Tag: কৃষক কণ্ঠ

  • পরিবেশবান্ধব বিপ্লবের গল্পে বিষাক্ত সাকার ফিশ থেকে প্রাণিখাদ্য

    পরিবেশবান্ধব বিপ্লবের গল্পে বিষাক্ত সাকার ফিশ থেকে প্রাণিখাদ্য

    বাংলাদেশের নদী, খাল, বিল ও হাওর অঞ্চলে এক সময় বৈচিত্র্যময় মাছের প্রাচুর্য ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জলজ পরিবেশে আগ্রাসী প্রজাতি সাকার ফিশের (চানা স্ট্রায়াটা) ব্যাপক বিস্তার এই ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। স্থানীয়ভাবে এই মাছকে বিষাক্ত ও নিম্নমানের হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর প্রভাবে নদীর স্বাভাবিক মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, জলজ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর মৎস্যজীবীদের জীবিকা সংকটাপন্ন হচ্ছে। কিন্তু এই সমস্যাকে সম্পদে রূপান্তর করার অভিনব সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) একদল উদ্যমী শিক্ষার্থী, গবেষক ও উদ্যোক্তা। তাদের গবেষণা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হলো সাকার ফিশ থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ প্রাণিখাদ্য তৈরির সফল প্রযুক্তি। এই দীর্ঘ প্রতিবেদনে আমরা জানব কীভাবে একটি পরিবেশবিধ্বংসী মাছকে কাজে লাগিয়ে টেকসই খাদ্য উৎপাদনের মডেল তৈরি করা সম্ভব হলো, এবং এই উদ্ভাবন কীভাবে দেশের অর্থনীতি ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

    সাকার ফিশ (স্ট্রাইডেড স্নেকহেড) দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় প্রজাতি হলেও বাংলাদেশের জলাশয়ে এর অস্তিত্ব ছিল সীমিত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নদীদূষণ ও অন্যান্য পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে গত দুই দশকে এটি দেশের প্রায় সব প্রধান নদী ও জলাভূমিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে—দূষিত পানি, অক্সিজেনের স্বল্পতা, এমনকি শুষ্ক মৌসুমে কাদার নিচেও এটি বেঁচে থাকতে পারে। প্রতিবছর একটি সাকার মাছ হাজার হাজার ডিম পাড়ে, যা এর বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে।

    সাকার ফিশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি স্থানীয় মাছের ডিম ও পোনা খেয়ে ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গা নদীতে গত পাঁচ বছরে স্থানীয় মাছের প্রজাতির সংখ্যা ৪০% কমেছে, যার মূল কারণ সাকার ফিশের আধিপত্য। হাওর অঞ্চলেও একই চিত্র। মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আগে যেখানে জালে নানান রকম মাছ উঠত, এখন সেখানে ৬০-৭০% সাকার ফিশ ধরা পড়ে। কিন্তু এই মাছের বাজারমূল্য প্রায় শূন্য—বিষাক্ততা ও দুর্গন্ধের কারণে মানুষ এটি খেতে চায় না, পশুখাদ্য হিসেবেও এর ব্যবহার সীমিত।

    নরসিংদীর মৎস্যজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, “আগে প্রতিদিন ৫০০-৬০০ টাকার মাছ বিক্রি করতাম। এখন সাকার ফিশ ছাড়া অন্য মাছ পাওয়াই দায়। বিক্রি করা যায় না বলে এগুলো ফেলে দিতে হয়।” এভাবে প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকার ক্ষতি হচ্ছে মৎস্যজীবীদের। পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন, সাকার ফিশের অপ্রতিরোধ্য বিস্তার যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তবে আগামী এক দশকে দেশের জলজ সম্পদ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

    ২০২২ সালের শুরুতে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের একদল শিক্ষার্থী ও গবেষক এই সমস্যা সমাধানের জন্য গবেষণা শুরু করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল সাকার ফিশকে এমনভাবে প্রক্রিয়াজাত করা যাতে তা পোষা প্রাণী, পোলট্রি ও মাছের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য তৈরি করা যায়। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইয়াস ওয়ার্ল্ড এই প্রকল্পে অর্থায়ন করে, যা “বর্জ্য থেকে সম্পদ” (ওয়েস্ট টু ওয়েলথ) এবং “সমস্যা থেকে সম্পদ” (প্রব্লেম টু ওয়েলথ) নামক বৈশ্বিক ধারণাকে অনুসরণ করে।

    সাকার ফিশ থেকে খাদ্য তৈরির প্রধান বাধা ছিল এর মধ্যে থাকা বিষাক্ত উপাদান ও দুর্গন্ধ। গবেষক দলটি নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে এই সমস্যা মোকাবেলা করেন:

    ১. ডিটক্সিফিকেশন (বিষাক্ততা দূরীকরণ): বিশেষ ফার্মেন্টেশন (গাঁজন) পদ্ধতি ব্যবহার করে মাছের টিস্যু থেকে ভারী ধাতু ও অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ দূর করা হয়।

    ২. পুষ্টি সংযোজন: প্রোটিন সমৃদ্ধ সাকার ফিশের মাংসের গুঁড়ার সাথে সয়াবিন মিল, ভুট্টা, ভিটামিন ও মিনারেল মিশিয়ে সুষম খাদ্যের ফর্মুলা তৈরি করা হয়।

