Tag: ছোঁয়াচে_রোগ

  • দাদ নাকি রিংওয়ার্ম? ছত্রাকের সংক্রমণে ত্বকের যত সমস্যা

    দাদ নাকি রিংওয়ার্ম? ছত্রাকের সংক্রমণে ত্বকের যত সমস্যা

    দাদ রোগ একটি পরিচিত চর্মরোগ। এই রোগটি ছত্রাক বা ফাঙ্গাল ইনফেকশনের কারণে ঘটে। একে মেডিকেল ভাষায় টিনিয়া কর্পোরিস (Tinea Corporis )বা রিং ওয়ার্ম(Ring worm) বলা হয় তবে আমরা একে দাউদ বা দাদ নামে চিনি। এটিকে Ring worm বলা হয় কারণ এটি একটি বৃত্তাকার ফুসকুড়ি (রিংয়ের মতো আকৃতির) হয় যা সাধারণত দেখতে লাল হয় এবং চুলকায়।

    দাদ এক ধরনের ছোঁয়াচে রোগ।

    তাই পরিবারের কেউ এমন রোগে আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা করা উচিত। না হলে অল্পদিনেই কিন্তু বাকিদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে দাদ এর প্রাদুর্ভাব থাকলেও আমাদের দেশের মতো গরম ও ঘামপ্রবণ দেশে বেশি দেখা দেয়। সব বয়সের মানুষই এতে আক্রান্ত হতে পারে এবং একবার আক্রান্ত হলে বারবার আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। মনে রাখবেন, এ রোগের চিকিৎসা হোমিওপ্যাথিতে খুবই সহজ এবং দ্রুত আরোগ্য হওয়া সম্ভব, তবে দেরি করলে অনেক সময় জটিলতা সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাই দাদ হলে যথাসম্ভব দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। এজন্য নিজে ভালো থাকতে এবং পরিবারের সদস্যদেরও দাদ থেকে ভালো রাখতে হলে দাদ সর্ম্পকে সাধারণ কিছু তথ্য আপনার জানা থাকা একান্ত প্রয়োজন। যেমন:

    দাদ কেন হয়?

    দাদের লক্ষণ কি কি?

    দাদ রোগ কীভাবে ছড়ায়?

    দাদ প্রতিরোধে আপনার করণীয় কি?

    দাদ রোগের ঘরোয়া চিকিৎসা কি?

    দাদ কেন হয়?

    ডার্মাটোফাইট (Dermatophyte) নামক ছত্রাকের সংক্রমণে এ রোগ হয়।

     দাদ রোগের লক্ষণসমূহঃ

    ১. দাদের প্রধান উপসর্গ হলো ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ। এই র‍্যাশ দেখতে সাধারণত আংটির মতো গোল হয়ে থাকে। রঙ হয় লালচে। তবে রোগীর ত্বকের বর্ণভেদে এটি রূপালি দেখাতে পারে। আবার আশেপাশের ত্বকের চেয়ে গাঢ় বর্ণও ধারণ করতে পারে।

    ২. আক্রান্ত স্থানটি বৃত্তাকার (গোলাকার চাকার ন্যায়) ধারন করে যার কিনারাগুলো সামান্য উঁচু হয়। দিনদিন চাকার আকৃতি বাড়তে থাকে আর কেন্দ্রের বা মাঝখানের দিকে ভালো হয়ে যেতে থাকে।

    ৩. ক্ষতস্থান থেকে খুঁশকির মত চামড়া উঠতে থাকে।

    ৪. কখনো কখনো পানি বা পুঁজ ভর্তি গোঁটা দেখা যায়।

    ৫. ক্ষতস্থান অত্যন্ত চুলকায়।

    ৬. ত্বক কিছুটা খসখসে বা শুকনো হয়ে যাওয়া।

    ৭. আক্রান্ত ত্বকের ওপরে চুল অথবা লোম থাকলে সেগুলো পড়ে যায়।

    দাদ বা রিংওয়ার্ম হওয়ার কারণ কি কি?

