বাংলাদেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে মাছের ভূমিকা অপরিসীম। দেশের প্রায় ৮০% মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছের পোনা সংগ্রহ দিনদিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পাশাপাশি রুই, কাতলা, মৃগেল ও শিং-মাগুরের মতো চাহিদাসম্পন্ন প্রজাতির পোনা উৎপাদনে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়, প্রশিক্ষিত জনবল ও টেকসই বিনিয়োগ।
বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১.৪ লাখ কেজি মাছের পোনা উৎপাদন হয়, যার মধ্যে ৬৫% আসে সরকারি ও বেসরকারি হ্যাচারি থেকে। বাকিটা নির্ভর করে নদী ও প্রাকৃতিক উৎসের ওপর। কিন্তু প্রাকৃতিক উৎসের পোনার গুণগত মান ও সরবরাহ অনিশ্চিত। বিশেষ করে ইলিশের পোনা সংগ্রহ নিষিদ্ধ হওয়ায় এবং নদীদূষণ বেড়ে যাওয়ায় হ্যাচারির গুরুত্ব বেড়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৯৮২টি রেজিস্টার্ড হ্যাচারি রয়েছে, যার মধ্যে ৮০টিই সরকারি। তবে এসব হ্যাচারির সিংহভাগই আধুনিক প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে পোনার মান নিয়ন্ত্রণহীনতা, রোগবালাই ও উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় চাষিদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রথম শর্ত হলো উন্নত মানের পোনা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৩০% হ্যাচারিতে পোনার মৃত্যুর হার ৫০% ছাড়িয়ে যায়, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। এ সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানীরা জেনেটিক্যালি সুপিরিয়র ব্রুডস্টক (মা-মাছ) তৈরি, রোগ প্রতিরোধী পোনা উৎপাদন ও হ্যাচারি ব্যবস্থাপনায় অটোমেশনের ওপর জোর দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে বিএফআরআই ‘জিএসটি’ নামে রুই মাছের একটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে, যা সাধারণ পোনার চেয়ে ২০% দ্রুত বাড়ে। এ ধরনের উদ্ভাবন উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক।
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোও জরুরি। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম (আরএএস) ব্যবহার করে অল্প পানি ও জায়গায় উচ্চমাত্রায় পোনা উৎপাদন করা হয়। এই প্রযুক্তি পানির পিএইচ, অক্সিজেন ও তাপমাত্রা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যা পোনার বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে কয়েকটি বেসরকারি হ্যাচারিতে আরএএস পদ্ধতি চালু হয়েছে। খুলনার একটি হ্যাচারির মালিক মো. সাকিব হাসান বলেন, “আরএএস ব্যবহার করে পোনার উৎপাদন তিন গুণ বেড়েছে। বিদ্যুৎ খরচ বেশি হলেও লাভের পরিমাণ সন্তোষজনক।”
দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে হলে পোনার মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। মৎস্য অধিদপ্তরের হ্যাচারি ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতিটি হ্যাচারিতে ওয়াটার টেস্টিং ল্যাব, কোয়ারেন্টাইন সিস্টেম ও ট্রেন্ড টেকনিশিয়ান থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই নিয়মের প্রয়োগে শিথিলতা রয়েছে। অনেক হ্যাচারি মালিক অভিযোগ করেন, লাইসেন্স নবায়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া জটিল এবং দুর্নীতিগ্রস্ত। এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. খলিলুর রহমান বলেন, “হ্যাচারিগুলোকে আধুনিকায়নে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে, যারা নিয়মিত পরিদর্শন করবে।”
গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশে মাত্র ০.৫% জিডিপি গবেষণায় ব্যয় হয়, যার খুব সামান্যই মৎস্য খাতের জন্য বরাদ্দ। অথচ থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের জিডিপির ২% এর বেশি গবেষণায় খরচ করে, যা তাদেরকে বিশ্বব্যাপী পোনা রপ্তানিতে শীর্ষ位置上 এনেছে। বাংলাদেশে ক্রাইওপ্রিজারভেশন (শুক্রাণু হিমায়ন) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিরল প্রজাতির মাছের জেনেটিক মেটেরিয়াল সংরক্ষণ, আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন ও হাইব্রিড পোনা উৎপাদনের মতো প্রকল্প হাতে নেওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি এই খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। দেশে প্রায় ৫০ হাজার হ্যাচারি কর্মী রয়েছেন, যাদের মধ্যে মাত্র ১৫% ফরমাল ট্রেনিং পেয়েছেন। এ অবস্থা改善 করতে মৎস্য অধিদপ্তর ও এনজিওগুলোর যৌথ উদ্যোগে প্রশিক্ষণ কর্মশালা বাড়ানো হচ্ছে। কুমিল্লার একটি হ্যাচারিতে কাজ করা শিমুল মিয়া বলেন, “প্রশিক্ষণের পর পোনার খাবার দেওয়া ও রোগ চিহ্নিত করার দক্ষতা বেড়েছে। এখন পোনার মৃত্যুহার ১০% এর নিচে।”
সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও এগিয়ে আসছে। ইস্পাহানি অ্যাগ্রো লিমিটেডের মতো কোম্পানিগুলো উচ্চপ্রোটিন সম্পন্ন পোনার খাবার তৈরি করছে, যা বৃদ্ধির হার বাড়ায়। এ ছাড়া স্টার্টআপগুলো হ্যাচারি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ও আইওটি-ভিত্তিক মনিটরিং সিস্টেম চালু করেছে, যা ডিজিটাল পদ্ধতিতে উৎপাদন তদারকি করে।
স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের আরেকটি বড় পদক্ষেপ হলো স্থানীয় প্রজাতির পোনা সংরক্ষণ। বাংলাদেশে ২৬০টি দেশীয় মাছের প্রজাতি রয়েছে, যার অনেকগুলোই বিলুপ্তির পথে। মিঠাপানির শিং, মাগুর, পাবদা ও গুলশা মাছের কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি ইতিমধ্যে উদ্ভাবিত হয়েছে। ময়মনসিংহের একটি হ্যাচারিতে গুলশা মাছের পোনা উৎপাদন করে সাফল্য পেয়েছেন ড. মো. আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, “দেশীয় মাছের চাহিদা বাড়ছে। এসব পোনার উৎপাদন বাড়ালে আমদানিনির্ভরতা কমবে।”
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নেওয়া হচ্ছে বিশেষ উদ্যোগ। লবণাক্ততা সহিষ্ণু পোনা উৎপাদনের জন্য সাতক্ষীরা ও খুলনার হ্যাচারিগুলোতে গবেষণা চলছে। ইতিমধ্যে ‘সালাইন-রেজিস্ট্যান্ট রুই’ এর ট্রায়াল সফল হয়েছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলে চাষের জন্য উপযোগী।
তবে এই পথে এখনো কিছু বাধা রয়ে গেছে। ক্ষুদ্র হ্যাচারি মালিকদের মাঝে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত, ব্যাংক ঋণে সুদের হার বেশি এবং বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। নরসিংদীর একটি হ্যাচারির মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, “জেনারেটর চালানোর ডিজেল খরচ মেটাতে গিয়ে লাভের অঙ্কটা কমে যায়। সরকার যদি সোলার এনার্জি সাবসিডি দেয়, তাহলে খরচ কমানো যেত।”
ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় সরকার ই-ফিশারিজ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে পোনার চাহিদা-জোগান, মূল্য ও মান নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এ ছাড়া ‘ব্লু ইকোনমি’ কর্মসূচির আওতায় সামুদ্রিক মাছের পোনা উৎপাদনে গবেষণা বাড়ানো হবে।
সর্বোপরি, মাছের পোনা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কেবল মৎস্য খাতের জন্যই নয়, সমগ্র অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদার ও রপ্তানি আয় বাড়াবে। গবেষণা, প্রযুক্তি ও নীতিগত সমর্থনের সমন্বয়ে বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জন করে বিশ্বে রোল মডেল হয়ে উঠতে পারে।