    ৩. প্যালাটেবিলিটি বৃদ্ধি: প্রাণীদের কাছে আকর্ষণীয় করতে খাদ্যে প্রাকৃতিক ফ্লেভার যুক্ত করা হয়।

    গবেষণার প্রথম ধাপে বিড়ালের উপর পরীক্ষা চালানো হয়। প্রাথমিকভাবে ৭০% বিড়াল এই খাদ্য গ্রহণ করে, এবং তাদের স্বাস্থ্য ও ওজন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ফল দেখা যায়। দ্বিতীয় ধাপে ফর্মুলা উন্নত করে ৮৫% সাফল্য অর্জিত হয়। শেকৃবির অ্যানিম্যাল সায়েন্স বিভাগের ল্যাবরেটরিতে পোলট্রির জন্য প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য তৈরির পরীক্ষাও সফল হয়েছে।

    ২০২৪ সালে ইয়াস ওয়ার্ল্ডের গ্লোবাল প্রজেক্ট কম্পিটিশনে এই প্রকল্পটি বিশ্বের ১২০টি দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থান অর্জন করে। “সাকার ফিশ থেকে প্রাণিখাদ্য” থিমের অধীনে এই উদ্ভাবনী সমাধান আন্তর্জাতিক জাজ প্যানেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রতিযোগিতার একজন জাজ, ড. মারিয়া গোন্জালেজ বলেন, “এই প্রকল্পটি শুধু একটি স্থানীয় সমস্যার সমাধানই নয়, এটি বিশ্বব্যাপী আগ্রাসী প্রজাতি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি মডেল হতে পারে।”

    ফিশারিজ বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী নিয়ামুল ইসলাম, যিনি এই প্রকল্পের মূল সদস্য, বলেন: “আমরা দেখিয়েছি যে কোনো সমস্যাই সম্ভাবনায় রূপান্তরিত হতে পারে। সাকার ফিশকে সাধারণত শত্রু ভাবা হয়, কিন্তু আমরা এটিকে প্রাণিখাদ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য জয়-জয় পরিস্থিতি তৈরি করেছি। আমাদের লক্ষ্য হলো এই প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে দেশের পশুখাদ্যের আমদানি কমে এবং মৎস্যজীবীরা সাকার ফিশ বিক্রি করে আয় করতে পারে।”

    প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক ড. হাবীব বলেন, “সাকার ফিশ নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক বা জাল ব্যবহার করা অকার্যকর। আমরা বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোলের একটি মডেল তৈরি করেছি—এটি যত বেশি খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হবে, ততই এর জনসংখ্যা কমবে। বিড়ালের খাদ্য হিসেবে সাফল্যের পর আমরা এখন কুকুর, মুরগি ও মাছের খাদ্য নিয়ে কাজ করছি।”

    বাংলাদেশে পোষা প্রাণীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। শুধু ঢাকাতেই প্রায় ১৫ লক্ষ বিড়াল ও কুকুর রয়েছে, এবং প্রতি বছর ২০% হারে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে পশুখাদ্যের ৮০% আমদানি করা হয়, যা বছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে। শেকৃবির এই খাদ্য উৎপাদন শুরু হলে দাম স্থানীয় বাজারের তুলনায় ৩০-৪০% কম হবে, যা আমদানির উপর চাপ কমাবে।

    প্রকল্পটিকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে প্রয়োজন বড় আকারের উৎপাদন ইউনিট, সরকারি অনুমোদন, এবং বিপণন কৌশল। ইতিমধ্যে এগ্রো-প্রসেসিং কোম্পানি প্রাণ ও এসিআইয়ের সাথে আলোচনা চলছে। এছাড়া, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এই উদ্যোগকে সহায়তা করার জন্য প্রযুক্তিগত কমিটি গঠন করেছে।

    সাকার ফিশের জনসংখ্যা ৫০% কমানো গেলে, SAU-এর মডেলিং অনুযায়ী, আগামী ৫ বছরে স্থানীয় মাছের প্রজাতি ২৫-৩০% পুনরুদ্ধার হতে পারে। এছাড়া, এই প্রকল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমির জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ তৈরি করেছে।

    বাংলাদেশের এই সাফল্য বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও অনুপ্রেরণাদায়ক। উদাহরণস্বরূপ, ক্যারিবিয়ানে লায়নফিশের আগ্রাসন বা উত্তর আমেরিকায় স্নেকহেড মাছের সমস্যা সমাধানেও এই মডেল কাজে লাগানো যেতে পারে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. রবার্ট ক্লার্ক মন্তব্য করেন, “এটি প্রমাণ করেছে যে স্থানীয় উদ্ভাবন বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সংকট মোকাবেলায় কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে।”

    শেকৃবির এই গবেষণা শুধু একটি মাছের গল্প নয়—এটি একটি দৃষ্টান্ত যে বিজ্ঞান, উদ্ভাবনী চিন্তা ও স্থানীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো সংকটকে সুযোগে পরিণত করা সম্ভব। সাকার ফিশ থেকে প্রাণিখাদ্য তৈরির এই প্রযুক্তি যদি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়, তবে এটি বাংলাদেশের জলজ বাস্তুতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন, মৎস্যজীবীদের আয় বৃদ্ধি, এবং পশুখাদ্য শিল্পের স্থিতিশীলতায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পের সাফল্য আমাদের শেখায় যে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ না করে তার সাথে সহাবস্থান করাই টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি।

