বাংলাদেশের কৃষি ও মৎস্য খাতের ইতিহাস ঐতিহ্যবাহী। নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবায় ভরপুর এ দেশে মাছ চাষ শুধু অর্থনীতির চাকা সচল রাখে না, বরং লাখো মানুষের পুষ্টি ও কর্মসংস্থানের যোগান দেয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নদীদূষণ, মৎস্য প্রজননক্ষেত্রের সংকট এবং প্রাকৃতিক জলাধার কমে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী মাছ চাষের পদ্ধতিগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের মৎস্য খাতে বিপ্লব এনেছে বায়োফ্লক প্রযুক্তি। পরিবেশবান্ধব এই পদ্ধতিতে অল্প জায়গায়, কম পানিতে এবং রাসায়নিকের ব্যবহার ছাড়াই উচ্চমূল্যের মাছ চাষের সাফল্য দেখাচ্ছেন কৃষক ও উদ্যোক্তারা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমর্থন এবং তরুণ প্রজন্মের আগ্রহে বায়োফ্লক এখন বাংলাদেশের মৎস্য খাতের নতুন আশার আলো।
বায়োফ্লক প্রযুক্তির মূল কথা হলো প্রাকৃতিক উপায়ে পানির গুণাগুণ বজায় রেখে মাছের উৎপাদন বাড়ানো। এই পদ্ধতিতে ট্যাংক বা চৌবাচ্চায় উচ্চপ্রোটিনযুক্ত খাবার দেওয়া হয়, যা মাছ সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারে না। অবশিষ্ট খাবারের সঙ্গে মাছের মলমূত্র মিশে পানিতে অ্যামোনিয়ার মাত্রা বাড়ায়। এ অবস্থায় ট্যাংকে নিয়মিত অক্সিজেন সরবরাহ ও প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহার করা হয়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো অ্যামোনিয়াকে নাইট্রোজেনে রূপান্তর করে এবং পানিতে ভাসমান কণাগুলো (বায়োফ্লক) তৈরি করে, যা মাছের জন্য প্রাকৃতিক খাবার হিসেবে কাজ করে। ফলে পানির ঘনঘন পরিবর্তন না করেই ট্যাংকে মাছের ঘনত্ব বাড়ানো যায়। শিং, মাগুর, পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, ভেটকির মতো মাছগুলো বায়োফ্লকে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে।
বাংলাদেশে বায়োফ্লক প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হয় এক দশক আগে, কিন্তু গত কয়েক বছরে এটি জনপ্রিয়তা পায়। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়। সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বায়োফ্লক চাষিদের জন্য ভর্তুকি, ঋণ সুবিধা এবং কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সফল চাষিদের ভিডিও প্রচার হওয়ায় গ্রামীণ যুবক থেকে শুরু করে শহুরে উদ্যোক্তাদের মাঝেও এই পদ্ধতিতে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ময়মনসিংহের ত্রিশালের কৃষক রফিকুল ইসলামের কথা ধরা যাক। তিনি মাত্র দুই শতক জমিতে ১০টি ফাইবারগ্লাস ট্যাংক স্থাপন করেছেন। প্রতিটি ট্যাংকে ৩ হাজার শিং মাছের পোনা ছেড়েছেন। গত ছয় মাসে রাসায়নিক বা অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াই প্রাকৃতিক উপায়ে মাছ বিক্রি করে তিনি ২ লাখ টাকারও বেশি লাভ করেছেন। তার মতো হাজারো কৃষক এখন বায়োফ্লককে “সোনার হাঁস” বলে অভিহিত করছেন। এ প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—সীমিত জায়গায় বাড়ির ছাদে, উঠানে বা ব্যালকনিতেও মাছ চাষ করা যায়। রাজধানীর উত্তরায় বসবাসকারী তাসনিমা আক্তার বাড়ির ছাদে ৪টি ট্যাংকে তেলাপিয়া চাষ করছেন। তিনি বলেন, “মহামারির সময় চাকরি হারিয়েছিলাম। এখন বায়োফ্লকের মাছ বিক্রি করেই সংসার চলে।”
খুলনার ডুমুরিয়ায় বায়োফ্লক প্রযুক্তির আরেকটি মডেল দেখা যায়। স্থানীয় যুবক আরিফুল ইসলাম ২০টি ট্যাংকে শিং ও পাঙ্গাশ চাষ করছেন। তিনি তার ফার্মে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেন, যা দিয়ে ট্যাংকের অক্সিজেন জেনারেটর ও পাম্প চালানো হয়। তার এই স্বয়ংসম্পূর্ণ মডেল ইতিমধ্যে জেলার অন্যান্য চাষিদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। এদিকে, রাজশাহীর চারঘাটে নারী উদ্যোক্তা সেলিনা বেগম ১৫ জন নারীকে নিয়ে একটি সমবায় গড়ে তুলেছেন। তারা সম্মিলিতভাবে বায়োফ্লক ট্যাংক থেকে মাছ চাষ করে স্থানীয় বাজার ও রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করছেন। নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে এই উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বায়োফ্লকের সাফল্য কেবল আর্থিক লাভেই সীমিত নয়। এই প্রযুক্তি পরিবেশ রক্ষায়ও ভূমিকা রাখছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে মাছ চাষে পানি দূষণ, মাটির ক্ষয় এবং রোগব্যাধির ঝুঁকি থাকে। কিন্তু বায়োফ্লকে পানি পুনর্ব্যবহার করা যায়, রাসায়নিকের ব্যবহার প্রায় শূন্য এবং মাছের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় জমির ব্যবহার কম হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলাম সাদিক বলেন, “বায়োফ্লক টেকসই মৎস্য চাষের একটি মাইলফলক। এটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু সহিষ্ণু অর্থনীতি গড়তে সাহায্য করবে।”
তবে এই প্রযুক্তি চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি—একটি ট্যাংক স্থাপন, অক্সিজেন জেনারেটর ও প্রশিক্ষণে প্রায় ৫০-৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে অনেক চাষি শুরুতে হোঁচট খান। কেউ কেউ পানির pH লেভেল নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বা ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলায় সম্পূর্ণ ফসল হারিয়েছেন। তবে সরকারি ও বেসরকারি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এই ঝুঁকি কমিয়ে আনছে। ইতিমধ্যে দেশের ৪৬টি জেলায় ১০ হাজারের বেশি বায়োফ্লক ইউনিট স্থাপিত হয়েছে, যা থেকে বছরে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বায়োফ্লকের সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত করতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর “একটি বাড়ি, একটি খামার” প্রকল্পের আওতায় দরিদ্র পরিবারগুলোকে বায়োফ্লক ইউনিট দিচ্ছে। এ ছাড়া এগ্রো-প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে চুক্তি করে চাষিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিদেশি বাজারেও বায়োফ্লক মাছের চাহিদা তৈরি হয়েছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে বাংলাদেশের অর্গানিক মাছ রপ্তানির আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বায়োফ্লক কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির গতিপথ বদলে দেওয়ার হাতিয়ার। শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার—এই তিনটি লক্ষ্যকে একসাথে স্পর্শ করেছে বায়োফ্লক। জলবায়ু সংকট মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। ইতিমধ্যে পথে নামা চাষি, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বায়োফ্লক প্রযুক্তির জয়ধ্বনি শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে।

Leave a Reply