ১.যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করুন।

    ২.ত্বক সবসময় শুকনো ও পরিষ্কার রাখুন। আক্রান্ত ত্বক স্পর্শ করলে সাথে সাথে হাত ধুয়ে ফেলুন।

    ৩. দৈনন্দিন ব্যবহারের কাপড় (যেমন: তোয়ালে ও বিছানার চাদর) নিয়মিত ফুটন্ত পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।

    যা করবেন না

    ১.দাদ হয়েছে এমন কারও ব্যবহার্য জিনিস (যেমন: তোয়ালে, চিরুনি ও বিছানার চাদর) ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

    ২.আক্রান্ত ত্বক স্পর্শ করা অথবা চুলকানো থেকে বিরত থাকুন। নাহলে দাদ শরীরের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি চুলকানোর কারণে ত্বকে ভিন্ন আরেকটি জীবাণু আক্রমণ করে ইনফেকশন ঘটাতে পারে, যা দাদের চিকিৎসাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

    লেখকঃ

    ডাঃ মুরাদ আলী

    এমডি (হোমিওপ্যাথি), ভারত।

    লেকচারার ইন মেডিসিন (এস.এইচ.এম.সি.এইচ)

    ফাউন্ডার: ইনফো হোমিও।

    মোবাইল: ০১৭৩৩-১৯৩০৬১

  • নারীদের সবচেয়ে কমন সমস্যা ইউরিন ইনফেকশন

    নারীদের সবচেয়ে কমন সমস্যা ইউরিন ইনফেকশন

    ইউরিন ইনফেকশনের বা Urinary tract infections (UTIs) খুবই কমন একটা রোগ, যে কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে নারীদের এই রোগ সবথেকে বেশি হয়।

    পরিসংখ্যান মতে প্রতি ২ জন মেয়ের মধ্যে ১ জন এবং প্রতি ২০ জন ছেলের মধ্যে ১ জন ছেলে  জীবনে কোন না কোন সময় এই রোগে আক্রান্ত হয়।

    ইউরিন ইনফেকশন থেকে বাঁচতে হলে ইউরিন ইনফেকশন সর্ম্পকে কিছু তথ্য আপনাদের জানতে হবে। তাহলে সহজেই ইউরিন ইনফেকশন হওয়া থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারবেন।

    ইউরিন ইনফেকশন কী?

    আমাদের শরীর থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি প্রস্রাব হিসেবে বেরিয়ে যায়। প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়ার এই ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত অঙ্গগুলো নিয়ে আমাদের মূত্রতন্ত্র গঠিত। মূত্রতন্ত্রের মধ্যে থাকে দুটি কিডনি, দুটি ইউরেটার, একটি মূত্রথলি বা ব্লাডার ও একটি মূত্রনালী।

    মূত্রতন্ত্রের কোনো অংশে ব্যাকটেরিয়া সংক্ৰমণ হলে সেটিকে ইউরিন ইনফেকশন বা প্রস্রাবের সংক্ৰমণ বলে। ডাক্তারি ভাষায় একে ‘ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন’ বা ‘ইউটিআই’ বলা হয়।

    ইউরিন ইনফেকশনের লক্ষণ

    ইউরিন ইনফেকশনের সবচেয়ে কমন লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

    ১. প্রস্রাবের সময়ে ব্যথা অথবা জ্বালাপোড়া হওয়া

    ২. স্বাভাবিকের চেয়ে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া

    ৩. রাতে বারবার প্রস্রাবের বেগ আসা

    ৪. অস্বাভাবিক গন্ধযুক্ত অথবা ঘোলাটে প্রস্রাব হওয়া

    ৫. হঠাৎ প্রস্রাবের বেগ আসা অথবা বেগ ধরে রাখতে সমস্যা হওয়া

    ৬. তলপেটে ব্যথা হওয়া

    ৭. প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া

    ৮. কোমরের পেছনে পাঁজরের ঠিক নিচের অংশে ব্যথা হওয়া

    ৯. জ্বর আসা কিংবা গা গরম লাগা এবং শরীরে কাঁপুনি হওয়া

    ১০. শরীরের তাপমাত্রা ৩৬° সেলসিয়াস বা ৯৬.৮° ফারেনহাইট এর চেয়ে কমে যাওয়া

    ১১. ক্লান্তি ও বমি বমি লাগা

    ১২. কোমর ও তলপেটে ব্যথা করতে পারে

    ওপরের লক্ষণগুলোর পাশাপাশি বয়সভেদে প্রস্রাবের ইনফেকশনের লক্ষণগুলোতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা দিতে পারে।

    বয়স্ক ও প্রস্রাবের নল (ক্যাথেটার) দেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় পরিবর্তনগুলো হলো—