     

  • পরিবেশবান্ধব পর্যটনের পথে আশাজাগানিয়া অভিযাত্রা

    পরিবেশবান্ধব পর্যটনের পথে আশাজাগানিয়া অভিযাত্রা

    বিশ্বজুড়ে পর্যটন শিল্পের রূপান্তরের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে—পরিবেশবান্ধব পর্যটন। এই ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভ্রমণ, স্থানীয় সম্প্রদায়ের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা, এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার। বাংলাদেশেও এই প্রবণতা বাড়ছে আশাজাগানিয়া গতিতে। সুনীল সাগরের কোলজুড়ে কক্সবাজার থেকে শুরু করে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন, পাহাড়ি অঞ্চলের আদিবাসী গ্রাম থেকে নদীবিধৌত গ্রামীণ বাংলা—সবখানেই গড়ে উঠছে পরিবেশ-সচেতন পর্যটনের নানা উদ্যোগ। এই পরিবর্তন শুধু প্রকৃতিকে রক্ষা করছে না, বরং কৃষক, মৎস্যজীবী, ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পথ দেখাচ্ছে।

    বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পৃথিবীবিখ্যাত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পর্যটনের নামে অপরিকল্পিত নির্মাণ, প্লাস্টিক বর্জ্যের ছড়াছড়ি, এবং সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণহীনতা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটক ও উদ্যোক্তাদের চিন্তায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন ভ্রমণ মানেই কেবল দর্শনীয় স্থান দেখা নয়—এটি একটি দায়িত্বশীল অভিজ্ঞতা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে মাটির কথা, পানির কথা, মানুষের কথা ভাবা হয়। সুন্দরবনের গহিনে ইকো-কটেজ থেকে শুরু করে রাঙ্গামাটির পাহাড়ি রিসোর্টে সৌরশক্তির ব্যবহার, সেন্ট মার্টিনে প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পেইন—এসবই এখন টেকসই পর্যটনের প্রতীক।

    এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে বৈশ্বিক জলবায়ু সচেতনতা। নতুন প্রজন্মের ভ্রমণপিপাসুরা চাইছেন কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো, স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান করা, এবং প্রকৃতির কাছ থেকে শেখা। বাংলাদেশের গ্রামীণ পর্যটন এই চাহিদাকে পূরণ করছে অনন্যভাবে। সিলেটের চা বাগানের পাশে গড়ে উঠেছে জৈব খামারভিত্তিক স্টে-ক্যাম্প, যেখানে পর্যটকরা নিজ হাতে চা পাতা তুলতে পারেন, স্থানীয় খাবার রান্না শিখতে পারেন। নেত্রকোনার চলনবিলে নৌকায় ভেসে দেখা যায় জলাভূমির জীববৈচিত্র্য—যেখানে স্থানীয় মাঝিরা গাইডের ভূমিকায়। এভাবে পর্যটনের অর্থ স্থানীয় মানুষের হাতে রয়ে যাচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন গতি দিচ্ছে।

    সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বও এই খাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড “গ্রিন ট্যুরিজম গাইডলাইন” চালু করেছে, যাতে হোটেল ও রিসোর্টগুলো শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এছাড়া, সুন্দরবন এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প চালু হয়েছে, যা পর্যটকদের অংশগ্রহণে সফল হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থাগুলো আদিবাসী নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গাইড হিসেবে গড়ে তুলছে, যারা তাদের ঐতিহ্যবাহী গল্প ও শিল্পকে বিশ্বের সাথে ভাগ করে নিচ্ছেন।

    তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। পরিবেশবান্ধব পর্যটনের প্রসারে প্রয়োজন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস। এছাড়া, পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি—যেমন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়ানো, স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান করা। বাংলাদেশের কিছু প্রত্যন্ত এলাকায় এখনও যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল, যা পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্প্রসারণে বাধা।

    ভবিষ্যতে এই শিল্পের সম্ভাবনা অপার। বিশ্বজুড়ে টেকসই পর্যটনের চাহিদা বাড়ছে, এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ এই খাতকে সমৃদ্ধ করতে পারে। যদি সরকার, স্থানীয় সম্প্রদায়, ও পর্যটকরা একসাথে কাজ করে, তাহলে পরিবেশবান্ধব পর্যটন হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন ইঞ্জিন।

  • আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নির্দেশিকা হালনাগাদ

    আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নির্দেশিকা হালনাগাদ

    বৈশ্বিক মহামারি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রভাবে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নির্দেশিকা ক্রমাগত হালনাগাদ হচ্ছে। এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে প্রতিটি দেশই নিজেদের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জনস্বাস্থ্যের ভারসাম্য রক্ষায় নতুন নীতি প্রণয়ন করছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি কোটি ভ্রমণপিপাসু, ব্যবসায়ী ও প্রবাসী শ্রমিকের জন্য এই হালনাগাদকৃত নির্দেশিকা জানা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই প্রবন্ধে আমরা আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সংশ্লিষ্ট সর্বশেষ নীতিমালা, ডিজিটাল রূপান্তর, স্বাস্থ্যবিধি ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করব।

