Tag: তামাক চাষ

  • উত্তরের চার জেলায় এক বছরে তামাক চাষ বেড়েছে ৪৪ শতাংশ

    উত্তরের চার জেলায় এক বছরে তামাক চাষ বেড়েছে ৪৪ শতাংশ

    দেশে মূলত উত্তরের চারটি জেলায় তামাক চাষ হয়। জেলাগুলো হলো লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো বিনামূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক সরবরাহ করায় তামাক চাষ বেড়েই চলেছে।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, রংপুর অঞ্চলের উৎপাদিত তামাকের ৬০ শতাংশ আসে লালমনিরহাট থেকে। এর পরই রয়েছে রংপুর। এই জেলা থেকে আসে ২০ শতাংশ তামাক। নীলফামারীতে ১৫ শতাংশ আর ৫ শতাংশ গাইবান্ধায়। দেশি-বিদেশি কয়েকটি তামাক কোম্পানি এখানে রীতিমতো তামাকের বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তুলেছে।

    লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলাকে বলা হয় ‘তামাকের রাজধানী’। উপজেলার টিপারবাজার গ্রামের কৃষক সেজাব আলী গত বছর চার বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছিলেন। তার খরচ হয়েছিল ৮৬ হাজার টাকা। ওই জমিতে উৎপাদিত ৩৩ মণ তামাক বিক্রি করেছেন ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকায়। বাড়তি লাভের আশায় এবার সাত বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছেন তিনি।

    সেজাব আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এ বছর তামাকের দাম আরও বাড়বে। কোম্পানির লোকজন এসে তামাক কিনে নিয়ে যায়। তামাকের বাজারদর নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না। এ বছর তামাক দিয়ে মাঠ ভরে গেছে।’

    রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের (৭০) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তিনি গত ৩৯ বছর ধরে তামাক চাষ করছেন। তবে এ বছরের মতো ব্যাপক জমিতে তামাক চাষ আগে কখনো দেখেননি।

    তিনি আরও বলেন, ‘এ বছর অনেক কৃষক নতুনভাবে তামাক চাষ করেছেন। তামাক কোম্পানি থেকেই বীজ, সার, কীটনাশক ও সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হয়। গেল বছর তামাকের বাজারদর বেশি ছিল। তাই এ বছর কৃষকরা তামাক চাষে আরও বেশি ঝুঁকেছেন।’

    লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভাদাই গ্রমের কৃষক প্রবির চন্দ্র বর্মণ (৬৫) বলেন, ‘তামাক জমির উর্বরতা নষ্ট করে। এটি মানব স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এর পরও কৃষকরা তামাক চাষে বেশি আগ্রহী। কারণ, অন্য ফসলের তুলনায় তামাকে লাভ বেশি।’

    ‘তামাক কোম্পানিগুলো যেভাবে কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে তাতে আগামীতে তামাকের চাষ আরও বাড়বে,’ বলেন তিনি।

    অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্সের সদস্য খোরশেদ আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যের চেয়ে দ্বিগুণ জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। তামাক কোম্পানিগুলো অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় তামাকের চাষ বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। তামাক কোম্পানিগুলোর অবাধ কার্যক্রমে লাগাম টানতে হবে। কোম্পানি থেকে সহযোগিতা দেওয়া বন্ধ হলে কৃষকরা তামাক চাষে নিরুৎসাহিত হবেন। এজন্য সরকারের শক্ত পদক্ষেপ দরকার।’

    লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কৃষকদের কোনোভাবেই তামাক চাষ থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। এর জন্য তামাক কোম্পানিগুলো দায়ী। জমির উর্বরতা নষ্ট করছে তামাক। খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’

    রংপুর অঞ্চল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, এই অঞ্চলে তামাক চাষ বেড়ে যাওয়া নিয়ে তারাও চিন্তিত। সরকারিভাবে তামাক চাষ নিষিদ্ধ না হওয়ায় কৃষি বিভাগ শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারছে না। উন্নত দেশগুলো তামাক চাষ বন্ধ করায় বাংলাদেশে এটা বেড়ে গেছে। তামাক কোম্পানিগুলো রংপুর অঞ্চলে আস্তানা গেড়েছে।

    তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকের কাছে তামাক অর্থকরী ফসল হলেও এটি মাটি, পরিবেশ ও মানব-স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এটি কৃষির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।’

    লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার বলেন, তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করতে কৃষি বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

  • কুষ্টিয়ায় তামাকের চাষ বাড়াচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

    কুষ্টিয়ায় তামাকের চাষ বাড়াচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

    কুষ্টিয়ার মিরপুর, ভেড়ামারা ও দৌলতপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে তামাক চাষ হচ্ছে। এর ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব বাড়ছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত সার কীটনাশক প্রয়োগের ফলে মাটির উর্বরা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা অন্য ফসল বাদ দিয়ে তামাক চাষ করছে।

    কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়া জেলায় ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর আবাদযোগ্য জমির মধ্যে এবার বোরো আবাদ হচ্ছে মাত্র ৩৬ হাজার ৮৩০ হেক্টর জমিতে। অপর দিকে তামাক কোম্পানিগুলো প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করেছে।

    বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিরা সার-বীজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামগ্রী প্রদান করে এবং ভালো দামেরও নিশ্চয়তা দেয়। তা ছাড়া টার্গেটের জন্য আলাদাভাবে কার্ড তৈরি করে দেয়। ফলে চাষিরা তামাক চাষে উৎসাহী হয়। মিরপুর উপজেলার বলিদাপাড়া এলাকার তামাক চাষি জীবন আলী মণ্ডল বলেন, তামাক চাষে উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় আমরা এই আবাদ করে থাকি। বিক্রি শেষে মোটা একটা টাকা পাওয়া যায়।

    তামাক চাষে অতিরিক্ত সার ব্যবহার করার ফলে ভালো ফলন হয়। বিক্রির ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়তে হয় না। অথচ টমেটো বা সবজির আবাদ বেশি হলে বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কিংবা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় দাম পাওয়া যায় না। ভালো বাজার ব্যবস্থাপনা এবং চাষিদের স্বার্থ সংরক্ষণ না করায় কৃষকরা অন্য ফসল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

    পরিবেশ বিশেষজ্ঞ গৌতম কুমার রায় বলেন, তামাক চাষের কারণে খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তিনি বলেন, এক একর জমির তামাক জ্বালাতে ৫ মেট্রিক টন জ্বালানি হিসেবে খড়ির প্রয়োজন হয়। এতে বৃক্ষ উজাড় হয়। তামাক জ্বালানোর সময় যে ধোঁয়া বের হয় তাতে ছত্রাক নিকোটিন ও কেমিক্যাল টেস্টিসাইড ড্রকিসহ নানাবিধ উপাদান থাকে যা বাতাসে মিশে যায়। তেমনি চারাগাছ বড় করা পর্যন্ত যে কীটনাশক ব্যবহার করা হয় সেগুলো বৃষ্টির পানিতে নদীতে চলে যায়। এতে ২১৪ প্রজাতির জলজ প্রাণী ধ্বংস হয়।

    গ্রামে তামাক চাষের জন্য কৃষকের পাশাপাশি ঘরের বৌ-ঝিদের এ কাজে সহায়তা করতে হয়। শিক্ষার্থী স্কুলে না গিয়ে তামাকের কাজে যুক্ত থাকে। অনেক সময় গর্ভবতী মহিলারাও এসব কাজে জড়িত থাকার ফলে তাদের ভূমিষ্ঠ সন্তানরা বিকলাঙ্গ হয়। জেলার সবচেয়ে বেশি তামাকের চাষ হয় মিরপুর ও দৌলতপুর উপজেলায়। আর এই দুই উপজেলাতেই সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধীর জন্ম হয়।

    মিরপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, উপজেলায় চলতি বছর তামাক চাষ হয়েছে সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর। আগে এসব জমিতে গম, মসুর, ছোলা, মটর, ভুট্টা, সরিষার আবাদ হতো। কিন্তু তামাক চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে।

    তিনি আরও জানান, এ অঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনা করে বিকল্প ফসল উৎপাদনে সরকারিভাবে সার-বীজ, কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রণোদনা হিসেবে দিলে সাড়া পাওয়া যাবে।

    কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. আকুল উদ্দিন জানান, তামাক চাষ ও সেবন কিডনি, হার্ট, ফুসফুসসহ মানবদেহের স্পর্শকাতর অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি করে। জেলায় এবারও বিপজ্জনক মাত্রায় তামাক আবাদ হয়েছে।