    • অস্বাভাবিক আচরণ
    • মানসিক বিভ্রান্তি অথবা ক্ষোভ
    • নতুন করে শরীরে কাঁপুনি অথবা ঝাঁকুনি হওয়া
    • প্রস্রাব করে জামাকাপড় নষ্ট করে ফেলা

    আবার বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সাধারণ লক্ষণগুলোর পাশাপাশি ভিন্ন ধরনের কিছু লক্ষণ দেখা দেয়।

    যেমন—

    • মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া
    • ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করা বন্ধ করে দেওয়া
    • জ্বর আসা বা শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া
    • ঘন ঘন প্রস্রাব করা কিংবা হঠাৎ বিছানায় প্ৰস্রাব করতে শুরু করা
    • বমি হওয়া

    জ্বর আসা ও বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে

    ইউরিন ইনফেকশনের কারণ

    বেশিরভাগ ইউরিন ইনফেকশন এশেরিকিয়া কোলাই বা ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া কারণে হয়।

    সাধারণত মলদ্বার থেকে  বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া মূত্রতন্ত্রে প্রবেশ করে ইউরিন ইনফেকশন ঘটায়। প্রস্রাবের রাস্তা বা মূত্রনালী দিয়ে এসব ব্যাকটেরিয়া মূত্রতন্ত্রে প্রবেশ করে।

    মেয়েদের ইউরিন ইনফেকশন বেশি হবার কারণ

    মেয়েদের মূত্রনালী পুরুষদের মূত্রনালীর তুলনায় দৈর্ঘ্যে অনেক ছোটো।

    এ ছাড়া নারীদের মূত্রনালী পায়ুপথের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই পায়ুপথ থেকে মূত্রনালীতে প্রবেশ করে ইউরিন ইনফেকশন সৃষ্টি করে।

    যেসব কারণে ইউরিন ইনফেকশনের সম্ভাবনা বেড়ে যায়—

    ১. পর্যাপ্ত পানি পান না করলে

    ২. মূত্রতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এমন রোগ হলে। যেমন: কিডনিতে পাথর হওয়া

    ৩. যৌনাঙ্গ পরিষ্কার ও শুকনো না রাখলে

    ৪. যেকোনো কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে। যেমন—

    ৫. টাইপ ২ ডায়াবেটিস অথবা এইচআইভি আক্রান্ত হলে

    ৬. কেমোথেরাপি অথবা দীর্ঘদিন ধরে স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ সেবনকালে

    ৭. গর্ভবতী হলে

    ৮. মূত্রথলি পুরোপুরি খালি করতে বাধা সৃষ্টি করে এমন রোগ হলে। যেমন: পুরুষদের ‘প্রস্টেট গ্রন্থি’ বড় হয়ে যাওয়া, শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা স্নায়ুতন্ত্রের কোনো অসুখ

    ৯. মাসিক চিরতরে বন্ধ হয়ে গেলে। এই ঘটনাকে ‘মেনোপজ’ বলা হয়। এক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন নামক হরমোন কমে যাওয়ায় সংক্ৰমণ প্রবণতা বেড়ে যায়

    ১০. যৌন সহবাস করলে

    ১১. প্রস্রাবের রাস্তায় নল বা ক্যাথেটার পরানো থাকলে

    ১২. ইতঃপূর্বে প্রস্রাবের ইনফেকশন হয়ে থাকলে

    উল্লেখ্য, ইউরিন ইনফেকশন ছোঁয়াচে নয়। এটি যৌন সহবাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। কিন্তু সহবাসের সময়ে ঘর্ষণের কারণে জীবাণু মূত্রনালীতে প্রবেশ করতে পারে কিংবা ইতোমধ্যে মূত্রনালীতে থাকা জীবাণু আরও ভেতরে চলে যেতে পারে।

    ইউরিন ইনফেকশনের প্রকারভেদ

    1. Urethritis (ইউরেথ্রাইটিস):

    ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালীতে প্রবেশ করলে মূত্রনালীর সংক্রমণ হয়। যখন এটি মূত্রনালীতে ছড়িয়ে পড়ে তখন তাকে ইউরেথ্রাইটিস বলে।

    1. Cystitis (সিসটাইটিস):

    ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালীতে প্রবেশ করার পর যদি  মূত্রনালির নিম্নাংশ আক্রান্ত হয়, তখন তাকে ব্লাডার /মূত্রথলির সংক্রমণ বা সিস্টাইটিস বলে

    1. Pyelonephritis (পায়েলোনেফ্রাইটিস):

    ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালীতে প্রবেশ করার পর যদি  মূত্রনালির ঊর্ধ্বাংশ আক্রান্ত হয়, তখন তাকে কিডনির সংক্রমণ বা পায়েলোনেফ্রাইটিস বলে।