    কোভিড-১৯ মহামারি আন্তর্জাতিক ভ্রমণে আমূল পরিবর্তন এনেছে। যদিও ২০২৩ সালে এসে অনেক দেশ কোয়ারেন্টাইন নীতি শিথিল করেছে, তবুও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত শর্তাবলি এখনও প্রাসঙ্গিক। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা বিদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য পূর্ণ ডোজ টিকার প্রমাণ চেয়ে থাকে। অন্যদিকে, জাপান ও চীন মতো দেশগুলো নেগেটিভ PCR টেস্ট রিপোর্ট বাধ্যতামূলক রেখেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের “ইইউ ডিজিটাল কোভিড সার্টিফিকেট” একটি মডেল হিসেবে কাজ করছে, যা টিকা, টেস্ট বা সুস্থতার সার্টিফিকেট একীভূত করে। বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য এই সার্টিফিকেট অপরিহার্য, বিশেষত স্কেংজেনভুক্ত দেশগুলোতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে।

    আন্তর্জাতিক ভ্রমণে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার অভূতপূর্ব গতি পেয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ভারতের মতো দেশগুলো ই-ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করেছে, যেখানে অনলাইনে আবেদন করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভিসা মিলছে। বাংলাদেশ সরকারও ২০২৩ সালে ৪০টি দেশের জন্য “অন অ্যারাইভাল ভিসা” চালু করেছে, যা পর্যটনকে উদ্দীপিত করছে। এছাড়া, বিমানবন্দরগুলোতে বায়োমেট্রিক স্ক্রিনিং (চেহারা ও আঙুলের ছাপ শনাক্তকরণ) চালু হয়েছে, যা সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করছে। তবে এই প্রযুক্তির প্রসারে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল বিভাজন একটি চ্যালেঞ্জ।

    জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অনেক দেশ পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ নীতি গ্রহণ করেছে। ফ্রান্স ও নিউজিল্যান্ড স্থানীয় ফ্লাইটের বিকল্প হিসেবে রেলভ্রমণকে প্রণোদনা দিচ্ছে। এছাড়া, কার্বন অফসেট ফি (যেমন—জার্মানির বিমান ভাড়ায় অতিরিক্ত পরিবেশ কর) চালু হয়েছে। বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য এই নীতিগুলো জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভবিষ্যতে এয়ারলাইন্সগুলো “গ্রিন ফ্লাইট” সার্টিফিকেট চালু করতে পারে, যা পরিবেশ-সচেতন ভ্রমণকে অগ্রাধিকার দেবে।

    রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মিয়ানমার সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নির্দেশিকাকে প্রভাবিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ান নাগরিকদের জন্য ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবের শ্রম ভিসা নীতিতে পরিবর্তন এসেছে—যেমন, দক্ষতার স্বীকৃতির জন্য নতুন সার্টিফিকেশন প্রয়োজন। এ ধরনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভ্রমণ পূর্বাভাস ও ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি মনিটরিং জরুরি।

    বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সহজীকরণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন “স্মার্ট পাসপোর্ট” চালু করা হয়েছে, যা বায়োমেট্রিক ডেটা সমৃদ্ধ। এছাড়া, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বয়ংক্রিয় ইমিগ্রেশন সিস্টেম (e-gate) চালু হয়েছে, যা ভ্রমণ সময় কমিয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে—যেমন, ভিসা প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি, স্বাস্থ্য সার্টিফিকেট জালিয়াতি ও সীমান্তে স্বচ্ছতার অভাব। বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য পরামর্শ হলো—যেকোনো দেশে ভ্রমণের আগে ঐ দেশের দূতাবাসের ওয়েবসাইট থেকে হালনাগাদ তথ্য নেওয়া।

    ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নির্দেশিকা আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) মাধ্যমে ভার্চুয়াল ভিসা ইন্টারভিউ, মেটাভার্সে ডিজিটাল ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন—এসব ধারণা বাস্তবায়নের পথে। এছাড়া, AI-চালিত কাস্টমস চেক ও ব্লকচেইনভিত্তিক স্বাস্থ্য রেকর্ড শেয়ারিং সিস্টেম আসতে পারে। তবে এসব উদ্ভাবন নিয়ে গোপনীয়তা ও ডেটা সুরক্ষার প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

    হালনাগাদকৃত ভ্রমণ নির্দেশিকা শুধু ব্যক্তি পর্যায়েই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। পর্যটন-নির্ভর দেশগুলো (যেমন—থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ) তাদের জিডিপি পুনরুদ্ধারে ভিসা শিথিল করেছে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য নীতি কঠোর থাকায় চীনের মতো দেশগুলো পর্যটন আয় হারাচ্ছে। সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ভ্রমণ নীতির উদারতা মানুষে মানুষে সংযোগ বাড়াচ্ছে, যা শান্তি ও সমঝোতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

    আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নির্দেশিকা এখন আর স্থির নয়—এটি গতিশীল ও পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তনশীল। এই প্রেক্ষাপটে ভ্রমণকারী, নীতিনির্ধারক ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অভিযোজনশীলতা ও সচেতনতা ключ। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। ভবিষ্যতের ভ্রমণ হবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও ডিজিটাল—এই লক্ষ্যে আমাদের প্রস্তুত হতে হবে।

  • আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বিধিনিষেধ পরিবর্তন

    আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বিধিনিষেধ পরিবর্তন

    বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ইতিহাসে কোভিড-১৯ মহামারি এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। ২০২০ সালের শুরুতে চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই দেশে দেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, কোয়ারেন্টাইন নীতি, এবং স্বাস্থ্যবিধির কঠোর প্রয়োগ দেখা গেছে। তবে সময়ের সাথে সাথে টিকা উদ্ভাবন, ভাইরাসের প্রকৃতি বোঝা, এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে এই বিধিনিষেধগুলোর ধারায় পরিবর্তন এসেছে। আজকের বিশ্বে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ শুধু পাসপোর্ট ও ভিসার অধীনেই নয়, এটি এখন স্বাস্থ্য সনদ, টিকার ডোজ, এবং জৈবনিরাপত্তার গ্যারান্টির সাথে জড়িত। এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি ভ্রমণকারী, পর্যটন শিল্প, এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।

    মহামারির শুরুর দিকে দেশগুলো প্রবল অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে গেছে। ইতালি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো যখন সংক্রমণের চূড়ায়, তখন সীমান্ত বন্ধ করা হয়েছিল জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও কঠোর লকডাউন এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই সময়ে শুধু জরুরি ভিত্তিতে কূটনৈতিক ও মানবিক ফ্লাইট পরিচালিত হতো। তবে এই বিধিনিষেধের অর্থনৈতিক ফলাফল ছিল ভয়াবহ—পর্যটন শিল্প ধসে পড়া, হাজারো মানুষ কর্মহীন হওয়া, এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস নামা।

    ২০২১ সালের মাঝামাঝি টিকা উদ্ভাবনের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) টিকার বৈশ্বিক বন্টনের ওপর জোর দিলেও ধনী দেশগুলোর টিকা মজুদদারি “ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ” এর জন্ম দেয়। এই সময়ে আন্তর্জাতিক ভ্রমণে টিকার সনদ বাধ্যতামূলক করা শুরু হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন “ইইউ ডিজিটাল কোভিড সার্টিফিকেট” চালু করে, যা টিকা, টেস্ট, বা সুস্থতার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। এশিয়ার অনেক দেশ, যেমন সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া, “ভ্যাকসিন ট্রাভেল লেন” চালু করে নির্বাচিত দেশগুলোর সাথে ভ্রমণ সুবিধা বাড়ায়। তবে টিকার বৈষম্য ছিল সুস্পষ্ট—আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ টিকা সংকটে থাকায় তাদের নাগরিকরা ভ্রমণে পিছিয়ে পড়ে।

    ২০২২ সালে ওমিক্রন ভেরিয়েন্টের প্রাদুর্ভাব বিধিনিষেধের পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে। যদিও এই ভেরিয়েন্ট দ্রুত ছড়ালেও গুরুতর অসুস্থতার হার কম ছিল, ফলে অনেক দেশ স্বাস্থ্যবিধি শিথিল করে। যুক্তরাজ্য, কানাডা, এবং অস্ট্রেলিয়া বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন তুলে নেয় এবং টিকার সনদ বাধ্যতামূলক করা বন্ধ করে। এই নীতির পেছনে যুক্তি ছিল—”কোভিড-১৯ এর সাথে বসবাস শেখা”। তবে চীন, জাপান, এবং নিউজিল্যান্ড কঠোর শূন্য কোভিড নীতি বজায় রাখে, যা পরবর্তীতে অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক অসন্তোষের কারণে প্রত্যাহার করা হয়।

    বর্তমানে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ প্রায় পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে, তবে কিছু রেশ রয়ে গেছে। বেশিরভাগ দেশ এখন আর আগের মতো কঠোর টেস্ট বা কোয়ারেন্টাইনের বিধি রাখছে না। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য টিকার প্রমাণ চায়, কিন্তু আগের মতো নেগেটিভ টেস্টের রিপোর্ট জমা দিতে হয় না। অন্যদিকে, ভারত “এয়ার সুভিধা” অ্যাপ চালু করেছে, যেখানে ভ্রমণকারীরা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সকল ডকুমেন্ট আপলোড করতে পারেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, যেমন থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম, পর্যটন পুনরুজ্জীবনে বিশেষ ভিসা সুবিধা দিচ্ছে—যেমন “স্যান্ডবক্স প্রোগ্রাম” বা দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল নোমাড ভিসা।

    এই পরিবর্তনের মূলে কাজ করেছে অর্থনৈতিক চাপ। পর্যটনশিল্প বৈশ্বিক জিডিপির ১০% এবং ৩৩০ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের উৎস। থাইল্যান্ডের মতো দেশ, যেখানে পর্যটন জিডিপির ২০% অবদান রাখে, তারা দ্রুত ভ্রমণ নীতি শিথিল করে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। একইভাবে, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে ভিসা-অন-অ্যারাইভাল এবং ট্যাক্স ছাড়ের মতো প্রণোদনা দিয়েছে।

    তবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি এখনও অমীমাংসিত। নতুন ভেরিয়েন্টের উত্থান, যেমন ক্রোনাস বা এরিস, কিছু দেশকে সতর্কতা অবলম্বন করতে বাধ্য করেছে। চীন ২০২৩ সালের শুরুতে শূন্য কোভিড নীতি তুলে নিলেও হঠাৎ সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে আবারও ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এই অনিশ্চয়তা ভ্রমণ শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে বাধা দিচ্ছে।

