বয়কট!!!! বয়কট!!! বয়কট!!! তরমুজ কেন ওজনে কিনবো????
বয়কট শব্দটি নিয়ে কিছুদিন ধরেই বাক বিতন্ডাসহ সকলের মাঝেই চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। বয়কট করলে কি শুধু কৃষকেরই ক্ষতি, নাকি অন্যান্য কিছু অসহায় দুর্বল পেশার লোকজনও জড়িত। মানতেই হবে আমরা হুজুগে বাঙ্গালি। কোন কিছুর হুজুগ উঠলেই আমরা না বুঝে শুনেই সবার কাছেই ভাইরাল নামক শব্দকে প্রাধান্য দিয়ে প্রচার শুরু করি।
আমরা কৃষি নিয়ে কাজ করি তাই কৃষি পণ্য নিয়ে বয়কটের কিছু বাস্তবতা নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। গত সিজনের ড্রাগন ফল থেকে শুরু করে বর্তমান তরমুজ পর্যন্ত যে বয়কট আমরা করেছি, তাতে আসলে কে লাভবান হয়েছে, একটু খতিয়ে দেখতে হবে। ডিজিটালাইজেশনের এই যুগে সমাজে ইউটিউবারদের বড় একটি প্রভাব সমাজে দেখা দিয়েছে।
যাদের আমরা কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে জানি। এই কনটেন্টের যাত্রা ভালোভাবে শুরু প্রায় ২০ বছর পূর্বে। যখন সোহাগ ৩৬০ ডিগ্রি চ্যানেল বিভিন্ন কম্পিউটার কোর্স ও মোবাইলের ফাংশন নিয়ে ভিডিও প্রচার করেন। সেই সময় থেকে আস্তে আস্তে আবাল, বৃদ্ধ বনিতা সকলেই ইউটিউবার হয়ে ডলার ইনকামের দিতে ঝুকতে শুরু করেছে। কিন্তু আসলে কতজন সফল হয়েছে, আর কতজন সমাজের কি পরিমাণ ক্ষতি করেছে তা, বাংলার জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
কিছু কিছু শিক্ষনীয় চ্যানেল এখনও স্বমহিমায় উজ্জল দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছেন আমাদের কাছে, আমরা তাদের ঋণ কখনও শোধ করতে পারবোনা। আবার কিছু কিছু অশিক্ষিত মূর্খ মানব যে বিষয়ে কোন জ্ঞান নেই, পেটে বোমা মারলে দু-চার কলম লিখতে পারবে না, তাঁরা কৃষকের উৎপাদন ব্যবস্থা, কৃষি পণ্যের বাজারজাত ব্যবস্থা, কৃষিতে অর্থনৈতিক প্রভাব, মুদ্রাস্ফিতি, কৃষকের কলা ফুলে বড়লোক হওয়া (বানোয়াট ও মিথ্যা গল্প) নিয়ে ভিডিও করে রাতারাতি ভাইরাল হওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত।
তাঁরা জানেনা ড্রাগন ফলে হরমোন ব্যবহার করা বৈধ কিনা, এতে কৃষি অফিস অনুমোদন দিয়েছে কিনা, স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় কর্তৃক স্বাস্থ্য ঝুকি সংক্রান্ত কোন প্রতিবাদ লিপি আছে কিনা, কৃষক এটা না বুঝে শুনে করছে কিনা। না জেনে না বুঝে ভিডিও করা হলো ড্রাগন ফলে হরমোন ব্যবহার করে এটা বড় করা হয়েছে, এটা খাওয়া যাবেনা, ব্যাস রাতারাতি ইউটিউবে, ফেসবুক ও টিকটকে ভাইরাল, বাংলার সুবোধ ও সহজ সরল জনগণ তাতে সায় দিয়ে ড্রাগন কেনা বন্ধ করে দিলো। ফলাফল দুস্থ, অসহায় কৃষকের লক্ষ, লক্ষ, কোটি টাকা লস। ব্যাংকের দেনা, এনজিও কিস্তি, সারের দোকানের হালখাতা ইত্যাদির চাপে কৃষক প্রায় দিশেহারা।
আমরা এখন এমন ইউটিউবার ও ফেকবুকার দেখতে পাই দুর্ঘটনার স্বীকার হয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে, পাশের মানুষগুলো তাঁকে সেবা শুশ্রষা করা বাদ দিয়ে ভিডিও করতে শুরু করেন। অথচ এমন হতে পারতো উনাকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হলে হয়ত উনি বেঁচে যেতে পারতেন। দেখে মনে হয় উনারা নোবেল জয়ী বিশ্বসেরা সাংবাদিক, এখনই মানুষ কিভাবে মারা যাচ্ছে সেই ভিডিও না দিলে উনার বিশ্বনন্দিত পদ হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সামনের দু-চারজন মানুষ মারা গেলেও উনাকে ভিডিও করতেই হবে।