    ১) সাধারণত ভেঁজা, স্যাঁতস্যাঁতে ও আদ্র জায়গা ও আবহাওয়াতে, যেখানে পর্যাপ্ত আলোবাতাস পৌছায় না, এ ধরনের জায়গায় দাদ বা রিংওয়ার্ম সৃষ্টিকারী ছত্রাক জন্ম নেয়।

    ২) একই কাপড় না ধুঁয়ে দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে, নোংরা, অপরিস্কার কাপড়চোপড় পরিধান করলে।

    ৩) আক্রান্ত রোগীর জামা-কাপড়, গামছা, তোয়ালে, চিড়ুনি ইত্যাদি ব্যবহারেও দাঁদ হয়ে থাকে।

    ৪) আঁটসাঁট কাপড়চোপড় ও আঁটসাঁট অন্তর্বাস ব্যবহার করলে।

    ৫) পায়ের পুরনো মোজা দ্বারা সংক্রমণ হতে পারে।

    ৬) যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা সহজেই আক্রান্ত হতে পারেন।

    ৭) যারা বেশী ঘামেন।

    ৮) পোষ্য প্রাণী থেকেও ছড়াতে পারে।

    শরীরের কোন কোন স্থানে দাদ রোগ হয়?

    আমাদের শরীরের যেকোনো অংশে দাদ দেখা দিতে পারে। যেমন: কুঁচকি, মাথার ত্বক, হাত, পা, পায়ের পাতা, এমনকি হাত-পায়ের নখ। আক্রান্ত স্থানভেদে দাদের লক্ষণেও ভিন্নতা আসতে পারে। যেমন, র‍্যাশের আকারে ভিন্নতা থাকতে পারে। দাদের র‍্যাশ আস্তে আস্তে বড় হয়ে ছড়িয়ে যেতে পারে। আবার কখনো কখনো একাধিক র‍্যাশ দেখা দিতে পারে।

    নিচে শরীরের বিশেষ কিছু স্থানের দাদ রোগ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরা হয়েছে—

    মাথার ত্বক: মাথার ত্বকে দাদ দেখা দিলে সাধারণত আক্রান্ত অংশের চুল পড়ে টাক সৃষ্টি হয়। টাক পড়া অংশে লালচে, গোলাকার ও ছোটো ছোটো আঁইশযুক্ত র‍্যাশ তৈরি হয়। এতে চুলকানি থাকতে পারে।

    ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়লে টাক পড়া অংশের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে এবং মাথার ত্বকে দাদ রোগের একাধিক র‍্যাশ তৈরি হতে পারে।

    মাথার ত্বকের দাদ রোগ প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

    পা ও পায়ের আংগুলের ফাঁকে

    এক্ষেত্রে আক্রান্ত স্থানটি লাল হয়ে ফুলে ওঠে এবং সেখান থেকে চামড়া উঠে যেতে থাকে। সেই সাথে পায়ের আঙ্গুলগুলোর ফাঁকে ফাঁকে চুলকানি হয়। বিশেষ করে পায়ের সবচেয়ে ছোটো আঙুল দুটির মাঝখানের অংশে চুলকানি হয়ে থাকে।

    পায়ে দাদ হলে পায়ের পাতা ও গোড়ালিও আক্রান্ত হতে পারে। এমনকি গুরতর ক্ষেত্রে পায়ের ত্বকে ফোস্কা পড়তে পারে।

    (ছবি: পা ও পায়ের আংগুলের ফাঁকে দাদ রোগ)

    কুঁচকি

    কুঁচকিতে দাদ হলে সেটি সাধারণত ঊরুর ভেতরের দিকের ভাঁজে লাল লাল র‍্যাশ হিসেবে দেখা যায়। র‍্যাশে আঁইশ থাকে এবং চুলকানি হয়।

    দাঁড়ি

    গাল, চিবুক ও গলার ওপরের অংশে এই ধরনের দাদ দেখা দেয়। এটিও লাল লাল র‍্যাশ হিসেবে দেখা যায়, যাতে আঁইশ থাকে এবং চুলকানি হয়। দাঁড়িতে দাদ হলে অনেক সময় র‍্যাশের ওপরে চলটা পড়ে।আবার ভেতরে পুঁজও জমতে পারে। একই সাথে আক্রান্ত অংশের চুল পড়ে যেতে পারে।)

    চামড়ার যে জায়গায় সংক্রমণ হয় সেই জায়গার নামানুসারে দাঁদের নামকরণ করা হয়। উদাহরণ স্বরুপঃ

    ১)টিনিয়া কর্পোরিসঃশরীরের যেকোন জায়গায় ছত্রাকের  সংক্রমণ হলে তাকে সাধারণত টিনিয়া কর্পোরিস বলা হয়।

    ২)টিনিয়া ক্যাপিটিসঃ মাথার তালুতে ছত্রাক সংক্রমণ।

    ৩)টিনিয়া ক্রুরিসঃকুঁচকিতে ছত্রাকের সংক্রমণ।

    ৪)টিনিয়া আঙ্গুইয়ামঃ নখের ছত্রাক সংক্রমণ।

    ৫)টিনিয়া ম্যানুমঃ হাতের ছত্রাক সংক্রমণ।

    ৫)টিনিয়া পেডিস(অ্যাথলেটস ফুট):পায়ের ছত্রাক সংক্রমণ।

    দাদ রোগ কীভাবে ছড়ায়?

