পোলট্রি ব্যবসা কৌশলগতভাবে পরিচালনা করলে সফলতা পাওয়া যায়। আপনিও যদি এমন সফলতা পেতে চান তাহলে জানতে হবে একজন সফল পোলট্রি খামারী র গল্প। যার মাধ্যমে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল করণীয় সম্পর্কে আপনি সঠিক ধারণা পেতে পারেন। সফল পোলট্রি খামারীর গল্প সবসময়ই নতুন খামারীদের জন্য প্রেরণা। তাই চিরাচরিত কৌশল বর্ণনার পাশাপাশি আজ সেসব টিপস নিয়ে আলোচনা করব যেগুলো সফল খামারীরা মেনে চলেন। যাতে আপনার নতুন খামার আপনি সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারেন।
চট্টগ্রামের মিরসরাই এ ইছাখালী ইউনিয়নের চরশরৎ গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনযাপন। যারা বছর তিনেক আগেও সংসারে চালাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যেতেন তারাই আজ মাসে লাখটাকা পর্যন্তও ইনকাম করেন। আর এর মূলে রয়েছে পোলট্রি খামার তৈরীর গল্প। সেই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশেই ছোট বা বড় খামার রয়েছে।এই গল্প শুধু একটি গ্রামের নয়, বরং বাংলাদেশের লাখ লাখ কৃষক পরিবারের যারা এখন সফল পোলট্রি খামারী। কিন্তু কীভাবে তারা খামার থেকে এত উন্নতি করলেন? সেটাই ধাপে ধাপে তাদের বর্ণনা অনুযায়ী উপস্থাপন করব আমরা।
এক্ষেত্রে প্রথমেই জেনে নেবো খামার শুরুতে তাদেরকে কোন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হয়েছিল। সেগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-
- প্রথমত তারা যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিলেন তা হলো অর্থের অভাব। বেশিরভাগ খামারীদেরই মূলধন থাকে অত্যন্ত কম। তাই বিনিয়োগের জন্য যে টাকা প্রয়োজন তা জোগাড় করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে তাদের।
- এরপর তাদের সমস্যা ছিল মুরগীর জাত নির্বাচনে। কোন মুরগী তাদের জন্য বেশি লাভজনক হবে এটা নিয়ে দ্বন্দ্বে ছিলেন। যদিও অনেকেই ভুলও করেছেন এই ক্ষেত্রে।
- তাদের অনেকেরই পোল্ট্রি সম্পর্কিত সঠিক প্রশিক্ষণ ছিল না। যার ফলে মুরগীর যত্ন কীভাবে নেবেন এবং মুরগীর জন্য কোন খাবারগুলো দিলে সবচেয়ে ভালো হবে তা বুঝতে পারেন নি।
- খামার তৈরী করার জায়গা নিয়েও ছিল তাদের দুশ্চিন্তা
- আর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল বাজারজাতকরণ। এই ব্যবসা প্রসার এর মূল দিক হলো এটি। তাই এটি সঠিকভাবে বুঝতে তাদের বেশ সমস্যা হয়েছিল প্রথম দিকে।
সফলতার জন্য কি ধরনের মানসিকতা এবং পরিকল্পনা প্রয়োজন
উপর্যুক্ত বিষয়গুলো থেকে খামারীদের শুরুর চ্যালেঞ্জগুলো তো আমরা জেনে নিয়েছি। এবার জানা প্রয়োজন যে এই সমস্যাগুলো সমাধানে তারা কেমন পরিকল্পনা করেছিলেন।এদের মধ্যে অনেকেই বলেছেন যে প্রথম দিকে কয়েকজনকে ক্ষতির মুখেও পড়তে হয়েছে। কারণ সঠিক জ্ঞানের অভাব। তবে তারা হাল ছাড়েননি। ক্ষতি হওয়ার কারণসমূহ চিহ্নিত করে তা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজেছেন এবং অবশেষে সফল হয়েছেন।তাই তাদের মতে, খামার শুরুর পূর্বেই নিজেকে ধৈর্যশীল করে নিতে হবে এবং নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক আগাতে হবে। আর এই মানসিকতাই আপনাকে সাফল্যের দ্বারে নিয়ে যাবে।
পাশাপাশি, আপনাকে খামারের সঠিক পরিকল্পনা করে নিতে হবে। খামারের পরিকল্পনা বিষয়ক বিস্তারিত ধারণা আপনারা এই ওয়েবসাইটেই পেয়ে যাবেন। সেখান থেকে বিষদভাবে এই বিষয়গুলো জেনে নিতে পারবেন।
খামারীদের উদ্ভাবনী চিন্তা এবং সৃজনশীলতার ভূমিকা