    ইউরিন ইনফেকশনের ঘরোয়া চিকিৎসা

    ইউরিন ইনফেকশন তেমন গুরুতর না হলে রোগী কয়েকদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠে। ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলার পাশাপাশি ঘরোয়াভাবে নিচের উপদেশগুলো মেনে চলতে পারেন—

    • পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে এবং প্রচুর পানি পান করতে হবে। এমন পরিমাণে পানি পান করা উচিত যেন নিয়মিত স্বচ্ছ ও হালকা হলুদ রঙের প্রস্রাব হয়। নিয়মিত প্রস্রাব করলে সেটি শরীর থেকে ব্যাকটেরিয়া বের করে দিতে সাহায্য করে।
    • পেটে, পিঠে ও দুই উরুর মাঝে গরম সেঁক নেওয়া যায়। এটি অস্বস্তি উপশমে সাহায্য করতে পারে।
    • সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত যৌন সহবাস থেকে বিরত থাকা ভালো। ইউরিন ইনফেকশন ছোঁয়াচে না হলেও ইনফেকশন থাকা অবস্থায় যৌন সহবাস অস্বস্তিকর হতে পারে।
    • কিডনি রোগ, হৃদরোগ অথবা প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারার মতো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দৈনিক কতটুকু পানি পান করা নিরাপদ সেটি ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।

    ইউরিন ইনফেকশনের জটিলতা

    • ইউরিনের ইনফেকশনের চিকিৎসা না করা হলে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। ইনফেকশন কিডনিতে পৌঁছে গেলে কিডনির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
    • এ ছাড়া ইনফেকশন রক্তে ছড়িয়ে পড়লে ‘সেপসিস’ নামক মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। এমনকি রোগীর জীবন বিপন্ন হতে পারে।
    • পুরুষদের ক্ষেত্রে বারবার সংক্ৰমণ হলে মূত্রনালি সরু হয়ে যেতে পারে। এতে মূত্রতন্ত্রের জটিলতার পাশাপাশি যৌন ও প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যা হতে পারে।
    • গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে কিডনির ইনফেকশনসহ নানান জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন: জন্মের সময়ে শিশুর ওজন কম হওয়া ও নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই বাচ্চা প্রসব (প্রিম্যাচুর বেবি) হয়ে যাওয়া।

    ইউরিন ইনফেকশন প্রতিরোধ

    প্রস্রাবের ইনফেকশন সবসময় প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও কিছু নিয়ম মেনে চললে ইনফেকশন হওয়ার প্রবণতা কমিয়ে আনা যায়।

    যা করবেন

    • টয়লেটে টিস্যু ব্যবহারের সময়ে সামনে থেকে পেছনে পরিষ্কার করুন।
    • যৌনাঙ্গ শুকনো ও পরিষ্কার রাখুন।
    • প্রচুর পানি পান করুন। দৈনিক কমপক্ষে ছয় থেকে আট গ্লাস পানি পান করা উচিত।
    • বাথটাব বা পুকুরে গোসল করার পরিবর্তে শাওয়ার কিংবা বালতির সাহায্যে গোসল করুন।
    • প্রস্রাব করার সময়ে মূত্রথলি সম্পূর্ণ খালি করার চেষ্টা করুন।
    • সহবাসের আগে ও পরে যৌনাঙ্গ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
    • সহবাসের পরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রস্রাব করুন।
    • সুতি কাপড়ের ঢিলেঢালা অন্তর্বাস ব্যবহার করুন।
    • এক থেকে তিন বছর বয়সী বাচ্চার ডায়পার বা কাপড়ের ন্যাপি নিয়মিত পরিবর্তন করুন।

    যা করবেন না

    • প্রস্রাবের বেগ আসলে তা ধরে রাখবেন না।
    • প্রস্রাব করার সময়ে তাড়াহুড়ো করবেন না।
    • যৌনাঙ্গে সুগন্ধি সাবান অথবা ট্যালকম পাউডার ব্যবহার করবেন না।
    • সিনথেটিক কাপড় (যেমন: নাইলন) এর তৈরি আঁটসাঁট অন্তর্বাস ব্যবহার করবেন না।
    • আঁটসাঁট পায়জামা পরবেন না।
    • চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় খাবেন না। এগুলো জীবাণু বেড়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে।
    • যেসব কনডম অথবা ডায়াফ্রামে শুক্রাণু ধ্বংস করার পিচ্ছিলকারক থাকে সেগুলো ব্যবহার করবেন না। এর পরিবর্তে ভিন্ন ধরনের কনডম ও লুব্রিকেন্ট কিংবা জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করুন।

    লেখকঃ

    ডাঃ মুরাদ আলী

    এমডি (হোমিওপ্যাথি), ভারত।

    লেকচারার ইন মেডিসিন (এস.এইচ.এম.সি.এইচ)

    ফাউন্ডার: ইনফো হোমিও।

    মোবাইল: ০১৭৩৩-১৯৩০৬১