    ডিজিটাল প্রযুক্তি ভ্রমণ বিধিনিষেধ ব্যবস্থাপনাকে সহজ করেছে। “কমনপাস” বা “ভেরিফ্লাই” এর মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম স্বাস্থ্য সনদ যাচাইকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করেছে। এছাড়া, বায়োমেট্রিক সিস্টেম, যেমন ফেসিয়াল রিকগনিশন, বিমানবন্দরে ভিড় কমাতে সাহায্য করেছে। তবে ডিজিটাল বিভাজন এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ—অনুন্নত দেশগুলোর অনেক নাগরিকের কাছে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট সুবিধা সীমিত।

    ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নীতিতে স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, স্বাস্থ্য ঝুঁকির স্তরভেদে নীতি প্রণয়ন করতে—যেমন, “লাল”, “হলুদ”, ও “সবুজ” তালিকা তৈরি। এছাড়া, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং টিকা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি, যাতে ভবিষ্যতের মহামারিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়।

  • সৌদি আরবকে ছাড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও আরব আমিরাত

    সৌদি আরবকে ছাড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও আরব আমিরাত

    চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের প্রধান উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরব। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে—এ সময়ে শীর্ষ ৩০ দেশ থেকে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১৫ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার।

    গত ডিসেম্বরে এই রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ বেড়ে গেলেও জানুয়ারিতে তা কমতে শুরু করে। সম্ভবত উৎসব-পরবর্তী মন্দা ও অর্থনৈতিক সমন্বয়ের কারণে এমনটি হয়েছে।

    ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স এসেছে দুই দশমিক নয় বিলিয়ন ডলার। গত বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ৫৬৫ দশমিক শূন্য চার মিলিয়ন ডলার। জানুয়ারিতে তা কমে হয় ৪০৭ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলার।

    দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্য থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল এক দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্য থেকে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৪৮ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন ডলার। গত জানুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ২৭৩ দশমিক চার মিলিয়ন ডলার।একই সময়ে সৌদি আরব থেকে এসেছে এক দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। গত ডিসেম্বর এই দেশ থেকে এসেছে ২৯০ মিলিয়ন ডলার, যা জানুয়ারিতে কমে যায় ৩০ শতাংশ।

    রেমিট্যান্স আয়ের দিক থেকে চতুর্থ অবস্থানে থাকা আরব আমিরাত থেকে এসেছে দুই দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার। এই দেশ থেকে গত ডিসেম্বরে এসেছিল ৩৭০ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার, যা জানুয়ারিতে কমে হয় ২৪৯ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলার।

    শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে এসেছিল ৮৭৬ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ডলার ও কুয়েত থেকে ৮৬৭ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স আয়ের প্রেক্ষাপটে ইতালি, ওমান, কাতার ও সিঙ্গাপুরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

    গত জানুয়ারিতে ইতালি থেকে এসেছিল ১৩১ মিলিয়ন ডলার। গত সাত মাসের মধ্যে তা সর্বোচ্চ।

    দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে মোট রেমিট্যান্স এসেছে যথাক্রমে ১৭৫ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ডলার, ৯৯ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলার ও ৯৩ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলার।

    ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দেশ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ডিশটিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রেমিট্যান্স আয়ের দিক থেকে আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্র প্রধান উৎস হয়েছে।’

    তিনি আরও বলেন, ‘ডলার ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের কাছ থেকে বেশি দামে ডলার কিনে তা আরও বেশি দামে অন্য ব্যাংকের কাছে বিক্রি করেছে।’

    এই সময়ে বিশেষ করে দুবাই এ ধরনের কাজের মূল কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে বলে জানান তিনি।

    ‘হঠাৎ সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স আসা কমে গেছে। অন্যদিকে, আরব আমিরাত থেকে রেমিট্যান্স আসা বেড়েছে। রেমিট্যান্সের উৎসের এই পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার।’

    পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী থাকায় এই দেশগুলো বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে থেকে গেছে।’

    তার মতে, ‘ঈদ, পূজা ও শীতকালে বিয়ের ধুম পড়লে তখন অভিবাসীরা দেশে টাকা পাঠান বলে সেই সময় রেমিট্যান্স আসা বেড়ে যায়।’

    রেমিট্যান্স প্রবণতা

    বাংলাদেশের অর্থনীতি রেমিট্যান্সের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত কয়েকটি দেশ মূল ভূমিকা পালন করে।

    ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবণতা, অভিবাসন নীতি ও শ্রমবাজারের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে দেশের রেমিট্যান্স আয়ের উৎসে পরিবর্তন দেখা গেছে।

    আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে প্রধান রেমিট্যান্স উৎস হিসেবে রয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে সেসব দেশ থেকে রেমিট্যান্স আসা বাড়ছে।

    ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আরব আমিরাত থেকে রেমিট্যান্স এসেছে দুই দশমিক শূন্য নয় বিলিয়ন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা তিন দশমিক শূন্য এক বিলিয়ন ডলার হয়।

    সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দুই দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা তিন দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার হয়।

    ২০২২-২৩ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স আসা বেড়ে দুই দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।

    কয়েকটি দেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। আবার কয়েকটি দেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা কমবেশি হয়েছে।

    ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কুয়েত থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল এক দশমিক শূন্য তিন বিলিয়ন ডলার যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেড়ে হয় এক দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় এক দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার ধরে রেখেছে।