এবার আসি তরমুজের ঘটনা নিয়ে। কৃষক কত কস্ট করে তরমুজের জমি চাষ করা থেকে শুরু করে তরমুজ কাটা পর্যন্ত কি পরিমাণ শ্রম আর পয়সা খরচ করেছেন, তা একমাত্র কৃষকই জানে। হুট করে একদল হলুদ সাংবাদিক প্রচার শুরু করলেন আমরা কেজিতে তরমুজ কিনবো না, আমাদের কাছে পিস হিসেবে তরমুজ বিক্রি করতে হবে। ব্যাস কম্ম সারা, তরমুজ বিক্রিতে ধস। বিক্রি কমে যাওয়াও বেপারি আর ক্ষেতে যায় না তরমুজ কিনতে, তরমুজ পেঁকে ফেটে নস্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষকের রক্তের প্রবাহ বেড়ে সে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে, তাঁর গত কয়েক মাসের পরিশ্রম জলে ভাসিয়ে দিয়ে মার্ক জুকারবাগের বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের তালিকাভূক্ত হতে সহায়তা করছে।
একটি কৃষি পণ্য কৃষকের ক্ষেত থেকে ভোক্তা পর্যন্ত আসতে কতটি হাত বদল হয় ও কত খরচ হয়? এ সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছি। কৃষক যে হাটে বিক্রি করে সেখান থেকে বেপারী কেনে। লেবার দিয়ে বেপারী তার গোডাউনে নিয়ে আসে, কোন সময় ক্ষেত থেকে ট্রাকে লোড হয়, আবার জমিতে ট্রাক না পৌছালে গোডাউন থেকে ট্রাকে লোড হয়। ট্রাক বরিশাল বিভাগ থেকে কারওয়ান বাজার সহ দেশের অন্যান্য জায়গায় পৌছাতে কতগুলো ব্রীজের টোল, আর রাস্তা খরচ দিতে হয় তা আমরা সবাই জানি।
এরপর ট্রাক পৌছালে সেখান থেকে আড়তের গোডাউনে আনলোডিং, সেখান থেকে পাইকারি বিক্রেতা এরপর খুচরা বিক্রেতা, সবশেষে ভোক্তা। মাঝে আড়তের অ্যাডভান্স ও ভাড়া, পাইকারি বিক্রেতার গোডাউন ও মাসিক ভাড়া, খুচরা দোকানদারের এডভান্স ও দোকান ভাড়া, ভ্যানওয়ালার ভ্যান বানানো খরচ ও যেখানে বিক্রি করবে সেই জায়গার মাস্তানি ট্যাক্স। সব মিলিয়ে তরমুজ, শসা, ও ড্রাগন পেয়ারা বেচারারা কতবার যে নিজেদের ভ্যালু এ্যাড করেছে, তা তাঁরা নিজেরাও জানেনা।
এখন আমরা যারা ভোক্তা তাঁরা প্রশ্ন করি ১০ টাকার শসা কেন আমরা ৪০ টাকায় কিনবো, কৃষকের নিকট থেকে পিসে কেনা তরমুজ কেন ওজনে কিনবো? কিন্তু এই প্রশ্নগুলো আসলে কার কাছে করছি? এই দাম বৃদ্ধির দায়ভার কার? কে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে? প্রশ্ন সবার, জবাব কারোও কাছে নেই। আমরা জানি অফিস আদালতে বা বাড়িতে ব্যবহৃত কাঁচ ওজনে বিক্রি হয় পাইককিরি ভাবে আর
আমরা কিনে আনি স্কয়ার ফিট হিসেবে, কিন্তু এটা নিয়ে কোন দিনও কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখিনি, আবার কেউ বয়কটের ডাক দিয়েছে এমন প্রমাণও নেই। তাহলে শুধুমাত্র কৃষকের উপর কেন এত ক্ষোভ ও রাগ যে কিছু হলেই কৃষি পণ্য বয়কট করতে হবে।
কৃষক যদি সংগঠিত হয়ে কৃষি পণ্য উৎপাদন বয়কট করে তখন কি হবে? অতিরিক্ত টাকা কি শহরে যে ভ্যানওয়ালা বা দোকানদার খুচরা বিক্রি করছে সে একাই নিচ্ছে, নাকি এই টাকা ট্রাকের ড্রাইভার, ভ্যানচালক, লোড ও আনলোডের লেবার, প্যাকিং লেবার, টোল গ্রহিতা আরোও কতজনের পকেটে গিয়ে তাঁদের সংসার চলে?
আমি ভোক্তা যদি ১০ টাকায় শসা ও পিস হিসেবে তরমুজ খেতে চাই, তাহলে সরাসরি টাকা খরচ করে কৃষকের নিকট গিয়ে কিনে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু সে সময় তো আমাদের কাছে নেই, তাহলে কেন আমরা বারে বারেই কৃষকের ক্ষতি করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছি, তথাকথিত ইউটিউবার ও ফেসবুকিংদের কথায়। আমাদের নাচা বন্ধ করতে হবে, যতদিন না আমরা বুঝবো যে, আমার নাচানাচির কারণে কতটি সংসার ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, ততদিন এ সমস্যার সুরাহা হবেনা।
আমি কাউকে কটাক্ষ বা ছোট করার জন্য কথাগুলো বলিনি, বাস্তবতা তুলে ধরেছি মাত্র। অযথা কেউ কস্ট পাবেন না, কস্ট পেলে জোড় হাতে ক্ষমা চাইছি।
ধন্যবাদ, প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক কৃষক কণ্ঠ।