    এটি মূলত তিনভাবে ছড়ায়—

    ১. আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা তার ব্যবহার্য জিনিসের সংস্পর্শ থেকে। যেমন: চিরুনি, তোয়ালে ও বিছানার চাদর।

    ২. দাদ আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শ থেকে। যেমন: কুকুর, বিড়াল, গরু, ছাগল ও ঘোড়া।

    ৩. দাদ রোগের জীবাণু আছে এমন পরিবেশ, বিশেষ করে স্যাঁতস্যাঁতে স্থান থেকে।

    প্রতিরোধঃ

    জীবন ধারা বা লাইফস্টাইলের পরিবর্তনের মাধ্যমে দাঁদ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। স্বাস্থ্যকর কিছু অভ্যাস এবং দৈনন্দিন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে দাঁদ সংক্রমণ রোধ করা যায়ঃ

    ১) ত্বক সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও শুষ্ক রাখুন।

    ২)পরিস্কার,ঢিলেঢালা এবং শুষ্ক কাপড় (বিশেষত সুতি কাপড়) এবং অন্তর্বাস পড়িধান করুন।

    ৩) আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহার্য জিনিস ব্যবহার করলেও দাদ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই দাদ আছে এমন কারও সাথে পোশাক, তোয়ালে, চাদর বা অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিস শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন।

    ৪) খুব আঁটসাঁট জুতা পরলে এবং অতিরিক্ত ঘাম হলে দাদ রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই এমন জুতো ব্যবহার করুন যা আপনার পায়ের চারপাশে অবাধে বাতাস চলাচল করতে দেয়।

    ৫)আক্রান্ত স্থান স্পর্শ করার পর সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিন,যাতে সংক্রমণ দেহের অন্যত্র না ছড়ায়।

    ৭) প্রতিদিনের পরিহিত কাপড়চোপড়, গেঞ্জি, মোজা, আণ্ডারওয়্যার প্রতিদিন ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

    ৯) পোষ্য-প্রাণীর সংস্পর্শে আসার পর হাত ধুয়ে ফেলুন।

    ১১) স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে দাদ রোগের ঝুঁকি বেশি। তাই জিম কিংবা চেঞ্জিং রুম ও পাবলিক গোসলখানা এর মতো স্থানে খালি পায়ে হাঁটা থেকে বিরত থাকা উচিত।

    দাদ রোগের ঘরোয়া চিকিৎসা

    যা করবেন

    ১.যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করুন।

    ২.ত্বক সবসময় শুকনো ও পরিষ্কার রাখুন। আক্রান্ত ত্বক স্পর্শ করলে সাথে সাথে হাত ধুয়ে ফেলুন।

    ৩. দৈনন্দিন ব্যবহারের কাপড় (যেমন: তোয়ালে ও বিছানার চাদর) নিয়মিত ফুটন্ত পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।

    যা করবেন না

    ১.দাদ হয়েছে এমন কারও ব্যবহার্য জিনিস (যেমন: তোয়ালে, চিরুনি ও বিছানার চাদর) ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

    ২.আক্রান্ত ত্বক স্পর্শ করা অথবা চুলকানো থেকে বিরত থাকুন। নাহলে দাদ শরীরের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি চুলকানোর কারণে ত্বকে ভিন্ন আরেকটি জীবাণু আক্রমণ করে ইনফেকশন ঘটাতে পারে, যা দাদের চিকিৎসাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

    লেখকঃ

    ডাঃ মুরাদ আলী

    এমডি (হোমিওপ্যাথি), ভারত।

    লেকচারার ইন মেডিসিন (এস.এইচ.এম.সি.এইচ)

    ফাউন্ডার: ইনফো হোমিও।

    মোবাইল: ০১৭৩৩-১৯৩০৬১