    যুক্তরাজ্য ও ইতালিসহ ইউরোপীয় দেশগুলো রেমিট্যান্সের শক্তিশালী উৎস হিসেবে আছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যুক্তরাজ্য থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৮০৮ দশমিক দুই মিলিয়ন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় দুই দশমিক শূন্য আট বিলিয়ন ডলার।

    একই সময়ে ইতালি থেকে রেমিট্যান্স বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, ৫১০ দশমিক শূন্য আট মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে এক দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার।

    রেমিট্যান্সের উদীয়মান ও ক্রমহ্রাসমান উৎস

    দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া থেকে রেমিট্যান্স আয় বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আয় হয়েছে ৮০ দশমিক সাত মিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১১৬ দশমিক চার মিলিয়ন ডলার।

    জাপান থেকে রেমিট্যান্স আসা বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়া থেকেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী।

    বিপরীতে, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে রেমিট্যান্স আয় কমবেশি হচ্ছে। কাতার থেকে প্রথমে রেমিট্যান্স বাড়লেও পরে তা কমে যায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ওমান থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ৮৯৭ দশমিক দুই মিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে হয় ৭৬৬ দশমিক তিন মিলিয়ন ডলার।

    পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী এই বিষয়ে বলেন, ‘করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে বৈশ্বিক মুদ্রাবাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় রেমিট্যান্স এগ্রিগেটরের সংখ্যা বেড়েছে।’

    তিনি আরও বলেন, ‘কাতার বা ওমানের মানি চেঞ্জাররা বাংলাদেশে ডলার পাঠাতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রেমিট্যান্স এগ্রিগেটরের চ্যানেল ব্যবহার করে থাকতে পারে। এর ফলে কাতার ও ওমান থেকে রেমিট্যান্স কমেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেড়েছে।’

  • উপসাগরীয় ছয় দেশে এক ভিসায় ভ্রমণের সুযোগ

    উপসাগরীয় ছয় দেশে এক ভিসায় ভ্রমণের সুযোগ

    আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জগতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC) ভুক্ত ছয় দেশে একক ভিসার প্রবর্তন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন—এই ছয়টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত জিসিসি অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চল। সম্প্রতি এই দেশগুলোর মধ্যে একটি “ইউনিফাইড ট্যুরিস্ট ভিসা” চালুর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে, যা শেঙ্গেন ভিসার আদলে তৈরি হতে পারে। এই উদ্যোগ সফল হলে বিশ্বব্যাপী পর্যটক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের জন্য ভ্রমণ সহজ হবে, পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সমন্বয়ও শক্তিশালী হবে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তিগত, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

    ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ওমানে অনুষ্ঠিত জিসিসি শীর্ষ সম্মেলনে ছয় দেশের নেতারা একক ভিসা ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেন। এই ভিসার মূল উদ্দেশ্য হলো পর্যটন শিল্পকে গতিশীল করা এবং জিসিসি অঞ্চলকে বৈশ্বিক ভ্রমণ বাজারে একটি সমন্বিত গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। বর্তমানে এই দেশগুলো পৃথকভাবে ভিসা ইস্যু করে থাকে, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরব ২০১৯ সাল থেকে নির্বাচিত দেশের জন্য ই-ভিসা চালু করলেও কুয়েত এখনও প্রচলিত পদ্ধতিতে ভিসা দিয়ে থাকে। ইউনিফাইড ভিসা চালু হলে একজন পর্যটক একবার আবেদন করেই ছয় দেশে ভ্রমণ করতে পারবেন, যা ভ্রমণ খরচ ৩০-৪০% কমিয়ে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া, ব্যবসায়িক ভ্রমণ ও আন্তঃদেশীয় বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে।

    একক ভিসা ব্যবস্থা জিসিসি অঞ্চলকে বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে। এই দেশগুলোর রয়েছে বৈচিত্র্যময় আকর্ষণ—সংযুক্ত আরব আমিরাতের অত্যাধুনিক শহর দুবাই ও আবুধাবি, সৌদি আরবের ঐতিহাসিক মদিনা ও মক্কা, ওমানের প্রাকৃতিক নৈসর্গ, কাতারের বিশ্বকাপ-বিপ্লবী অবকাঠামো, বাহরাইনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং কুয়েতের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র। বর্তমানে এই দেশগুলো বছরে প্রায় ৫ কোটি পর্যটক গ্রহণ করে, যা একক ভিসার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ১২ কোটিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার ভ্রমণপিপাসুদের জন্য জিসিসি হয়ে উঠতে পারে একটি অখণ্ড ভ্রমণ সার্কিট, যেখানে মরুভূমির সাফারি, সমুদ্রসৈকতের বিলাসিতা ও ঐতিহ্যের সম্মিলন ঘটবে।

    এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে জিসিসি দেশগুলো একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে, যেখানে ভিসা আবেদন, অনুমোদন ও ট্র্যাকিং করা যাবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের “স্মার্ট গভর্ন্যান্স” মডেল এবং সৌদি আরবের “Vision 2030” প্রযুক্তিগত রূপান্তরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে। বায়োমেট্রিক ডেটা শেয়ারিং (যেমন ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ফেসিয়াল রিকগনিশন) এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া, জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম ডেটা বিনিময়ের জন্য একটি কমন ডাটাবেস তৈরি করা হবে, যা সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।