একটু আগেই বলেছি, খামারীরা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সৃজনশীলতা প্রয়োগ করে তাদের রাস্তায় আসা সমস্যাগুলো সমাধান করেছেন।তাই এখানে আমরা তাদের উদ্ভাবনগুলোও তুলে ধরতে চাই যেনো আপনি বুঝতে পারেন আকস্মিক কোনো সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়।
- প্রথমত এই খামারীরা তাদের মুরগীগুলোকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন সব সময়। গ্রামীণ পরিবেশে মুরগী পালন কম-বেশি সবাই আগে থেকেই করতেন।
তাই কোনো মুরগীর অস্বাভাবিকতা দেখা গেলেই তারা দ্রুত তা নিরাময়ের চেষ্টা করতেন। আর যদি তাদের দ্বারা সম্ভব না হত তবে এলাকায় কর্মরত পশু ডাক্তারদের পরামর্শ নিতেন।
- লেয়ার মুরগী কোন পরিবেশে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এ বিষয়টি তারা এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই বুঝে নিয়েছিলেন। তাই প্রথমবার ভুল হলেও পরবর্তী বছর থেকে এই ভুলগুলো তারা শুধরে নেন।
- মুরগীর জন্য তারা বিভিন্ন দানাজাতীয় খাবারের ব্যবস্থা করেন এবং কোন খাদ্যে মুরগী বেশি মাংস এবং ডিম উৎপাদন করে তা পর্যবেক্ষণ করে রাখেন। এতে ঐ খাবারই বেশি করে দেন।
- কিছু কিছু খামারী পোলট্রি সফলতার জন্য প্রশিক্ষণ নেন। তারা এ শিক্ষা নিজের খামারে প্রয়োগ করেন। পাশাপাশি অন্যান্যদের সমস্যা সমাধানেও এগিয়ে যান।
- এলাকার খামারীরা মাঝে মাঝে একসাথে বসে গল্পগুজব করেন এবং খামার নিয়ে আলোচনা করেন। ফলে তাদের আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমাধান সম্ভব হত।
এভাবে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এবং নিজের সৃজনশীলতা প্রয়োগের মাধ্যমে সফল খামারীরা আস্তে আস্তে নিজেদের খামার গড়ে তুলেছেন।
সফল পোলট্রি খামারী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি ও দক্ষতা
পোলট্রি খামারে সমস্যার সূচনা এবং সমাধানের বিষয়গুলো নিয়ে এতক্ষণ আমরা আলোচনা করেছি। তবে সফল খামারী হওয়ার কৌশল জানতে হলে কিছু দক্ষতা প্রয়োজন। পোলট্রি খামার পরিচালনা করে যারা সফল হয়েছেন তাদের অনুযায়ী জানব খামারী সফলতার মন্ত্র।
- খামারের শুরু থেকে সফলতা পেতে হলে পোলট্রি খামারে পরিশ্রম করতে হবে। খামারী পরিশ্রমের ফল হিসেবে অবশ্যই সফলতা পাবেন।
- খামারে ব্যবসায়িক মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ একটি ব্যবসায় যেমন লাভ-লোকসান দুটোই থাকে। তেমনি এই বিষয়গুলো মেনে নিয়ে ব্যবসা পরিচালনার সাহস থাকতে হবে।
- পোলট্রি খামারের চ্যালেঞ্জ আসতেই থাকবে। তাই সেগুলো মোকাবেলার করার সাহস এবং বুদ্ধি দুটোই থাকতে হবে।
- খামারী ও তাদের উদ্যোগ সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখতে হবে। খামারীদের উদ্ভাবন ও নয়া কৌশল নিজের খামারে সঠিকভাবে প্রয়োগের চেষ্টা থাকতে হবে।
- পোলট্রি খামারে সঠিক পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। তাই পোলট্রি খামারে প্রাথমিক উদ্যোগ নেবার পূর্বেই পরিকল্পনা করার পদ্ধতি সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে।
- সফল পোলট্রি খামারীদের পরামর্শ অনুযায়ী নিজের পোলট্রি খামার ব্যবসায়ের বৃদ্ধির কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে।
খামারীর সফলতার গল্প থেকে এসকল দক্ষতা এবং গুণাবলীর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমরা জেনেছি। বলতে পারেন এগুলো হলো খামারে সাফল্যের উপাদান।
পোলট্রি খামার আমাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী এবং গতিশীল করতে সহায়তা করবে। তাই ব্যক্তিগত উন্নয়ন এবং দেশের উন্নয়নের জন্য সঠিক কৌশল অবলম্বন করে পোলট্রি খামার পরিচালনা করা আবশ্যক।

Leave a Reply