    যদিও অর্থনৈতিক সুবিধা স্পষ্ট, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা এই উদ্যোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে কাতার অবরোধ (২০১৭-২০২১), ইয়েমেন সংকট ও তেল নীতিকে কেন্দ্র করে মতপার্থক্য রয়েছে। একক ভিসা চালু করতে গেলে সীমান্ত নিরাপত্তা নীতিতে সমঝোতা প্রয়োজন, যা অর্জন সহজ নয়। এছাড়া, ভিসা রেভেনিউ বণ্টন নিয়েও দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব পর্যটন থেকে সর্বোচ্চ আয় করে; ছোট দেশগুলো (যেমন বাহরাইন) ভিসা আয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে।

    জিসিসি দেশগুলোতে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা বিপুল। একক ভিসা চালু হলে শ্রমিক পাচার ও অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এজন্য শ্রম ভিসার জন্য পৃথক নিয়ম প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এছাড়া, স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষায় পর্যটকদের জন্য গাইডলাইন তৈরি করতে হবে—যেমন সৌদি আরবের রক্ষণশীল পোশাক নীতি বা ওমানের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন মেনে চলা।

    জিসিসি ভিসা চালু হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। প্রায় ২৫ লক্ষ বাংলাদেশি এই অঞ্চলে কাজ করেন; একক ভিসার মাধ্যমে তাদের জন্য আন্তঃদেশীয় চলাচল সহজ হতে পারে। এছাড়া, বাংলাদেশি পর্যটকরা কম খরচে উপসাগরীয় দেশ ভ্রমণ করতে পারবেন। তবে এজন্য বাংলাদেশকে ডিজিটাল পাসপোর্ট সিস্টেম আপগ্রেড করতে হবে এবং ভিসা প্রক্রিয়ায় দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে।

    জিসিসি নেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এর জন্য প্রয়োজন পর্যায়ক্রমিক পদক্ষেপ:

    ১. ফেজ ১ (২০২৪-২০২৬): প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো তৈরি ও ট্রায়াল রান।

    ২. ফেজ ২ (২০২৬-২০২৮): নির্বাচিত দেশে পাইলট প্রকল্প চালু (যেমন UAE-সৌদি-কাতার ট্রায়াঙ্গেল)।

    ৩. ফেজ ৩ (২০২৮-২০৩০): সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং।

    উপসাগরীয় একক ভিসা কেবল একটি ভ্রমণ নীতি নয়—এটি জিসিসি অঞ্চলের রাজনৈতিক ঐক্য, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতীক। এই উদ্যোগ সফল হলে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বায়নের নতুন মডেল হিসেবে আবির্ভূত হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন আন্তরিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ও সামাজিক সচেতনতা। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের উচিত এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া, যাতে ভবিষ্যতের সুযোগগুলো কাজে লাগানো যায়।

  • নীলফামারীতে জিংক ধান চাষ উদ্বুদ্ধকরণ কর্মশালা

    নীলফামারীতে জিংক ধান চাষ উদ্বুদ্ধকরণ কর্মশালা


    নীলফামারী প্রতিনিধি

    নীলফামারীতে জিংক ধান চাষ উদ্বুদ্ধকরণ কর্মশালা। নীলফামারীতে পুষ্টিগুণ সম্পন্ন জিং ধান চাষে উদ্বুদ্ধকরণ ও বাজারজাত নিয়ে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার দিনব্যাপী সদর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের নটখানায় টিএলএমের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জেলা খাদ্য অধিদপ্তরের আয়োজনে এ কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়।

    কর্মশালায় জিং ধানের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইম্প্রোভড নিউট্রিশনের (গেইন) কনসালট্যান্ট ড. মনির হোসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট পুষ্টি সমৃদ্ধ জিংক ধান চাষ উৎপাদনে নতুন ধারা উন্মোচন করেছে। এতে কৃষক শতভাগ সফলতাও পেয়েছে। বায়োফর্টিফাইড ধানের জাত বি-৭৪, বি-৮৪, বি-৮২ ও বঙ্গবন্ধু ১০০, ১০২ জাতের ধান উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করার এখন আমাদের সময় এসেছে।

    গেইন’র সহযোগিতায় বায়োফর্টিফাইড ধান সংগ্রহ এবং সামাজিক সুরক্ষায় জলবায়ুবান্ধব মসুর ডাল ও চালের ভূমিকা বিষয়ক এ কর্মশালাটির সভাপতিত্ব করেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সৈয়দ আতিকুল হক। কর্মশালায় বক্তব্য রাখেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) শাহিনা বেগম, নীলফামারী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আতিক আহমেদ, সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তৌহিদুর রহমান, টুপামারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান, অটোরাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি সামসুল হক, প্রেস ক্লাবের সভাপতি এবিএম মঞ্জুরুল আলম সিয়াম, কৃষক তারা পদ রায় ও আজাহারুল ইসলাম প্রমুখ।

    ড. মনির হোসেন আরও বলেন, সরকার আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে জিং ধান চাষের বিকল্প নেই। কর্মশালায় বিভিন্ন সেক্টরের কর্মকর্তা, এনজিও কর্মী, কৃষক, বিএডিসি কর্মকর্তা, কৃষি কর্মকর্তা ও সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।